পাটকল বন্ধে কর্মহীন হাজারো শ্রমিক

Posted: 28 জুন, 2026

খুলনা অঞ্চলে জুট মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের আকাশ আর চিমনির ধোঁয়ায় ভারী হয় না। বরং থমকে থাকা বাতাস এখন হাজারো কর্মহীন মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে। বন্ধ কারখানার জরাজীর্ণ দেয়ালে কান পাতলে আজও যেন মেশিনের সেই চেনা শব্দ শোনা যায়, যা এখন কেবলই এক যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি। মিলের সাইরেন শুনে যেখানে একসময় পুরো শহর জেগে উঠেছে, সেখানে এখন শ্মশানের নিস্তব্ধতা। শ্রমিক কলোনিগুলোতে আগের সেই প্রাণের স্পন্দন হারিয়ে গেছে। প্রতিটি ঘরে জমেছে অনিশ্চয়তা আর অভাবের কালো বাণের তীব্র আঘাত। পাকিস্তান আমল থেকে খুলনার পরিচিতি শিল্পনগরী হিসেবে। পাটকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠেছিল মূল শিল্প। সেটি এখন নানান কারণে বিপর্যয়ের মুখে। যশোরের নওয়াপাড়া থেকে খুলনার খালিশপুর পর্যন্ত বিস্তৃত এলাকাই মূলত শিল্পাঞ্চল হিসেবে পরিচিত। শুধু শ্রমিক আন্দোলনই নয়, স্বাধিকার সংগ্রাম ও মুক্তিযুদ্ধেও এখানকার শ্রমিকদের ছিল গৌরবময় অবদান। এই এলাকায় রয়েছে নয়টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন ও বেশকিছু বেসরকারি পাটকল। রয়েছে ব্যাটারি, আটা-ময়দা, ক্যাবল, বিদ্যুৎ, সিমেন্টসহ বিভিন্ন ধরনের কারখানা। এর বাইরে খুলনার রূপসা, দিঘলিয়া এলাকায় আরও বেশকিছু শিল্প গড়ে উঠেছে। এই জেলায় পাটকল আছে তিন ধরনের- ১) রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন, ২) পূর্বের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বর্তমানে বেসরকারি, ৩) শুরু থেকেই বেসরকারি। তৃতীয় ভাগের পাটকলগুলো বেশ ভালোভাবেই উৎপাদনে আছে, যদিও এখানকার কর্মপরিবেশ আর শ্রমিকদের মজুরি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শ্রমিকনেতারা। স্বাধীনতার অব্যবহিত পরে চলমান ৭৭টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকলের বিপরীতে এখন দেশে রয়েছে মাত্র ২৬টি। এর মধ্যে খুলনা ও যশোরেই রয়েছে ৯টি; যশোর জুট ইন্ডাস্ট্রিজ (জেজেআই), কার্পেটিং, ইস্টার্ন, আলিম, ক্রিসেন্ট, প্লাটিনাম জুবিলী, স্টার, দৌলতপুর ও খালিশপুর জুটমিল। এই পাটকলগুলো এখন সারা বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিত হয়ে গেছে বারবার শ্রমিক আন্দোলনের কারণে। দীর্ঘদিন আন্দোলন করে বকেয়া মজুরি আদায় করেছিলেন শ্রমিকেরা। আবারও বেতন বাকী। আবারও আন্দোলন চলমান রয়েছে। শ্রমিকদের মূল দাবি ছিল ২০১৫ সালে ঘোষিত মজুরি কমিশনের পূর্ণ বাস্তবায়ন। সরকার এবং বিজেএমসি এই ব্যাপারে পুরোপুরি নীরবতা পালন করায় ফুঁসে ওঠেন শ্রমিকেরা। গেটসভা, ভুখা মিছিল, প্রতীক অনশন, ২৪ ঘণ্টা ধর্মঘট পালনের পরও দাবি আদায় না হওয়ায় আমরণ অনশন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। খুলনায় পাটকল শিল্প সুরক্ষায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকল সিবিএ-নন সিবিএ সংগ্রাম পরিষদ এই আন্দোলনে নেতৃত্ব দিচ্ছে। শ্রমিকদের অভিযোগ, সরকার যে ৬টি সেক্টরে নিম্নতম মজুরি ঘোষণা করে, তার মধ্যে ৫টিতেই এর বাস্তবায়ন করা হয়েছে, শুধুমাত্র পাটকল সেক্টরে প্রদান করা হয়নি। বাংলাদেশে আগের তুলনায় পাটের আবাদ সামান্য হ্রাস পেলেও এখনো সারা বিশ্বের মোট উৎপাদিত পাটের ২৬ শতাংশ বাংলাদেশেই হয় এবং এই হ্রাসের কারণে তেমন কোনো প্রভাবও নেতিবাচকভাবে পড়েনি। তাহলে পাট শিল্পের প্রতি সরকারের এই বিমাতাশুলভ আচরণ কেন- প্রশ্ন পাটকল শ্রমিকদের। বর্তমানে রাষ্ট্রীয় পাটকলের স্থায়ী শ্রমিকদের মাসিক সর্বনিম্ন বেতন ৪১৫০ টাকা। সর্বশেষ ঘোষিত মজুরি কমিশনে এটি বাড়িয়ে ৮৩০০ টাকা করলেও তার বাস্তবায়ন না থাকায় বিক্ষুদ্ধ পড়েছেন শ্রমিকেরা। কাগজে-কলমে সারাদেশের ২৬টি রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন পাটকলের কর্মরত শ্রমিকের সংখ্যা ৮০ হাজার। শুধু খুলনা-যশোরে রয়েছেন ৩০ হাজার ৫৮২। কিন্তু অস্থায়ী শ্রমিকদের প্রতিদিন কাজ না থাকা, মজুরি পেতে দীর্ঘসূত্রিতাসহ বিভিন্ন কারণে অনেক শ্রমিক এখন আর কাজে নেই। ক্ষমতাসীন দলকে সমর্থন না করলে নানা অজুহাতে চাকরিচ্যুত করার অভিযোগও আছে সরকারি দলের শ্রমিকনেতাদের বিরুদ্ধে। আবার শ্রমিক আন্দোলন করতে গিয়ে খোদ সিবিএ নেতার চাকরিচ্যুতির ঘটনাও আছে। পাটকল শ্রমিক সুরক্ষার আন্দোলনের বিরোধিতা করে মালিকপক্ষ ও সরকারের কর্তাব্যক্তিরা নানাবিধ হামলা, মামলা, জেল ও জুলুম করেছে, এখনো হুমকি-হয়রানি অব্যাহত আছে এমন অভিযোগ করছেন শ্রমিকেরা। জানা যায়, ২০১৯ সালে তৃতীয় কোয়ার্টারে (জুলাই-সেপ্টেম্বর) বিদেশে পাটজাত পণ্য রপ্তানি করে বাংলাদেশ আয় করেছে ১ কোটি ২২ লক্ষ ডলার। এটি লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও ২৪ লক্ষ ডলার বেশি। কাজেই বাংলাদেশের পাটখাত লোকসানগ্রস্ত- এক অর্থে কথাটি সঠিক নয়। কিন্তু নানাভাবে পাটকলগুলোকে লোকসানগ্রস্ত করে রাখার চক্রান্ত করা হচ্ছে। এ বিষয়ে শ্রমিকদের অভিযোগ, মিলগুলোতে পরিকল্পিতভাবে অস্থিরতা তৈরি করে রাখছে সরকার। তারা এই অস্থিরতার অজুহাতে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলেকে বেসরকারি খাতে দিয়ে দিতে চায়। আর এটা হলে একটি পাটকলও ঠিকভাবে চলবে বলে শ্রমিকরা মনে করেন না। কারণ এর আগে রাষ্ট্রায়ত্ত যে কয়টি পাটকল বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে, তার একটিও ভালোভাবে চলেনি। বরং অনেকগুলি বন্ধ হয়ে গেছে। পাটকল শ্রমিকদের ১১ দফার মধ্যে সঠিক সময়ে পাট কেনার