বাংলার সহজিয়া বিপ্লবী
কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি
Posted: 03 মে, 2026
বাংলার বাউলদের সহজিয়া ধারার যাপনের সাথে যার জীবনের নিবিড় সখ্য, তিনি কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি। মাটির কাছে, মাটির মানুষের পাশে তিনি তার জীবন তরী বেয়ে গেছেন মরমিয়া হয়ে, মার্কসবাদকে তিনি মানুষের কাছে নিয়ে গেছেন। প্রান্তজনের ভাবনায় তিনি দক্ষ কুমোরের মতো গড়েছেন সংগ্রামের আর শৃঙ্খল মুক্তির তৈজস। তাই শিরোনাম নির্ধারণ করেছি ‘সহজিয়া বিপ্লবী’।
অগ্নিযুগের এই বিপ্লবী মার্কসীয় দর্শনকে হৃদয়ঙ্গম করে কমিউনিস্ট পার্টিকে গড়ে তোলার জন্য নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন তাবৎ জাগতিক সুখকে তুচ্ছ করে।
কৃষক থেকে দিনমজুর আর মুটে থেকে শ্রমিকের অধিকার আদায়ের এই লড়াকু কমরেডের জীবন অবসান হয় দুনিয়ার শ্রমিক শ্রেণির অধিকার আদায়ের মহা সংগ্রামের বিজয়ের দিন পহেলা মে, ২০০১ সালে। অদ্ভুত মিল জীবন আর সংগ্রামের। যেন তিনিই যেতে চেয়েছিলেন মে দিবসে, দুনিয়া জোড়া শ্লোগান-মিছিলে উত্তাল দিনে।
সন্তোষ ব্যানার্জি জন্মগ্রহণ করেছিলেন মাদারীপুর শহরের পুরান বাজার জমিদার বাড়িতে। যে বাড়িটি এখন আড়িয়ালখাঁ নদীর গর্ভে বিলীন। জমিদার পরিবারে সাত বোনের এক ভাই ছিলেন কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি। তিনি যখন কৈশোর থেকে তারুণ্যের সময় অতিক্রম করছেন তখন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনে বাংলা মুখরিত। বাংলা জুড়ে তোলপাড় করে ফেলছে অনুশীলন আর যুগান্তর সংঘ। তাদেও নেতৃত্বে চলছে ব্রিটিশ বিরোধী সশস্ত্র লড়াই আর সেই লড়াইয়ে অবতীর্ণ হলেন তরুণ সন্তোষ ব্যানার্জি।
বাংলাদেশে সশস্ত্র বিপ্লবীদের বিরুদ্ধে ব্রিটিশ শাসকেরা বেছে নেয় দমন-পীড়নের পথ। দেশ জুড়ে শুরু হয় গণহারে ধরপাকড়। সেই সময় তরুণ বয়সের হাজার হাজার যুবক-যুবতীকে জেলবন্দি করা হয়। ব্রিটিশ বিরোধী লড়াইয়ে যারা সশস্ত্র বিপ্লবী ধারায় ছিল তাদের শাস্তি ছিল হয় ফাঁসি, না হয় আন্দামান সেলুলার জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে বদ্ধ জীবন। আমাদের দেশে সাধারণভাবে পরিচিত যা ছিল ‘কালা পানিতে নির্বাসন’ নামে।
আন্দামান সেলুলার জেলের বন্দীদের জীবন যাপন ছিল অমানবিক। তাদের উপর নির্যাতন নেমে আসত যখন-তখন। ছোট্ট একটি খুপড়ি কক্ষে বন্দীদের একা একা থাকতে হতো। এখানে পা মেলে শোয়ার ব্যবস্থা পর্যন্ত ছিল না। আলো বাতাসের প্রবেশ নেই এরকম পরিবেশে তাদেরকে রাখা হত। এখানকার বন্দীদের দিয়ে অস্বাভাবিকভাবে কায়িক পরিশ্রম করানো হতো। ঘোড়া অথবা বলদের পরিবর্তে এই বন্দীদের দিয়ে তেলের ঘানিতে সরিষা ভাঙাতে বাধ্য করত ব্রিটিশ অসভ্য শাসকেরা। এই অবর্ণনীয় নির্যাতন নিপীড়নের বন্দী জীবনের মধ্যে একদিন কমিউনিস্টরা নিয়ে গেল আলোকবর্তিকা মার্ক্সবাদ, কমিউনিস্ট মতাদর্শ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় দলে দলে আন্দামান ফেরত বিপ্লবীরা দেশের মাটিতে এসে কমিউনিস্ট পার্টিতে যোগ দিতে থাকেন। সাম্যবাদ প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে যুক্ত হতে আন্দামান সেলুলার জেলে বন্দীদের কমিউনিস্টরা আহ্বান জানিয়েছিলেন, সেই আহ্বানে সাড়া দিয়ে একদিন কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জিও শামিল হলেন লাল পতাকা হাতে শোষণ মুক্তি, শ্রেণি মুক্তি আর শ্রেণি শত্রু বিনাশের মহা সংগ্রামের অধিনায়ক শ্রমজীবী মেহনতি মানুষের পার্টির সাথে। সেই লাল পতাকা মৃত্যুর দিন পর্যন্ত তিনি উড্ডিন রেখেছিলেন।
