বাজেটের গতানুগতিকতা

Posted: 28 জুন, 2026

আবার শুনতে হয়েছে যে, এবারও বামপন্থিদের বাজেট-প্রতিক্রিয়াটি ছিল নিতান্তই গতানুগতিক ও গৎবাধা ধরনের। সেই একই কথাবার্তা– অনেকটা পুরানো ভাঙ্গা রেকর্ড বাজিয়ে শুনানোর মতো ব্যাপার। তাতে নতুন কোনো কথা নেই, সব একেবারেই সেই একঘেয়ে ‘গতানুগতিক’ পুরানো কথাবার্তা! এই অভিযোগটিকে আমি মোটেও মিথ্যা বলব না। কথা হলো– বাজেট প্রতিক্রিয়া যে গতানুগতিক ছিল সেজন্য কি বামপন্থিদের দায়ী করা যায়? না! কারণ, প্রতিক্রিয়া গতানুগতিক হওয়ার জন্য বামপন্থিরা কোনোমতেই দায়ী নয়– দায়ী বাজেট-প্রস্তাবনার রচিয়তারা। বছর বছর ধরে বাজেট- প্রস্তাবনাগুলো যদি গতানুগতিক ধারায়ই পেশ হতে থাকে, তাহলে তার প্রতিক্রিয়াও গতানুগতিক হতে বাধ্য- সেটিই স্বাভাবিক নয় কি? সুতরাং এই ‘গতানুগতিকতার’ আসল কারণটি হলো বাজেট-প্রস্তাবনার গতানুগতিকতা, বাজেট-প্রতিক্রিয়ার নয়। অথচ বাজেট কেন গতানুগতিক, সেই মৌলিক বিষয়ে আলোচনা-বিশ্লেষণ খুবই কম। এবং তা যেন কম হয় সেজন্য বাজেট-প্রস্তাবনা রচনাকারীদের চেষ্টার কোনো কমতি থাকে না। বাজেটের গতানুগতিকতার চরিত্রটিকে আড়াল করে রাখার জন্য তুলনামূলক গুরুত্বহীন চটকদার নানা চমক সৃষ্টি করার মতো উপাদানে তাকে আবৃত রাখার চেষ্টারও তাদের কোনো শেষ থাকে না। প্রশ্ন উঠতে পারে যে, বাজেটকে গতানুগতিক বলে আক্ষায়িত করার আদৌ কোনো যুক্তি আছে কি? কারণ, আমরাতো স্বচক্ষে দেখি যে– আলাদা আলাদা দু’বছরের বাজেট কখনই হুবহু একরকম হয় না। বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিমাণগত তারতম্য থাকে। তাছাড়া তারতম্য থাকে বাজেটের খাতওয়ারী আপেক্ষিক গুরুত্বের। বাজেট কার্যক্রমের সাথে সম্পর্কিত বিভিন্ন ক্ষেত্রে নতুন নতুন পদ্ধতি ও বিধি-বিধান চালু করা হয়। কিন্তু বাজেটের মূল চরিত্র নির্ধারণের ক্ষেত্রে এসব হলো নিতান্তই ‘কসমেটিক’ বা প্রসাধনমূলক পরিবর্তন। বাজেটের চরিত্রগত গতানুগতিকতাকে আড়াল করার উদ্দেশ্যে এসব নিয়ে সকলের মনোযোগ ও তর্ক বিতর্ককে সেসব গৌণ বিষয়ে এভাবে আবদ্ধ করে রাখার চেষ্টা করা হয়। এবারও তারই পুনরাবৃত্তি ঘটছে। এক্ষেত্রেও গতানুগতিকতা! সকলের বাজেট-প্রতিক্রিয়া গতানুগতিক হলেও সকলের ক্ষেত্রে তা কিন্তু এক প্রকারের হয় না। বরং প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে একেবারে পরস্পরবিরোধী প্রকারের। এর কারণ হলো বাজেট-প্রস্তাবনাতে যেহেতু ধনীক শ্রেণির স্বার্থ প্রতিফলিত হয়, তাই ধনীক শ্রেণির বাজেট-প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে গতানুগতিকভাবে ইতিবাচক। এবং বাজেট-প্রস্তাবনায় মেহনতি মানুষসহ ব্যাপক জনগণের স্বার্থ যেহেতু উপেক্ষিত হয়, তাই তাদের বাজেট- প্রতিক্রিয়া হয়ে থাকে গতানুগতিকভাবে নেতিবাচক। প্রতিবারই তেমনই ঘটছে। একথাও একেবারেই গতানুগতিক কারবার! এরকমটাই হতে বাধ্য। কারণ চার দশক ধরে এদেশের বাজেট রচিত হয়ে চলেছে দেশের মুষ্ঠিমেয় বিত্তবান ব্যক্তি