জন্য সকল পাটকলে অর্থ বরাদ্দ, সকল অস্থায়ী শ্রমিককে স্থায়ীকরণ, পাকিস্তান আমলে স্থাপিত পাটকলগুলোর যন্ত্রাংশের আধুনিকায়ন- প্রভৃতি দাবিও রয়েছে। অবসরে যাওয়া শ্রমিকরা ভবিষ্যৎ তহবিলের (পিএফ) টাকা পাননি। সেই টাকা পরিশোধের দাবি আছে তাঁদের। খুলনার খালিশপুরে ঐতিহ্যবাহী পিপলস জুটমিল ও দৌলতপুর জুটমিল বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিলো। পরবর্তীতে মিল দুটি বাংলাদেশ জুট মিলস কর্পোরেশনের (বিজেএমসি) মালিকানায় পুনরায় চালু করা হয়। এই দুই মিলের সকল শ্রমিক অস্থায়ী। দিন শেষে তারা মজুরি পান মাত্র ২৭৭ টাকা। পাশের ক্রিসেন্ট জুটমিলে স্থায়ী ও অস্থায়ী- দুই ধরনের শ্রমিকই রয়েছেন। তারা পান ৩১৯ টাকা। একই জায়গার পাশাপাশি দুই রাষ্ট্রায়ত্ত জুটমিলে মজুরি বৈষম্য সৃষ্টি করা হয়েছে। বারবার কেন শ্রমিকরা আন্দোলনে নামছেন তার ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে, তেমনই আরেকটি ব্যাখ্যাও শ্রমিকদের তরফ থেকে পাওয়া গেছে। তাঁরা মনে করেন, অতীতে শ্রমিকদের দাবি মেনে কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়েছে। এরকমভাবে কখনোই মজুরি কমিশনের রোয়েদাদ বাস্তবায়নে এত সময় লাগেনি। সরকারের সদিচ্ছার প্রতিফলন দেখতে চায় শ্রমিকেরা। দীর্ঘদিনের দাবিতে নিয়মিত আন্দোলন কর্মসূচি চালিয়ে শেষতক অনশন কর্মসূচি পালন করা হয়েছে। বিশ্বের বুকে বিরল এক রেকর্ডের জন্ম দিয়েছেন বাংলাদেশের পাটকল শ্রমিকরা। কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীন কর্মকাণ্ডের কারণে একসাথে এত বিপুল সংখ্যক মানুষ কোনো দেশে কখনো অনশনে বসেও ১১ দফা দাবি আদায় অধরা থেকে গেছে। তবে ১১ দফা আদায়ে খুলনার ‎পাটকল শ্রমিকরা বিভিন্ন কর্মসূচি চালিয়ে যাচ্ছে। খুলনা অঞ্চলে সরকারি ইজারাকৃত ও বেসরকারি মিলিয়ে ২০টি পাটকল রয়েছে। এসব পাটকলে গড়ে প্রতি মাসে প্রায় ২৫ হাজার টন পাটপণ্য উৎপাদন হয়, যার বড় একটি অংশ বিদেশে রফতানি করা হয়। তবে কাঁচা পাটের দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন সংকটে পড়েছে পাটকলগুলো। উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় অনেক কারখানা উৎপাদন বন্ধ করে দিয়েছে। বিপুলসংখ্যক শ্রমিক কাজ হারানোর পাশাপাশি লোকসানে কারখানাগুলো বন্ধ হওয়ার ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। বর্তমান সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে উৎপাদন ও রফতানি–দুই ক্ষেত্রেই বড় ধাক্কা আসতে পারে বলে সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা। খুলনায় ভারী শিল্পের ইতিহাস ও বর্তমান প্রসঙ্গে পাটকল শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক এসএম চন্দন বলেন, ‘খুলনায় পাটকল হওয়ার অনেক আগে থেকেই