‘মুল্লুক চলো’ : চা-শ্রমিক দিবসের রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদানের দাবি
Posted: 31 মে, 2026
সিলেট সংবাদদাতা :
ঐতিহাসিক ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের স্মরণে ২০ মে কে ‘চা-শ্রমিক দিবস’ হিসেবে রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি প্রদান, সবেতন ছুটি ঘোষণা এবং মুল্লুক চলো আন্দোলনের গৌরবজ্জল ইতিহাস পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানিয়েছে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র।
চা-শ্রমিকদের ইতিহাসের রক্তক্ষয়ী দিবসটি উপলক্ষে সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জের বিভিন্ন চা-বাগানে চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের উদ্যোগে র্যালি, সমাবেশ, কর্মবিরতি এবং সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
গত ২০ মে সকাল ৯টায় সিলেট জেলার খাদিম চা-বাগানের লোহার পুল এলাকা থেকে একটি মিছিল বের করা হয়। মিছিলটি খাদিম বাগানের স্মৃতিসৌধে গিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণের মাধ্যমে শ্রদ্ধা নিবেদন করে।
শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে সংগঠনের সভাপতি সবুজ তাঁতীর সভাপতিত্বে এবং দপ্তর সম্পাদক দীপ্ত নায়েকের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের উপদেষ্টা ও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) সিলেট জেলা কমিটির সভাপতি সৈয়দ ফরহাদ হোসেন, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক মনীষা ওয়াহিদ, সাংস্কৃতিক সম্পাদক অনিমা বসাক এবং চা-শ্রমিক নেতা কিষাণসহ অন্যান্য নেতৃবৃন্দ।
একই দিনে বিকেল ৫টায় মৌলভীবাজার জেলার কালিটী চা-বাগানে সংগঠনের উদ্যোগে আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়।
নিরঞ্জন কালোয়ারের সভাপতিত্বে এবং সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক কৃষ্ণদাস অলমিকের সঞ্চালনায় এই সমাবেশে প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ। সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন সিপিবি মৌলভীবাজার জেলা কমিটির সম্পাদকমন্ডলীর সদস্য জহর লাল দত্ত, জেলা কমিটির সদস্য সৈয়দ মোশাররফ আলী, কালিটি চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অনিমা অলমিক, শ্রমিকনেতা দয়াল অলমিক, বিশ্বজিত দাস, গাজীপুর চা-বাগান পঞ্চায়েত কমিটির সাধারণ সম্পাদক ফিলিপ, রাংগীছড়া চা-বাগানের বিশ্বজিত রাজভর, মুরইছড়া চা-বাগানের সত্যজিৎ উরাং এবং বোরহাননগর চা-বাগানের ঠাকুর ও কার্তিক নাইডু প্রমুখ।
আলোচনা সভা শেষে গীতা অলমিকসহ স্থানীয় শিল্পীরা রক্তক্ষয়ী আন্দোলনের চেতনাকে ধারণ করে গণসংগীত পরিবেশন করেন।
এদিকে ঐতিহাসিক এই দিনটি স্মরণে ২০ মে সকাল ৯টায় হবিগঞ্জের লালচান্দ চা-বাগানের শ্রমিকরা চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের ব্যানারে এক ঘণ্টার কর্মবিরতি পালন করেন। কর্মবিরতি শেষে শ্রমিকদের অংশগ্রহণে একটি বিশাল মিছিল ও সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত সমাবেশে বক্তব্য রাখেন সংগঠনের সাংগঠনিক সম্পাদক সুমন মুন্ডা, কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক জিতেন ভৌমিক এবং প্রচার-প্রকাশনা সম্পাদক রিংকু ভৌমিকসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ।
