বাজেটের আকার ও তার শ্রেণি চরিত্র

Posted: 14 জুন, 2026

শ্রেণিবৈষম্য ও ধনবৈষম্য হলো একটি শ্রেণিবিভক্ত সমাজের অবিচ্ছেদ্য অনুষঙ্গ ও বৈশিষ্ট্য। আমাদের সমাজেও বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে ধন-সম্পদের বিন্যাস ও বণ্টন হলো অসম। শুধু অসম নয়, চরমভাবে ও ক্রমবর্ধমান মাত্রায় অসম। সমাজের মেরুকরণ ঘটেছে প্রধানত দুই বিপরীত প্রান্তে। এক প্রান্তে রয়েছে সমাজের অতি ক্ষুদ্র খুব বেশি হলে ৫ শতাংশের একটি অংশ, যাদের হাতে আজ পুঞ্জিভূত হয়েছে দেশের সিংহভাগ সম্পদ। এরা হলো ‘ঃযব যধাবং’ অর্থাৎ ‘পেট মোটা সব-থাকাদের’ অংশ। অপর প্রান্তে রয়েছে সমাজের সেই বিশাল সংখ্যাগরিষ্ঠ ৯৫ শতাংশ মানুষ, যাদের হাতে রয়েছে জাতীয় সম্পদের ছিটেফোটা মাত্র। এরা হলো ‘ঃযব যধাব-হড়ঃং’ অর্থাৎ ‘কোনো রকমে বেঁচে-বর্তে থাকা সর্বহারাদের’ অংশ। সরকারি হিসাবেই দেখা যায় যে, দেশের ৯৫ ভাগ সম্পদ এখন ৫ ভাগ মানুষের হাতে কুক্ষিগত হয়ে আছে। সম্পদের বিন্যাস ও বণ্টনের ক্ষেত্রে যে বৈষম্য রয়েছে, তা সমাজে অতি কুৎসিত এক ‘অসম মেরুকরণের’ জন্ম দিয়েছে। ধন-সম্পদের ওপর মুষ্ঠিমেয় মানুষের কর্তৃত্ব থাকার এই ঘটনা রাষ্ট্রশক্তির ওপর তাদের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠার এক সহজ সুযোগ করে দিয়েছে। রাষ্ট্র, সমাজ, অর্থনীতি-সবকিছুর ক্ষেত্রেই এখন এই গুটিকয়েক বিপুল ধন-সম্পদের অধিকারী ও ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও পরিবারের ‘রাজত্ব’ কায়েম হয়েছে। সম্পদ ও ক্ষমতার এই কেন্দ্রীভবন দিন দিন বেড়ে চলেছে। দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে আজ এমনভাবে সাজানো হয়েছে, যাতে করে যে সম্পদ মানুষের পরিশ্রম ও মেধাশক্তির দ্বারা সৃষ্টি হচ্ছে, তা অদৃশ্য ‘বাজার শক্তির’ সর্বগ্রাসী হস্তক্ষেপের যোগ-বিয়োগ শেষে, ‘নিচের তলা’ থেকে ‘উপরের তলায়’ ক্রমাগতভাবে স্থানান্তর হয়ে চলেছে। আমাদের দেশে যে ‘পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতির’ ব্যবস্থা অনুসরণ করা হচ্ছে, তার মৌলিক চরিত্র ও বৈশিষ্ট্যই হলো এমনই যে সেখানে একদিকে গরিবের আপেক্ষিক ‘গরিবত্ব’ এবং অন্যদিকে বড়লোকের আপেক্ষিক ‘বড়লোকত্ব’ অবধারিতভাবে বাড়তেই থাকবে। আমাদের দেশে এই পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ‘নয়া উদারবাদী’ ধারা অনুসৃত হওয়ায় এই কেন্দ্রীভবন ও বৈষম্যের প্রক্রিয়া এ দেশের ঐতিহাসিক পশ্চাদপদতাসহ আরও কতক বৈশিষ্ট্যের কারণে বিশেষ মাত্রার গতি ও ব্যাপ্তি সম্পন্ন এবং অমানবিক ও কুৎসিত হয়ে উঠেছে। আমরা মুক্তিযুদ্ধ করেছিলাম এমন এক সমাজের স্বপ্ন নিয়ে যেখানে ‘কেউ খাবে, আর কেউ খাবে না’-এমন অবস্থা আর থাকবে না। যেখানে সাম্যের পথ রচিত হবে। কিন্তু, মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সাড়ে পাঁচ দশক ধরে ‘গরিব আরও গরিব এবং ধনী আরো ধনী হওয়ার’ উল্টো পথ ধরেই আমাদের দেশ চলছে। দেশবাসী চায়, দেশের সমাজ-অর্থনীতি ‘কেউ খাবে, আর কেউ খাবে না’র বৈষম্যের পথের পরিবর্তে প্রকৃত ইনসাফ তথা সাম্যের পথে পরিচালিত হোক। প্রশ্ন হলো-সমাজ ‘বৈষম্যের’ পথে যাচ্ছে, নাকি তা ‘সাম্যের’ পথে অগ্রসর হচ্ছে, তা নির্ণয়ের উপায় কি? এ প্রশ্নের জবাব হলো-শেষ বিচারে তা নির্ভর করে দেশের ধন-সম্পদ কি ‘নিচের তলা’ থেকে ‘উপর তলা’ অভিমুখে, নাকি তা ‘উপর তলা’ থেকে ‘নিচের তলা’ অভিমুখে প্রবাহিত করার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, তার ওপর। ‘পুঁজিবাদী বাজার অর্থনীতি’ এমন একটি ব্যবস্থা, যেখানে বাইরে থেকে রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ না হলে, সম্পদ স্বতঃস্ফূর্ত ও স্বয়ংক্রিয়ভাবেই ‘গরিব থেকে ধনী’ অভিমুখে প্রবাহিত হবে। রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সহায়তায়ই কেবল সম্পদ স্থানান্তরের এই গতিমুখ উল্টিয়ে ‘ধনী থেকে গরিব’ অভিমুখী করা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু রাষ্ট্র সে কাজটি আদৌ করবে কি না তা নির্ভর করে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতির চরিত্র-ধারার ওপর। রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক নীতি কী চরিত্রের হবে সেটি আবার নির্ভর করে সরকারের শ্রেণি চরিত্রের ওপর। সম্পদ প্রবাহের গতিমুখ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ‘বাজেট’ হলো একটি প্রধান গুরুত্বপূর্ণ চাবিকাঠি। তাই, যেকোনো বাজেট মূল্যায়ন করার ক্ষেত্রে সবচেয়ে আগে যেটি বিচার করে দেখা প্রয়োজন তা হলো-তার শ্রেণি চরিত্র ও শ্রেণি অভিমুখীনতা। কিন্তু দেখা যায় যে বাজেটের শ্রেণি চরিত্র নিয়ে আলোচনা খুব একটা হয় না, যতটা না তা হয় তার আকার ও পরিমাণ নিয়ে। এবারও তেমনই করার চেষ্টা করা হয়েছে। গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী সংসদে আগামী অর্থবছরের বাজেট প্রস্তাব পেশ করেছেন। সরকারি মহল থেকে বলা হয়েছিল যে, এবারের বাজেটে ‘চমক’ ও ‘অভিনবত্ব’ থাকবে। কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে মৌলিক চরিত্রের ক্ষেত্রে কোনো ‘চমক’ বা ‘অভিনবত্ব’ নেই। আছে শুধু কিছু চোখ ধাঁধানো ‘কসমেটিক’ তথা প্রসাধনমূলক উপাদান। বাজেটের শ্রেণি চরিত্রের ক্ষেত্রে ‘গতানুগতিকতাই’ বজায় রাখা হয়েছে। এবারের বাজেট যে এ দেশের ইতিহাসে ‘সবচেয়ে বড় বাজেট’ সে কথাটিই সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ও জোরের সাথে ক্ষমতাসীনরা প্রচার করেছে। এ বিষয়ে সন্দেহ নেই যে, স্বাধীনতার পর ১৯৭২ সালে তৎকালীন অর্থমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহমেদের উত্থাপিত দেশের প্রথম বাজেটের তুলনায় এবারের বাজেট আকারে ১৬৮ গুণ বড়। বাজেটের আকার ছোট হোক বা বড় হোক তাতে কিছুই আসে যায় না, যদি তার চরিত্র ‘ধনীকে আরও ধনী এবং গরিবকে আরও গরিব’ করার গতানুগতিক ধারাতেই রচিত হয়। বাজেটের উদ্দেশ্য যদি হয় সম্পদ ‘নিচের তলা’ থেকে ‘উপরের তলায়’ স্থানান্তর করে বিত্তবানদের