শিক্ষায় বরাদ্দ : গুণগত শিক্ষার জন্য যথেষ্ট নয়

Posted: 21 জুন, 2026

২০২৬-২৭ বছরের বাজেট সম্প্রতি জাতীয় সংসদে প্রস্তাব আকারে উত্থাপিত হয়েছে। ঋণের বোঝা, কারখানা বন্ধ, বেকারত¦, জ্বালানি সংকট ও মুদ্রাস্ফীতির পরিস্থিতিকে সামাল দিতে হবে সরকারকে। সরকারের বিভিন্ন বিভাগ, পরিকল্পনাবিদ, দাতাগোষ্ঠীর নামে ঋণের কারবারি সংস্থা, উন্নয়ন সংস্থা/এনজিও সিভিল সোসাইটি, গ্লোবাল এডুকেশন ফান্ড, ইউনেস্কোর পক্ষ থেকে আলোচনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও পেশাজীবী সংগঠনের দাবি-দাওয়া ও তাদের মতামত বিবেচনা করে সরকার বাজেট ঘোষণা করবেন–এমনটাই মানুষের প্রত্যাশা ছিলো। কৃষি, শিল্পসহ সেবাখাত উদারীকরণ বা বেসরকারিকরণ, বেসরকারি বিনিয়োগ বৃদ্ধির মাধ্যমে কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং করের আওতা বৃদ্ধির মাধ্যমে, রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি সামনে এনেছে, মোটাদাগে রাষ্ট্র জনগণের শিক্ষা, স্বাস্থ্য, খাদ্য আর কর্মসংস্থানের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে দায় গ্রহণ করছে না। রাজনৈতিক দর্শনে ভিন্ন চিন্তার বাইরেও সরকার দলীয় রাজনীতির মদাদর্শের অনুসারীরাও বাজেট বিষয়ে ভিন্নমত প্রকাশ করেছে। ঋণ করে বড় ধরনের ঘাটতি বাজেট করা এবং ঋণের সুদ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২০.৫০%, যেখানে রাষ্ট্রের সরকারি কর্মচারীদের বেতন-ভাতাবাবদ বরাদ্দ ১৪.৪০%। দায়িত্বশীল বিরোধী দলের অনুপস্থিতিতে প্রস্তাবিত বাজেট সংশোধনীতে যেয়ে বড় ধরনের পরিবর্তনেরও আশা করা যায়না, অতএব ঘোষিত বাজেটই সংশোধিত বাজেট হয়ে সরকারের মূল বাজেট হিসেবে বহাল থাকবে এমনটাই সবার ধারণা। প্রস্তাবিত ৯ লক্ষ ৩৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট, যা চলতি অর্থ বছরের সংশোধিত বাজেটের চেয়ে ১৮% বেশি। রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ৬ লক্ষ্য ৯৫ হাজার কোটি টাকা ,যার মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড বা এনবিআর আদায় করবে ৬ লক্ষ ৪ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি ২ লক্ষ ৪৩ হাজার কোটি টাকা, যা দেশি, বিদেশি খাত ও ব্যাংক থেকে ঋণ করবেন। বার্ষিক উন্নয়ন খাতে ৩ লক্ষ হাজার কোটি টাকা। ঘাটতি বাজেট আর উন্নয়ন কর্মসূচির পরিমাণটা প্রায় কাছাকাছি। রাজস্ব আদায় যথাযথভাবে না হলে উন্নয়ন কর্মসূচি হুমকির মুখে পড়বে অথবা বরাদ্দকৃত টাকা ব্যবহার না করে ঘাটতি বাজেটের সাথে সমন্বয় করা হতে পারে। দেশীয় শিল্পকে রক্ষা এবং মুদ্রাস্ফীতিকে নিয়ন্ত্রণ করতে ৭.৫ মূল্যস্ফীতি এবং ৬.৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি ধরে বাজেট করা হয়েছে। ২০২৫/২৬ অর্থবছরে বাজেট ছিলো ৭ লক্ষ ৯০ হাজার কোটি টাকা, যা পূর্বের (২০২৪-২৫) বছরের তুলনায় ৭ হাজার কোটি টাকা কম এবং বাজেট ঘাটতি ছিলো জিডিপির ৩.৬২ শতাংশ। ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি এবং ৬.২ শতাংশের মুদ্রাস্ফীতির লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে বাজেট ঘোষণা করা হয়েছিলো। বিগত অর্থবছরে খাতওয়ারি বরাদ্দ ছিলো–জনপ্রশাসন ২৪%, সুদ পরিশোধ ১৫%, শিক্ষা ও প্রযুক্তি ১৪%, পরিবহন ও যোগাযোগ ৯%, সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণ ৬%, কৃষি ৬%, স্বাস্থ্য ৫%, প্রতিরক্ষা ৫%, জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা ৪%, জ্বালানি ও বিদ্যুৎ ৩%। এ বছর সর্বোচ্চ বরাদ্দ জনপ্রশাসনে ১৫.১%, সুদ পরিশোধ ১৩.৬% এবং শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে ১৩.১%, বিভিন্ন স্টেকহোল্ডারদের পক্ষ থেকে বাজেটের ২০% এবং জিডিপির ৬% বরাদ্দের দাবি ছিলো, কিন্তু বরাদ্দ হয়েছে বাজেটের ১৩.১% এবং জিডিপির ২%। যদিও সরকার নির্বাচনী ইস্তেহারে শিক্ষায় জিডিপির ৫% বরাদ্দের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলো। সর্বোচ্চ উন্নয়ন ব্যয় পরিবহন ও যোগাযোগ (১৫.৮%), শিক্ষা ও প্রযুক্তিতে (১৫.৭%)। গতানুগতিক বাজেট নীতির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন ও জীবিকার মান উন্নয়ন কঠিন হবে, তেমনই বৈষম্যও বহালই থাকবে। সরকারি বেতন-ভাতা খাতে ৮৯,৩৮০ কোটি টাকা, প্রতিরক্ষা খাতে ৪২,৪৯৭ কোটি, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জন্য ৩১,০৯৯ কোটি, অর্থাৎ দুটি সামাজিক খাত মিলে ৭৩৫৯৬ কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে (ফ্যামিলি কার্ড) ১,৪৫,০০০ কোটি টাকা, কৃষিখাতে (কৃষিকার্ডসহ) ১০৬৬.৫ কোটি টাকা। ৪ কোটি শিক্ষার্থী আর ১৪ লক্ষ শিক্ষক কর্মচারী নিয়ে গঠিত শিক্ষা পরিবারের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থ যথেষ্ট নয়, যদিও আগের বাজেট থেকে বেশি। ২৪ বছর পর্যন্ত বয়সের ৪১ ভাগ শিক্ষার্থী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে ঝরে পড়েছে, এদের বিষয়টি বিবেচনায় রাখার প্রয়োজন। চুল-দাড়ি কাটার জন্য যদি রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে কাউকে অর্থ সরবরাহ করা হয়, অন্যদিকে প্রকল্প আর অনুদানের টাকায় শিক্ষা-স্বাস্থ্য পরিচালনা করলে, সেখানে দৈন্যদশা কিয়ামতের আগে কাটবে বলে মনে হয় না, তার উদাহরণ আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। শিক্ষার দর্শন কী হবে। শিক্ষা শিক্ষার্থীকে প্রশিক্ষিত ডিগ্রিধারী বানাবে না মানবিক গুণসম্পন্ন সৃষ্টিশীল উদ্ভাবনী মানুষ বানাবে। সেই কারণে আন্তর্জাতিকভাবে দাবি উঠেছে কোয়ালিটি, ইক্যুইটি ইনক্লুসিভ এবং লাইফলং শিক্ষা বাস্তবায়নের। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে এটি বাস্তবায়নে সরকারের পরিকল্পনা কমিশন সুপারিশ করেছে জিডিপির ৪.৪%। এ ধরনের শিক্ষা বাস্তবায়নে দক্ষ যোগ্য এবং প্রশিক্ষিত শিক্ষক প্রয়োজন, প্রযোজন ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ, পর্যাপ্ত উপকরণ, এবং গবেষণা কাজ। কাজটি কঠিন হলেও করতে হবে। এ বিষয়টি নিয়ে ব্যক্তি সমাজ ও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। শিক্ষকদের বেতন-ভাতা বাড়ানোর প্রয়োজন, কিন্তু ২% বরাদ্দ দিয়ে সেটা সম্ভব নয়। বাজেটের এই বরাদ্দ থেকেই নবম পে-কমিশন অনুযায়ী শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রদান ৫ বছর ধরে জমে থাকা লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর অবসর ও কল্যাণ তহবিলের টাকা প্রদান এমপিওভুক্ত প্রায় ৫ লক্ষাধিক শিক্ষক-কর্মচারীর বাড়িভাড়া বাবদ পূর্বের তুলনায় ৭.৫% টাকা প্রদান এবং মুদ্রাস্ফীতির কারণে শিক্ষার জন্য ইতিবাচক বড় কিছু আশা করা যায় না। এরপরও প্রকল্পের নামে নয়-ছয় এবং বাজেটের টাকা অব্যবহৃত অবস্থায় থাকার ঘটনাও রয়েছে। সবার জন্য একটা স্তর (প্রথম শ্রেণি-দ্বাদশ শ্রেণি) পর্যন্ত শিক্ষার দায় সরকারকে নিতে হবে, সরকার আন্তর্জাতিক অনেকগুলো ডিক্লারেশনে সেই সম্মতি দিয়েছে। কারণ জাতিসংঘভুক্ত সকল দেশের সরকার ১৮ বছর বয়স পর্যন্ত সকল নাগরিককে শিক্ষা প্রদানের প্রতিশ্রুতি দিয়েছে ১৯৪৮ সালে গৃহীত আন্তর্জাতিক সর্বজনীন মানবাধিকার ঘোষণাপত্রে, সেটি আরেকবার সম্মতি দিয়েছে ২০১৫ সালে দক্ষিণ কোরিয়ার ইনচন সম্মেলনে গৃহীত এসডিজিস এর ডিকøারেশনে। তারই আলোকে জাতিসংঘের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ইউনেস্কোর সুপারিশ অনুযায়ী জিডিপির ৭ ভাগ, অপারগতায় ৬ ভাগ ব্যয় করার অঙ্গীকার করেছে। স¦াধীনতার পর ৫৫ বছরে শিক্ষায় সর্বোচ্চ বরাদ্দ ২.৪ ভাগ আর সর্বনিন্ম বরাদ্দ ১.৬৭ ভাগ, সর্বনিম্ন বরাদ্দটাও বর্তমান অর্থ বছরে,বরাদ্দ ছিলো ১.৬৭% আর ব্যয় হয়েছে ১.৩%। বেসরকারি এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের বাড়িভাড়া এখনও মূল বেতনের মাত্র ৭ ভাগ, উতসব বোনাস ৫০ ভাগ, এমপিওবিহীন লক্ষাধিক শিক্ষক- কর্মচারী, অবসরে যাওয়ার ৫ বছর পরও তাদের কর্তনকৃত অবসর ও কল্যাণের টাকা পাচ্ছেন না। অবসরপ্রাপ্ত ১৫ ভাগ শিক্ষক-কর্মচারী কল্যাণ ও অবসরের টাকা পাওয়ার আগেই মৃত্যুবরণ করছে। সরকার প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের জামা, জুতা ব্যাগ প্রদান এবং স্নাতকের ছাত্রীদের উপবৃত্তি প্রদানের ঘোষণা দিয়েছে, এটা ভালো উদ্যোগ, তবে বেসরকারি শিক্ষকদের জন্য শিক্ষায় বরাদ্দ বাড়ানোর প্রয়োজন। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে শিক্ষায় কম বরাদ্দ বাংলাদেশে। একবারে না পারলেও বার বার আংশিক করে দিয়ে বাজেট বাড়ানো যেতে পারে। শিক্ষাখাতে আয়ের নতুন নতুন খাত বের করা যেতে পারে। শিক্ষা যেহেতু সকল নাগরিকের জন্যই দরকার, সে কারণে অন্যান্য করের সাথে শিক্ষা কর ধরা, প্রধানমন্ত্রীর শিক্ষা তহবিলে ধনাঢ্য ব্যক্তিদের অনুদান গ্রহন, কোম্পানীগুলির সিএসআর এর টাকা যথাযথভাবে আদায়পূর্বক শিক্ষাখাতের বাজেট বাড়ানো যেতে পারে, অন্যদিকে বর্তমানে শিক্ষায় বরাদ্দকৃত টাকার সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের টাকা প্রতিরক্ষা খাতের ক্যাডেট শিক্ষায় না দেওয়া, প্রকল্পের নামে হরিলুটের কালচার বন্ধ করা এবং শিক্ষায় বরাদ্দকৃত টাকা অব্যহৃত না রাখার মধ্য দিয়ে শিক্ষায় অর্থ সংকট কিছুটা হলেও কমানো যেতে পারে, সেইসাথে প্রতি বছর অল্প অল্প বরাদ্দ বৃদ্ধির মাধ্যমে শিক্ষার আর্থিক সংকট কাটানো যেতে পারে। শিক্ষায় বাণিজ্যিকীকরণের মধ্য দিয়ে বৈষম্যের যে প্রাচীর তৈরি করা হয়েছে, তা না ভাঙলে সমাজের বৈষম্যও কমবে না। মফস্বলের মানুষ, হাওড়, বাওড়, পার্বত্য অঞ্চল, চর অঞ্চলের সুবিধাবঞ্চিত মানুষের ছেলে-মেয়েকে শিক্ষার মূলধারায় আনতে বিশেষ ব্যবস্থা করা জরুরি। আর এই কাজগুলি করতে নতুন নতুন আইডিয়া নিয়ে কাজ করা এবং সেখোনে আর্থিক বরাদ্দের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। বিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর, শিক্ষা সমাপ্ত করার আগেই ঝরে পরা ৪১ শতাংশ (প্রাথমিক স্তরে ১৩ ভাগ, মাধ্যমিক স্তরে ২৮ ভাগ) শিক্ষার্থীর শিক্ষা ও ভবিষ্যৎ জীবন ও জীবিকার কথা বিবেচনা করে বয়স্ক শিক্ষা উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা এবং ভোকেশনাল শিক্ষার জন্য প্রাথমিক ও গণসাক্ষরতা খাতে বরাদ্দ বাড়ানো প্রয়োজন। মেধাবীদের জন্য সুযোগ সৃষ্টির অভাবে মেধা পাচার অব্যাহত আছে। টাকা পাচার, হুন্ডি সব মিলিয়ে অর্থনীতির জন্য সংকট সৃষ্টি করেছে। দেশের অর্থনীতির জন্য সম্ভাবনাময়ী সেক্টর গার্মেন্টস শিল্পের শ্রমিক, খাদ্যের যোগানদার কৃষক সমাজ আর বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনকারী শ্রমিকদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য শিক্ষার আধুনিকীকরণ, বিজ্ঞান শিক্ষার প্রসার আর দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য উদ্যোগ গ্রহণ এবং সংশোধিত বাজেটে শিক্ষায় বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবি রাখে। লেখক : কলেজ অধ্যক্ষ ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, বাকবিশিস