ও সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক পুঁজির সেবা করার জন্য। দেশের বাজেট রচিত হচ্ছে বিশ্ব ব্যাংক, আইএমএফ, ডাব্লিউটিও প্রভৃতি সংস্থার নির্দেশিত পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক দর্শন অনুসারে। এর মধ্যে নতুনত্ব কোথায়? ভাঙ্গা রেকর্ডের মতো একই গণবিরোধী প্রতিক্রিয়াশীল মর্মবাণীকে ধারণ করেই বছর বছর বাজেট উপস্থাপন করা হচ্ছে। সেক্ষেত্রে ভিন্ন ভিন্ন শ্রেণির বাজেট-প্রতিক্রিয়া আপন আপন মতো স্বার্থানুসারে গতানুগতিক তো হবেই! এক্ষেত্রে কিছুই করার নেই। কারণ, শ্রেণি স্বার্থ যে গতানুগতিক! করবোটা তবে কি? এক দশক আগের কথা। সেবার অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতা আরেকটি প্রসঙ্গে বাজেটের মর্মবাণীর একটি বিষয়কে প্রতীকীভাবে হলেও ফাঁস করে দিয়েছিলেন। অর্থমন্ত্রী মহোদয় আগেভাগেই জানিয়েছিলেন যে, এতোদিন প্রধানত সাদা মলাটে বাজেট প্রস্তাবনার বইটি ছাপানো হতো। এখন থেকে সেটি, এ বছরটির মতো, দেশের পতাকার রংয়ের মলাটে ছাপানো হবে। তিনি টিভি ক্যামেরায় মলাটটি প্রদর্শন করলেন। দেখলাম যে মলাটের প্রায় সম্পূর্ণটার রংই হলো সবুজ। লাল রংয়ের উপস্থিতি মোটেও চোখে পড়ার মতো নয়। জাতীয় পতাকার রংয়ে প্রস্তুতকৃত বলে বলা হলেও মলাট থেকে এভাবে ‘লাল’ রংকে কার্যত বিদায় করে দেয়ার প্রকৃত স্বরূপ এর দ্বারা কিন্তু প্রদর্শিত হয়েছিল। বাজেটে সমাজতন্ত্রের গন্ধ ছিটেফোঁটাও না রাখার যে পথ অনুসরণ করা হচ্ছে, সেটিকে গতানুগতিকতার সিল মেরে দেয়ার জন্যেই হয়তোবা এরকমটা করা হয়েছিল। প্রতিবারই বাজেটের আয়তন নিয়ে চলে বাহাদুরি, বাগাড়ম্বর, হৈ-চৈ। এক্ষেত্রেও গতানুগতিকতা! অথচ বাজেট-সাইজের বিষয়টি বাজেটের চরিত্রের নির্ধারক কোনো বিষয় নয়। একথা ঠিক যে, সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা দুনিয়ার নব-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি-দর্শনের অনুসারীরা অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের সরাসরি অবদান ও অংশগ্রহণকে নাকচ করে থাকেন। তারা বলে থাকেন যে, ‘অর্থনৈতিক কাজ পরিচালনা করা সরকারের কাজ নয়’ (এড়াঃ. যধং হড় নঁংরহবংং ঃড় ফড় নঁংরহবংং)। শুধু তাই নয়, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে বড় করার ঘোরতর বিরুদ্ধে। তারা বলে থাকে যে, ‘সেই সরকারই সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ যেটা সবচেয়ে ছোট’ (ঞযধঃ মড়াঃ. রং নবংঃ, যিরপয রং ঃযব ংসধষষবংঃ)। রক্ষণশীল বাজার-মৌলবাদের ভাবধারার প্রতিধ্বনি করে নয়া-উদারবাদীরা রাষ্ট্রের ভূমিকাকে নাটকীয়ভাবে খর্ব করে অর্থনীতি ও সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যক্তিখাত ও বাজারের শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যের পক্ষে কথা বলে থাকেন। এটিই তাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক চিন্তাধারার মর্মকথা তথা তাদের