কেমন হলো ‘মিট দ্য কমরেডস’
Posted: 05 জুলাই, 2026
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কমিটির সিদ্ধান্ত মোতাবেক চলতি বছরের মে ও জুন মাসে সারাদেশে জেলা, উপজেলা ও শাখা পর্যায়ে “মিট দ্য কমরেডস” বা কমরেডদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সবগুলো এখনো শেষ হয়নি, জুলাই মাসের প্রথমার্ধের মধ্যে সমাপ্ত হবে। পার্টি সদস্যদের সাধারণ সভা আমাদের পার্টিতে উপজেলা ও শাখা পর্যায়ে করার কোনো রেওয়াজ নেই, পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তাবিত দলিল ব্যাখ্যার জন্য জেলা-জেলায় সাধারণ সভা করা হয়। ফলে এ বছরের সাধারণ সভাসমূহ পার্টিতে নতুন। উক্ত কর্মসূচি যতটা না রাজনৈতিক, তার চেয়ে বেশি হলো সাংগঠনিক। নেতৃত্বের পক্ষ থেকে সদস্যদের সঙ্গে সাক্ষাতের জন্য সাধারণ সভা। নেতৃত্ব বলতে শুধু কেন্দ্রীয় কমিটি নয়, কেন্দ্রীয় কমিটিসহ জেলা নেতৃত্বকেও বোঝানো হয়েছে।
আমাদের পার্টিতে নেতৃত্বের উপস্থিতিতে সভাসমূহে সাধারণত অতিথি বা উপরের প্রতিনিধি দীর্ঘক্ষণ একটা বক্তৃতা করেন, তারপর উপস্থিত অন্যরা কিছু প্রশ্ন বা অতি সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলেন। কিন্তু এবারের সাধারণ সভা ছিল ভিন্ন ধরনের। এখানে কেউই দীর্ঘক্ষণ বলেন নাই। নেতৃত্ব বলেছেন কম, শুনেছেন অনেক বেশি। প্রশ্ন হলো- কী শুনবেন এবং কেন শুনবেন। আর কেনইবা এই আয়োজন। আমরা জীবন দিয়ে বুঝতেছি যে দেশের অবস্থা ভালো নয়। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা এবং গণঅভ্যুত্থানের আকাঙ্ক্ষার পথে আমাদের দেশ হাঁটছে না। কিন্তু আমরা কী করছি এবং কী করা উচিত, তা সদস্যদের কাছ থেকে সরাসরি শোনা দরকার। কেমন আছেন, কীভাবে আছেন তা-ও জানা দরকার। এসব হলো সাধারণ সভার একটি দিক; কিন্তু অন্য দিকটি পার্টির জন্য বেশি প্রয়োজন। পার্টির ভেতরে কর্মসংস্কৃতি উন্নত করা, সদস্যদের মধ্যে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক বাড়ানো, সকলের সঙ্গে পারস্পরিক ভাব বিনিময় বাড়ানো।
এখন পর্যন্ত ১৮৭টি সাধারণ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আরও সভা হবে এমন খবর পার্টি দপ্তরে আছে। সব মিলিয়ে আড়াইশোর মত হতে পারে। বলতে সমস্যা নেই- সব সভা একরকম হয়নি। সব আয়োজকবৃন্দ এই কর্মসূচি ঠিকমত বুঝে উঠতে পারেননি। এটা ঘাটতির দিক হলেও কিছু ব্যতিক্রম বাদে জেলা নেতৃবৃন্দ ভালোমত সাড়া দিয়েছেন। জেলা নেতৃবৃন্দ উপজেলা ও শাখা নেতৃত্বের মাঝে যোগাযোগ রেখেছেন এবং সভা যেন ভালো হয় সেজন্য পরামর্শ দিয়েছেন সহযোগিতা করেছেন। কেন্দ্রীয় দপ্তর থেকেও নিচের দিকে যথাযথভাবে যোগাযোগ রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। সভাসমূহের উপস্থিতি কোনভাবেই খারাপ নয়। হয়তো কোথাও শতভাগ হয়নি। কিন্তু নব্বই ভাগের বেশি উপস্থিতির খবর