সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 28 জুন, 2026

একতা ডেস্ক : এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের সংখ্যা-৩২ থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে। আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১৫তম কিস্তি। (১৫) রেল শ্রমিক ধর্মঘট ও বামপন্থী হঠকারিতা এই পরিস্থিতিতে, রেল শ্রমিকগণের ধর্মঘট সমুপস্থিত হইয়াছিল।--- রেল শ্রমিকদের প্রধান সংগঠন ‘ইপরেল’ মজুরী বৃদ্ধি প্রভৃতি দাবীতে ২৭শে মে ধর্মঘট করার সিদ্ধান্ত নিয়াছিল। একমাত্র চট্টগ্রামে এই ধর্মঘট চারদিন চলিয়াছিল। আখাউড়া, ঈশ্বরদী, সৈয়দপুর প্রভৃতি স্থানে ধর্মঘট শুরু হইয়াছিল, কিন্তু একদিনও টিকিতে পারে নাই। বস্তুতঃ, ধর্মঘট সফল হয় নাই।--- প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের পর জনমনে হতাশা, ধর্মঘটের তারিখের মাত্র ১২ দিন আগে এক প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসে বরিশাল ও কয়েকটি জেলায় হাজার হাজার লোকের মৃত্যু ও বিরাট ধ্বংস সাধনে প্রদেশে একটা দুর্গত অবস্থা, দহগ্রাম ও কচ্ছের রণ নিয়া শাসকচক্রের উগ্র ভারত বিরোধী প্রচার--- সেজন্য ধর্মঘটের সাংগঠনিক প্রস্তুতির অভাব ইত্যাদি পটভূমিতে রেলের মত শিল্পে ২৭শে মে তারিখে ধর্মঘট করাই ছিল বামপন্থী হঠকারিতা।--- রেল শ্রমিক ধর্মঘট ব্যর্থ হইলেও,--- শ্রমিক আন্দোলন দমনকল্পে ১৯৬৭ সনের ৩রা আগস্ট সরকার পূর্ব পাকিস্তান আইন সভায় ‘শ্রম বিরোধ আইন’ নামে এক নূতন কালা কানুন পাশ করাইয়াছিল।--- ঐ কালা কানুনের প্রতিবাদ করিতে--- শ্রমিকগণ ৬ই আগস্ট প্রায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে ধর্মঘট করিয়াছিলেন এবং ঢাকা নগরীতে ৪০ হাজার শ্রমিকের এক বৃহৎ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হইয়াছিল। ইহা ছিল তখন ঢাকাতে বৃহত্তম শ্রমিক সমাবেশ।--- শ্রমিকশ্রেণী আবার সংগ্রামের পথে অগ্রসর হইতে যাইতেছিল। এই সময়ে ছাত্র ইউনিয়নের ঐক্য পুনঃ প্রতিষ্ঠার জন্য পার্টি প্রচেষ্টা চালাইতেছিল। এই সময়ে ৬ই সেপ্টেম্বর কাশ্মীর নিয়া পাক-ভারত যুদ্ধ বাঁধিয়া গিয়াছিল।--- পাক-ভারত যুদ্ধ : হর-দফতরের সংগ্রাম : শ্রমিকশ্রেণীর পার্টিতে ভাঙ্গন : প্রগতিশীল শক্তিসমূহের ব্যর্থতা : গণতান্ত্রিক শিবিরে অনৈক্য : গণ আন্দোলনে ভাটা (১৯৬৬ সনের জুন পর্যন্ত) কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে পার্টির নীতি কমরেডগণ, কাশ্মীর নিয়া পাক-ভারত সংঘর্ষ আগস্ট মাসের প্রথম সপ্তাহ হইতেই শুরু হইয়াছিল--- ৪ঠা সেপ্টেম্বর কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রস্তাবে কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে পার্টির নীতি প্রসঙ্গে বলা হইয়াছিল যে : “কাশ্মীর সমস্যা সাম্রাজ্যবাদীদের সৃষ্টি, কাশ্মীর লইয়া ভারত পাকিস্তান সংঘর্ষ বৃটিশ উপনিবেশিকতাবাদেরই এক ভয়াবহ পরিণতি।... আর ভারত ও পাকিস্তানের বুর্জোয়া সামন্তবাদী সরকারগুলিও কাশ্মীরী জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারের স্বীকৃতি না দিয়া কাশ্মীরকে নিজ নিজ কুক্ষিগত করিতে চাহিতেছে।” “আমরা দ্ব্যর্থহীন ভাষায় কাশ্মীরী জনসাধারণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার স্বীকার করি” এবং “বিশ্বাস করি যে সাম্রাজ্যবাদীদের আওতার বাহিরে, পাক-ভারত সমঝোতার মাধ্যমে কাশ্মীরী জনগণের হাতে তাহাদের ভাগ্য নির্ধারণের দায়িত্ব ছাড়িয়া দেওয়াই কাশ্মীর সমস্যা নিষ্পত্তির প্রকৃষ্ট পথ।”--- ঐ প্রস্তাবে কাশ্মীর সমস্যা সম্পর্কে যে নীতি ব্যাখ্যা করা হইয়াছিল, অনুরূপ নীতি পার্টির ১৯৬৫ সনে সম্মেলনে গৃহীত হইয়াছিল। এখনও কাশ্মীর সম্পর্কে ঐ নীতিই পার্টির মৌল নীতি। পাক-ভারত যুদ্ধ কেন্দ্রীয় কমিটির প্রস্তাব পার্টির ভিতর প্রচারিত হওয়ার পূর্বেই কাশ্মীর নিয়া সংঘর্ষ পাক-ভারত যুদ্ধে পরিণত হইয়াছিল।--- ঐ যুদ্ধ শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই গণ-বিরোধী সরকার জরুরী অবস্থা ও দেশ রক্ষা আইনসমূহ জারি করতঃ জনগণের যেটুকু শাসনতান্ত্রিক অধিকার ছিল তাহাও কাড়িয়া নিয়াছিল--- যুদ্ধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কেন্দ্রীয় কমিটিও যুদ্ধ সম্পর্কে এক প্রস্তাব গ্রহণ করিয়াছিল। সে প্রস্তাবে (৭/৯/৬৫) “ভারতের শাসকচক্র কর্তৃক পাকিস্তানের উপর আক্রমণের দ্ব্যর্থহীন নিন্দা” এবং “দেশ রক্ষার কাজে সরকারের চেষ্টার সহিতও সহযোগিতা” করার কথা উল্লেখ করিয়া বলা হইয়াছিল যে,--- ভারতের শ্রমিক, কৃষক ও মেহনতী জনতা তথা ভারতের ব্যাপক জনসাধারণের স্বার্থের সাথে আমাদের দেশের শ্রমিক, কৃষক ও জনগণের স্বার্থের কোন দ্বন্দ্ব নাই। পাক-ভারত যুদ্ধে এই উভয় দেশের জনসাধারণেরই নিদারুণ ক্ষতি হইয়াছে।”--- “আমরা চাই অবিলম্বে যুদ্ধ বন্ধ হউক” এবং “পারস্পরিক আলাপ আলোচনা ও সমঝোতার” মধ্য দিয়া কাশ্মীরের বিরোধ সহ পাক-ভারতের মধ্যকার সকল বিরোধের মীমাংসা হউক।--- শ্রমিক শ্রেণীর পার্টি প্রলেতারিয় আন্তর্জাতিকতাবাদের প্রতি বিশ্বস্ত থাকিয়া পাক-ভারত জনগণের সম স্বার্থ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে শান্তির কথা তুলিয়া ধরিয়াছিল।--- কিন্তু--- ঐ প্রস্তাবে--- একটা বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদী বিচ্যুতি--- কিছুটা ঘটিয়াছিল।