রাষ্ট্র-সংবিধান-সংসদ এবং বাজেট প্রসঙ্গ

Posted: 05 জুলাই, 2026

সংসদে আগামী বছরের জন্য বাজেট প্রস্তাব পেশ ও অনুমোদন করা হয়েছ। বাজেট হলো সরকারের বাৎসরিক আয়-ব্যয়ের পরিকল্পনা ও হিসাবপত্রের বিবরণ। রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে বাজেট বহুমাত্রিক গুরুত্ব বহন করে। দেশের মালিক যদি হয় জনগণ, তাহলে দেশ তথা রাষ্ট্রের বাজেট নির্ধারণের কর্তৃত্বও থাকার কথা জনগণের হাতে। বুর্জোয়া ব্যবস্থায় যেহেতু দাবি করা হয় যে নির্বাচিত সংসদই হলো জনগণের কর্তৃত্ব প্রয়োগের প্রতিনিধিত্বশীল সংস্থা, তাই রাষ্ট্রের বাজেট প্রণয়নের অধিকার এককভাবে একমাত্র নির্বাচিত সংসদেরই রয়েছে। একাত্তরে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের সে সময়কালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ১৯৭২ সালের জন্য ৭৮৬ কোটি টাকার যে প্রথম বাজেট প্রণয়ন করেছিলেন তা সংসদেই পাস হয়েছিল। ১৯৭৫ সাল পর্যন্ত বাজেট প্রণীত ও অনুমোদিত হয়েছিল সংসদে। এরপর সামরিক শাসনের অধ্যায় শুরু হলে রাষ্ট্রপতির অধ্যাদেশের মাধ্যমে জারিকৃত নির্বাহী আদেশে, অথবা সামরিক কর্তৃপক্ষের ইচ্ছা অনুসারে গঠিত (ভুয়া!) সংসদে রাষ্ট্রের বাজেট প্রণীত হতো। নব্বইয়ে দেশে ফিরে এসেছিল সাংবিধানিক শাসন। পরবর্তী ৩৬ বছরে, দুটি সময়কাল ছাড়া, প্রতিবারই জাতীয় সংসদে বাজেট পেশ করা ও পাস করা হয়েছে। প্রথম ব্যতিক্রমটি ঘটেছিল একটানা আওয়ামী শাসনকালে। তখন সুষ্ঠু নির্বাচনের বদলে কারচুপি দ্বারা গঠিত ভেজাল ও ভুয়া সংসদে বাজেট পাস করার নাটক মঞ্চস্থ করা হতো। দ্বিতীয় ব্যতিক্রমটি ছিল অ-নির্বাচিত অন্তর্বর্তীকালীন সরকার হয়েও ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রাখা ইউনূস সরকারের রাষ্ট্রপতির ফরমান জারি করে প্রশাসনিক নির্দেশ দ্বারা ২০২৫ সালের বাজেট ঘোষণাকালে। ২০২৬ সালে সংবিধান অনুসারে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে সংসদ গঠিত হয়েছে। সেই সংসদে সাংবিধানিক বিধি মোতাবেক বাজেট প্রস্তাব পেশ ও তা নিয়ে আলোচনা শেষে সেখানে সে বাজেট অনুমোদন করা হয়েছ। বহু বছর পর বাজেট প্রণয়নে সংসদের অধিকার ফিরে এসেছে। ছাত্র-জনতার এক ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থান সেটাকে সম্ভব করেছে। সেকারণে রাজনীতির খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও মৌলিক অনেক বিষয় নিয়ে কথা উঠেছে, বিতর্ক উঠেছে- অথবা বলা যায়- নানা দুরভিসন্ধি থেকে উঠানো হয়েছে। কিন্তু অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অভিজ্ঞতা ও তত্ত্বের ভিত্তিতে, যুক্তির আলোকে এবং প্রয়োজনীয় গভীরতা নিয়ে সেসব বিষয়ে আলোচনা হয়নি। ধারণার অস্পষ্টতা ও ধোঁয়াশার ওপর দাঁড়িয়ে এমন সব বিতর্কেরও অবতারণা করা হয়েছে যার উদ্দেশ্য স্রেফ প্রতারণা ষড়যন্ত্রের জাল বোনা ও যেনতেন উপায়ে শোষিত শ্রেণির সংগ্রামকে বিপথগামী করা। উদ্দেশ্য হালকা বিষয়ে কূটতর্কে মানুষের মনোযোগ আটকে ফেলা। রাষ্ট্র