আমার বাবার সংগ্রাম ও আদর্শের স্মৃতি
Posted: 14 জুন, 2026
আমার বাবা কমরেড জ্যোতিষ বসুকে নিয়ে লিখতে বসলে প্রথমেই একটি কথা বলতে হয়, আমি তাঁকে স্মৃতিতে খুব বেশি ধরে রাখতে পারিনি। শিশু বয়সেই তাঁকে হারিয়েছি। তাই বাবাকে আমি চিনেছি আত্মীয় পরিজন ও তাঁর সহযোদ্ধাদের স্মৃতিচারণে, সবচেয়ে বেশি আমার মা ছায়া বসুর মুখে শোনা গল্পে।
আমার কাছে বাবা শুধু একজন মানুষ নন। তিনি একটি সময়ের ইতিহাস, একটি রাজনৈতিক ধারার প্রতিনিধি এবং আদর্শের জন্য জীবন উৎসর্গ করা এক বিরল সংগ্রামী মানুষ।
১৯২০ সালে ময়মনসিংহ শহরের নওমহলে জন্মগ্রহণ করেন জ্যোতিষ বসু। তাঁর বাবা উমেশ চন্দ্র বসু এবং মা লাবণ্য প্রভা বসু ছিলেন দেশপ্রেমিক ও প্রগতিশীল চিন্তার মানুষ। আমার ঠাকুরমা (বাবার মা) লাবণ্য প্রভা বসু কংগ্রেসের একজন সক্রিয় নারী নেত্রী ছিলেন। নারীদের স্বাবলম্বী করার লক্ষ্যে তিনি ময়মনসিংহের রামকৃষ্ণ মিশন রোডের নিজ বাড়িতে একটি সেলাই ও বয়ন বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন এবং নিজেই সেটি পরিচালনা করতেন। বাবার কাকা উপেন্দ্র বসুও ছিলেন ভারতীয় জাতীয় কংগ্রেসের সংগঠক।
এই রাজনৈতিক ও মানবিক পরিবেশেই বাবার বেড়ে ওঠা। ছাত্রজীবনেই তিনি ময়মনসিংহের বিপ্লবী গোপন রাজনৈতিক সংগঠনের নেতাদের সংস্পর্শে আসেন। বিখ্যাত বামপন্থি বিপ্লবী নেতা সুনির্মল সেনের একান্ত সহচর হিসেবে তাঁর রাজনৈতিক জীবন শুরু হয়। চল্লিশের দশকের শুরুতে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনের একজন সক্রিয় কর্মী হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন। সেই আন্দোলনের একপর্যায়ে ফরোয়ার্ড ব্লকের সঙ্গে সংঘর্ষে তাঁর সহকর্মী ও বন্ধু ফণী চক্রবর্তী নিহত হন এবং কানু রায় আহত হন।
১৯৪০ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যপদ লাভ করেন। ১৯৪৩ সালে ভিয়েতনাম দিবস উপলক্ষে ময়মনসিংহে যে ব্যাপক আন্দোলন গড়ে উঠেছিল, তিনি ছিলেন তার অন্যতম সংগঠক। ১৯৪৪ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্তি লাভের পর তিনি আবার রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় হয়ে ওঠেন।
কমরেড মণি সিং, খোকা রায় এবং আলতাব আলীর মতো নেতাদের সহকর্মী হিসেবে শুরু হয় তাঁর পূর্ণাঙ্গ রাজনৈতিক জীবন। বৃহত্তর ময়মনসিংহ জেলার কৃষকদের ঐতিহাসিক টংক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন।
চল্লিশের দশকের শেষভাগে যখন সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় সমগ্র বাংলা জ্বলছিল, তখন কমরেড আলতাব আলীর সঙ্গে ময়মনসিংহে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা ও দাঙ্গা প্রতিরোধে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। দেশভাগের পর রাজনৈতিক বাস্তবতা সম্পূর্ণ পাল্টে যায়। অনেক নেতাকর্মী দেশত্যাগ করলেও বাবা দেশ ছাড়েননি। মুসলিম লীগ সরকারের দমন-পীড়ন এবং সাম্প্রদায়িক অস্থিরতার মধ্যেও তিনি বৃহত্তর ময়মনসিংহ অঞ্চলে কমিউনিস্ট পার্টিকে সংগঠিত করার কাজে আত্মনিয়োগ করেন।
১৯৪৮ সাল থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত দীর্ঘ ছয় বছর তিনি আত্মগোপনে ছিলেন। পরিচিত ও অপরিচিত মানুষের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে, অনাহার-অর্ধাহার সহ্য করে তিনি পার্টির সাংগঠনিক কাজ চালিয়ে গেছেন। এই সময় পাকিস্তান সরকারের নির্যাতন নেমে আসে তাঁর পরিবারের ওপরও।