ব্রিটিশ আমলে আর পাকিস্তান আমল মিলে তিনি জেলে ছিলেন ২৭ বছর। ’৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানের সময় জেল থেকে বেরিয়ে তিনি ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে। মহান মুক্তিযুদ্ধে অন্যতম সংগঠক হিসেবে মানুষকে সংগঠিত করেছেন প্রান্তিক অঞ্চলে। মুক্তিযুদ্ধের সময় ন্যাপ-সিপিবি-ছাত্র ইউনিয়নের গেরিলা বাহিনী গঠনে অসাধারণ ভূমিকা পালন করেন সহজিয়া কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি। শরণার্থীদের কাছে তিনি ছিলেন দেবতাতুল্য।
মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, ফরিদপুরের সেই সময় যারা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের শরণার্থী হিসেবে গিয়েছিলেন তাদের পাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন দরদী সন্তোষ ব্যানার্জি। কি বিচিত্র এই দেশ; মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক, দেশপ্রেমিক এই বিপ্লবীকে স্বাধীন দেশে বারবার কারাবরণ করতে হয়। ৯০ দশকে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলনের জন্য সন্তোষ ব্যানার্জিকে জেলে যেতে হয়। জীবনের ৩২টি বছরই জেলে কাটিয়েছেন চিরকুমার সর্বস্বত্যাগী এই বিপ্লবী সন্তোষ ব্যানার্জি।
অবিভক্ত ফরিদপুরে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার মহান ব্রত পালনের জন্য কী করেননি তিনি? পরিবার, ব্যক্তিগত সম্পদ, জীবনের সুখ এমন কি সংসার সব কিছু ত্যাগ করে দিয়ে শামিল হয়েছিলেন শ্রেণি সংগ্রামে লড়াইয়ে। যুক্ত হয়েছিলেন সর্বহারা মানুষের মুক্তির সংগ্রামে। নিজেকে অর্পণ করেছিলেন যে পথে আজীবন সেই পথ থেকে তিনি একটু তিনি নড়চড় করেননি।
মানুষের মুক্তির লড়াইকে এগিয়ে নিতে পার্টি এবং গণসংগঠনের ভিত্তিকে মজবুত করতে তিনি ছুটে বেড়িয়েছেন ভেদরগঞ্জ থেকে পালং, পালং থেকে মাদারীপুর সেখান থেকে কালকিনি, রাজৈর, টেকেরহাট; হয়তো সেখানে থেকে আবার কয়েকদিনের গন্তব্য ছিল গোপালগঞ্জ। তিনি এবং তার সময়কালের কমরেডরা বৃহত্তর ফরিদপুরে গড়ে তুলেছিলেন বিশাল ভিত্তির কমিউনিস্ট পার্টি এবং গণসংগঠন।
ঘরবাড়ি ঠিকানাহীন সর্বস্ব ত্যাগী এই বিপ্লবী শেষ জীবনে বেশির ভাগ সময় থাকতেন রাজৈর উপজেলার কবিরাজপুরে এক কমরেডের বাড়িতে। টেকেরহাটেও থাকতেন অনেকটা সময়।
টেকেরহাটে থাকতেন কমরেড নুরু ভাই, কমরেড কালামের বাড়িতে। রাজৈর থাকতেন কমরেড তুষার কান্তি সাহা, ন্যাপ নেতা শিবু সাহার বাড়িতে। রাজৈর আর টেকেরহাট এ অবস্থানকালীন তিনি আড্ডায় সমবেত হতেন তুষার দার ঔষুধের দোকান ‘আশা ড্রাগস হাউজ’ এ। সে আড্ডায় সামিল হত রাজৈর-মাদারীপুর কখনো কখনো গোপালগঞ্জের কমরেড-বন্ধুরা আর এই আড্ডার মধ্যমণি ছিলেন আমাদের দাদা কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি। সেই আড্ডায় রাজনৈতিক আলাপ আলোচনা হত, আবার কমরেডদের জীবনের সমস্যা সংকট, সামাজ সংস্কৃতি নিয়ে হতো তর্ক-বিতর্ক আর জমজমাট আলাপ।