স্বার্থরক্ষা করা, তাহলে বড় আকারের বাজেট সেই বৈষম্যমূলক সম্পদ স্থানান্তরের পরিমাণকেই শুধু বাড়াবে। এ ধরনের বাজেট যত বড় আকারেরই হোক না কেন, তা দিয়ে সমাজে সম্পদের বৈষম্যমূলক অসম বিন্যাস বৃদ্ধি পাবে মাত্র। তাছাড়া প্রশ্ন হলো, এবারের বাজেটের আকার আসলেই কি খুব বড়? আমি বলব যে, তেমনটি মোটেও নয়। এবারের বাজেটের পরিমাণ হলো জিডিপির মাত্র ১৮ শতাংশের কাছাকাছি। তাতে আবার ঘাটতি রাখা হয়েছে জিডিপির ৫ শতাংশের বেশি। অথচ, আমাদের মতো দেশে বাজেটের আকার জিডিপির ২৫-৩০ শতাংশ হওয়াটাই উচিত। এবং তার মধ্যে উন্নয়ন ব্যয় হওয়া উচিত কমপক্ষে ১০-১৫ শতাংশ। আমি সে রকমই মনে করি। অনেকে প্রশ্ন তুলতে পারেন যে, এই পরিমাণ অর্থের সংস্থান হবে কোথা থেকে? হিসাব কষে দেখানো যায় যে, কালো টাকা ও খেলাপি ঋণের টাকা বাজেয়াপ্ত করার ব্যবস্থা গ্রহণ করলে এবং প্রগতিমূলক হারে কর ধার্য করলে সে অর্থের জোগান করা সম্ভব। বাজেটের আকার না বাড়িয়েও যদি উন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ অনুপাতিকভাবে আরও বেশি হতো এবং ঘাটতির পরিমাণ যদি আরও কম রাখা যেত, তাহলে সেটিই হতো যথার্থ। কিন্তু সে ক্ষেত্রে প্রয়োজন হতো-(১) সাধারণ গরিব মানুষের ওপর করের বোঝা না বাড়িয়ে কর ব্যবস্থাকে প্রগতিমূলক ও সামাজিক-ন্যায়বিচার বান্ধব করা এবং সাধারণ গরিব মেহনতি মানুষের অনুকূলে ব্যক্তিগত আয়ের পুনর্বিন্যাস করে মোট জাতীয় আয় বাড়ানো। (২) অনুন্নয়ন ব্যয় হ্রাস করার জন্য মাথাভারি প্রশাসন ও অপচয় রোধ, প্রশাসনে দক্ষতা-কর্মক্ষমতা বৃদ্ধি, দুর্নীতি রোধ, সিস্টেম-লস বন্ধ ইত্যাদি ব্যবস্থাসহ রাজস্ব খাতে ব্যয় যুক্তিসঙ্গত পর্যায়ে সঙ্কুচিত করে আনা। (৩) অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের ভূমিকা গুণগতভাবে নতুন মাত্রায় উন্নত করার অর্থনৈতিক নীতি-দর্শন গ্রহণ করা। কিন্তু বর্তমান ক্ষমতাসীন বিএনপি সরকার এ ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করার সামর্থ্য, যোগ্যতা, শক্তি রাখে কি? অতীতে তাদের সরকার যে ব্যবস্থা ও নীতিতে দেশ চলিয়েছে, তা আমূল পরিবর্তন না করলে সম্পদ প্রবাহের অভিমুখীনতাকে এভাবে উল্টিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। সরকারের বর্তমান পদক্ষেপগুলো সে ধরনের কোনো লক্ষণ দেখা যায় না। বরং তার অতীত গরিব মারার ব্যবস্থার লক্ষণগুলোই প্রধানভাবে প্রকাশিত হচ্ছে।। কারণ, এসব পদক্ষেপ গ্রহণ করা হলে, ধন-সম্পদ এখন যেভাবে ‘নিচের তলা’ থেকে ‘উপর তলায়’ স্থানান্তরিত হচ্ছে, তা বন্ধ হয়ে যাবে। সম্পদ-স্থানান্তরের গতিমুখ উল্টোমুখী হয়ে উঠবে। লুটেরা ধনিক শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী শাসকদের পক্ষে সে ধরনের পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে আত্মঘাতী। তাই, এ ধরনের ‘গরিব স্বার্থ অভিমুখীন’ বাজেটের জন্য লুটেরা ধনিক শ্রেণির সরকারের বদলে বিকল্প শ্রেণিচরিত্রসম্পন্ন সরকার প্রতিষ্ঠা করা যে একটি আবশ্যিক