--- প্রস্তাবে লাহোর ফ্রন্টের ভারতের আক্রমণের তীব্র নিন্দা করা হইয়াছিল। কিন্তু আমাদের নিজ রাষ্ট্রের গণ-বিরোধী শাসকগণের যুদ্ধের প্ররোচনা দানের সমালোচনা করা, যা ছিল শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির প্রথম কর্তব্য, উহা করা হয় নাই।--- জনগণের ভিতর সাম্প্রদায়িক জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির সামনে যে পরীক্ষা উপস্থিত করিয়াছিল, পার্টির অধিকাংশ সভ্য, সমর্থক ও দরদী তাহা উত্তীর্ণ হইতে পারিয়াছেন।--- ন্যাপ নেতৃত্বের আত্মঘাতী নীতি কিন্তু, পার্টির--- কেন্দ্রীয় কমিটির ‘পিকিংপন্থী’ দুইজন সভ্য প্রথম ৭ই সেপ্টেম্বরের প্রস্তাবে মত দিয়াছিলেন। কিন্তু, ‘পাকিস্তান কাশ্মীরীদের আত্মনিয়ন্ত্রণের জন্য ও ভারতীয় সম্প্রসারণবাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিতেছে’, ‘এই যুদ্ধ পাকিস্তানের পক্ষে ন্যায় যুদ্ধ’ পিকিং রেডিও’র এই সব উস্কানিমূলক প্রচারের পর হইতেই কেন্দ্রীয় কমিটির ঐ দুইজন সভ্য ও গোটা পিকিংপন্থী গ্রুপ যুদ্ধ সম্পর্কে এরূপ প্রচারে নামিয়া পড়িয়াছিল।--- ‘আইয়ুব খানের বৈদেশিক নীতি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী’ ‘আইয়ুব সরকারকে বিব্রত করা উচিত নয়’ প্রভৃতি দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদী বিচ্যুতি হইতে ‘পিকিংপন্থীরা’--- বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের পক্ষে নিমজ্জিত হইয়াছিল।--- ফলশ্রুতিতে তখন হইতে ন্যাপ জনগণ, বিশেষ করিয়া মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী মহলের নিকট সরকার সমর্থক বলিয়া চিহ্নিত হইয়া উঠিতেছিল।--- বলা বাহুল্য, পাক-ভারত যুদ্ধের প্রশ্নে পার্টির ভিতর মতবিরোধ শ্রমিকশ্রেণীর আন্তর্জাতিকতাবাদের সহিত বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদের সংঘাত তীব্ররূপ ধারণ করিয়াছিল।--- সোভিয়েট ইউনিয়ন শান্তি প্রচেষ্টার ফলে এই মারাত্মক পরিস্থিতির পরিসমাপ্তি ঘটিয়াছিল।--- সোভিয়েট ইউনিয়নের উদ্যোগেই ১৯৬৬ সনের জানুয়ারীর প্রথম সপ্তাহে পাক-ভারতের নেতাদের ভিতরে তাসখন্দ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হইয়াছিল এবং সোভিয়েত প্রধানমন্ত্রী কোসিগিনের অক্লান্ত কর্ম প্রচেষ্টাতেই তাসখন্দ ঘোষণা স্বাক্ষরিত হইয়াছিল (১০ই জানুয়ারী)।--- যুদ্ধ বিরতি, ও তাসখন্দ ঘোষণার পর টেঁটুপাতা আমদানীর উপর হইতে নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের দাবীতে সারা পূর্ববঙ্গে বিড়ি শ্রমিকদের আন্দোলন, কৃষক সমিতির আহ্বানে লেভী প্রথার জুলুমের প্রতিবাদে কৃষকদের বহু সভা, সমাবেশ অনুষ্ঠান, কতকগুলি স্থানে ভূখা মিছিল প্রভৃতির মধ্য দিয়া জনগণের বিক্ষোভের প্রকাশ ঘটিয়াছিল। ইহা ছাড়া, ঢাকা জেলার রায়পুরা অঞ্চলে বেলাবো বাজারে ইজারাদারদের জুলুমের বিরুদ্ধে যুদ্ধের পূর্বে যে আন্দোলন শুরু হইয়াছিল, যুদ্ধের সময়ে উহা স্থগিত থাকার পর যুদ্ধ বিরতির পরে আবার জাগিয়া উঠিয়াছিল। সরকার এই আন্দোলনের বিরুদ্ধে তীব্র দমননীতি চালাইয়াছিল এবং ন্যাপের একজন নেতা ও আন্দোলনের প্রধান প্রধান নেতাদের দেশরক্ষা আইনে গ্রেপ্তার করিয়াছিল। ইহা সত্ত্বেও ঐ আন্দোলন জয়ী হইয়াছিল।