অনুষ্ঠিত সমাবেশে বছর বক্তারা বলেন, চা-বাগান শুরুর সূচনালগ্নে ততকালীন ভারতবর্ষের বিভিন্ন অঞ্চলের দরিদ্র মানুষদের মিথ্যা আশ্বাস এবং উন্নত জীবনযাপনের প্রলোভন দেখিয়ে চা-বাগানগুলোতে কাজের জন্য নিয়ে আসা হয়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন ছিলো, কঠোর পরিশ্রম করে বন-জঙ্গল পরিষ্কার করে, হিংস্র জীবজন্তুর সাথে লড়াই করেও দু’বেলা খাবার জুটতো না শ্রমিকদের। বিষাক্ত পোকামাকড়ের কামড়, আর মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুকে বরণ করতে হতো শ্রমিক ও পরিবারের সদস্যদের। আর ছিলো সাহেবদের অমানুষিক নির্যাতন। তার বিরুদ্ধে রুখে দাড়িয়েছিলেন চা-শ্রমিকরা। সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন নিজ দেশে ফিরে যাবেন, যা ইতিহাসে “মুল্লুক চলো আন্দোলন “ নামে পরিচিত।
বক্তারা আরও বলেন, মুল্লুক চলো আন্দোলনের ১০৫ বছর অতিক্রান্ত হলেও চা-শ্রমিকরা আজও দাসত্বের শৃঙ্খলে বন্দী। আজও বাঁচার মত ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত হয় নি। স্বাধীন দেশে চা-শ্রমিকরা পরাধীন জীবনযাপন করছেন। ১৮৫ বছর ধরে এভূখন্ডে বসবাস করলেও আজও ভূমির অধিকার থেকে বঞ্চিত চা-জনগোষ্ঠী। নিরাপদ খাবার পানিসহ মৌলিক নাগরিক অধিকার থেকে আজও চা-জনগোষ্ঠীর মানুষেরা বঞ্চিত। চা-শ্রমিকদের সন্তানদের শিক্ষার অধিকার আজও নিশ্চিত হয় নি। তাই চা-শ্রমিকদের মুক্তির লক্ষ্যে, অধিকার আদায়ে মুল্লুক চলো আন্দোলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
চা-শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’র সভাপতি শ্রমিকনেতা সবুজ তাঁতি বলেন, শ্রমিকশ্রেণীর অধিকার আদায়ে লড়াই-সংগ্রামের বিকল্প নেই। আমাদের পূর্বপুরুষদের মুল্লুক চলো আন্দোলন থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।
মজুর,ভূমির অধিকারসহ ১০ দফা দাবি আদায়ে চা-শ্রমিকদের ঐক্যবদ্ধ আপোষহীন লড়াই গড়ে তুলতে হবে। চা-শ্রমিকরা ঐক্যবদ্ধ থাকলে বিজয় অবশ্যম্ভাবী।
সংগঠনের প্রধান সমন্বয়ক এস এম শুভ বলেন, পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় শ্রমিক-মেহনতি মানুষ সম্পদ উৎপাদন করলেও ভোগ করে মালিকেরা। সেকারণেই শ্রমিকশ্রেণির অর্থনৈতিক মুক্তি মালিকের মুনাফার লোভের কাছে বন্দী। তাই শ্রমিকশ্রেণির ঐক্যবদ্ধ লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে এই শোষণমূলক ব্যবস্থা উচ্ছেদ করে শ্রমিকশেণির সামাজিক মালিকানা নিশ্চিত করতে হবে। সে লক্ষ্যে শ্রমিকশ্রেণীর বিপ্লবী রাজনীতিকে শক্তিশালী করতে হবে। আগামীর ইতিহাস শ্রমিকশ্রেণির বিজয়ের ইতিহাস।
কেন্দ্রীয় ও আঞ্চলিক এই কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি সিলেটের হিলুয়াছড়া, ডালুছড়া, কালাগুল, লালাখাল, আলীবাহার; মৌলভীবাজারের হামিদিয়া, পদ্মছড়া, মৌলভী, আলীনগর, মুরইছড়া, করিমপুর এবং হবিগঞ্জের চন্ডী, রামগঙ্গা ও দেউন্দী চা-বাগানে সংগঠনের স্থানীয় বাগান শাখার নেতাকর্মী ও সাধারণ শ্রমিকেরা পুস্পস্তবক অর্পণ ও শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদনের মাধ্যমে বীর শহীদদের স্মরণ করেন।