কতটুকু মাংস খাওয়া স্বাস্থ্যসম্মত?

Posted: 14 জুন, 2026

একতা স্বাস্থ্য ডেস্ক : কোরবানির ঈদ মানেই আনন্দ, উৎসব আর নানা ধরনের সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। আর এই আয়োজনের কেন্দ্রেই থাকে গরু ও খাসির মাংস। অনেক পরিবারে ঈদের কয়েক দিন ধরে সকাল, দুপুর ও রাত–সব খাবারেই চলে মাংসের বাহারি পদ। কিন্তু আনন্দের এই সময়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন প্রায়ই উঠে আসে–আসলে কতটুকু মাংস খাওয়া শরীরের জন্য নিরাপদ? বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মাংস একদিকে যেমন গুরুত্বপূর্ণ পুষ্টির উৎস, অন্যদিকে অতিরিক্ত খেলে এটি হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ক্যান্সার ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে। তাই মাংস পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই, বরং প্রয়োজন সঠিক পরিমাণ ও স্বাস্থ্যসম্মত উপায়ে খাওয়ার অভ্যাস। ডায়াবেটিস, থাইরয়েড ও হরমোন রোগ বিশেষজ্ঞ ডা. এ হাসনাত শাহীন জানিয়েছেন, গরু ও খাসির মাংসকে “রেড মিট” বলা হয় এবং এটি উচ্চমানের প্রাণিজ প্রোটিনের অন্যতম বড় উৎস। প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে প্রায় ২৬ গ্রাম বিশুদ্ধ প্রোটিন থাকে। এই প্রোটিন শরীরের কোষ গঠন, ক্ষত সারানো, পেশি তৈরি এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। শুধু প্রোটিনই নয়, মাংসে রয়েছে আয়রন, জিঙ্ক, সেলেনিয়াম, থায়ামিন, রিবোফ্লাভিন এবং ভিটামিন বি-১২-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব উপাদান রক্তস্বল্পতা দূর করতে সাহায্য করে, শরীরের শক্তি বাড়ায় এবং ত্বক, চুল ও নখের সুস্থতায় ভূমিকা রাখে। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি এবং হাড় মজবুত করতেও প্রাণিজ প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সমস্যা শুরু হয় অতিভোজন থেকে। গবেষণায় দেখা গেছে, লাল মাংসে স্যাচুরেটেড ফ্যাট বা জমাট চর্বির পরিমাণ তুলনামূলক বেশি। প্রতি ১০০ গ্রাম গরুর মাংসে প্রায় ২ দশমিক ৫ গ্রাম স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকে। এই অতিরিক্ত চর্বি রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ ও কোলন ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়তে পারে। ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, একজন পূর্ণবয়স্ক মানুষের দৈনিক মোট প্রোটিন গ্রহণ ৭০ গ্রামের বেশি হওয়া উচিত নয়। সেই হিসেবে একজন সুস্থ মানুষ দৈনিক প্রায় ৫০ থেকে ৭০ গ্রাম এবং সপ্তাহে গড়ে ৪০০ থেকে ৫০০ গ্রাম পর্যন্ত লাল মাংস খেতে পারেন। তবে এটি নির্ভর করে ব্যক্তির বয়স, ওজন, শারীরিক পরিশ্রম এবং স্বাস্থ্যগত অবস্থার ওপর। বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলেছেন, যাদের ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগ, কোলেস্টেরল সমস্যা বা পরিবারে হৃদরোগের ইতিহাস রয়েছে, তাদের ক্ষেত্রে আরও সতর্ক থাকা জরুরি। কারণ অতিরিক্ত মাংস ও চর্বিযুক্ত খাবার তাদের জন্য দ্রুত স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে। গবেষকদের মতে, শুধু কতটুকু মাংস খাওয়া হচ্ছে সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়; কীভাবে রান্না করা হচ্ছে সেটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অতিরিক্ত তেল, ঘি ও মসলা দিয়ে ভুনা বা কষা মাংস শরীরের জন্য বেশি ক্ষতিকর হতে পারে। বরং কম তেলে রান্না, গ্রিল, বেক অথবা হালকা ঝোল করা তুলনামূলক স্বাস্থ্যসম্মত। ডা. এ হাসনাত শাহীন পরামর্শ দিয়েছেন, রান্নার আগে মাংসের ওপরের দৃশ্যমান সাদা চর্বি ফেলে দেওয়া উচিত। এছাড়া ভিনেগার, লেবুর রস বা টক দই দিয়ে মাংস ম্যারিনেট করলে কিছুটা চর্বি কমে এবং হজমও সহজ হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, খুব বেশি তাপে দীর্ঘসময় ধরে মাংস রান্না করলে ক্ষতিকর রাসায়নিক তৈরি হতে পারে। যেমন পলিসাইক্লিক হাইড্রোকার্বন ও হেটেরোসাইক্লিক অ্যামাইন জাতীয় উপাদান, যা দীর্ঘমেয়াদে ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। তাই মাঝারি আঁচে ধীরে ধীরে রান্না করাই ভালো। মাংস খাওয়ার সঙ্গে পর্যাপ্ত সবজি ও সালাদ রাখার পরামর্শ দিয়েছেন পুষ্টিবিদরা। শসা, টমেটো, লেবু ও আঁশযুক্ত সবজি মাংস হজমে সাহায্য করে। একই সঙ্গে অতিরিক্ত কোমল পানীয় বা মিষ্টিজাত খাবারের বদলে টকদই, মাঠা বা পুদিনার শরবত খাওয়া ভালো। আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো শরীরচর্চা। মাংস খাওয়ার পরিমাণ বাড়লে হাঁটাচলা ও হালকা ব্যায়ামও বাড়ানো উচিত। কারণ অতিরিক্ত ক্যালরি পোড়ানো না গেলে দ্রুত ওজন বৃদ্ধি ও বিপাকীয় সমস্যা দেখা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, মাংস কখনোই “খারাপ খাবার” নয়। বরং এটি শরীরের জন্য প্রয়োজনীয় পুষ্টির গুরুত্বপূর্ণ উৎস। তবে অতিরিক্ত খাওয়া, অতিরিক্ত চর্বি এবং অস্বাস্থ্যকর রান্নার ধরনই মূল ঝুঁকির কারণ। তাই উৎসবের আনন্দ উপভোগ করতে হলে প্রয়োজন সচেতনতা ও পরিমিত খাদ্যাভ্যাস।