দৌলতপুরে পাড়ের বড় মোকাম ছিল ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর খুলনার বয়রা, খালিশপুর, আটরা, রামপাল ও মোংলা এলাকায় অনেক জমি অধিগ্রহণ করে শিল্পকারখানা স্থাপনের উদ্যোগ নেয় তৎকালীন সরকার। তখন শিল্পোদ্যোক্তাদের নামমাত্র মূল্যে জমি দেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংকঋণ, ভর্তুকি দেওয়া বিদ্যুৎ ও রপ্তানির ওপর প্রণোদনা দেওয়া হয় প্রথম দিকে উদ্যোক্তাদের ৯০ শতাংশই ছিল পাকিস্তানি। শ্রমিকনেতা চন্দন আরও বলেন, কাঁচা পাট রপ্তানি বন্ধ থাকলে সরাসরি চাষীরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। পাটকল এমন একটি খাত, যেখানে কৃষক, শ্রমিক, পরিবহন সেক্টরসহ একাধিক খাতের মানুষ যুক্ত। তাই এটিকে একটি বড় সাপ্লাই চেইন ধরা হলে যেকোনো একটি জায়গা বন্ধ হলে সবটাতেই ধাক্কা আসবে।’ পাটকল মালিকরা জানান, মৌসুমের শুরুতে যে কাঁচা পাট মণপ্রতি প্রায় ৩ হাজার ২০০ টাকায় কেনা হয়েছিল, বর্তমানে তা কিনতে হচ্ছে প্রায় ৫ হাজার ২০০ টাকায়। দ্বিগুণের কাছাকাছি দাম বেড়ে যাওয়ায় উৎপাদন খরচ বেড়েছে। কিন্তু বাজারে সে অনুপাতে পাটপণ্যের দাম বাড়েনি। ফলে পণ্য উৎপাদনে আগ্রহ হারাচ্ছেন উদ্যোক্তারা। পাটকল মালিকদের অভিযোগ, ব্যবসায়ীদের একটি অংশ কাঁচা পাট মজুত রাখায় দাম বেড়েছে। মজুদদাররাই এখন বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। তাদের কারসাজির কারণে দাম আরো বাড়তে পারে। এতে কারখানা মালিকরা বিপাকে পড়েছেন। পাট রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিজেএএর সাবেক চেয়ারম্যান ফরহাদ আহমেদ আকন্দ বলেন, ‘দাম প্রায় দ্বিগুণ হয়ে যাওয়ায় পাটকল মালিকদের পক্ষে বাজার থেকে কাঁচা পাট কেনা সম্ভব হচ্ছে না। ব্যবসায়ীদের একটি অংশ পাট মজুদ করে রেখেছে। তারাই মূলত বাজার অস্থিতিশীল করে রেখেছে। এর ফলে দাম বেড়েছে। মজুদদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেয়ায় তারাও বাজারে পাট ছাড়ছেন না। পাশাপাশি আরো নানা সংকট রয়েছে। ব্যাংক থেকে ঋণ পাওয়া যায় না ঠিকমতো। এসব কারণে এ খাত এখন ধুঁকছে।’ কৃষি বিভাগের তথ্য বলছে, দুই বছর ধরে বিভাগের ১০ জেলায় উৎপাদন প্রায় একই রয়েছে। খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল নিয়ে খুলনা কৃষি অঞ্চলের তথ্য বলছে, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ৩৯ হাজার ৩৪৪ হেক্টর জমিতে ৯৪ হাজার ৬৬৬ টন কাঁচা পাট উৎপাদন হয়েছে। আর ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ৩৮ হাজার ২৬৮ হেক্টর জমিতে উৎপাদন হয়েছে ৯১ হাজার ১৩৫ টন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, খুলনার দৌলতপুর জুট মিলে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। কাঁচা