--- এই সময়ে পার্টির আনুষ্ঠানিক একতা বজায় থাকিলেও ‘পিকিংপন্থীরা’ আলাদা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করিয়া তাহাদের কাজকর্ম চালাইতেছিল।--- শ্রমিক ফ্রন্টেও পার্টির কর্মীদের ভিতর বিভেদ চলিতেছিল এবং বামপন্থী হঠকারিতাহেতু রেল আন্দোলনে বিপর্যয়ের প্রতিক্রিয়ায় তখন পার্টির--- সারা শ্রমিক আন্দোলনেই সমূহ ক্ষতি হইয়াছিল।--- কৃষক সমিতি তখন কার্যতঃ অকেজো হইয়া পড়িতেছিল এবং ১৯৬৬ সনে এপ্রিল মাসে রায়পুরাতে অনুষ্ঠিত প্রাদেশিক কৃষক সম্মেলন--- বিক্ষুব্ধ কৃষক সমাজকে কোন নেতৃত্ব দিতে পারে নাই।--- ৬-দফার আন্দোলন ও পার্টির নীতি এই পরিস্থিতিতে, ১৯৬৬ সনের ফেব্রুয়ারী মাসে আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব জনগণের সামনে তাহাদের ৬-দফা কর্মসূচী পেশ করিয়াছিল। এই কর্মসূচীর মূল দাবী ছিল, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্র ও পূর্ববঙ্গের পরিপূর্ণ ও ব্যাপক আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসন। ঐ কর্মসূচী পূর্ববঙ্গে জনমতের ব্যাপক সমর্থন পাইয়াছিল। গণ-বিরোধী সরকার প্রথম হইতে ঐ কর্মসূচীকে ‘বিচ্ছিন্নতাবাদী’ বলিয়া আক্রমণ করিতেছিল।--- এই সময়ে (১৯৬৬ সনের মার্চ মাসের শেষের দিকে) আমাদের পার্টির ‘পিকিংপন্থী’ জন কয়েক নেতা--- পার্টির অগোচরে সরকারের সাথে একটা সমঝোতা করিয়া তাঁহাদের উপর হইতে গ্রেপ্তারী পরোয়ানা প্রত্যাহার করাইয়া প্রকাশ্য হইয়া গিয়াছিলেন। প্রকাশ্য হইয়াই তাঁহারা ৬-দফা কর্মসূচীর আন্দোলনের বিরুদ্ধে প্রচারে অবতীর্ণ হইয়াছিলেন। তাঁহারা ঐ আন্দোলনের পিছনে “সি আই এ’র ষড়যন্ত্রও” আবিষ্কার করিয়াছিলেন। ৬-দফা কর্মসূচী ও উহার আন্দোলন সম্পর্কে কেন্দ্রীয় কমিটির এক প্রস্তাবে বলা হইয়াছিল যে, “দাবী হিসাবে ৬-দফা দাবী হইল মূলতঃ, পার্লামেন্টারী গণতন্ত্রসহ পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের দাবী। ঐ দাবী ন্যায়সঙ্গত।”--- ঐ কর্মসূচিকে ‘পূর্ববঙ্গের জনগণের মুক্তির সনদ’ বলিয়া আখ্যায়িত করাকে সমালোচনা করিয়া ও ঐ কর্মসূচীর অসম্পূর্ণতা দেখাইয়া বলা হইয়াছিল যে, ৬-দফা কর্মসূচীর দাবীগুলি ন্যায়সঙ্গত হইলেও “শ্রমিক-কৃষকের দাবী-দাওয়া, সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী দাবী, ব্যক্তি স্বাধীনতার দাবী প্রভৃতি জরুরী দাবীর ইহাতে কোন উল্লেখ পর্যন্ত নাই। ইহা হইল এই কর্মসূচীর নেতিবাচক দিক।