সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 17 মে, 2026

একতা ডেস্ক : [এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২ নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে আজ মুদ্রিত হচ্ছে তার ১০ম কিস্তি।] (১০) পার্টি তার জন্মের প্রথম লগ্ন থেকেই জাতীয় রাজনীতির মূল স্রোতধারার সাথে সম্পৃক্ত থেকে সেখানে শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের আশু ও দূরবর্তী লক্ষ্যকে এগিয়ে নেয়ার জন্য কাজ করেছে। পার্টির কংগ্রেস ও সম্মেলনগুলোতে অনুমোদিত এসব রিপোর্ট পাঠ করলে সেসব থেকে দেশের ও বিশ্বের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহের বস্তুনিষ্ঠ বিবরণ ইত্যাদি এসব ঘটনাপ্রবাহে পার্টির ভূমিকা এবং তা থেকে অর্জিত অভিজ্ঞতা ও গৃহীত শিক্ষা সম্পর্কে অবহিত হওয়া যায়। পার্টির এসব দলিল সঠিক ইতিহাস পাঠের গুরুত্বপূর্ণ সূত্র। তেমনি কিছু দলিলের অংশ উদ্ধৃত করে আজ এখানে মুদ্রিত হলো। জাতীয় পরিস্থিতি গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অগ্রগতি, শাসক চক্রের সংকট বৃদ্ধি ও সামরিক শাসন (১৯৫৬ সনের জুলাই হইতে ১৯৫৮ সনের অক্টোবর) কমরেডগণ, বিগত বার বৎসরে আমাদের জাতীয় পরিস্থিতিতে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটিয়া গিয়াছে। .... আওয়ামী লীগ মন্ত্রীসভা গঠন ১৯৫৬ সনের মাঝামাঝি পার্টির তৃতীয় সম্মেলনে আমরা দুইটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলাম, যথা– ১. পাকিস্তানের প্রতিক্রিয়াশীল শাসনের অবসান করিয়া সে স্থলে সাম্রাজ্যবাদ-সামন্তবাদ বিরোধী ও গণতান্ত্রিক দাবী সম্বলিত ন্যূনতম কর্মসূচীর ভিত্তিতে একটি দেশপ্রেমিক কোয়ালিশন সরকার গঠন করা এবং; ২. পূর্ববঙ্গে তদানীন্তন বৃহত্তম প্রগতিশীল দল আওয়ামী লীগের মাধ্যমে কাজ করিয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলন অগ্রসর করিয়া নিতে ও আমাদের পার্টির গণ-সংযোগ বৃদ্ধি করিতে সচেষ্ট থাকা।.... তখন পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ক্ষমতা ছিল প্রেসিডেন্ট ইস্কান্দার মীর্জা এবং চৌধুরী মোহাম্মদ আলির নেতৃত্বে গঠিত মুসলিম লীগ-কৃষক শ্রমিক পার্টি (কে-এস-পি) কোয়ালিশন মন্ত্রীসভার হাতে। আমাদের পার্টির উপর তীব্র দমননীতি চলিতেছিল, পার্টির অনেক নেতা ও কর্মী বিনা বিচারে কারাগারে আটক ছিলেন এবং অনেকে ছিলেন আত্মগোপনে। প্রদেশের অর্থনৈতিক, বিশেষ করিয়া খাদ্য পরিস্থিতির বিশেষ অবনতি ঘটিয়াছিল এবং মেহনতী জনগণের জীবনের সংকট গভীরতর হইতেছিল। .... ১৯৫৫ সনের শেষ দিক হইতে যে আন্দোলন শুরু হইয়াছিল, ঐ সময়ে তাহা জোরদার হইতেছিল। আমাদের পার্টি এই আন্দোলনে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিতেছিল। .... ১৯৫৪ সনে পূর্ববঙ্গের নির্বাচনে মুসলিম লীগের শোচনীয় পরাজয়ের পর হইতে জনগণ হইতে বিচ্ছিন্ন সংকটগ্রস্ত প্রতিক্রিয়াশীল শাসকবর্গের ভিতর ক্ষমতা নিয়া যে ন্যাক্কারজনক কোন্দল শুরু হইয়াছিল, উহা তখনও চলিতেছিল। ....