রাষ্ট্র দর্শন। তারা রাষ্ট্রকে যথাসম্ভব ছোট করে রাখার পক্ষে পরামর্শ দিয়ে থাকেন। সে যুক্তিতে বাজেটের সাইজ যথাসম্ভব ছোট হওয়ার কথা। কিন্তু তাদের পক্ষে এই নীতি বাস্তবায়ন করা বাস্তব কারণে বস্তুত অসম্ভব বলে প্রমাণিত হচ্ছে। কারণ, এই নীতি অনুসরণের ফলে সমাজে বৈষম্য, শোষণ, শ্রেণি-দ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নৈরাজ্য এমনভাবে প্রসারিত হয় যে তা দমন করার জন্য দমন-পীড়ন আরো বাড়াতে তারা বাধ্য হয়। নিজ দেশে যেমন, তেমনি সারা বিশ্বে এটি তাদেরকে করতে হয়। এ কাজটির জন্য নিজস্ব বাহিনীর শক্তি যথেষ্ট নয়। ৯৫ শতাংশের বিরুদ্ধে তারা দাঁড়াবে কিভাবে? তাই তাদেরকে রাষ্ট্রের নিপীড়নমূলক শক্তির ওপর নির্ভর করতে হয়। এখানেই রাষ্ট্রের জন্ম ইতিহাসের রহস্য নিহিত। যাই হোক, দমন-পীড়নের এই কাজটি যেহেতু রাষ্ট্রের মাধ্যমেই করতে হয়। ফলে রাষ্ট্রের ভূমিকাকে কমিয়ে আনার ও ছোট করার নীতি বাস্তবায়ন করার ফলশ্রুতিতে উল্টো বরঞ্চ রাষ্ট্রের দমনমূলক তৎপরতাকে বাড়াতে হয়। শেষ পর্যন্ত ফলাফল দাঁড়ায় এই যে, রাষ্ট্রকে ছোট করার বদলে বরঞ্চ তাকে আরো শক্তিশালী করা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। তা তারা করার চেষ্টা করে থাকে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জনকল্যাণমুখী কাজ সংকুচিত করে সেটার দমন-পীড়নমূলক কাজ বাড়িয়ে তোলার মাধ্যমে। রাষ্ট্রের আর্থিক শক্তি পুলিশ, মিলিটারি, জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড, প্রতিরোধের আধুনিক অস্ত্রপাতি, গোয়েন্দা, কারাগার ইত্যাদি ক্ষেত্রে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু তাতেও বাজেটের সাইজ কমিয়ে রাখা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর দেশের প্রথম অর্থমন্ত্রী জনাব তাজউদ্দিন আহমেদ যে বাজেট পেশ করেছিলেন তার পরিমাণ ছিল মাত্র ৭৮৬ কোটি টাকা। এবারের বাজেটের পরিমাণ হলো তা থেকে প্রায় ১৫০০ গুণ বেশি। একথা ঠিক যে গত ৫ দশকে এদেশে ইতোমধ্যে কিছু লোকের সম্পদের পরিমাণ এর চেয়েও বেশ গুণ পরিমাণে বেড়েছে। কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, অবশিষ্ট ৯৯% শতাংশ দেশবাসীর আয় উপার্জন (প্রকৃত ক্রয় ক্ষমতা) কতোটা বেড়েছে? সে বৃদ্ধির পরিমাণ নিতান্তই সামান্য। তাছাড়া মূল কথাটি হচ্ছে, তাজউদ্দিন সাহেবের বাজেটের সাথে পরবর্তীকালের সব অর্থমন্ত্রীদের বাজেটের তফাৎটি শুধু কয়েকশত বা হাজার-দেড় হাজার গুণ। এদিক-ওদিকই নয়। এই দুই বাজেটের দর্শনগত ভিত্তি সম্পূর্ণ বিপরীতমুখী। ত্রুটি-দুর্বলতা সত্ত্বেও তাজউদ্দিন সাহেবের বাজেট ছিল প্রগতিমুখীন। আর পরবর্তীকালের অন্যান্য সব সাহেবের বাজেট হলো পুঁজিবাদের নয়া-উদারবাদী ধারার। এই ধারায়ই বাজেট রচিত হচ্ছে বিগত ৪ দশক ধরে। একটি দেশের জন্য তার বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। রাষ্ট্রের আয়-ব্যয় পরিচালনা করে দেশের সরকার। রাষ্ট্রীয় এ আয়-ব্যয়ের হিসাবকেই জাতীয় বাজেট বলে আখ্যায়িত করা হয়। একটি দেশের মোট বাৎসরিক আয়ের মধ্যে এককভাবে সবচেয়ে বড় অংশের মালিক হলো রাষ্ট্র। সে কারণেই রাষ্ট্রের বাৎসরিক আয় ও ব্যয়ের উৎস, ক্ষেত্র, উপাদান ও চরিত্রের ওপর দেশের অর্থনীতির হালচাল বহুলাংশে ও গতিধারা নির্ভর করে। অন্যদিকে, দেশের অর্থনীতির হালচাল যেহেতু দেশের সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে নিয়ন্ত্রণ করে তাই, রাষ্ট্রের আয়-ব্যয়ের হিসাব-বিবরণ বাজেটের মূল উপাদান হলেও তা মোটেও কেবলমাত্র একটি হিসাবের ফর্দ অথবা একাউনটেন্সির ব্যাপার নয়। শুধুমাত্র একটি অর্থনীতি-সংশ্লিষ্ট বিষয়ও তা নয়। জাতীয় বাজেট চূড়ান্ত বিচারে একটি রাজনৈতিক বিষয়। এ কারণেই, রাষ্ট্র ও সরকারের শ্রেণি চরিত্র, অর্থাৎ তারা মূলত কোনো সামাজিক শ্রেণির স্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করে, তার ওপর নির্ভর করে বাজেটের চরিত্র। দেশের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোর ক্ষেত্রে যদি ‘যা আছে তাই’ তথা ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখা হয়, তাহলে সেই বাজেটকে ‘গতানুগতিক’ বলে আক্ষায়িত করাটা সর্বাংশে যুক্তিসংগত। সেরূপ বাজেটের তাৎপর্য সামান্যই। কিন্তু বাজেটের চরিত্র ও উদ্দেশ্য যদি হয় প্রচলিত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে রূপান্তর করা, তাহলে সেই বাজেট প্রগতিমুখীন বলাটা যুক্তিসংগত বৈকি। বাজেটের এই মৌলিক চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি হলো সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। আগে সেদিকে দৃষ্টি না দিয়ে ‘স্থিতাবস্থা’ রক্ষায় প্রণীত একটি ‘গতানুগতিক’ বাজেট নিয়ে হৈ হৈ-রৈ রৈ করাটাকে কেবল একটি হালকা ছেলেমানুষী কাজ বলে গণ্য করা সঠিক হবে না। এটি বুর্জোয়াদের বহুল ব্যবহৃত সুচতুর গণপ্রতারণার পরিকল্পিত কৌশলও বটে। বাজেট প্রনয়ণ প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির দিকে এবার একটু নজর দেয়া যাক। এক বিবেচনায় বাজেট হতে পারে তিন ধরনের– ঘাটতি, উদ্বৃত্ত বা ব্যালেন্সড। যে ধরনের বাজেটই প্রণীত হোক না কেন, তাতে মোট জমা ও মোট খরচের পরিমাণ সমান সমান হতে হয়। বাজেটে জমা-খরচের হিসাব মিলাতেই হবে। এদিক থেকে (অর্থাৎ টেকনিক্যাল দিক থেকে) বিবেচনা করলে বাজেট হলো ক্রেডিট ও ডেবিটের হিসাব মিলানোর একটি কসরৎ। অর্থাৎ এটি হলো মূলতঃ একটি ‘অ্যাকাউনটেন্সি’ বিষয়ক কাজ। কথা হলো, আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় স্থিতাবস্থা টিকিয়ে রাখাই যদি বাজেটের চরিত্র এবং দার্শনিক ভিত্তি হয়, তাহলে বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া প্রধানত একটি ‘অ্যাকাউনটেন্সির’ হিসাব মিলানোর কাজে পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই, বাজেটের গতানুগতিক হয়ে ওঠার বিষয়টি শুরু হয় বাজেট প্রনয়ণের প্রক্রিয়াকালেই। যে