কেন্দ্রীয় দপ্তরে রয়েছে। এ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত সভাগুলোর মধ্যে মাত্র তিনটি সভার উপস্থিতি শতকরা পঞ্চাশ ভাগের কম হওয়াতে সেখানে নতুন করে সাধারণ সভা করার তারিখ নির্ধারিত হয়েছে। প্রাপ্ত খবর অনুযায়ী বেশ কয়েকটি সাধারণ সভার আয়োজকরা টাকা জোগাড় করে একবেলা একসাথে খেয়েছেন। নেতৃত্ব যত আন্তরিক হয়েছেন সাধারণ সভা তত ভাল হয়েছে। বড় শহর ও জেলা সদর বাদে উপজেলা ও শাখাসমূহের সাধারণ সভা সাপ্তাহিক ছুটির দিন বাদেও হয়েছে। বৃষ্টি, গরম ও কৃষিকাজের মৌসুম বিবেচনায় সাধারণ সভার উপস্থিতির তারতম্য হয়েছে। সাধারণ সভা যে অন্য সভাগুলোর মত নয়; অর্থাৎ কর্মীসভা বা বর্ধিত সভা নয় তা বেশিরভাগ পার্টি সদস্য বুঝতে পেরেছেন। সদস্যবৃন্দ মন খুলে কথা বলেছেন, প্রশ্ন করেছেন- এবং এ ধরনের সভা আরও আগেই করা উচিত ছিল বলে মত প্রকাশ করেছেন। নানা অভিযোগ ও শৃঙ্খলার কথা বলেছেন এবং ব্যবস্থা গ্রহণের তাগিদও কমরেডরা দিয়েছেন।
সাধারণ সভায় সদস্যবৃন্দ অন্য কথার মধ্যে যে অভিযোগটি জোরের সাথে করেছেন, তা হলো যোগাযোগের ঘাটতির বিষয়। কেন্দ্র ও জেলা নেতৃত্বকে অনেক কমরেড যথাযথভাবেই তাদের কর্মের কথা বলেছেন। যা আগে করেননি। তবে অভিযোগের ক্ষেত্রে সম্পর্কের অবনতি হবে এমন কোনো ভাব পরিলক্ষিত হয়নি।
বেশ কিছু সাধারণ সভায় উপস্থিত থাকতে পেরে আমার নিকট কয়েকটি বিষয়ে খটকা লেগেছে। কেন্দ্রীয় কমিটির আরও কয়েকজন কমরেডের সাথে কথা বলে বুঝেছি ওগুলো সাধারণ প্রবণতা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো–কমরেডরা জাতীয় রাজনীতি নিয়ে বেশি কথা বলার চেষ্টা করেছেন। যদিও এ বিষয়ে ভিন্নতাও থাকতে পারে। পার্টি কমরেডরা কোনো আনুষ্ঠানিক সভার জন্য একত্রে হবেন- যেখানে রাজনীতি আসবে সেটা স্বাভাবিক বিষয়। কিন্তু একটি বিপ্লবী পার্টির সদস্যরা মিলিত হলে শ্রেণি পেশার কথা তো কম হওয়ার কথা নয়। সাধারণ মানুষের জীবন-জীবিকা শ্রেণি-পেশার লড়াই সংগ্রামের-সংগঠনের কথা আসবে, কিন্তু কম এসেছে। এটা আমার অভিজ্ঞতা। অন্য বন্ধুদের ক্ষেত্রে ভিন্নতা হতে পারে। অধিকাংশ সাধারণ সভার সময়ে আমাদের দেশের জাতীয় বাজেটের জন্য সংসদ অধিবেশন চলমান। কিন্তু কোন পেশার মানুষের কী চাহিদা তা তো সাধারণ সভায় সাধারণভাবেও উচ্চারিত হয়নি। আরও দেখলাম আমেরিকার সাথে আমাদের দেশের স্বার্থ ও সার্বভৌমত্ববিরোধী চুক্তি নিয়ে সদস্যদের আগ্রহের ঘাটতি রয়েছে। এসব হয়েছে শ্রেণি পেশার লড়াইয়ের ঘাটতির কারণে। সাধারণ সভায় কমরেডরা কেন লড়াই-সংগ্রামে আগের মত নেই, তা কিন্তু অনেকে বলেছেন। যা নেতৃত্বের জন্য ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য সহায়ক হবে।