পশ্চিম পাকিস্তানের মুসলিম লীগ হইতে কিছু লোক ভাঙাইয়া ও ডাঃ খান সাহেবকে দলে টানিয়া খান সাহেবের নেতৃত্বে সেখানে রিপাবলিকান দল গঠন করতঃ মুসলিম লীগের স্থানে এই দলকে পশ্চিম পাকিস্তানের মন্ত্রীত্বের গদীতে বসাইয়া দিয়াছিল এবং কেন্দ্রে ও পূর্ববঙ্গে কে-এন-পি’র সুবিধাবাদী নেতৃত্বের সঙ্গে আঁতাত করিয়াছিল। এই সব ঘটনা ঘটিয়াছিল ১৯৫৫ সনের মধ্যভাগ হইতে শুরু করিয়া ১৯৫৬ সনের মধ্যভাগে। .... এই অবস্থায়, ইস্কান্দার মীর্জা কেন্দ্রে ও পূর্ববঙ্গে তাঁহার অবস্থান দৃঢ় করার জন্য (১৯৫৬ সনের মধ্যভাগে) আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর প্রতি আপোষের হাত বাড়াইয়া দিয়াছিল। দক্ষিণপন্থী সংস্কারবাদী বুর্জোয়া নেতা সোহরাওয়ার্দীও প্রধান মন্ত্রীত্বের পদ লাভ ও উহার মাধ্যমে পূর্ববঙ্গে ও কেন্দ্রে নিজ দলের ক্ষমতা প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ইস্কান্দার চক্রের সঙ্গে আপোষ করিয়াছিলেন। এইভাবে চরম প্রতিক্রিয়াশীল ইস্কান্দার চক্র ও বুর্জোয়া গণতন্ত্রকামী আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের এক সুবিধাবাদী আঁতাত গড়িয়া উঠিয়াছিল। এই পটভূমিতে, ১৯৫৬ সনের সেপ্টেম্বর মাসে আওয়ামী লীগের উদ্যোগে ঢাকা নগরীতে একটি ভুখা মিছিলের অনুষ্ঠান ও তাহাতে পুলিশ গুলিবর্ষণে একাধিক নর-নারীর মৃত্যু প্রভৃতিতে সারা প্রদেশে মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে প্রবল গণ বিক্ষোভ দেখা দিলে কেন্দ্রীয় সরকারের নির্দেশে পূর্ব বাংলার গভর্ণর কৃষক শ্রমিক পার্টির কোয়ালিশন মন্ত্রীসভাকে বরখাস্ত করেন এবং সে স্থলে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রীসভা গঠিত হয় (সেপ্টেম্বর, ১৯৫৬)। ইহার অব্যবহিত পরেই সেপ্টেম্বর মাসেই কেন্দ্রে চৌধুরী মোহাম্মদ আলীর মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে এবং সে স্থলে আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ রিপাবলিকান মন্ত্রিসভা পাকিস্তানের শাসনভার গ্রহণ করিয়াছিল। বস্তুতঃ পূর্ববঙ্গে আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা ও উহার পিছনে গণ-সমর্থন এবং ইস্কান্দার মীর্জার সহিত আওয়ামী লীগ নেতা সোহরাওয়ার্দীর সুবিধাবাদী সমঝোতা এই দুই কারণেই পূর্ববঙ্গে ও কেন্দ্রে আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা গঠিত হইয়াছিল। তখন আমরা আওয়ামী লীগের মাধ্যমে কাজ করিতেছিলাম। ঐ দলের নেতৃত্বে মন্ত্রীত্ব গঠিত হওয়ার ফল হিসাবে আমাদের পার্টির সামনে একটা পরিবর্তিত পরিস্থিতিরও উপস্থিত হইয়াছে। অন্যদিকে, পাকিস্তানে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের অনুপ্রবেশ ও প্রভাব, প্রেসিডেন্ট পদে কুখ্যাত ইস্কান্দার মীর্জার অধিষ্ঠান, সরকারি ব্যবস্থা ও অর্থনীতিতে প্রতিক্রিয়াশীল বড় ধনিক ও সামন্তবাদী ভূস্বামীদের ক্ষমতা, ইত্যাদির ফলে গণতন্ত্রের সামনে বিপদও তখন বিরাজ করিতেছিল এবং গণতন্ত্রকে নস্যাৎ করার জন্য দেশী ও বিদেশী প্রতিক্রিয়াশীলরা সর্বদা নানাবিধ চক্রান্তেও লিপ্ত ছিল। সাম্রাজ্যবাদের নিকট আওয়ামী লীগ নেতৃত্বের আত্মসমর্পণ ও ন্যাপ গঠন কেন্দ্রে ও এই প্রদেশে ক্ষমতা পাওয়ার পর আওয়ামী লীগ কোয়ালিশন মন্ত্রিসভা- (ক) পূর্ব পাকিস্তানের সমস্ত রাজবন্দীদের মুক্তি, এখানকার নিরাপত্তা আইন নাকচ ও ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রসার, (খ) তদানীন্তন খাদ্য সংকটের প্রতিকারের জন্য কিছুটা রিলিফের ব্যবস্থা, (গ) যুক্ত নির্বাচন প্রথা চালু করা, (ঘ) নূতন শাসনতন্ত্র অনুযায়ী প্রথম সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য উদ্যোগ গ্রহণ এবং (ঙ) সমাজতান্ত্রিক শিবিরের সাথে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নয়নের জন্য চেষ্টা ইত্যাদি বিষয়ে দুই একটি প্রাথমিক পদক্ষেপ নিয়েছিল। কিন্তু, অন্যদিকে, শ্রমিক-কৃষকদের কয়েকটি আশু দাবি, দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি রোধ, দুর্নীতি দমন প্রভৃতি, যেগুলি ছিল জনগণের জরুরি ও যেগুলি পূরণে আওয়ামী লীগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ছিল, সেগুলি পূরণে মন্ত্রীসভার বিমুখতা ও ব্যর্থতা এবং অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পুঁজিপতি ও ভূস্বামীদের তোষণ নীতি অনুসরণের দরুণ ঐ মন্ত্রীসভা অর্থনৈতিক সংকট ও জনগণের আর্থিক দুর্গতি লাঘব করিতে পারিতেছিল না। .... তদুপরি, ১৯৫৬ সনের অক্টোবর মাসের শেষের দিকে প্রধানমন্ত্রী সোহরাওয়ার্দি নিজের গদি রক্ষার জন্য বিদেশী সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের নিকট নির্লজ্জভাবে আত্মসমর্পণ করিয়াছিলেন পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে সাম্রাজ্যবাদের সঙ্গে সহযোতিার নীতির দৃঢ় সমর্থক হইয়া দাঁড়াইয়াছিলেন। অথচ, তখনও পররাষ্ট্র ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগ দলের গৃহীত নীতি ছিল ‘স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতি’। .... সোহরাওয়ার্দি সেন্টো (তখন বাগদাদ চুক্তি), সিটো প্রভৃতি সমর্থন করিয়াছিলেন। সোহরাওয়ার্দির ঐ সব যুক্তি ও প্রচার গণ-মনে বিভ্রান্তিও সৃষ্টি করিতেছিল। .... আমাদের পার্টি সোহরাওয়ার্দীর আত্মসমর্পণের তীব্র সমালোচনা করিয়া আওয়ামী লীগের গৃহীত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতি অক্ষুণ্ণ রাখার জন্য গণতন্ত্রকামীদের নিকট আবেদন জানাইতেছিল এবং আওয়ামী লীগের কাগমারী অধিবেশনে ১৯৫৭ সনের ফেব্রুয়ারী পররাষ্ট্র নীতিকে কেন্দ্র করিয়া ঐ দলের দক্ষিণপন্থী নেতৃত্বের সঙ্গে আমাদের একটা তীব্র দ্বন্দ্বও সৃষ্টি হইয়াছিল। ইহার পর, মে মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত আওয়ামী লীগ কাউন্সিল অধিবেশনে সোহরাওয়ার্দী ও তাঁহার অনুগামীগণ পূর্বেকার গৃহীত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ নীতি পরিবর্তন করাইয়া নেয়। .... আওয়ামী লীগের কোন স্তরের পক্ষে নিরপেক্ষ বৈদেশিক নীতির প্রচার নিষিদ্ধ হয়। এর পর আমাদের কমরেডদের আওয়ামী লীগে থাকা ও আওয়ামী লীগ মাধ্যমে কাজ করিয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনকে অগ্রসর করিয়া নেওয়া সম্ভব নয় বিবেচনা করিয়া পার্টি আওয়ামী লীগ ত্যাগ করার সিদ্ধান্ত করে এবং জুলাই মাসে ঢাকায় অনুষ্ঠিত সারা পাকিস্তান কনভেনশন একটি সাম্রাজ্যবাদ বিরোধী ও গণতান্ত্রিক কর্মসূচী নিয়া পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি গঠনের সময় হইতে আমাদের পার্টি এই নূতন রাজনৈতিক দলে সক্রিয় অংশ গ্রহণ করিতে থাকে। [চলবে]