এক লাখ বছরেরও বেশি পুরানো মানুষের পায়ের ছাপ মিলল আরবে

Posted: 24 মে, 2026

একতা বিজ্ঞান ডেস্ক : আরব উপদ্বীপের উত্তর সৌদি আরবে ১ লাখ ১৫ হাজার বছরের পুরনো মানুষের পায়ের ছাপের সন্ধান পেয়েছেন বিজ্ঞানীরা। নেফুদ মরুভূমির এক শুকনো হ্রদে পাওয়া সাতটি পায়ের ছাপ প্রাচীন মানুষের পথচলার এক বিরল নিদর্শন। আধুনিক মানুষের পূর্বপুরুষরা যে সেই সময়েই এ দুর্গম পথ পাড়ি দিয়েছিলেন এ আবিষ্কার তারই বড় প্রমাণ বরে প্রতিবেদনে লিখেছে আমেরিকান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি ম্যাগাজিন পপুলার মেকানিক্স। বিজ্ঞানীদের মতে, আরব উপদ্বীপে মানুষের সবচেয়ে প্রাচীন এ ছাপের সন্ধান মিলেছে প্রাগৈতিহাসিক কাদা-গর্তে। সেখানে শত শত পশুর পায়ের ছাপের মধ্যে মানুষের সাতটি ছাপ দেখা গেছে। ২০১৭ সালে আবহাওয়ার কারণে উপরের মাটির স্তর সরে যাওয়ায় প্রত্নতাত্ত্বিকরা এ নিদর্শনগুলো খুঁজে পান। ধারণা করা হয়, ১ লাখ বছরেরও বেশি আগে কাদাঘেরা এ হ্রদটি মানুষ ও পশুদের চলাচলের একটি ব্যস্ত এলাকা ছিল। মানুষ কোনো এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় তাদের ফেলে যাওয়া পায়ের ছাপগুলো মাটির আস্তরণে ঢাকা না পড়া পর্যন্ত টিকে থাকে। এর আগে ‘বার্জেস শেল’ এর মতো অনেক পুরানো ঘটনার ক্ষেত্রে দেখা গেছে, হঠাৎ কাদার নিচে চাপা পড়ে যাওয়ার কারণে পৃথিবীর আদিমতম কিছু জীব সম্ভবত অক্ষত অবস্থায় টিকে ছিল। ‘নোডোসর’ নামের বর্মধারী এক ডাইনোসরও বিস্ময়কর রকমভাবে ভালো অবস্থায় পাওয়া গেছে। কারণ সেটিও সমুদ্রের তলদেশের ঠান্ডা কাদায় আটকে গিয়েছিল। ফলে প্রত্নতত্ত্বের এসব বিস্ময়কর আবিষ্কারের জন্য কাউকে যদি পুরস্কার দিতে হয়, তবে তার সবচেয়ে বড় দাবিদার হবে ‘কাদা’। কেন প্রাচীন কাদা এতটা বিশেষ ছিল সেই ব্যাখ্যায় গবেষণাপত্রে বিজ্ঞানীরা বলেছেন, “আধুনিক মানুষের পায়ের ছাপ নিয়ে করা পরীক্ষায় দেখা গেছে, কাদাঘেরা সমতলে পায়ের ছাপের সূক্ষ্ম বিবরণগুলো কেবল দুই দিনের মধ্যেই হারিয়ে যায় এবং চার দিনের মধ্যে সেগুলো চেনা দায় হয়ে পড়ে। মানুষের বাইরে অন্যান্য স্তন্যপায়ী প্রাণীর পায়ের ছাপের ক্ষেত্রেও একই রকম ফলাফল দেখা গেছে।” যার মানে, এসব বিশেষ পায়ের ছাপ এমন এক অনন্য পরিবেশে তৈরি হয়েছিল, যা অনেকটা ‘ফিংগারপ্রিন্ট’ বা আঙুলের ছাপের মতো কাজ করেছে। এর থেকে নিশ্চিত হওয়া যায়, সবগুলো ছাপ একই সময়ে তৈরি। এরপর বিজ্ঞানীরা খুঁজতে শুরু করেন আসলে কারা এসব ছাপগুলো ফেলেছিল। সেই সময়ে সোজা হয়ে হাঁটা মানুষের মতো আরও প্রজাতি থাকলেও বিজ্ঞানীরা দাবি করছেন, হ্রদের সেই শুকিয়ে যাওয়া কাদার ওপর দিয়ে আমাদের পুর্বপুরুষরাই, অর্থাৎ আধুনিক মানুষেরাই হেঁটে গিয়েছিলেন। তারা গবেষণায় বলেছেন, “সেখানে মানুষের সাতটি পায়ের ছাপ শনাক্ত হয়েছে। প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার থেকে ৮০ হাজার বছর আগে লেভান্ত ও আরব অঞ্চলে হোমো সেপিয়েন্সদের ছড়িয়ে পড়ার প্রমাণ মেলে, অথচ সেই সময়ে ওই এলাকায় নিয়ান্ডারথালদের কোনো অস্তিত্বই ছিল না। ফলে বলা যায়, আল-আথার এলাকার এসব ছাপ হোমো সেপিয়েন্সেরই ছিল। পায়ের ছাপের মাপও নিয়ান্ডারথালদের চেয়ে আদি হোমো সেপিয়েন্সদের সঙ্গে বেশি মেলে।” বর্তমানের ‘আল-আথার’ হ্রদটি সম্ভবত সেই সময়ে বিশাল এক মহাসড়কের মতো ছিল, যা এলাকার বড় বড় সব প্রাণীকে আকর্ষণ করত। মিঠা পানির ছোট ছোট জলাশয়গুলো পথজুড়ে অনেকটা ‘বিশ্রামাগারের’ মতো কাজ করত, যেখানে প্রাণীরা আবহাওয়া বা জলবায়ু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে যাতায়াত করত। তবে এ গবেষণায় প্রাচীন মানুষের শিকার করার মতো কোনো প্রমাণ, যেমন প্রাণীর হাড়ে ছুরির দাগ বা পাথরের তৈরি হাতিয়ার পাওয়া যায়নি। বিজ্ঞানীরা বলেছেন, “প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনের অভাব থেকে বোঝা যায়, মানুষ আল-আথার হ্রদে খুব অল্প সময়ের জন্য এসেছিল। এসব তথ্য থেকে ইঙ্গিত মেলে, শেষ আন্তঃতুষার যুগের শুষ্ক সময়ে মানুষ সুপেয় পানির সন্ধানেই এই হ্রদের তীরে সাময়িকভাবে আশ্রয় নিয়েছিল।” এ হোমো সেপিয়েন্সরা হয়ত সেই শেষ দল ছিল যারা বরফ যুগ শুরু হওয়ার ঠিক আগ মুহূর্তে নাতিশীতোষ্ণ এলাকাটি পার হচ্ছিল। এর থেকে ব্যাখ্যা মেলে, কেন অন্য কোনো দল তাদের এই পায়ের ছাপের ওপর দিয়ে হেঁটে গিয়ে সেগুলো নষ্ট করে দেয়নি, অন্তত মাটির একটি নতুন স্তর পড়ার আগে তো নয়ই।