সাধারণ সভাসমূহে উপস্থিতির বড় অংশই হলো বেশি বয়সী কমরেড। কম বয়সী কমরেডদের উপস্থিতি খুবই কম। এর মানে হলো কম বয়সী সদস্য আমাদের কম। ঘাটতির এই দিকটি পার্টির জন্য বিপজ্জনক। আরেকটি অসঙ্গতি লক্ষ্যণীয়- নারী সদস্য কম থাকা। যেখানে জনসংখ্যার অর্ধেক হলো নারী সেখানে নারী সদস্যের স্বল্পতা পার্টির জন্য বেমানান। নারী সদস্য ও কম বয়সী সদস্যের ঘাটতি কাটিয়ে উঠার জন্য সাধারণ সভায় কিছু আলোচনা হয়েছে, যা আমাদের দ্রুত কাজে লাগাতে হবে। সাধারণ সভার আরেকটি বিষয় লক্ষ্যণীয়- তা হলো পার্টির অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও ২/৩টি গণসংগঠনের স্থবিরতার কথা। কমরেডরা বিরক্তি প্রকাশ করেছেন এবং গঠনতান্ত্রিকভাবে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আহ্বান করেছেন। পার্টি নেতৃত্বকে কমরেডদের এই আহ্বানকে সম্মান জানিয়ে ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করতে হবে।
পার্টি সদস্যদের সাধারণ সভাকে আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর করার জন্য কিছু কাজ করা প্রয়োজনীয় মনে হয়েছে। পারস্পরিক সম্পর্ককে উন্নত করার জন্য এবং পার্টির ভেতরে সৌহার্দ ফিরিয়ে আনার তাগিদে সভাগুলো আর একটু বেশি সময় ধরে করা প্রয়োজন। গান, কবিতা, পুথিপাঠ, গল্প বলা, বয়স ভেদে ছোট-ছোট প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে পারলে ভালো হতো। হাসি-ঠাট্টা-চুটকি বলার মধ্য দিয়ে ভেতরের জড়তা দূর করার চেষ্টা করা। ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণের জন্য সাধারণ সভার শিক্ষা আমাদের কাজে লাগাতে হবে। সাধারণ সভাসমূহে জেলাভিত্তিক ও কেন্দ্রীয় মূল্যায়ন প্রয়োজন। সাধারণ সভায় কতজন সদস্য সরাসরি উপস্থিত হয়েছেন এবং কতজন অনুপস্থিত সদস্যের সাথে নেতৃত্ব সাক্ষাৎ করেছেন, তার একটি পূর্ণাঙ্গ পরিসংখ্যান আমাদের করতে হবে। আরও একটি কথা না বলে পারছি না- তা হলো আমার দেখা সাধারণ সভাগুলোতে সমাজতন্ত্র-মার্ক্সবাদের কথা কম উচ্চারিত হওয়া। পার্টির চলতি করণীয় ও ভবিষ্যৎ নীতিগত অবস্থান নিয়ে উপস্থিত কমরেডরা তেমন প্রশ্ন করেননি। অন্য বন্ধুদের অভিজ্ঞতা ভিন্ন হলে ভালো। নেতৃত্বের একটি লাভ লক্ষ্যণীয়। একটি সভার শিক্ষা অন্য সভায় কাজে লাগানো। দৈনন্দিন পার্টি শিক্ষা ও চর্চার অভাব সাধারণ সভায় উঠে এসেছে। সাধারণ সভার সময় কেন্দ্র থেকে যে পত্রটি আমরা দিয়েছি, তার ভাষা কিছুটা কঠিন হলেও ভবিষ্যতে কাজে লাগবে বলে মনে হয়েছে। আরেকটি বিষয় ভবিষ্যতে আমাদের করতে হবে- তা হলো সভায় বই বিক্রির ব্যবস্থা করা। যে আশা নিয়ে সাধারণ সভার কর্মসূচি নেয়া হয়েছিল- সেক্ষেত্রে বরফ গলবে বলে মনে হয়েছে। মানুষের সাথে থাকার শিক্ষা কাজে লাগাবার রূপকার লেনিনের আহ্বানকে পার্টি গড়ার ক্ষেত্রে কাজে লাগাতে হবে। এ ধরনের সাধারণ সভা চলমান রাখা প্রয়োজন। শিখব-শেখাব, সমাজতন্ত্রের জন্য লড়াইয়ের উপযুক্ত পার্টি গড়ে তুলবো।
লেখক: প্রেসিডিয়াম সদস্য, সিপিবি, কেন্দ্রীয় কমিটি