পাটের সংকটে শ্রমিকরা প্রতিদিন মিলে এসে কাজ না করেই সময় কাটাচ্ছেন। পাটকলটির উৎপাদন কর্মকর্তা মো. ইসরাফিল মল্লিক বলেন, ‘আগে ৩ হাজার ২০০ টাকা মণ দরে পাট কিনে প্রতিটি বস্তা আমরা ৮০ টাকা দরে বিক্রি করতাম। সর্বশেষ ৪ হাজার টাকা দরেও পাট কিনে আমরা কারখানা চালিয়েছি। কিন্তু এখন পাটের দাম ৫ হাজার ২০০ টাকা হয়ে গেছে। এখন একটা বস্তা তৈরিতে খরচ হচ্ছে ১২০ টাকারও বেশি। কিন্তু ৮০ টাকার ওপরে দাম মিলছে না। বাধ্য হয়ে আমরা উৎপাদন বন্ধ রেখেছি।’ কাঁচা পাটের কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, ‘এ বছর কাঁচা পাটের উৎপাদন মোটেও গত বছরের তুলনায় কম নয়। অথচ উৎপাদন কম হয়েছে জানিয়ে একশ্রেণির ব্যবসায়ীরা দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। সরকার যদি এটা তদারক না করে, তাহলে আমাদের কারখানা চালানো সম্ভব হবে না।’ ফরচুন গ্রুপের মালিকানায় থাকা সরকারি দৌলতপুর জুট মিলের শ্রমিক কালাম সিকদার বলেন, ‘মিলে আসি, বসে থাকি, কোনো কাজ নেই। কাঁচা পাট না থাকায় মালিক কারখানা চালাতে পারছেন না। এভাবে চলতে থাকলে আমরা কাজ হারাতে পারি। কাজ না থাকলে আমরা কীভাবে সংসার চালাব?’ একই মিলের আরেক শ্রমিক রমজান মৃধা বলেন, ‘তিন বছর ধরে এ মিলটা ভালোই চলছিল। কিন্তু কাঁচা পাট না থাকায় গত ছয় মাস আমরা বসে আছি।’ বাজার পরিস্থিতি সহনীয় রাখতে নিয়মিত নজরদারি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া কথা জানিয়েছে পাট অধিদপ্তর। সংস্থাটির খুলনা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক সরজিত সরকার বলেন, ‘পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। একজন আড়তদার বা ডিলার সর্বোচ্চ এক মাস ৫০০ মণ পাট মজুদ করতে পারবেন। বিষয়টি ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কিনা তা আমরা নিয়মিত তদারক করছি। কোথাও বেশি মজুদ পাওয়া গেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি। দাম সহনীয় রাখতে আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। আশা করছি দ্রুতই পাটের বাজার সহনীয় হবে।’ খুলনায় সরকার কর্তৃক বন্ধ হওয়া জুটমিল শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনের খবর এখন কেউ রাখেনা ব’লে অভিযোগ রয়েছে। বন্ধ জুটমিলের কর্মহীন শ্রমিক মরছে অনাহারে। থেমে কর্মহীন শ্রমিকদের বেঁচে থাকার লড়াই। খুলন অঞ্চলে বন্ধ থাকা নির্বাক প্রাণ জুটমিলগুলো কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। পাটকল শিল্পের গৌরবময় অতীত পতনের ৭ বছরে এ শিল্পে জড়িত শ্রমিকদের দুর্বিষহ জীবনের গ্লানি থেকে মুক্তি মেলেনি। হাজারো শ্রমিক এখন কর্মহীনর, তাদের জীবনকে বিষিয়ে দিয়েছে বেকারত্বের অভিশাপ। খুলনার খালিশপুর শিল্প কারখানা পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। ফলে হাজারো শ্রমিক কর্মহীন হয়ে পড়েছে। খালিশপুরের শিল্পাঞ্চলটি এক সময়ে কলকারখানার সাইরেন আর হাজারো শ্রমিকের ছন্দময় পদভারে মুখরিত এক জনপদ হিসেবে পরিচিত ছিল। আজ সেখানে কেবল গুমোট নীরবতা নেমে এসেছে।