পদ্ধতিতে বছর বছর বাজেট প্রণীত হয় তাতেই রয়েছে তার গতানুগতিক হয়ে ওঠার একটি উপাদান। আমাদের দেশে বছর বছর বাজেট প্রণয়নের কাজটি মূলত ‘অ্যাকাউনটেন্সির’ দৃষ্টিকোন থেকেই করা হয়ে থাকে। নতুন কোনো দর্শন, নীতি, প্রেক্ষিত ইত্যাদিকে প্রথমে স্থির করে নিয়ে সেসবের ভিত্তিতে সার্বিকভাবে গোটা বাজেট রচনা করা হয় না। কারণ আর্থ-সামাজিক দিকদর্শন বছরের পর বছর অপরিবর্তিত রাখা হয়। তাই তার পুরানো কাঠামো বদলানোর প্রয়োজন হয় না। পুরানো বাজেটের এখানে একটু পরিমাণ বাড়িয়ে, ওখানে একটু কমিয়ে, পুরানো কিছু বাদ দিয়ে, নতুন কিছু যোগ করে, জমা-খরচের হিসাব মিলিয়ে দিতে পারলেই বাজেট প্রণয়নের কাজ শেষ। কম্পিউটারে ‘কাট অ্যান্ড পেস্ট’ করে নতুন লেখা তৈরির মতো ব্যাপার। অনেকটাই নতুন বোতলে সামান্য স্বাদ বদল করা পুরানো মদ ঢেলে, কথার চমক দেয়া আবরণে পরিবেশন করার মতো। দক্ষ আমলাদের হাতেই মূলত গোটা কাজটি সম্পাদিত হয়। এরকমই চলছে বছরের পর বছর। এই প্রক্রিয়ায় বাজেট প্রণীত হলে তার মূল বৈশিষ্ট ও মর্মবাণী কি গতানুগতিক না হয়ে পারে? বাজেটের চরিত্র-দর্শন বদল না করেও শুধু অ্যাকাউনটেন্সির দৃষ্টিভঙ্গী থেকে নতুন বাজেট রচিত হলেও, প্রতি বছর এখানে-ওখানে কিছু পরিবর্তন করাটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অন্যথায়, বছর বছর একই বাজেটের কার্বন কপি পেশ করলে ‘নতুন বাজেট’ রূপে পরিচয় দেয়ার যৌক্তিকতা তার একেবারেই থাকে না। অভিজ্ঞতার আলোকে কিছু ওপর ভাসা পরিবর্তন করা হয়। তার অনেকটাই আবার করা হয় বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লবিকে সন্তুষ্ট করার জন্য। লুটেরা শাসক গোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ তাদের নিজের নিজের স্বার্থকে আরো সুরক্ষার জন্য বাজেটের এসব প্রান্তিকী পরিবর্তনের জন্য আগে থেকেই তোড়জোড় শুরু করে দেয়। বিভিন্ন ‘চেম্বার’ ও ধনীক গোষ্ঠীর সমিতি-সংগঠন জোর তদবির চালায়। অর্থমন্ত্রী সবাইকে সময় দেন। কিন্তু দেশের খেটে খাওয়া পনেরো আনা মানুষের কথা শোনার সময় তার কখনোই হয় না। কারণ, লুটেরা চোর-ডাকাতের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে গৃহস্থের আবেদনে কান দিলে কি চলবে? তাই বাজেট প্রণীত হয় লুটেরা চোর-ডাকাতদের স্বার্থে। গতানুগতিক ধাঁচে। কিন্তু গৃহস্থ তা মানবে কেন? গতানুগতিক ধারাতেই তাকে এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে হয়। ফলে, লুটেরাদের স্বার্থে রচিত গতানুগতিক ধারার বাজেটের বিরুদ্ধে জনগণের বিরোধিতার প্রকাশও গৎ বাধা ও গতানুগতিকতার চেহারা নেয়। সৃষ্টি হয় এক ধরনের ভারসাম্যপূর্ণ স্থিতাবস্থা। কিন্তু চিরদিন এভাবে চলতে পারে না। বিপরীতমুখী দুই গতানুগতিকতার দ্বারা সৃষ্ট অচলায়তন একদিন ভেঙে পড়তে বাধ্য। কারণ সেটিই ইতিহাসের ধারা। গতানুগতিকতার শেকলে বাঁধা পড়া সে অচলায়তন ভাঙার জন্য সমাজ বিপ্লবের লক্ষ্যে তাই আজ প্রস্তুত হতে হবে ঘরে ঘরে।