--- ৭ জুনের হরতাল ৬-দফা কর্মসূচীর আন্দোলনের বিরুদ্ধে সরকারের উগ্র শাসানি ও পিকিংপন্থীদের অপ-প্রচার সত্ত্বেও সে আন্দোলন অগ্রসর হইয়া গিয়াছিল এবং জনগণ বিশেষ করিয়া মধ্যবিত্ত ও বুদ্ধিজীবী ঐ আন্দোলন সমর্থন করিতেছিল। মে মাসে আওয়ামী লীগের সমস্ত প্রধান প্রধান নেতা গ্রেপ্তার হইয়া গেলেও কর্মীরা আন্দোলনকে অগ্রসর করিয়া নিয়া যাইতেছিল--- ৭ই জুন সারা প্রদেশে হরতাল আহ্বান করিয়াছিল।--- শিল্প এলাকার গরীব জনসাধারণ ও শ্রমিকগণ উদ্যোগ নিয়া হাজারে হাজারে রাস্তায় নামিয়া আসিয়া পুলিশের তীব্র দমন নীতির মোকাবিলা করিয়াছিল এবং সমস্ত কলকারখানা, যানবাহন প্রভৃতি অচল করিয়া হরতালকে অপূর্ব সাফল্যমণ্ডিত করিয়া তুলিয়াছিল। পুলিশের গুলিতে সে দিন, সরকারী হিসাব মতেই, ঢাকা নারায়ণগঞ্জে ১১ জন নিহত হইয়াছিল, যদিও নিহতের সংখ্যা আসলে ছিল আরও অনেক বেশী। গ্রেপ্তার হইয়াছিল শত শত। ৭ই জুনের পর ঢাকা নারায়ণগঞ্জের জনগণ ও শ্রমিকদের ভিতর যে ব্যাপক বিক্ষোভ ও উত্তেজনা বিরাজ করিতেছিল এবং সারা পূর্ববঙ্গে তখন যে অবস্থা ছিল তাহাতে ঐ সংগ্রামকে বিভিন্নভাবে অগ্রসর করিয়া নিয়া যাওয়াও সম্ভব ছিল। কিন্তু, আওয়ামী লীগ ৭ই জুনের পর জনগণকে আর কোন নেতৃত্ব দেয় নাই। তাই, ৭ই জুনের জনগণের ঐ গৌরবময় সংগ্রামের পর নেতৃত্বের অভাবে ৬-দফা আন্দোলন আর অগ্রসর হয় নাই।--- ৭ই জুনের সংগ্রামে কোন কোন স্থানে আমাদের কয়েক জন কর্মী অংশ গ্রহণ করিলেও পার্টির অধিকাংশ কর্মী ইহাতে অংশ গ্রহণ করিতে পারেন নাই। পাকিস্তান হওয়ার পর উহাই ছিল প্রথম ঘটনা যখন জনগণ ও শ্রমিকরা রাস্তায় নামিয়া নিজেদের দাবীর জন্য সংগ্রামে লিপ্ত হইলেও শ্রমিকশ্রেণীর পার্টির কর্মীরা দূরে দাঁড়াইয়া নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিতে বাধ্য হইয়াছিলেন।--- এই পটভূমিতে গণ-বিরোধী সরকার আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমান এবং কতিপয় সামরিক ও সিভিল অফিসারকে “পাকিস্তান হইতে পূর্ববাংলাকে বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টার” অভিযোগে গ্রেপ্তার করে, কতিপয় অভিযুক্ত ব্যক্তিকে পুলিশ-লকআপে অমানুষিক ও বর্বর অত্যাচার করিয়া তাহাদের নিকট হইতে স্বীকারোক্তি আদায় করে এবং সেইগুলির ভিত্তিতে ধৃত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে এক ষড়যন্ত্র মামলাও দায়ের করে। কিন্তু, এই মামলার প্রতিক্রিয়ায় জনগণের ভিতর অভিযুক্ত ব্যক্তিদের পক্ষেই সমর্থনের যে মনোভাব দেখা যাইতেছে তাহাতে বুঝা যাইতেছে যে, মামলা দায়ের করার পিছনে সরকারের রাজনৈতিক উদ্দেশ্য ব্যর্থ হইয়া যাইতেছে।--- (চলবে)