নারীর মর্যাদা ইতিহাস-পরিক্রমায়
Posted: 10 মে, 2026
আদিম সাম্যবাদী সমাজ ছিলো মাতৃতান্ত্রিক সমাজ। মাতৃতান্ত্রিক সমাজে গোষ্ঠীর প্রধান ছিলো মা। তাই নারী ছিলো মর্যাদার দিক থেকে শ্রেষ্ঠ। সে সময় গোষ্ঠীর সব নারীরা ছিলো যৌথ-স্ত্রী আর পুরুষরা যৌথ-স্বামী। ফলে পিতা-নির্ণয় ছিলো দুরূহ কিন্তু মা চিহ্নিত সহজ ছিলো গর্ভধারণের কারণে। নারীর শ্রেষ্ঠত্বের এটা একটা কারণ। তখন মার পরিচয়েই গোষ্ঠীর সব লোকেরা পরিচিত হতো। সে সময়ও ঘরের কাজ মেয়েরা করতো এবং বাইরের কাজ পুরুষ। কিন্তু সমাজের মুখ্য নেতৃত্বে ছিলো নারী আর গৃহকাজ তার জন্য ছিলো গৌণ, সেটা দায়িত্ব হিসেবে ছিলো না।
পরবর্তীতে সমাজে ধীরে ধীরে নারী নেতৃত্বের পরিবর্তন হলো। জীবিকা অর্জনে প্রাধান্য স্থাপন করে পুরুষ নারীর কর্তৃত্ব কেড়ে নিলো। তখন হাতিয়ার বানানোর দায়িত্বও ছিলো পুরুষের। তারপর তারা গ্রহণ করলো পশুপালনের দায়িত্ব এবং ক্রমান্বয়ে সম্পত্তির মালিকানাও পুরুষের হাতে চলে আসে। আবিষ্কৃত হাতিয়ার দ্বারা নির্মিত জিনিসেরও মালিক হয় পুরুষ। আয়ের পর ব্যয় হয়, ব্যয়ের পর সঞ্চিত জিনিসের মালিকও পুরুষ হয়। সে সময়টাতে নারীরা সেসব জিনিস ব্যবহার করতে পারলেও তাদের এর ওপর কোনো মালিকানা ছিলো না। এই প্রক্রিয়ায় পুরুষ নারীর সিংহাসন কেড়ে নিয়ে তাদেরকে সমাজে অপাঙক্তেয় করে দিলো। ফলে সমাজ বিভক্ত হয়ে গেলো। একপক্ষ মালিক এবং অন্যপক্ষ দাস। নারীরা পুরুষের অধীনে দাসী বনে গিয়ে মর্যাদাহীন হলো। এভাবে পুরুষতান্ত্রিক সমাজের গোড়াপত্তন হলো।
পিতৃতান্ত্রিক যুগে পশুপালন জোরদার হলে পুরুষের কাজের সামনে নারীজাতির কাজ নগণ্য হয়ে পড়লো। গুরুত্বের দিক থেকে পশুপালন হলো মুখ্য কাজ আর নারীদের কাজ হলো গৌণ। এই মুখ্য-গৌণের ধারাটি সমাজে এখনো বিরাজিত। তাই পুরুষরা কথায় কথায় নারীদের বিদ্রুপ করে, তুমি নারী ঘরে বসে দিব্যি আরাম কর আর আমি পুরুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলে রোজগার করি। তাই স্পষ্ট করে বলতে চাই জীবিকা অর্জনে পুরুষের সমান অংশ নিতে না পারলে নারীর মর্যাদা পুরুষের সমান হবে না। নারীমুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হলো উপার্জনের জন্য নারীকে বাইরে যেতে হবে। বাইরের কাজই হবে তার মুখ্য কাজ আর ঘরের কাজ হবে গৌণ।
দাসসমাজ
সমাজে ব্যক্তিস্বার্থ বা ব্যক্তিগত সম্পত্তি মানুষের একমাত্র লক্ষ্যে পরিণত করলো পুরুষতন্ত্র। পিতৃসত্তাই দাসযুগের সূচনা করে। এই সমাজে নারী, পুরুষের ব্যক্তিগত সম্পত্তিতে পরিণত হয়। সে সময় বিয়ে না করেও তাদের ভোগ করা যেতো। সমাজে বহুবিবাহ প্রথা চালু হয়। একজন পুরুষ ইচ্ছেমতো বিয়ে করতে পারতো এবং এর পরও বিয়ে-বহির্ভূত মেয়েদেরকেও ভোগ করতে সামাজিক কোনো বাধা ছিলো না। নারীসম্ভোগ তখন দাসমালিক পুরুষদের নেশায় পরিণত হয়েছিলো। এর পেছনে মূল প্রেরণা ছিলো সম্পত্তি। সম্পত্তির মালিক শোষকরা ছাড়া বহুবিবাহের বিলাসিতা করা অন্য কারো পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
এ যুগে সমাজে পুরুষের অধিকার বহুল পরিমাণে বৃদ্ধি পায় অন্যদিকে নারীর অধিকার সমান হ্রাস পায়। নারী পুরুষের অস্থাবর সম্পত্তিতে পরিণত হয়ে তার মানবিক মর্যাদা হারায়। গবেষণায় একটা জিনিস বেরিয়ে আসে নারীর প্রতি এমন পরিবেশে প্রেম খেলনা বস্তুর মতো হয় নকল। নারীর প্রতি পুরুষের প্রেম প্রদর্শন মর্যাদার মানসে নয়- ভোগের মানসে। ভোগের ক্ষেত্রে এটা একটা কৌশল মাত্র। দাসসমাজে পুরুষের প্রাধান্যের জন্য সমাজে ছেলের দাম ব্যাপক বাড়ে এবং কন্যার দাম সমান কমে। সমাজে বিষয়টা এখনো চালু আছে। যেমন- ছেলে জন্মালে আযান দেয়া হয় এবং মেয়ের ক্ষেত্রে হয় না। দাসসমাজে কখনো সদ্যজাত কন্যাটিকে লবণ বা তামাকের রস খাইয়ে মেরেও ফেলা হতো। এখনো কেনো মা মেয়ের প্রতি রাগ দেখাতে বলেন, আগে জানলে তোকে তামাক পাতার রস খাইয়ে আতুরঘরে মেরে ফেলতাম। বর্তমান সমাজে এমনটা না হলেও মেয়েদের প্রতি পারিবারিক নির্মমতা অনুক্ষণ চোখে পড়ে।
সামন্তসমাজ
শ্রেণিবিভক্ত দাসযুগে মূল দু শ্রেণি ছিলো দাস-মালিক এবং দাস। এ দু শ্রেণির দ্বন্দ্ব চরমে পৌঁছলে সমাজের বিকাশ থেমে যায়, ফলে এ সমাজ ভেঙ্গে সামন্তসমাজের সূচনা ও বিকাশ হয়। এটিও শ্রেণিবিভক্ত সমাজ। এর মূল শ্রেণি দুটো হচ্ছে ভূমি-মালিক এবং ভূমিদাস। সামন্তসমাজে মানবসংস্কৃতি ও উৎপাদনের অনেক বিকাশ হয়। কিন্তু মানুষ সরাসরি দাসত্ব থেকে মুক্ত হয়ে একখণ্ড ভূমিতে আটকা পড়ে। মানুষের অধীনতা, শোষণ-বঞ্চনা সব বজায় থাকে বরঞ্চ বহুগুণে বৃদ্ধি পায়। ভূমি-মালিকরা ক্রমশ সমাজে দেবতার আসন গ্রহণ করে। তাদেরকে কেন্দ্র করে ধর্মের বিকাশ হয়। ভূমি-মালেকরা মূলত ধর্মকে নিজেদের স্বার্থে ব্যবহার করে। সামন্ত সমাজে দাসসমাজের গোষ্ঠীপিতারাই নিজেদের অধিকার বাড়িয়ে ক্রমে সামন্ত শাসকে পরিণত হয়। সে সময় মানুষ-দেবতার এক সংমিশ্রণ ঘটে। তখন পরিকল্পিতভাবে সাধারণ মানুষকে শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত রাখা হতো কারণ মুর্খদের শাসন করা সহজ ছিলো। উচ্চবর্গের লোকেরা আমোদে ডুবে থাকতো। তাদের রক্ষক হিসেবে কাজ করতো বাহিনী। সামন্ত সমাজে শাসকরা দুভাগে বিভক্ত ছিলো, পার্থিব শাসক ও দৈবিক শাসক অর্থাৎ রাজা এবং পুরোহিত। দু পক্ষ পরস্পর মিটমাট করেই শাসন করতো। আলোচিত বিষয়সমূহের ওপর ভিত্তি করেই সামন্তযুগে নারীর মর্যাদার আসনটি নির্ধারিত ছিলো।
সামন্তযুগে নারী চিহ্নিত হতো রাজার সম্পত্তি রূপে। নারী সম্পর্কে দার্শনিক প্লেটোর দৃষ্টিভঙ্গি এরূপ, ‘শাসক বিয়ে করলে তার স্ত্রীর ওপর সব শাসকেরই যুক্ত অধিকার থাকবে।’ সে সময় উচ্চবর্গের লোকেরা নারীকে ভোগ্য বস্তুর বাইরে ভাবতেই পারতো না। শাসকরা সৌন্দর্য উপভোগের জন্য কেবল নারীদের জন্য পোশাক-প্রসাধনের ব্যবস্থা করতো। সে যুগে নারীর মর্যাদার অধপতনের উদাহরণ হচ্ছে বেশ্যাবৃত্তিতে নারীকে বাধ্য করা। এছাড়া সে সময়ের স্মরণীয় নীতিবাক্য হচ্ছে, কুমারীকালে নারীর রক্ষক পিতা, যৌবনকালে পতি এবং বার্ধক্যের রক্ষক পুত্র। অর্থাৎ নারীর নিজেকে রক্ষা করার ক্ষমতা বা অধিকার কোনোটাই ছিলো না। নারীর জন্য তখন ভারতবর্ষে সহমরণের প্রথা চালু ছিলো। অর্থাৎ মৃত স্বামীর সাথে তার স্ত্রীকেও পুড়ে মরতে বাধ্য করা হতো। পনেরশত বছর ধরে এই হত্যাযজ্ঞ চলে। সে সময় বিধবা বিয়েকে অনৈতিক আখ্যা দেয়া হতো। এটাও নারীর অধিকার হরণ। পুরুষতন্ত্র এ ক্ষেত্রে পুরুষকে সম্পূর্ণ স্বাধীনতা দিয়েছিলো, বাধা শুধু নারীর বেলায়। সামন্তযুগে এশিয়ার আরব অংশে মুখ ও শরীর সম্পূর্ণ ঢেকেই শুধু নারী বাইরে বের হতে পারতো। এই প্রথার জের এখনো চলছে। তখন শাহি হেরেমের জানানাখানায় শত শত সুন্দর নারীকে বন্দী করে রাখা হতো বাদশার ইচ্ছামতো ভোগের জন্য। ইউরোপের নারীরা সে সময় কিছুটা স্বাধীনতা ভোগ করলেও পুরুষের সমান বিবেচিত হতো না। তারা ভোট দিতে, পার্লামেন্ট সদস্য হতে এবং নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারতো না।
সামন্তযুগে পুরুষের হাতে অধিকতর সম্পত্তি জমা হওয়ায় পুরুষতন্ত্র আরো শক্তিশালী হয়ে ওঠে। পৃথিবীর সব দেশে পুরুষরা বহুবিবাহের অধিকার প্রাপ্ত হয়। মজার ব্যাপার হলো নারীর জন্য এক বিয়ে নির্দিষ্ট হয়ে যায়। একবার সৌদি বাদশার কয় সন্তান তিনি সেটা বলতে পারছিলেন না। তখন রাজকীয় নাপিত তাকে সাহায্য করলো। বাদশা সন্তান জন্মালে মাথা মোড়ানোর জন্য নাপিতকে ছেলের জন্য সোনার খুর আর মেয়ের জন্য রুপার খুর উপহার দিতেন। নাপিত খুর গুণে বলে দিলো ৩০৩ জন। এই হচ্ছে বাদশার নারী সম্ভোগ, রাজার পক্ষে সব স্ত্রীদের চেহারা পর্যন্ত মনে রাখা সম্ভব হতো না। এছাড়া সে সময় দাসীদেরও বিয়েবহির্ভূত যথেচ্ছ ভোগ করা যেতো।
সামন্তযুগে স্ত্রীকে স্বেচ্ছাচারিণী মনে করলে স্বামী তাকে জলে নিক্ষেপ করে মেরে ফেলতে পারতো। এ সময় বিয়েকে সামাজিক কর্ম না ধরে ধর্মীয় কর্ম মনে করা হতো। বিয়ের নিয়মনীতির কড়াকড়ি সব বর্তাতো নারীর ওপর আর পুরুষ থাকতো সম্পূর্ণ স্বাধীন। বিয়েটা ছিলো ভোগের বন্ধন যেখান থেকে বর্তমান সমাজও বেরিয়ে আসতে পারছে না। এছাড়া ভোগের ক্ষেত্রে ধর্মীয় প্রধান পর্যন্ত ছিলো অসহায়। একটা গল্প বলি- রাজার জন্য প্রয়োজনীয় সব আইন ইশ্বরের বিধান রূপে উত্থাপন করতেন পুরোহিত। রাজা বোঝাতেন পুরোহিত ইশ্বরের প্রতিনিধি। তাঁর আগমনে রাজা আসন থেকে উঠে দাঁড়াতেন। পুরোহিত বসলে রাজা বসতেন, এমন সম্মান দেখাতেন। একদিন সবার শেষে দরবার ত্যাগ করার জন্য রাজা পুরোহিতকে অনুরোধ করলেন। সবাই চলে গেলে রাজা পুরোহিতকে নির্দেশ করলেন, আজ যেনো তার কণিষ্ঠ কন্যাটিকে রাজার শয়নকক্ষে পাঠানো হয়। পুরোহিত সজল চোখে নির্বাক বিদেয় হলেন।
পুঁজিবাদী সমাজ
যে প্রাকৃতিক বস্তুর ওপর মানুষের শ্রম সাধিত হয় সেটা শ্রমের বস্তু। আর শ্রম প্রয়োগ করতে যেসব উপকরণ ব্যবহৃত হয় সেসবকে শ্রমের উপকরণ বলে। আর এ দুটি মিলে হয় উৎপাদনের উপকরণ। উৎপাদনের উপকরণ ব্যবহার করে নিজেদের অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে যারা উৎপাদনের কাজ সম্পাদন করেন তাদের বলা হয় উৎপাদিকা-শক্তি। আর নির্দিষ্ট উৎপাদন-প্রক্রিয়ায় মানুষে-মানুষে যে সম্পর্কের প্রকাশ ঘটে তাকে বলা হয় উৎপাদন-সম্পর্ক। আমরা জানি প্রত্যেক সমাজের বদল হয় উৎপাদিকা-শক্তি ও উৎপাদন-সম্পর্কের মাঝে সৃষ্ট দ্বন্দ্বের কারণে। কোনো নির্দিষ্ট সমাজের উৎপাদিকা-শক্তির বিকাশ হতে হতে এমন এক অবস্থায় পৌঁছে, বিরাজিত উৎপাদন-সম্পর্ক অর্থাৎ মানুষে-মানুষে প্রচলিত সম্পর্কটির সাথে এর বিরোধ হয়ে যায়। উৎপাদন-সম্পর্ক তখন উৎপাদিকা-শক্তির বিকাশকে বাধা দেয়। ফলে প্রচলিত সমাজটি ভেঙ্গে যায়। এভাবেই ভেঙ্গে যায় সামন্তসমাজ এবং গড়ে ওঠে নতুন সমাজ, নতুন উৎপাদন-সম্পর্ক যার নাম পুঁজিবাদ। পুঁজিবাদের বিপরীত মূল দুটি শ্রেণি হচ্ছে পুঁজিপতি এবং শ্রমিক শ্রেণি।
এবার আমাদের আলোচ্য বিষয়টি হচ্ছে- শ্রেণি বিভক্ত পুঁজিবাদী সমাজে নারীর মানবিক অবস্থানটি কেমন? “স্বাধীনতা-সাম্য-মৈত্রী” জন্মলগ্নে এটা ছিলো পুঁজিবাদের ঘোষণা। কিন্তু তার মনের ভেতর ছিলো ‘শোষণ’। সে সামন্ত প্রভুদের হারাতে নির্যাতিত মেহনতি মানুষদের সাথে নিয়েছিলো ঠিকই। অবশ্য পরবর্তীতে মানুষকে কিছুটা স্বাধীনতাও দেয়, একখণ্ড জমির বন্ধন থেকে মানুষ মুক্ত হয়। তা না হলে পুঁজিপতি শ্রমিক পাবে কোথা থেকে? মত প্রকাশের কিছুটা স্বাধীনতা, প্রযুক্তির উন্নতি সবই তার লাভের জন্য। পুঁজিবাদ সবক্ষেত্রে উন্নতি করতে রাজি যতোক্ষণ তার লাভ হচ্ছে। নারীর স্বাধীনতা বিষয়েও পুঁজিবাদের একই নীতি। পুঁজিবাদ প্রকাশ্যে পরিষ্কারভাবে তার ভাবাদর্শের প্রচার করে, শোষণ চিরন্তন ও অমোঘ। মানুষের অধিকার হরণ না করেতো তা সম্ভব নয়। নারীর ক্ষেত্রেও তাই হয়। সে লক্ষ্যে পুঁজিবাদ সামন্ত সমাজের গোঁড়ামি, পশ্চাৎপদতাকে একেবারে ছেটে ফেলে দেয় নি, এই সময়ে সাম্রাজ্যবাদ আফগানিস্তানে তালেবানদের সাথে আপস করেছে। সে পুরুষতন্ত্রকে বাতিল করেনি, সমাজের নারী মানে অর্ধেক মানুষকে নিপীড়নের মানসে। তারা এই বিষয়টির সামাজিকীকরণ করে যে নারীর ওপর পুরুষের আধিপত্য স্বাভাবিক। আবার প্রয়োজনে বলপ্রয়োগও করে। ধর্মীয় গোঁড়ামিকে ব্যাবহার করে। ধর্মীয় বক্তারা প্রচার করেন পুরুষ বলবান, বুদ্ধিমান ও সক্রিয়। অন্যদিকে নারী দুর্বল, বুদ্ধিহীন ও নিষ্ক্রিয়, তারা নারীর আচরণও ঠিক করে দেয়। পুরুষতন্ত্র সদম্ভে ঘোষণা করে গৃহকাজ ও সন্তান উৎপাদন নারী করুক তো সেটা পুরুষের ইচ্ছে অনুযায়ী। কিছু ক্ষেত্রে পুঁজিবাদ তার স্বার্থে নারীকে ঘর থেকে বের করে নিয়ে আসে যেমন আমাদের গার্মেন্ট শিল্পে, তবে পোশাকটা সামন্তযুগেরই রেখে দেয়, এখানেই গোঁড়ামির সাথে মৈত্রী, গায়ে বন্দিত্বের চিহ্ন রেখে দাও, তবেই এর ছাপ পড়বে নারীর মনে। পিতৃতন্ত্র আরো বলে, নারী তোমাকে কন্যা-বধু-মা হয়ে থাকতে হবে। যদি না থাকতে চাও পণ্য হওয়ার স্বাধীনতা পাবে, পারবে অবাধে দেহ বিক্রি করতে।
স্বীকার করতে হবে পুঁজিবাদে অনেক কৃৎকৌশলগত উন্নতি হয়েছে যা নারীর মনোজগৎকেও বিকশিত করেছে। তাই এযুগে নারী নিকৃষ্ট এমন উত্থাপন একটু কঠিন। এক্ষেত্রে পুরুষতন্ত্র কৌশল নেয় চেষ্টা করে বিজ্ঞানকে ব্যবহার করতে। বলে, পুরুষ ও নারী শারীরিকভাবে পৃথক। জৈবিক দিক থেকে পুরুষ শক্তিশালী। এটা মূলত ঠিক না। নারীকে দুর্বল বানানো হয় সাংস্কৃতিক দিক থেকে। পুঁজিবাদী সংস্কৃতিতেই পুরুষ-প্রাধান্য সব দিক থেকে। নারীমুক্তির জন্য তাই পুঁজিবাদ ও এর সংস্কৃতিকে বদলাতে হবে। পুঁজিবাদ, নারী পুরুষের সমান এই প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে দিতে চায় না। কোনো নারী যদি কোনো কারণে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে যায় পুরুষতন্ত্র চোখ রাঙায়, দেখো আমাদের পুরুষতন্ত্রে আঁচড় কাটার চেষ্টা করো না ফল খারাপ হবে। তখন এই নারীকে শর্ত মেনেই ক্ষমতায় থাকতে হয়। পাকিস্তান, ভারত ও বাংলাদেশের ইতিহাস তা প্রমাণ করে।
আমরা জানি পুরুষতান্ত্রিক সামাজিক পরিবেশে প্রত্যেকের জন্ম হয় মানুষ হিসেবে। মার ঢ ক্রমোজোমের সাথে পিতার ঢ ক্রমোজোম যুক্ত হয়ে জন্ম নেয় কন্যা এবং মার ঢ ক্রমোজোমের সাথে পিতার ণ ক্রমোজোম মিলে জন্ম নেয় পুত্র সন্তান। তারপর পুঁজিবাদ তার পুরুষতান্ত্রিক সংস্কৃতির প্রভাব খাটাতে শুরু করে। আমরা ইতিপূর্বে বলেছি এভাবে ধীরে ধীরে কন্যাটি নারী এবং পুত্রটি পুরুষ হতে শুরু করে। বলতে পারেন এটা মানুষের দ্বিতীয় জন্ম। পুরুষটি অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতির প্রভাবে অধিপতি বনে যায়, আর নারী হয় তার অধিনস্থ। সুতরাং পুঁজিবাদে নারীর এই হেয় অবস্থানটি জন্মগত নয়, একদল স্বার্থপর পুরুষের সৃষ্টি।
নারীর মর্যাদার ভিত্তি হচ্ছে অর্থনীতি। অর্থনীতির ভিতের ওপর নির্মিত হয় সমাজের সমাজনীতি, রাজনীতি, শিক্ষানীতি এবং সংস্কৃতি। পুঁজিবাদী পুরুষতান্ত্রিক সমাজে সবচেয়ে অবহেলিত নির্যাতিত হচ্ছে নারী-শ্রমিক। ওরা কাজ করে পুরুষের সমান, বেতন পায় কম সে শুধু নারী বলে। কাজ করে অস্বাস্থ্যপ্রদ ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে। রানাপ্লাজা ও তাজিন ফ্যাশান এর উদাহরণ। গার্মেন্ট মালিকদের সম্পদের পাহাড় গড়ে উঠছে নারী-শ্রমিকদের শ্রম-ঘাম লুণ্ঠণ করে। অথচ এই শ্রমিকরা সবসময় মালিকদের কাছে চোর হিসেবে গণ্য হয়। নারী শ্রমিকদের কারখানা থেকে বের হওয়ার রাস্তা থাকে সরু, একজন একজন করে বের হতে হয় এবং তখন পথে তাদের চেক করা হয় কোনো সুতা বা বুতাম নিয়ে গেলো কিনা। এটা প্রতিদিনের প্রকাশ্য অপমান। বিষয়টা সাজানো হয়েছে এমনভাবে যেনো তা স্বাভাবিক, গা সওয়ার মতো করে। এটাকে সামাজিকীকরণ করা হয়েছে।
নারী-শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে লড়াই করতে গেলে প্রতিরোধ গড়ে তোলা হয় তিন দিক থেকে। এক- তাদেরকে প্রকৃত ট্রেড ইউনিয়ন গড়তে না দিয়ে, দুই- সাধারণ ও শিল্প পুলিশের গুণ্ডামি দিয়ে, তিন- শ্রমিক ঐক্যে ফাটল ধরিয়ে। নারী-শ্রমিকদের বিভক্ত করে রাখা হয় নানা কায়দায়। যেমন, এক জেলার শ্রমিকদের সাথে আরেক জেলার শ্রমিকদের বিবাধ লাগানো হয়। সরকার দলীয় শ্রমিকদের সাথে অন্য দলের শ্রমিকদের ঝগড়া লাগানো হয়। মালিকপক্ষ দালাল ধরে শ্রমিক সংগঠন বানিয়ে তা করে। ওরা অতিবিপ্লবী কার্যকলাপের মাধ্যমে অধিকারের আন্দোলনকে বিপথগামী করে। আবার মালিক-শ্রমিক ঐক্যের তত্ত্ব হাজির করে।
মালিকপক্ষ আরো অনেক কায়দায় নারী-শ্রমিকদের ঠকায়, যেমন- কাজের সময় বাড়িয়ে বেগার খাটিয়ে বা যন্ত্রায়ন করে সময় কমিয়ে। মালিকের কাছে ওরা যেনো মানুষই না। বৈদেশিক মুদ্রার একটা বৃহৎ অংশের যারা যোগানদাতা সেই নারী-শ্রমিকদের বসবাসের পরিবেশ নোংরা, অস্বাস্থ্যপ্রদ। বস্তিগুলোয় দেখা যায় আট-দশ পরিবারের জন্য একটা বাথরুম, লাইন ধরে কাজ সারতে হয়। ধরেন একজন নারী-শ্রমিক ওবারটাইম করে রাত ৮টা-১০টার সময় বাসায় ফিরলো। ফিরেই তাকে রান্নাবান্না করতে হবে, তারপর গোসল সেরে খেতে খেতে বারটা বেজে যাবে। এবার একটু ঘুমোবার পালা। এখানেই পুরুষতন্ত্রের প্রতাপ। হে তুমি আরাম কর তো যে পতিদেবতা সারাদিন তোমার অপেক্ষায় থেকেছেন তার মনোরঞ্জনের একটা বিষয় আছে না? ওটা সেরেই তোমাকে আরমে যেতে হবে। তারপর ভোর চারটায় তাকে জেগে রান্না করে ও পরিবারের খুটিনাটি কাজ সেরে স্নানাহার করে খাবার-পাত্রে দুপুরের খাবার নিয়ে সকাল ৭টার মধ্যে কারখানার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিতে হয়। আবার কারখানায় ঢুকলে নানান যৌন নির্যাতনতো আছেই। এটাই নারী-শ্রমিকদের প্রাত্যহিক জীবন- যেখানে আন্তর্জাতিক শ্রম আইন বা কোনো মানবিক নিয়ম খুঁজে পাওয়া দুষ্কর।
ক্ষেতমজুর, দিনমজুর ও রিকশা-ভ্যান-অটো-সিএনজি চালক পরিবারের নারীদের জীবন সমান অবহেলার। এরকম পরিবারের একজন নারী ধান কাটে, বোঝা টানে, গৃহকাজ করে, সন্তান লালন-পালন করে। এছাড়া বাঁশ-বেতের কাজ পশু-পাখি পালন, ইটভাটার কাজ, চাতালের কাজ, রাস্তার কাজ এমনতরো বহু কাজ করে থাকে। প্রায়ই দেখা যায় এমন পরিবারের পুরুষরা একটু উশৃঙ্খল টাইপের হয়। রাত করে বাড়ি ফেরে, মদ-গাঁজা-ভাং সেবন করে বা জুয়ো খেলে। অনেক ক্ষেত্রে স্ত্রীর উপার্জনের ওপরই এদের নির্ভরতা থাকে। কোনো সময় এমন একটি পুরুষের মন যোগাতে ব্যর্থ হলে নারীটিকে শারীরিক নির্যাতনের মুখোমুখি হতে হয়। সে পুরুষটিকে বলতে পারে না, জুয়ো খেলো না, ছাইভস্ম খেয়ো না। বললেই বেদম প্রহার। তার জন্য প্রতিবাদ করা কঠিন কারণ পুরুষতান্ত্রিক সমাজ তার পক্ষে না, তার কোনো সঞ্চয় নেই দুটু হাতই একমাত্র সম্বল। এ যেনো এক খোয়াড়ে বন্দী জীবন। যৌবন ফুরালে এ জীবন আরো দুঃসহ হয়ে ওঠে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পুরুষতন্ত্রের মালিক স্বামীটি নিজ দেহের ওপর অত্যাচার করে আগেই দেহত্যাগ করে। মেয়েরা বিয়ে করে অন্য সংসারে চলে যায়। ছেলের বউরা এসে শাশুড়িকে পৃথক করে দেয়, মানসিক নির্যাতনতো করেই অনেক সময় শারীরিক নির্যাতনও। এই হলো আমাদের শ্রমজীবী নারীদের জীবন। উৎপাদনের উপকরণে তাদের কোনো মালিকানা নেই যে জন্য তাদের এমন জীবন অতিবাহিত করতে হয়। শ্রমশক্তি বেচতে না পারলেই জীবন অবর্ণনীয় কঠিন রূপ ধারণ করে। ওরা শিক্ষা-স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত থাকে, থাকে সমৃদ্ধ সংস্কৃতির বাইরে। অথচ তারা সব সংস্কৃতির স্রষ্টা। ওরা মেহনতি মানুষ আর মেহনত হচ্ছে সংস্কৃতির উৎস।
আমাদের সংবিধান প্রত্যেক নাগরিককে নির্বাচনে অংশ নেয়া এবং নির্বাচিত হওয়ার অধিকার দিয়েছে। কিন্তু নারী-শ্রমিকদের এ অধিকার অর্থের দাপটে কেড়ে নিয়েছে পুঁজিপতি। পার্লামেন্ট দখল করেছে, ওরা কিছু নারীকেও নিয়েছে যারা পুরুষতন্ত্রের পক্ষে। পুঁজিবাদ, পুরুষতন্ত্র রাষ্ট্র ও এর সব শাখা দখল করে শ্রমজীবী নারীদের আজ দাসী বানিয়ে ফেলেছে। নারী-পুরুষের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় তীব্র লড়াইয়ের মাধ্যমে মানবিক সমাজ সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ভেতর দিয়ে নতুন সংস্কৃতির জন্ম দিলে একমাত্র হতে পারে- নারীমুক্তি।