হামের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বাড়ছে ডেঙ্গু, শঙ্কা জনমনে

Posted: 28 জুন, 2026

একতা প্রতিবেদক : দেশে হাম রোগে যখন শিশু মৃত্যুর ঘটনা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে এবং জনস্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে শঙ্কা তৈরি হয়েছে, ঠিক সেই সময় নতুন করে মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে ডেঙ্গু। মশাবাহিত এই রোগের সংক্রমণ ইতোমধ্যে বাড়তে শুরু করেছে এবং দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে প্রতিদিন নতুন নতুন রোগী ভর্তি হচ্ছে। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করা হলে চলতি বর্ষা মৌসুমে ডেঙ্গু পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। গত ২৬ জুন স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, গত ১৫ মার্চ থেকে ২৬ জুন পর্যন্ত দেশে হামের উপসর্গ নিয়ে মোট ৬০৯ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে প্রাণ হারিয়েছে ৯৩ শিশু। ফলে হাম ও হামের উপসর্গ মিলিয়ে মোট মৃত্যুর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭০২ জনে। এদিকে, দেশের ৫৮টি জেলায় ছড়িয়েছে ডেঙ্গু জ্বর। চলতি বছর ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেওয়া রোগীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫ হাজার ৫১৫ জনে। আর ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে এখন পর্যন্ত ১৩ জনের মৃত্যু হয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, চলতি বছর মারা যাওয়াদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি আটজন মারা গেছেন জুন মাসে। এ ছাড়া, মে মাসে একজন, ফেব্রুয়ারিতে দুইজন এবং জানুয়ারিতে মারা গেছেন দুইজন। স্বাস্থ্য অধিদফতরের পরিসংখ্যান বলছে, ২০২৫ সালের শুরু থেকে এ পর্যন্ত দেশে মোট ৪ হাজার ৬০০ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। আক্রান্তদের মধ্যে ৬৩ দশমিক ১ শতাংশ পুরুষ এবং ৩৬ দশমিক ৯ শতাংশ নারী। চলতি বছরে ডেঙ্গুতে এখন পর্যন্ত সাতজনের মৃত্যু হয়েছে। ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়তে থাকায় জনমনে উদ্বেগও বাড়ছে। বিশেষ করে হাম রোগের প্রাদুর্ভাব এবং শিশু মৃত্যুর ঘটনাগুলোর মধ্যে নতুন করে ডেঙ্গুর প্রকোপ শুরু হওয়ায় স্বাস্থ্যখাতের ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। অনেক অভিভাবক মনে করছেন, একই সময়ে দুটি সংক্রামক রোগের বিস্তার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টির পানি জমে থাকার কারণে এডিস মশার প্রজনন দ্রুত বৃদ্ধি পায়। ফলে বছরের এই সময়টাতে ডেঙ্গুর সংক্রমণও বাড়ে। যথাসময়ে মশার প্রজননস্থল ধ্বংস, পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনা এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধি না করলে আক্রান্তের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে। সাধারণ মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যেই ডেঙ্গু নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিভিন্ন এলাকায় ডেঙ্গু আক্রান্তের খবর ছড়িয়ে পড়ায় আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। অনেকেই আশঙ্কা করছেন, দ্রুত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা না গেলে ডেঙ্গু আক্রান্তের সংখ্যা হামের প্রকোপকেও ছাড়িয়ে যেতে পারে। জনস্বাস্থ্য বিশ্লেষকদের একটি অংশ মনে করেন, সরকারের সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যদি আরও আগে থেকেই মশকনিধন কার্যক্রম জোরদার করত এবং সম্ভাব্য ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোতে বিশেষ নজরদারি চালাত, তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হতো। তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে ইতোমধ্যে বিভিন্ন এলাকায় মশকনিধন অভিযান, লার্ভা ধ্বংস কার্যক্রম এবং সচেতনতামূলক কর্মসূচি জোরদার করা হচ্ছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরও জনগণকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছে। বিশেষ করে বাসাবাড়ি, অফিস, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং আশপাশের এলাকায় কোথাও যেন তিন দিনের বেশি পানি জমে না থাকে, সেদিকে নজর দিতে বলা হয়েছে। কারণ জমে থাকা পরিষ্কার পানিতেই এডিস মশা ডিম পাড়ে এবং দ্রুত বংশবিস্তার করে। বাংলাদেশে ডেঙ্গুর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, ২০২৩ সালে দেশের ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করেছিল। ওই বছরের জুন মাস থেকে সংক্রমণ দ্রুত বাড়তে শুরু করে এবং বছরের শেষ পর্যন্ত মোট ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেন। এর মধ্যে ঢাকায় চিকিৎসা নিয়েছিলেন ১ লাখ ১০ হাজার ৮ জন এবং ঢাকার বাইরে চিকিৎসা নিয়েছিলেন ২ লাখ ১১ হাজার ১৭১ জন। ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে শুধু সরকারি উদ্যোগই যথেষ্ট নয়; এর সঙ্গে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও জরুরি। নিজ নিজ বাসাবাড়ি ও আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার রাখা, জমে থাকা পানি অপসারণ করা এবং ডেঙ্গুর উপসর্গ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়ার মাধ্যমে সংক্রমণের ঝুঁকি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। হামের প্রকোপের মধ্যেই ডেঙ্গুর বাড়তে থাকা সংক্রমণ দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এখন পরিস্থিতি কতটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ এবং জনগণের সচেতনতার ওপর। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দ্রুত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা গেলে ডেঙ্গুর বিস্তার রোধ করা সম্ভব। অন্যথায় বর্ষা মৌসুমে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক হয়ে উঠতে পারে।