শর্ত, তা যুক্তি দিয়ে বুঝে ওঠা মোটেও কঠিন নয়। এ গেল বাজেটের শ্রেণিচরিত্রের বিষয়ে কিছু কথা। এবার দেখা যাক বাজেটের আকারের বিষয়ের তাৎপর্য বিষয়টিকে। সাম্রাজ্যবাদী পশ্চিমা দুনিয়ার নব-উদারবাদী অর্থনৈতিক নীতি-দর্শনের অনুসারীরা কোনো অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের সরাসরি অবদান ও অংশগ্রহণের বিরোধিতা করেন। তাদের কথা হলো, ‘অর্থনৈতিক কাজ করাটা সরকারের কাজ নয় (এড়াঃ. যধং হড় নঁংরহবংং ঃড় ফড় নঁংরহবংং)’। শুধু তাই নয়, তারা রাষ্ট্রযন্ত্রকে বড় করার ঘোরতর বিরুদ্ধে। তাদের মতে, ‘সেই সরকারই শ্রেষ্ঠ যেটি সবচেয়ে ছোট (ঞযধঃ মড়াঃ. রং ঃযব নবংঃ, যিরপয রং ঃযব ংসধষষবংঃ)’। নয়া উদারবাদীরা অর্থনীতি ও সমাজের চালিকাশক্তি হিসেবে ব্যক্তিখাত ও বাজারের শক্তির একচ্ছত্র আধিপত্যের পূজারী। তাদের এই নীতিকে বাজার-মৌলবাদ বলে চিত্রায়িত করা যায়। এ দিকে, রাষ্ট্রের কোনো ভূমিকাকে বদলে সামাজিক অঙ্গনে বাজার-শক্তির একচ্ছত্র ও অবারিত পদচারণা নিশ্চিত করার চিন্তা থেকেই একইসঙ্গে জন্ম নিয়েছে তথাকথিত ‘সুশীল সমাজ (পরারষ ংড়পরবঃু)’-এর ধারণা। নয়া-উদারবাদীরা অর্থনীতি ও সমাজে একদিকে বাজার-শক্তি ও অন্যদিকে সুশীল সমাজের কর্তৃত্বকে নিরঙ্কুশ করতে চায়। নয়া-উদারবাদীরা অবশ্য মনেই করেন যে, সব কাজ ব্যক্তিখাতের হাতে ছেড়ে দিয়ে রাষ্ট্রের কাজ হলো কেবল ব্যক্তি খাতকে পাহারা দেওয়ার জন্য আর্মি, র্যাব, পুলিশ, জেলখানা ইত্যাদির ব্যবস্থা করা। এটিই তাদের অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক চিন্তাধারার মর্মকথা। এসব কারণে তারা সাধারণভাবে সবসময় ‘ছোট বাজেটের’ পক্ষে থাকেন। কিন্তু বাজেট ছোট রাখার পক্ষে যত যুক্তিই তারা দেখাক না কেন, বাস্তবে তাদের সেই যুক্তি অনুসরণ করে চলাটা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না। এই নীতি অনুসরণের কারণে সমাজে বৈষম্য, শোষণ, শ্রেণিদ্বন্দ্ব ও অর্থনৈতিক-সামাজিক নৈরাজ্য এমনভাবে প্রসারিত হয় যে, তা দমন করার জন্য তাদেরকে দমন-পীড়ন আরও বাড়াতে হয়। এভাবেই রাষ্ট্রকে ছোট করার বদলে সেটি তাদের বরং আরও বড় করতে হয়। বাজেটে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও জনকল্যাণমুখী কাজের জন্য ব্যয় সংকুচিত করে তার জায়গায় রাষ্ট্রের দমন-নিপীড়নমূলক কাজের পেছনে ব্যয় বাড়িয়ে দিতে হয়। পুঁজিবাদী-সাম্রাজ্যবাদী মহলে এর বিপরীত ধারার চিন্তার মানুষও আছে। তারা রাষ্ট্রকে দুর্বল নয়, বরং আরও শক্তিশালী করতে চায়। ঠিকই, কিন্তু তাকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডির মধ্যে রাখতে চায়। এ ক্ষেত্রে তাদের যুক্তি হলো, রাষ্ট্রের একটা তাৎপর্যপূর্ণ অর্থনৈতিক ভূমিকা থাকতে হলেও সেই ভূমিকাটি হতে হবে প্রধানত ব্যক্তিখাতকে লালন-পালন করা ও মদত দেওয়া। তাদের মতে, রাষ্ট্রের প্রত্যক্ষ সহযোগিতা ছাড়া ব্যক্তিখাত পুষ্ট ও কর্তৃত্ববান হয়ে উঠতে পারবে না। এই মতবাদকে ‘রাষ্ট্রীয়-পুঁজিবাদ’ বলে আখ্যায়িত করা হয়ে থাকে। এই মতের অনুসারীরা বলে থাকেন যে, ‘বাজেটের’ পরিমাণ বড় হওয়া উচিত এবং প্রধানত ব্যক্তি খাতের স্বার্থে এবং তার সহায়ক অনুষঙ্গ হিসেবে সেটিকে কাজে লাগানো উচিত। রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের এসব অনুসারী এবং বামপন্থি প্রগতিবাদী চিন্তার সমর্থক-উভয়ই অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে রাষ্ট্রের শক্তিশালী ভূমিকার পক্ষে। অর্থনীতিতে রাষ্ট্রের ভূমিকা শক্তিশালী করার একটি প্রধান উপাদান যেহেতু জাতীয় বাজেট, তাই তারা উভয়ই সাধারণভাবে ‘বড় বাজেটের’ পক্ষে। কিন্তু রাষ্ট্রীয়-পুঁজিবাদের সমর্থকরা ‘বড় বাজেটের’ ভূমিকাকে নিছক ব্যক্তিখাতের জন্য সহায়তা প্রদানের কাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখার কথা বলে। আর বাম-প্রগতিশীলরা ‘বড় বাজেট’ চায় অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক খাতের স্বাধীন ভূমিকা এবং চূড়ান্তভাবে অর্থনীতিতে রাষ্ট্রীয় ও সমবায় খাতের প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে অগ্রসর হওয়ার জন্য। বাজেটের আকার-আয়তন প্রসঙ্গে এসব বিচারের বাইরে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিবেচনার বিষয় আছে। সেটি হলো বাজেটে বরাদ্দকৃত অর্থ দক্ষভাবে ব্যবহার করার প্রশ্নটি। এই প্রশ্নের সাথে সরাসরিভাবে জড়িত রয়েছে দুর্নীতির বিষয়টি। বাজেটের পরিমাণ যতো বড় হবে, সম্ভাব্য দুর্নীতির উৎসও ততো প্রসারিত হবে। দুর্নীতির সুযোগ বাড়ানোর জন্যও অনেকে, বিশেষত আমলা-মন্ত্রীরা, বাজেট যেন বড় আকারের হয় সাধারণত সেজন্য চেষ্টা করে। একইভাবে, সাম্রাজ্যবাদী বহুজাতিক কোম্পানিগুলোও প্রয়োজনে-অপ্রয়োজনে ‘মেগা প্রজেক্ট’ গ্রহণ করে তা থেকে তাদের ব্যবসায়িক মুনাফা বাড়ানোর উদ্দেশ্যে ‘বড় বাজেটের’ পক্ষে থাকে। ‘বড় বাজেটের’ জন্য এসব শক্তির চিন্তার সাথে বামপন্থিদের ‘বড় বাজেটের’ পক্ষে চিন্তার কোনো মিল নেই। বামপন্থিরা তা চায় সম্পদের ‘কেন্দ্রীভবন ও ব্যক্তিগতকরণের’ বদলে তার ‘সমবণ্টন ও সামাজিকীকরণের’ প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার জন্য। সে ক্ষেত্রে চারটি বিষয়কে তারা বিশেষভাবে গুরুত্ব দিয়ে থাকেন, তা হলো-(১) বাজেট যেন রাষ্ট্রীয়-পুঁজিবাদের ধারায় ব্যবহৃত না হয় (২) রাষ্ট্রের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক চরিত্র যেন নিশ্চিত থাকে (৩) রাষ্ট্রের অর্থ-সম্পদ যেন সাধারণভাবে দুর্নীতির গ্রাস থেকে মুক্ত থাকে। (৪) সর্বোপরি যেন বাজেটের আয়-ব্যয় কার্যক্রম দ্বারা সম্পদ যেন ‘উপর তলা থেকে’ ‘নিচের তলার দিকে’ পুনর্বণ্টিত হয়ে সমাজে সমতার ভিত্তি প্রসারিত হয়। সব মিলিয়ে মোদ্দা কথা হলো-বাজেট ছোট হলো নাকি বড় হলো সেটি প্রধান কোনো বিষয় নয়। প্রধান বিষয় হলো বাজেটের শ্রেণি অভিমুখীনতা। অর্থাৎ বাজেটের দ্বারা কোন দিক থেকে কোন দিকে সম্পদের পুনর্বণ্টন ঘটানো হচ্ছে, সেটিই প্রধান বিবেচ্য বিষয়।