সংবিধান সংসদ ও বাজেট এই বিষয়গুলো নিয়ে হুমকি-ধামকি, যুক্তিহীন আপ্তবাক্যের ফুলঝুরি থাকলেও যুক্তির উপাদান ছিল প্রায় শূন্য। তাতে রাজনীতি সম্পর্কে মানুষের শিক্ষা ও জ্ঞান বিকৃত ও খর্ব করার চেষ্টা হয়েছে। সেসব বিষয়ের দু’একটি আজ আলোচনায় আনবো। ১। দেশ ও রাষ্ট্র জনগণের সম্মতি ছাড়াই ‘মব সন্ত্রাসের’ জোরে পাকিস্তানী ধাঁচের সংবিধান, কিংবা কমসে কম সংবিধান সংস্কারের নামে তার কিছু মৌলিক বিধানের অনুরুপ সংস্কার জবরদস্তিমূলকভাবে চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল। ইতিহাস থেকে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধকে মুছে ফেলতে, নিদেনপক্ষে তার মর্মবাণীর অপসারণ ঘটিয়ে দেশের অস্তিত্বকে বিনষ্ট করতে কিছু মহল জানপ্রাণ দিয়ে নেমেছিল। এদের যুক্তি–যে সংবিধান আওয়ামী ফ্যাসিস্ট দুঃশাসন, অতীতে একদলীয় বাকশালী শাসন ইত্যাদির জন্ম দিয়েছে দেশবাসী তার বিরুদ্ধে ২০২৪’এর গণঅভ্যুত্থান সংগঠিত করেছে। তাই এই সংবিধান বাতিল করতে হবে। ‘২৪ এবং ‘৪৭-এ পাকিস্তান সৃষ্টির ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে নতুন সংবিধান রচনা করতে হবে। এসব যে ভ্রান্ত ও দেশদ্রোহী কথা তার কারণ: ক) গণঅভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের দাবি অভ্যুত্থান চলাকালে দেয়ালে দেয়ালে আঁকা গ্রাফিতিগুলোতে উৎকীর্ণ ছিল। এসবের সবগুলোতে লেখা ছিল “স্বাধীনতা এনেছি, সংস্কারও আনবো”। কেউ বলতে পারবে না যে কোনো একটি গ্রাফিটিতেও সংবিধান বাতিল করে নতুন সংবিধান রচনার কথা উৎকীর্ণ ছিল। নিছক ষড়যন্ত্রমূলক অভিসন্ধি থেকেই যে কৃত্রিমভাবে এই বিষয়টিকে মাস্টারমাইন্ড টিমের দ্বারা জোর করে আরোপ করার চেষ্টা হয়েছিল, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।। খ) একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ শুধু নয় মাসের সশস্ত্র যুদ্ধের ঘটনা, কিংবা সে সময়কার কোন বিশেষ মাস্টারমাইন্ডের মস্তিষ্কপ্রসূত একক বা গোষ্ঠীগত প্রজেক্ট, অথবা কোনো ষড়যন্ত্রমূলক বিচ্ছিন্নতাবাদী প্রয়াস ছিল না। এটি ছিল দীর্ঘদিন ধরে এদেশের গণমানুষের শত সংগ্রামের ধারায় গড়ে ওঠা জাতীয় মুক্তি সংগ্রামের অংশ। মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীন দেশ প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি পরিত্যক্ত রাষ্ট্রের ভিত্তি-চরিত্র-নীতি-আদর্শকে বদলে দিয়ে নতুন প্রগতিশীল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন অধ্যায় সূচনার এক ঐতিহাসিক যুগান্তকারী ঘটনা। এর সাথে আগে পরের গণঅভ্যুত্থানের তাৎপর্যকে এক পাল্লায় তুলনা করা যায় না। গ) ধারাবাহিক গণসংগ্রামের ধারায় যে অভিনব ঐক্য গড়ে উঠেছিল, তাকে ভিত্তি করেই পরিচালিত হয়েছিল মুক্তি সংগ্রামের শীর্ষ সশস্ত্র পর্ব। একাত্তরের ১০ এপ্রিল ঐতিহাসিক ‘স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রের’ পেছনে দেশবাসী সমবেত হয়ে দেশকে হানাদার বাহিনীর দখল থেকে মুক্ত করার সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল। ঘ) সংগ্রামের দীর্ঘকালীন প্রক্রিয়ায় প্রধান দুটি স্রোতধারা তথা- বামপন্থি ধারা ও বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী ধারা গড়ে তুলেছিল মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি। মুক্তিযুদ্ধ ক্রমে বিশ্বশক্তির মেরুকরণ ঘটিয়েছিল। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে দৃঢ়ভাবে ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নসহ সমাজতান্ত্রিক দুনিয়া, জোট নিরপেক্ষ আন্দোলনের রাষ্ট্রীয় ও জনগণের শক্তি, গণতান্ত্রিক ভারত প্রভৃতি দেশ। বিপক্ষে ছিল মার্কিন নেতৃত্বাধীন সাম্রাজ্যবাদী দুনিয়া, গণচীনের তাৎকালীন ভ্রান্ত নেতৃত্ব, মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিক্রিয়াশীল মৌলবাদী শক্তি ইত্যাদি। ইতোপূর্বে গণসংগ্রামের মধ্য দিয়ে ক্রমাগত শক্তিশালী হতে থাকা র্যাডিকাল উপাদান মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে আরো উপযুক্ত শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল। এর মূল কারণ সমস্ত মুক্তিযোদ্ধাদের মধ্যে ৭০ শতাংশ ছিল শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ। তাই, স্বধীনতার পর ক্ষমতাসীন বুর্জোয়া জাতীয়তাবদী শক্তির সরকারের পক্ষে এই র্যাডিকালাইজেশনের বিরুদ্ধে সরাসরি অবস্থান নেয়ার সুযোগ তেমন ছিল না। এমন এক পটভূমিতে ‘৭২ সালে রচিত সংবিধানের মূল ভিত্তি প্রগতির ধারায় রচিত হওয়া অনেকটাই অবধারিত ছিল। কিন্তু সংবিধানে কিছু গুরুতর ভুল, ত্রুটি, ঘাটতি রয়ে গিয়েছিল। এক্ষেত্রে করণীয় হলো সংবিধানের মূল ভিত্তি ঠিক রেখে তার উপযুক্ত ‘সংশোধন’ করা- তা ‘বাতিল’ করা নয়। সংবিধান সংশোধনের বিধান সংবিধানেই আছে, তাই এ বিষয়ে কোনো সমস্যা থাকার কারণ নেই। ঙ) বাকশাল, সামরিক শাসন, ফ্যাসিবাদী দুঃশাসন ইত্যাদি রাজনীতিতে যেসব বিচ্যুতি, দুরাচার, গণতন্ত্রহীনতা সৃষ্টি হয়েছে সেজন্য দেশের সংবিধান দায়ী নয়, বরং সংবিধান অনুসরণ না করার কারণেই সেসবের জন্ম সম্ভব হয়েছে। ২। সংবিধান ও সংসদ দেখা গেল যে ইতিহাসের প্রক্রিয়ায় রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে ভিত্তি করে সংবিধান রচিত হয়। সে সংবিধান সংশোধন করা যায়, কিন্তু রাষ্ট্র বিলুপ্ত না করে তা বাতিল করার কোনো সুযোগ নেই। প্রশ্ন হলো- একটি সার্বভৌম সংসদও কি তা করতে পারে না? না, পারে না। কারণ, সংবিধান হলো সংসদের স্রষ্টা। কিন্তু সংবিধানের স্রষ্টা সংসদ নয়, তার স্রষ্টা হলো রাষ্ট্র। ৩। সংসদ ও বাজেট যুক্তির ধারাবাহিকতায় তাই দেখা যাচ্ছে যে ইতিহাসের ক্রান্তিকালে যে রাষ্ট্রের সৃষ্টি হয়, তা হয় অন্যান্য সব রাজনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি। তাকে অবলম্বন করে প্রণীত হয় রাষ্ট্রের সংবিধান। সংবিধানের আলোকে গঠিত হয় সংসদ। সংসদ প্রণয়ন করে রাষ্ট্রের বাজেট। একমাত্র সংসদেরই যে বাজেট প্রণয়নের ক্ষমতা আছে তার প্রমাণ আমরা পাই ব্রিটিশ শাসনের হাত থেকে আমেরিকার