১৯৫৬ সালে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তফ্রন্ট সরকারকে অন্যায়ভাবে ভেঙে দিলে পূর্ব বাংলার বহু প্রগতিশীল নেতার সঙ্গে জ্যোতিষ বসুকেও ৯২(ক) ধারায় গ্রেপ্তার করা হয়। মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার আত্মগোপনে চলে যান।
১৯৫৭ সালে তিনি আমার মা ছায়া বসুর সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। আমার মা ছিলেন একটি প্রভাবশালী জমিদার পরিবারের কন্যা। তিনি চাইলে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক জীবন বেছে নিতে পারতেন। কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছিলেন সংগ্রামের জীবন।
১৯৫৮ সালে আইয়ুব খানের সামরিক সরকার আমার বাবা ও মায়ের নামে হুলিয়া জারি করে। বেআইনিভাবে ময়মনসিংহ শহরের পৈত্রিক বাড়িসহ মোট ২৪ কাঠা জমি ও আসবাবপত্র ক্রোক করা হয় এবং পুরো পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ সেই সম্পত্তির ক্ষতিপূরণ দিতে চাইলেও বাবা তা গ্রহণ করেননি। সদ্য স্বাধীন, যুদ্ধবিধ্বস্ত রাষ্ট্রের কোষাগার থেকে ব্যক্তিগত ক্ষতিপূরণ নিতে তিনি রাজি হননি। এতটাই দেশপ্রেমিক ছিলেন তিনি।
১৯৬০ সালে আত্মগোপন অবস্থায় কিশোরগঞ্জে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত প্রায় নয় বছর কারাগারে কাটান। এই দীর্ঘ কারাজীবনে তাঁর সহবন্দিদের মধ্যে ছিলেন মহারাজ ত্রৈলোক্যনাথ চক্রবর্তী, মনোরঞ্জন ধর, নগেন সরকার, মন্মথ দে, সুকুমার ভাওয়াল, কাজী আব্দুল বারী, আলতাব আলী, মহাদেব স্যানাল, রবি নিয়োগী, অজয় রায়, যতীন সরকার, আলোকময় নাহা, মীর কফিল উদ্দিন, তাজউদ্দীন আহমদ, শেখ ফজলুল হক মনি, আ. রাজ্জাক, রফিক উদ্দিন ভূইয়া, কৃষক নেতা সামসুল হক, আজিজুল ইসলাম খানসহ বহু দেশবরেণ্য নেতৃবৃন্দ।
১৯৬৯ সালে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি আবার আত্মগোপনে যান এবং ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় সীমান্ত অতিক্রম করার সময় লেংগুড়া বাজারের কাছে ইপিআরের হাতে আটক হন। একপর্যায়ে তাঁকে ফায়ারিং স্কোয়াডে পাঠানোর সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। কিন্তু স্থানীয় জনগণের প্রবল প্রতিরোধের মুখে তাঁরা মুক্তি পান। টংক আন্দোলনের কারণে ওই অঞ্চলের মানুষের কাছে জ্যোতিষ বসু ছিলেন অত্যন্ত সুপরিচিত ও শ্রদ্ধার মানুষ।
মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে ভারতের মেঘালয়ের বারেঙ্গাপাড়া, চান্দুভুঁই এবং সিশিংপাড়ায় ছাত্র ইউনিয়ন, ন্যাপ ও কমিউনিস্ট পার্টির সমন্বয়ে পরিচালিত তিনটি গেরিলা ক্যাম্পের পরিচালক ছিলেন তিনি। সেই সময় আমাদের পুরো পরিবার দেশের ভেতরে নানাভাবে নির্যাতন ও হয়রানির শিকার হয়েছিল।
স্বাধীনতার পর তিনি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ পুনর্গঠন এবং কমিউনিস্ট পার্টিকে শক্তিশালী গণভিত্তির ওপর দাঁড় করানোর কাজে আত্মনিয়োগ করেন। ১৯৭২ সালে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সংগঠক এবং ১৯৭৩ সালে দ্বিতীয় কংগ্রেসে কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য নির্বাচিত হন। ১৯৮০ সাল পর্যন্ত কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ময়মনসিংহ জেলা কমিটির সম্পাদক ছিলেন।
