সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 05 জুলাই, 2026

একতা ডেস্ক : এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের সংখ্যা-৩২ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১৬তম কিস্তি। (১৬) মুক্তিযোদ্ধাদের অবশ্য পালনীয় রাজনৈতিক নীতিমালা আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশের বুক হইতে পাকিস্তান সরকারের দখলকারী হানাদার বাহিনীকে বিতাড়িত করিয়া দেশকে মুক্ত করা এবং সাধারণ মানুষের সুখ শান্তির ব্যবস্থা করার জন্য আমাদের এই বাহিনী গঠিত। বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন, সুখী, সমৃদ্ধিশালী, শান্তিপূর্ণ ও প্রগতিকামী গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠা করা আমাদের প্রতিজ্ঞা। আমাদের এই বাহিনী জনসাধারণের নিজেদের বাহিনী। এই বাহিনী শুধুমাত্র শত্রুর বিরুদ্ধে সশস্ত্র লড়াই চালাইবে না, দেশের জনসাধারণকে রাজনৈতিকভাবে সচেতন ও সংগঠিত করাও ইহার কাজ। এই বাহিনীর প্রত্যেক সৈনিককে নিম্নোক্ত রাজনৈতিক নীতিমালা অবশ্যই মানিয়া চলিতে হইবে। এক । আমাদের লক্ষ্য মনে রাখিতে হইবে, আমাদের আজিকার সশস্ত্র লড়াইয়ের লক্ষ্য হইল, আমাদের মাতৃভূমি বাংলাদেশকে একটা স্বাধীন, সার্বভৌমত্ব, গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্ররূপে প্রতিষ্ঠা করা এবং ইহার সাড়ে সাত কোটি মানুষের প্রকৃত মুক্তি সাধন করা। দুই । আমাদের শত্রু -এই সশস্ত্র লড়াইয়ে আমাদের শত্রু হইল : পাকিস্তানের সামরিক সরকার ও সামরিক বাহিনী, তাদের এদেশীয় দালালেরা এবং মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও পাকিস্তান সরকারের সহযোগি অন্যান্য সাম্রাজ্যবাদী শক্তি। -শ্রেণীগতভাবে আমাদের শত্রু হইল : পশ্চিম পাকিস্তানের একচেটিয়া পুঁজিপতিগোষ্ঠী ও সেখানকার সামন্ত-ভূস্বামীরা এবং এই উভয় শ্রেণীর সহযোগি দালালরা। -দলগতভাবে আমাদের শত্রু হইল মুসলিম লীগ, জামাতে ইস্লামী, নেজাম ইস্লাম ও পাকিস্তান ডেমোক্র্যাটিক পার্টি। -মনে রাখিতে হইবে, চীনের নেতারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতা করিতেছে ও আমাদের শত্রুকে সাহায্য করিতেছে। দেশের মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী এখানকার চীন পন্থীদের সম্পর্কে হুঁশিয়ার থাকিতে হইবে। তিন । আমাদের শক্তি -এই সংগ্রামে আমাদের প্রধান শক্তি হইল : বাংলাদেশের আপামর জনসাধারণ, তথা-এখানকার শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক সমাজ, ছাত্র যুবক মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবি সম্প্রদায়, ধনিকশ্রেণী ও জোতদারগণ। -এই সংগ্রামে প্রধান শক্তি হিসাবে যাহাদের উপর আমাদিগকে নির্ভর করিতে হইবে আহারা হইলেন শ্রমিক কৃষক ছাত্র-যুবক ও মেহনতী সাধারণ মানুষ। -মনে রাখিতে হইবে, জনতার শিবিরে সবচেয়ে দুর্বল অংশ হইল বড় বড় জোতদারগণ। ইহাদের ভূমিকা সম্পর্কে সতর্ক থাকিতে হইবে। চার । আমাদের মিত্র -এই সংগ্রামে