রামিসা ও শিশু সুরক্ষা ভাবনা

Posted: 07 জুন, 2026

সুব্রতা রায় পৃথিবী নামক গ্রহটিকে পরিচালনা করছে সৃষ্টির সেরা জীব মানুষ। মস্তিকের নির্দেশনায় দেহ (একটি জৈবিক সত্তা) ও মন (মস্তিস্কের কার্যকলাপ ও চেতনার সমষ্টি) দিয়ে পরিচালিত হচিছ আমরা। জন্মলগ্ন থেকে গরীব-ধনী নির্বিশেষে সামর্থ অনুযায়ী দেহের পরির্চযা করা হলেও মনের পরিচর্যার ব্যপারে বেশিরভাগ মানুষই ভীষন অপরিকল্পিত বা অজ্ঞই বলা যায়। এটি সবসময় সিলেবাসের বাইরের একটি গুরুত্বহীন, অপ্রয়োজনীয় ও কখনো হাস্যকর বিষয় বলে বিবেচিত হয়। গত ১৯ মে ২০২৬ তারিখে রাজধানীর মিরপুর পল্লবীতে ৮ বছরের শিশু রামিসা আক্তার র্নিমমভাবে খুন হয়। রামিসা অত্র এলাকার “পপুলার মডেল হাই স্কুলের” দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী ছিল। সকাল সাড়ে ১০ টায় স্কুলে যাবার কথা ছিল। কিন্তু খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না তাকে। অবশেষে পাশের ফ্ল্যাটের কালপ্রিট সোহেল রানার শোয়ার ঘরের মেঝেতে রামিসার মস্তক বিহীন শরীর ও টয়লেটের বালতি থেকে বিচ্ছিন্ন মাথা উদ্ধার করা হয়। কী মর্মান্তিক! সকলে জানি, নির্যাতন ও ক্ষমতা একটিকে ছাড়া অন্যটি নয়। দুর্বলদের ওপর সবলদের অত্যাচার চিরন্তন, যা সব সময় প্রমাণ করা যায় না কিন্তু অনুভব করা যায়। সবার জীবনে একই ঘটনা ঘটবে এমনটা নয় কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে চিত্রটি নির্যাতনের । মনে করে দেখুন তো আপনার সাথে শিশুবেলায় কোন বিরক্তিকর ঘটনা ঘটেছে কি না ? যা কখনই বলতে পারেননি অন্যকে ? ....এবং আজও নয়। তার মানে প্রতিনিয়ত মানুষের মাধ্যমে মানুষ নির্যাতিত হচেছ, যেটি প্রকাশিত হচেছ সেটি জানছি কিন্তু অপ্রকাশিত ঘটনা তো কম নয়! এখন কথা হোল কেন আমাদের দেশে এসবের এতো বাড়বাড়ন্ত ? বিশেষ একটি বা দুটি কারণে নিশ্চয়ই নয়। তারপরও মোটাদাগে বলা যায়- সমাজে অসহনীয় সামাজিক টানাপোড়ন ও অবক্ষয়ের জন্য বানিজ্যিক রাজনীতি, পুঁজিবাদের চরম বিকাশ, শিক্ষাব্যবস্থার বেহাল দশা, পুরুষতান্ত্রিক দৃষ্টিভঙ্গি, দীর্ঘদিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি, স্বজনপ্রীতি, দূর্নীতি, সুশাসনের অভাব,দারিদ্র্য, বিনোদনের পর্যাপ্ত অভাবসহ অধিকসংখ্যক মানুষের মানবিক সত্তার নির্লিপ্ততা দায়ী বলে মনে করি। ঘটনার বর্ননা করার সময় পেরিয়ে গেছে বহু আগে এখন দরকার পদক্ষেপ গ্রহণ। দূর্ঘটনার “কারণ ও কেন” শব্দ দুটিকে সামনে এনে সমাজ ব্যবস্থার অভ্যন্তরীণ ক্ষয় রোধ করতে প্রয়োজন সংস্কার ও পরিবর্তন। প্রতিকারমূলক কাজ হিসেবে শিশু রামিসার ন্যায়বিচার পেতে কেসটির সাথে যুক্ত পরিবার, পুলিশ, ডাক্তার, আইনজীবী, সাক্ষী, বিচারক সকলের নিরাপত্তাবিধান করবেন রাষ্ট্র, আর দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান যথাযথভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা রাখি। ৫৪ বছরে হয়নি কিন্তু আজ তো শুরু করতে পারি। রামিসার মতো আর কোন একটি শিশুও যেন নিপীড়নের শিকার না হয় সেক্ষেত্রে ঝুঁকি প্রশমনের জন্য কাজ করতেই হবে। দেশ গড়ার কাজে প্রতিটি মানুষ, প্রতিটি পরিবারের ইতিবাচক ভুমিকার পাশাপাশি সকল ধর্মের-গোত্রের, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক দল, রাষ্ট্রীয়বাহিনী, বিশেষ করে সরকার ও রুলিং পার্টিকে প্রথমে অঙ্গীকারাবদ্ধ হতে হবে। হলিস্টিক এ্যাপ্রোচে সরকারের প্রতিটি সেক্টরকে দক্ষতার সাথে নিজ দায়িত্বটুকু পালন করে যোগ্যতার স্বাক্ষর রাখতে হবে। সমাজে কেউ নিষ্ঠুর হয়ে জন্মায় না। কালপ্রিট সোহেল রানাও জন্মায়নি। ঝুঁকি প্রশমনের জন্য সোহেলের মতো লোক তৈরির মেশিনটা বন্ধ করার পদক্ষেপ জরুরী। জন্মের পর একটি শিশু যে পরিবেশে বেড়ে ওঠে সেই পরিবেশের সংস্কৃতি, বৈশিষ্ট্য ও চালচিত্র ধারণ করে। এক্ষেত্রে পরিবার হচ্ছে শিশু বিকাশের জন্য একটি অন্যতম প্রথম বিদ্যালয়, দ্বিতীয়ত: প্রতিষ্ঠান (প্রাথমিক বিদ্যালয়, মাদ্রাসা, ধর্মীয়প্রতিষ্ঠান, কোচিংসেন্টার, বিভিন্ন শিশুসংগঠন ও সাংস্কৃতিক সংগঠন সহ অন্যান্য), তৃতীয়ত: সামাজিক/রাজনৈতিক পরিবেশ। দেশপ্রেম বোধহীন জীবন মানুষকে স্বার্থপর করে তোলে। তারা নিজের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, ক্ষমতা, শ্রেষ্ঠত্বের বাসনা ছাড়া অন্যের ভাল থাকবার কথা ভাবতেই পারে না, যেখানে আমি ছাড়া আমরা ও আমাদের শব্দটির কোন ঠাঁই নেই। তাইতো শিশু জন্মের সাথে সাথে যে ভুখন্ডের নাগরিক হয় সে ভুখন্ডকে জানা ও ভালবাসা শিক্ষার প্রথম ধাপ হওয়া বাঞ্ছনীয়। প্রয়োজন সাংস্কৃতিকচর্চা, খেলাধুলার অনুশীলন ও বিনোদনের ব্যবস্থা গ্রহণ। দরকার সবধরনের এবং সব লেভেলের সরকারী-বেসরকারী বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় সরকারের প্রত্যেকের জন্য শিশুসুরক্ষা বিষয়ক জ্ঞান রাখা। শিশুদের সঙ্গে সরাসরি কাজ করেন এমন তথা প্রত্যেকের জন্য কর্মী আচরণবিধি প্রণয়ন, অঙ্গিকারনামা এবং একটি নাম্বার থাকা জরুরী যেখানে তাৎক্ষনিক রিপোর্ট করা যাবে। উল্লেখ্য যে, বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘ ঘোষিত ৫৪টি ধারা সম্বলিত শিশু অধিকার সনদে অনুস্বাক্ষর করেছে এবং এর প্রেক্ষিতে শিশুঅধিকারের সামগ্রিক বিষয় নিয়ে গৃহিত হয়েছে কিছু কর্মসুচি। কিন্তু তা মোটেই যথার্থ নয় বা কার্যকর হচ্ছে না। মাদ্রাসাগুলিতে শিশুদের প্রতি প্রাত্যহিক যৌন নির্যাতনের ঘটনাসমুহ জানান দেয় সেখানকার বেহাল ব্যবস্থা। খুব প্রয়োজন প্রতিটি মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে শিশুসুরক্ষার বিষয়টি যুক্ত করা, একটি স্পষ্ট গাইডলাইন এবং দায়িত্বশীল ভূমিকা ও ভরসার জায়গা চিহ্নিতকরণ। মোবাইল, প্রিন্টমিডিয়া, ইলেক্ট্রনিকমিডিয়া ও বড় পর্দায় শিশুসুরক্ষা বিষয়ক ম্যাসেজ, নাটক সিনেমাসহ বিভিন্ন সচেতনতামুলক কার্যক্রম গ্রহণ এবং শিশুসুরক্ষার বিষয়টিকে বিশ্বাসের সাথে গ্রহণপুর্বক যথাযথভাবে তদারকি করা। এই বিশাল কর্মযজ্ঞ গ্রহণ না করলে আজকের যৌন নির্যাতনের শিকার শিশু আগামীতে যৌন নির্যাতনকারী হিসেবে সমাজে প্রবেশ করবে। কিশোর গ্যাং তৈরি হবে আরো ব্যপক হারে। কিউরেটিভ অ্যাকশন দিয়ে কতটি মোকাবেলা করবেন? প্রিভেন্টিভ অ্যাকশনে যেতেই হবে।