১৯৭৫ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর তাঁকে আবার আত্মগোপনে যেতে হয়। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রকাশ্যে ফিরে আসেন। তবে বাবার সংগ্রামের ইতিহাস বলতে গেলে আমার মায়ের কথা না বললে তা অসম্পূর্ণ থেকে যায়। এই গল্পের আরেকজন নীরব বিপ্লবীর নাম আমার মা, ছায়া বসু।
পাকিস্তানি শাসনামলে যখন বাবার বিরুদ্ধে হুলিয়া জারি করা হয়, তখন শুধু বাবাই রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের শিকার হননি; আমার মাকেও সেই নির্যাতনের অংশীদার হতে হয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধেও মামলা হয়েছে, হুলিয়া জারি হয়েছে, হাজতবাস করতে হয়েছে। দিনের পর দিন আত্মগোপনে থেকে পার্টির দায়িত্ব পালন করেছেন। পরিবারের সবাই যখন জীবন বাঁচাতে ভারতে চলে যায় তখনও তিনি তার পৈতৃক বাড়িতে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতা করেছেন, পার্টির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সচল রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন।
আমার বাবার দীর্ঘ জেল জীবনের অধিকাংশ সময় সংসারের পুরো দায়িত্ব ছিল আমার মায়ের কাঁধে। তিন সন্তানের লালন-পালন, সংসার পরিচালনা, রাজনৈতিক চাপ, রাষ্ট্রীয় নজরদারি সবকিছু তিনি একা সামলেছেন। কোনো অভিযোগ ছাড়াই, কোনো প্রাপ্তির হিসাব না কষেই।
আজ যখন অতীতের দিকে তাকাই, তখন বুঝতে পারি বাবার সংগ্রামকে সম্পূর্ণভাবে বুঝতে হলে মায়ের সংগ্রামকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে দেখতে হবে। কারণ, একজন মানুষ জেলে থেকেও আদর্শের লড়াই চালিয়ে যেতে পারেন তখনই, যখন বাইরে আরেকজন সমান দৃঢ় মানুষ তাঁর অসমাপ্ত দায়িত্বগুলো বহন করে নিয়ে যান।
আমার মা জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বাবার আদর্শের প্রতি অনুগত ছিলেন। তিনি কখনো ব্যক্তিগত লাভ-ক্ষতির হিসাব করেননি। রাজনৈতিক ক্ষমতা, পদ-পদবি বা আর্থিক প্রাপ্তির কোনো আকাঙ্ক্ষা তাঁকে স্পর্শ করেনি। তিনি বিশ্বাস করতেন মানুষের জন্য কাজ করাই জীবনের সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
আজ আমি যখন বাবা-মায়ের জীবন নিয়ে ভাবি, তখন মনে হয় তাঁরা দুজন শুধু স্বামী-স্ত্রী ছিলেন না; তাঁরা ছিলেন একই স্বপ্নের দুই যোদ্ধা। একজন সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন, আরেকজন নীরবে সেই সংগ্রামের ভিত শক্ত করে গেছেন।
ইতিহাস হয়তো সব নাম মনে রাখে না। কিন্তু আমার কাছে, আমাদের তিন ভাই বোনের কাছে কমরেড জ্যোতিষ বসু এবং ছায়া বসু শুধু আমার বাবা-মা নন; তাঁরা একটি সময়ের প্রতীক, একটি আদর্শের প্রতীক, ত্যাগ, সততা এবং মানুষের প্রতি দায়বদ্ধতার এক বিরল উদাহরণ। তাঁদের সন্তান হিসেবে আমি গর্ব করি এবং সেই গর্বই আমার পরিচয়।
১৮ জুন ১৯৮১ সালে মাত্র ৬১ বছর বয়সে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে বাবা মৃত্যুবরণ করেন। তিনি রেখে গেছেন না কোনো সম্পদের পাহাড়, না কোনো ক্ষমতার উত্তরাধিকার; বরং রেখে গেছেন সততা, ত্যাগ ও আদর্শের এক অনন্য রাজনৈতিক উত্তরাধিকার।
আজকের প্রজন্মের কাছে হয়তো তাঁর নাম খুব পরিচিত নয়। কিন্তু বৃহত্তর ময়মনসিংহের রাজনৈতিক ইতিহাস, কমিউনিস্ট আন্দোলনের ইতিহাস এবং মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কমরেড জ্যোতিষ বসুর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে উচ্চারিত হবে।
লেখক : কমরেড জ্যোতিষ বসু’র দ্বিতীয় কন্যা