রাষ্ট্রীয়ভাবে জুট মিলগুলো বন্ধ হওয়ার পর থেকে এই অঞ্চলের আকাশ আর চিমনির ধোঁয়ায় ভারী হয়না। বরং থমকে থাকা বাতাস এখন হাজারো গরিব কর্মহীন মানুষের দীর্ঘশ্বাসে ভারী হয়ে উঠেছে এই জরাজীর্ণ কারখানার দেয়াল আর জং ধরা গেটগুলো। ব্যবসায়ী শেখ আবদুল মান্নান বলেন, ‘আশির দশকে খুলনা ছিল জমজমাট, ব্যবসাও ছিল চাঙা। পরবর্তীতে পরিস্থিতি পুরোটাই ভিন্ন হতে থাকে। একে-একে বন্ধ হতে থাকে বড়-বড় কারখানা। ১৯৯৩ সালে খুলনা টেক্সটাইল কারখানা বন্ধ করে দেওয়া হয়। সেটি ছিল শিল্প বন্ধের প্রথম ঘটনা। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধে এলাকায় বেকারের সংখ্যা বেড়ে গেছে, বহু মানুষ অর্থনৈতিকভাবে দেউলিয়া হয়ে পড়েছে। আর্থিক লোকসানে হতাশাগ্রস্ত অনেকেই অপরাধপ্রবণতা, মাদকাসক্ত ও আইনশৃঙ্খলাবিরোধী কর্মকাণ্ডে যুক্ত হচ্ছে। খুলনার খালিশপুরের পথে এখন আর সেই কর্মব্যস্ততা নেই। বন্ধ কারখানার জরাজীর্ণ দেয়ালগুলো এখন কেবলই এক যন্ত্রণাদায়ক স্মৃতি। যারা একসময় চাকা ঘুরিয়ে দেশের অর্থনীতি সচল রেখেছিলেন, আজ তাদের জীবনই এলোমেলো থমকে গেছে কর্মহীন জীবনের চাবুকাঘাতে আর মাথাবোঝাই দেনা-ঋণে চাপে জীবন ওষ্ঠাগত। মিলের কাজ হারিয়ে দক্ষ কারিগররা এখন বেঁচে থাকার তাগিদে বেছে নিয়েছেন অতি কষ্টের পথ। ‘বিশ-তিরিশ বছর ধরে যারা পাটের সূতা বানান, সেই হাতগুলো আজ রিকশার হ্যান্ডেল ধরেছে। কেউবা দিনমজুরি করছেন, কেউ আবার ফুটপাতে ঝালমুড়ি-বাদাম বিক্রি করে সংসার চালানোর বৃথা চেষ্টা করছেন। জুটমিল প্রসঙ্গে অশ্রুসিক্ত একজন প্রবীণ শ্রমিক বলেন, ‘এই মিলের দেয়ালে আমাদের নাম আর রক্ত মিশে আছে, এখন যখন রিকশা নিয়ে মিলের পাশ দিয়ে যাই, মনে হয় মিলগুলো আমাদের দিকে তাকিয়ে কাঁদছে।’ খুলনার খালিশপুর এখন এক পরিত্যক্ত জনপদে পরিণত হয়েছে। মিলকেন্দ্রিক ছোট-ছোট ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধের পথে। অনেক শ্রমিক পরিবার সন্তানদের পড়াশোনার খরচ চালাতে না পেরে শহর ছেড়ে অন্যত্র চলে গেছে, ফলে স্থানীয় স্কুল কলেজে শিক্ষার্থীর সংখ্যাও আশঙ্কাজনকভাবে কমেছে। ঐতিহ্যের এই শিল্পনগরী এখন তাঁর জৌলুস হারিয়ে এক অন্ধকার ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আধুনিকায়নের অজুহাতে সোনালি আঁশের চাকাগুলো কেন জব্দ হলো, সেই উত্তর আজও খুঁজে বেড়ান খালিশপুর তথা খুলনা বিভাগের ভুক্তভোগী মানুষ। লেখক: সদস্য, কেন্দ্রীয় কমিটির, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি