হাওরের সমস্যা বিচিত্র ধরনের আছে সমাধানের পথও

Posted: 10 মে, 2026

হাওর অধ্যুষিত নেত্রকোনার পাঁচ উপজেলায় ১০ হাজার ৭২৭ হেক্টর জমির বোরো ধান তলিয়ে গেছে। একমাত্র অবলম্বন ধান হারিয়ে দিশেহারা কৃষক। জেলা কৃষি বিভাগ বলছে, এরই মধ্যে ৩৮ হাজার ২৩৮ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। তবে হাওর পারের মানুষ বলছে, এ সংখ্যা আরো বেশি। গত ১৪ এপ্রিল থেকে ২৮ এপ্রিলের টানা বৃষ্টিতে হাওরে এ দুর্যোগ দেখা দেয়। হাওরে কৃষকের বেশিরভাগেরই নিজস্ব কোনো জমি নেই। তারা অন্যের জমি বর্গা নিয়ে ধান চাষ করে থাকেন। এজন্য তাদের জমির মালিককে কাঠা প্রতি দুই থেকে তিন হাজার টাকা দিতে হয়। এরপর রোপণ থেকে শুরু করে ঘরে ধান তোলা পর্যন্ত আরও তিন থেকে সাড়ে তিন হাজার টাকা ব্যয় হয়। কিন্তু এসব জমির সঠিক কাগজপত্র না থাকায় সরকারি ব্যাংক থেকেও কোনো ধরনের লোন পান না তারা। ফলে পুঁজিহীন এসব দরিদ্র কৃষকদের বিভিন্ন এনজিও ও দাদনদারদের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জমি চাষ করতে হয়। কেউ কেউ আবার ধান বিক্রির পর টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে মজুরি খাটান। ফলে তাদের ধান পানির নিচে তলিয়ে যাওয়ায় বাঁচার আর কোনো পথ পাচ্ছেন না। বাধ্য হয়ে গরু ছাগল পানির দামে বিক্রি করতে হচ্ছে তাদের। তারও ক্রেতা পাওয়া যাচ্ছে না। আর যাদের অবস্থা একটু ভালো তারাও খড়ের অভাবে পশুখাদ্য নিয়ে দুঃশ্চিন্তায় আছেন। হাওরবাসীর অভিযোগ, এ দুঃসময়েও তাদের পাশে এসে দাঁড়ায়নি সরকারের লোকজন। তাদের অভিযোগ অন্যান্য বারে দুর্যোগের সময় সরকারি সাহায্য আসলেও অবস্থাসম্পন্ন কৃষকরাই কার্ড পেয়েছে। তাদেরকে বাড়ি ছেড়ে রাজধানী ঢাকাসহ দূরদূরান্তে কাজের সন্ধানে বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। এবারও তাদের তাই করতে হবে। তবে কৃষকদের অভিযোগ ভিত্তিহীন দাবি করে জেলা কৃষি বিভাগের কর্তাব্যক্তিরা জানান, “আমাদের মাঠ পর্যায়ে লোক রয়েছে। আমরা কৃষকের সমস্যা সমাধানে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।” গত কয়েকদিন সরজমিনে নেত্রকোনার মদন, মোহনগঞ্জ ও খালিয়াজুরির বিভিন্ন হাওর পারের কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে তাদের সমস্যা অন্তহীন। রুপচাঁন মিয়া, প্রাণেশ সামন্ত, ওলি মিয়া, মুন্নি আক্তার, সদুপা বেগম, রভু মণ্ডলসহ অন্তত ৩০ জন কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে হাওরে বোরো ধান রোপণের পর তাদেরকে অসময়ের উজানের ঢল, শিলাবৃষ্টি, বজ্রপাতসহ প্রাকৃতিক বিভিন্ন দুর্যোগের সঙ্গে লড়াই করে বাঁচতে হয়। সবসময় চিন্তায় থাকতে হয় প্রকৃতির সঙ্গে লড়াই করে তারা গোলায় ধান তুলতে পারবে তো! সেইসঙ্গে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) বীজ নিয়েও বিস্তর অভিযোগ রয়েছে তাদের। অসহায় কৃষক এটাকে শুধুমাত্র প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে নিজের ভাগ্যকে দোষারোপ করলেও বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির নেতৃবৃন্দ, হাওর নিয়ে কাজ করা গবেষকরা বলছেন, এ দুর্যোগের দায় শুধু প্রকৃতির ওপর চাপিয়ে দিলে হবে না। এটা সম্পূর্ণভাবে মানবসৃষ্ট। মোহনগঞ্জ উপজেলার সুয়াইর ইউনিয়নের হাঁটনাইয়া গ্রামের কৃষক মেনু মিয়া বলেন, “আমি আধিতে ডিঙ্গাপোতা হাওরে ৩০ কাঠা জমি করছিলাম। মাত্র ১০ কাঠা জমির ধান আধাপাকা তুলতে পারছি। আর বেকটা ফানির তলেই পইড়া রইছে। ধান হইছে মাত্র ৪০ মণের মতো। এর অর্ধেক ধান জমির মালিক লইয়া গেছেগা। এ জমি করতে ব্র্যাক ও এসডিএফ নামের দুটি এনজিও থেকে ঋণ নিছিলাম ৫০ হাজার করে এক লাখ ট্যাহা।” এই দুর্যোগের মধ্যেও এনজিওর লোকজন টাকার কিস্তি তুলতে আসছেন অভিযোগ করে তিনি বলেন, “এখন হেরারে আইতে দেখলেই লগের বাড়িত গিয়া পলাইয়া থাহি। এইবায় কয়দিন পলাইয়া থাকবাম?” ভাটিয়া গ্রামের রোজিনার স্বামী যখন মারা গেছেন তখন ছয় মাসের শিশু কোলে। এখন ছেলের বয়স ১০ বছর। তিনিও এবার ঋণ করে ছয় কাঠা ক্ষেত করছিলেন। যার থেকে এক মুষ্টি ধানও তিনি বাড়িতে আনতে পারেননি। সবটাই এখন পানির নীচে। এই ধান করতে গিয়ে তার খরচ হয়েছে ১৫ হাজার টাকা। এখন কী করবেন প্রশ্ন করলে বলেন, ‘আল্লায় দেয় আল্লায় নেয়। এখন আর করনের তো আমার কোনো ফত নাই। মাইনষ্যের বাড়ি কাম করি। এই ট্যাহা থেকেই ঋণ পরিশোধ করতে হবে।” এ উপজেলার কদমশ্রী গ্রামের বাসিন্দা কৃষক রুপচাঁন মিয়া দৌড়ের হাওরে ধান করেছেন ১৩ কাঠা। তার ধানও পানিতে তলিয়ে গেছে। তারপরও শেষ চেষ্টা হিসেবে ডুব দিয়ে দিয়ে কিছু ধানের হিজা (ধানের শীষ) তোলার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন, ‘সরকারের কাছ থিকা বীজ কিনছিলাম। কিতা বীজ দিছে জানি না। ধানে চাল আওয়ার আগেই ব্লাস্টার না ফ্লাস্টার রোগে চার কাঠা শেষ হইয়া গেছে। এখন বাকিটা ফাইন্নের (পানির তলে)।” দৌড়ের হাওরে বোরো ধান করে দৌড়ের ওপর আছেন আয়েশা আক্তারও। কথা বলার সময় নাই তার। কথা বলতে চাইলে ‘ ট্যাহা দিবাইন’ প্রশ্ন রেখে দৌড়ে বাড়ির দিকে চলে যান তিনি। এ সময় তারই প্রতিবেশী নাজু মিয়া বলেন, ‘ভাই কিছুতা মনে করইন না যে। আয়েশি ঋণ করে ৩০ কাঠা আধি জমি করছিল তার সবটাই ফানিত গেছে। হের মাথা ঠিক নাই।’ নাজু মিয়া আরও বলেন, “ধানের সাথে এইবার আমরার মানও যাইবো। ধান বেইচ্ছা দোহানদারের ঋণ দেয়ার কথা আছিল। এহন ট্যাহা না দিলে দোহানের মালিক কি মানব? হয়তো বহাজহা (বকা দেওয়া) করব।” উপজলার নগর ইউনিয়নের উদয়পুর গ্রামের বাসিন্দা প্রভাষক প্রাণেশ সামন্ত বলেন, ‘আমারও ৫০ কাঠার মতো বোরো ধান পানিতে ডুবছে। তবে এগুলো প্রথম দিকে যখন বৃষ্টি হচ্ছিল; তখন কাটা সম্ভব ছিল। কিন্তু ২০০০ টাকা দিয়েও শ্রমিক পাওয়া যায়নি।’ কেন শ্রমিক পাওয়া যায়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘এখন গ্রামে শ্রমিক সংকটতো আছেই। সেইসঙ্গে আকাশে মেঘ দেখলে বজ্রপাত আতঙ্কে কেউ ধান কাটতে চায় না।’ হাওরের সার্বিক সমস্যার সমাধান কী জানতে চাইলে প্রাণেশ সামন্ত বলেন, হাওর সংলগ্ন নদীগুলো গভীরভাবে খনন করতে হবে। ফসলরক্ষা বাঁধগুলো সঠিক পরিকল্পনা নিয়ে যথাযথভাবে করতে হবে। অকেজো স্লুইস গেটগুলো সংস্কার করতে হবে। তারপরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান কোনোদিন হবে না। হাওরের সমস্যার সঙ্গে প্রাকৃতিক দুর্যোগ জড়িত। এজন্য সরকারকে সুচিন্তিত পরিকল্পনা করে এগুতে হবে।