স্বাধীনতার জন্য উত্থাপিত প্রধান যুক্তি থেকে। আমেরিকার নাগরিকরা ব্রিটিশ রাজাকে কর দেয়া বন্ধ করার পেছনে প্রধান যে যুক্তি দিয়েছিল তা হলো– “ঘড় ঃধীধঃরড়হ রিঃযড়ঁঃ ৎবঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ” (প্রতিনিধিত্ব নেই যেখানে, কর কেন থাকবে সেখানে)। সংসদ বাজেট প্রণয়ন করবে। কিন্তু তার কি আপন খেয়াল খুশি মতো যেমন ইচ্ছা তেমন বাজেট প্রণয়ন করার অধিকার আছে? আমি বলবো- নেই! কারণ, সংসদ যেহেতু সংবিধানের সৃষ্টি তাই সংবিধানের মূলনীতি লঙ্ঘন করার অধিকার তার নেই। আবার, সংবিধানও যেহেতু রাষ্ট্রের মৌলিক ভিত্তিমূলক দর্শনের আলোকে প্রণীত, তাই কোনো বাজেট রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা-দর্শনের বাইরে রচিত হতে পারে না। কিন্তু ২০২৬ সালের বাজেট সংসদের অনুমোদন পেলেও তাকে কি সংবিধান সম্মত বলা যায়? বাজেট হলো রাষ্ট্রের অর্থনীতি সম্পৃক্ত একটি বিষয়। তাই দেখা যাক, সংবিধানে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি, দর্শন, লক্ষ্য সম্পর্কে কী বলা হয়েছে। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগের পঞ্চদশ অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে–“রাষ্ট্রের অন্যতম দায়িত্ব হইবে পরিকল্পিত অর্থনৈতিক বিকাশের মাধ্যমে উৎপাদন শক্তির ক্রমবৃদ্ধিসাধন এবং...নাগরিকদের জন্য..(ক) অন্ন, বস্ত্র, আশ্রয়, শিক্ষা ও চিকিৎসাসহ জীবনধারণের মৌলিক উপকরণের ব্যবস্থা;...।” এখানে স্পষ্টতই ‘পরিকল্পিত অর্থনীতি’-এর কথা–সমাজতন্ত্রের লক্ষ্যের কথা বলা হয়েছে। তাছাড়া, খসড়া সংবিধান-প্রণয়ন কমিটির রিপোর্টের ১২নং প্যারাগ্রাফে বলা হয়েছে, “সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের কাছে আমাদের যে প্রতিশ্রুতি রয়েছে, সম্পত্তির অধিকার সম্পর্কিত বিধানগুলোতে তার প্রতিফলন ঘটেছে। ...সমাজতান্ত্রিক অর্থ-ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাকল্পে যেসব আইন প্রণীত হবে, সেগুলো বিচার বিভাগীয় পর্যালোচনার আওতায় পড়বে না।” সংবিধানের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, “যে সকল মহান আদর্শ আমাদের বীর জনগণকে...প্রাণোৎসর্গ করিতে উদ্বুদ্ধ করিয়াছিল–জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সেই সকল আদর্শ এই সংবিধানের মূলনীতি হইবে।” প্রস্তাবনায় আরো বলা হয়েছে, “রাষ্ট্রের মূল লক্ষ্য হইবে...এমন এক শোষণমুক্ত সমাজতান্ত্রিক সমাজের প্রতিষ্ঠা–যেখানে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক সাম্য, স্বাধীনতা ও সুবিচার নিশ্চিত হইবে।” সংবিধানের দ্বিতীয়ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি প্রসঙ্গে একেবারে শুরুতেই অষ্টম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা–এই নীতিসমূহ...রাষ্ট্রপরিচালনার মূলনীতি বলিয়া পরিগণিত হইবে।’ তারপরে ১০ম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে, “মানুষের ওপর মানুষের শোষণ হইতে মুক্ত, ন্যায়ানুগ ও সাম্যবাদী সমাজলাভ নিশ্চিত করিবার উদ্দেশ্যে সমাজতান্ত্রিক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করা হইবে।” ১৩তম অনুচ্ছেদে মালিকানা সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘উৎপাদনযন্ত্র, উৎপাদন ব্যবস্থা ও বণ্টনপ্রণালীসমূহের মালিক বা নিয়ন্ত্রক হইবেন জনগণ এবং এই উদ্দেশ্যে মালিকানা-ব্যবস্থা নিম্নরূপ হইবে: (ক) রাষ্ট্রীয় মালিকানা, অর্থাৎ অর্থনৈতিক জীবনের প্রধান প্রধান ক্ষেত্র লইয়া সুষ্ঠু ও গতিশীল রাষ্ট্রায়ত্ত সরকারি খাত সৃষ্টির মাধ্যমে জনগণের পক্ষে রাষ্ট্রের মালিকানা; (খ) সমবায়ী মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে সমবায়সমূহের সদস্যদের পক্ষে সদস্যদের পক্ষে সমবায়সমূহের মালিকানা এবং (গ) ব্যক্তিগত মালিকানা, অর্থাৎ আইনের দ্বারা নির্ধারিত সীমার মধ্যে ব্যক্তির মালিকানা।’ লক্ষ্যণীয় যে, সংবিধানে রাষ্ট্রীয় মালিকানাকে প্রাধান্য দিয়ে সমবায়ী ও ব্যক্তি মালিকানাকে আইনের দ্বারা সীমাবদ্ধকৃত অবশিষ্টাংশ সম্পদ (ৎবংরফঁধষ)-হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। তার পরপরেই ১৪তম অনুচ্ছেদে বলা হয়েছে যে, ‘রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব হইবে মেহনতি মানুষকে-কৃষক ও শ্রমিককে- এবং জনগণের অনগ্রসর অংশসমূহকে সকল প্রকার শোষণ হইতে মুক্তি প্রদান করা।’ ২০তম অনুচ্ছেদে কর্মসংস্থান ও কর্ম সম্পর্কে বলা হয়েছে, “কর্ম হইতেছে কর্মক্ষম প্রত্যেক নাগরিকের পক্ষে অধিকার, কর্তব্য ও সম্মানের বিষয় এবং ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে যোগ্যতানুসারে ও প্রত্যেককে কর্মানুযায়ী’- এই নীতির ভিত্তিতে প্রত্যেকে স্বীয় কর্মের জন্য পারিশ্রমিক লাভ করিবেন।” উল্লেখ্য যে এখানে ‘প্রত্যেকের নিকট হইতে...কর্মানুযায়ী’ সংবিধানের এই কোটেশনে উদ্ধৃত অংশটি মার্কস-এঙ্গেলস রচিত ‘কমিউনিস্ট ইশতেহার’ থেকে হুবহু উদ্ধৃত করা হয়েছে। পরিবর্তিত বিশ্ব পরিস্থিতির কথা তুলে সমাজতন্ত্রকে বাদ দেয়া অথবা পুনঃসংজ্ঞায়িত করার কথা কেউ কেউ বলে থাকেন। ‘সমাজতন্ত্র’ বাদ দেয়ার অর্থ দাঁড়াবে মুক্তিযুদ্ধের ধারার গুরুতর অঙ্গহানি ঘটিয়ে তাকে পরিত্যাগ করা। সোভিয়েত ইউনিয়ন থাকা বা না-থাকার ওপর রাষ্ট্রীয় মূলনীতি হিসেবে ‘সমাজতন্ত্র’ থাকবে কি থাকবে না তা নির্ধারিত হওয়া উচিৎ বলে যদি যুক্তি তোলা হয়, তাহলে একই যুক্তিতে দেশের স্বাধীনতা অর্জনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করা থেকে কাউকে বিরত রাখার কারণ থাকে না। অতএব, যুক্তির কথা হলো- গত ৫০ বছর ধরে যে নীতি-দর্শনের ধারার অনুরুপ ধারায় এবারের বাজেট প্রণীত হয়েছে তা বহাল রাখলে মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রকে বাতিল করতে হয়। অন্যদিকে, মুক্তিযুদ্ধের রাষ্ট্রকে বহাল রাখতে হলে বাজেটকে বাতিল করতে হয়। এর মধ্যে কোনটা করতে হবে তা নিয়ে দ্বিধা আছে কি? না থাকলে আগের মতো আবার জান বাজি করে নেমে পড়ুন! হাঁক দিয়ে ডাকুন–“জাগো, বাহে, কোনঠে সবায়?”