আমাদের নিকটতম মিত্র হইল : পশ্চিম পাকিস্তানের নিপীড়িত জাতিসমূহ ও সেখানকার শোষিত জনগণ। আমাদের একই শত্রুর দ্বারা তাহারাও নিপীড়িত ও শোষিত হইতেছে। -আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে প্রতিবেশী ভারতের জনগণ, গণতান্ত্রিক শক্তি ও সরকার; সোভিয়েট ইউনিয়ন ও সমাজতান্ত্রিক শিবিরের দেশসমূহ; ভিয়েৎনাম সহ বিশ্বের স্বাধীনতা, শান্তি ও গণতন্ত্র ও প্রগতিকামী জনগণ-তাহাদের দল, সংগঠন ও রাষ্ট্রসমূহ আমাদের নির্ভরযোগ্য মিত্র। পাঁচ । সরকার সম্পর্কে -বর্তমান বাংলাদেশ সরকারকে আমরা বৈধ ও ন্যায়সঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠিত সরকার হিসাবে স্বীকার করি। ছয় । আমাদের সহযোগি -স্বাধীনতা সংগ্রামের সাফল্যের জন্য আমরা বাংলাদেশ সরকার, বাংলাদেশ বাহিনী, মুক্তিবাহিনী এবং দেশের স্বাধীনতার সশস্ত্র সংগ্রামে যাহারা অংশগ্রহণ করিতেছেন তাহাদের সহিত সর্বস্তরে সহযোগিতা করিয়া কাজ করিব। সাত । জাতীয় মুক্তিফ্রণ্ট সম্পর্কে -বাংলাদেশকে পরিপূর্ণভাবে শত্রুর কবলমুক্ত করিয়া স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে অংশগ্রহণকারী শক্তির সমবায়ে জাতীয় মুক্তিফ্রণ্ট গঠন করা আমাদের নীতি। সর্বক্ষেত্রে নীতির স্বপক্ষে কাজ করিতে হইবে। -আওয়ামী লীগ, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ), বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি, ভাসানী গ্রুপ, ছাত্র ইউনিয়ন ও ছাত্র লীগ এবং অন্যান্য সংগ্রামরত শক্তির সমবায়ে জাতীয় মুক্তিফ্রণ্ট গঠন করার জন্য চেষ্টা চালাইতে হইবে। আট । কতকগুলি বিধি-নিষেধ নিম্নোক্ত বিধি-নিষেধগুলি বাহিনীর প্রত্যেক যোদ্ধা ও সংগঠককে অবশ্যই মানিয়া চলিতে হইবে। জনগেণর স্বেচ্ছামূলক সহযোগিতার উপর নির্ভর করিতে হইবে। জনসাধারণের উপর কেন প্রকার জুলুম জবরদস্তি ও অন্যায় আচরণ করা চলিবে না। জনসাধারণের স্বেচ্ছামূলক সাহায্য গ্রহণ করা চলিবে। মুক্তিবাহিনীর সশস্ত্র সদস্যরা ব্যক্তিগত স্বার্থে কোন অর্থ সংগ্রহ করিতে পারিবেন না। সর্বক্ষেত্রে সর্ব অবস্থায় নারী জাতির প্রতি সম্মান ও শ্রদ্ধা পোষণ করিতে হইবে। ইহার ব্যতিক্রম চলিবে না। অবাংগালী জনসাধারণ যাহারা শত্রুর সহিত প্রত্যক্ষভাবে জড়িত নয় তাহাদিগকে পক্ষে পাওয়ার চেষ্টা করিতে হইবে। অবাংগালী জনসাধারণকে ঢালাওভাবে শত্রু বিবেচনা করা চলিবে না। বিভিন্ন পেশা ও স্তরের জনসাধারণের সহিত একত্রে থাকিতে গিয়া যথাসম্ভব তাহাদের কাজকর্মে শরীক হইতে হইবে। কোন প্রকার হুকুমদারী চলিবে না। গ্রাম্য দলাদলির উর্ধে থাকিতে হইবে। কোন যুক্তিতেই ইহাতে জড়িত হওয়া চলিবে না। সাম্প্রদায়িকতা ও আঞ্চলিকতার উর্ধে থাকিতে হইবে। কোন যুক্তিতেই এই ধরনের সংকীর্ণতার প্রশ্রয় দেওয়া চলিবে না, কাহারও ধর্ম বিশ্বাস ও রীতি নীতিকে ক্ষুন্ন করা চলিবে না। সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার দিকে সব সময় নজর রাখিতে হইবে। এ ব্যাপারে অমনোযোগী হইলে চলিবে না। ৩১/৮/৭১ চলবে