মানুষকে আপন করে নেওয়া মোহনীয় ক্ষমতাধর মানুষ ছিলেন তিনি। মানুষকে এবং সব মানুষকে ভালবাসতেন সে ভালোবাসায় কোনো খাদ ছিল না। সুঠাম দেহের অধিকারী প্রাণবন্ত সুন্দরের এই অপরূপ মিলনে তিনি ছিলেন এতদ অঞ্চলের সকলের ‘দাদা’। কেউ দাদা বললেই মানুষ বুঝে ফেলত সেখানে সন্তোষ ব্যানার্জির কথা বলা হচ্ছে।
আমার সাথে ব্যানার্জির পরিচয় হয় ১৯৭৯ সালে যখন আমি একাদশ শ্রেণির ছাত্র গোপালগঞ্জের প্রয়াত কমরেড শওকত চৌধুরীর বাড়িতে। সেই থেকে মৃত্যু পর্যন্ত আমাদের একসাথে পথচলা। ’৮৪ হতে ’৮৯ সাল পর্যন্ত কর্মসূত্রে আমার অবস্থান ছিল রাজৈর উপজেলার টেকেরহাটে। টেকেরহাটে থাকাকালীন সময়ে তুষারদার ঔষধের দোকানে সন্ধ্যাকালীন আড্ডায় আমি ছিলাম নিয়মিত একজন। টেকেরহাটের নুরু ভাই, মোতালেব মোল্লা, কালাম ভাই, শিবু দা আমগ্রামের গোপাল দা আরো অনেকে। দাদা আসলেই তুষারদা আমাদেরকে খবর দিতেন। খবরটা ছিল এই রকম- ‘দাদা আইছেন’। এই সংবাদ আমাদেরকে জড়ো করতো গভীর রাত পর্যন্ত। দাদাকে নিয়ে আমাদের এই প্রিয় আড্ডা আমি সাধারণত দাদার পাশে বসতে চাইতাম না, তথ্য ভুল করলেই বলতেন ‘তুমি গাধা’ আর সাথে একটা স্নেহের ‘পিটুনি’ থাকতো বোনাস হিসাবে।
পার্টি কমরেডদের প্রতি তার ভালোবাসার নমুনা একটি ছোট্ট ঘটনা উপস্থাপন করছি। ১৯৮৪ সালে এক ঘটনায় কমিউনিস্ট পার্টি গোপালগঞ্জ জেলা কমিটি আমার সদস্য পদ নবায়ন বন্ধ রাখে। এই কথাটি আমি দাদাকে কোনোদিন বলিনি। একদিন দাদা নিজেই হঠাৎ আমাকে বললেন “তুই তোর মেম্বারশিপটা রাজৈরে ট্রান্সফার করে নিয়ে আয়”। তখন বাধ্য হয়ে আমি দাদাকে বললাম আমি এখন আর পার্টির সদস্য নই এবং দাদা ঘটনাটি জানতে চাইলে আমি বিস্তারিত বললাম। এর কিছুদিন পরে ’৮৫ সালের নবায়নের সময় গোপালগঞ্জ জেলা কমিউনিস্ট পার্টির একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা আমার কর্মস্থলে উপস্থিত হন এবং আমার সদস্য পদ নবায়নের জন্য পার্টির সিদ্ধান্তের কথা জানান। সে অনুযায়ী আমাকে নিকটস্থ জলিলপার শাখায় যোগাযোগ করে নবায়ন করতে অনুরোধ জানান।
সেইদিন থেকে আজ অব্দি আমি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি একজন গর্বিত সদস্য। দাদা নিজে থেকেই কাজটি না করলে হয়তো আমি আর এই সহজ রাস্তাটি খুঁজেই পেতাম না; ভালোবাসার এই ঘরটিকে এভাবে আপন করে পেতাম না।
১৯৮৯ থেকে আমি গোপালগঞ্জে থাকি এবং আজো আছি। দাদা যতদিন জীবিত ছিলেন ফরিদপুর, মাদারীপুর, শরীয়তপুর ঘুরে তিনি গোপালগঞ্জে আসতেন। একবার আসলে আমরা চেষ্টা করতাম ধরে রাখতে। তিনি বড়জোর চার-পাঁচ দিন থেকে আবার ছুটে চলতেন সাতপাড়, জলিলপাড়, কোটালীপাড়া, কাশিয়ানিতে কমরেডদের বাড়িতে।
কমরেডদের বাড়িতে থেকে তাদের জীবনের সুখ-দুঃখের সাথী হতেন। তাদের পরিবারকে আপন এমন করে নিতেন, যেন তিনি সেই পরিবারের সদস্য। এই এক অসাধারণ ক্ষমতা ছিল ‘দাদার’। সেই সময় বাজারে প্রচলিত একটি কথা ছিল যে পরিবারে একদিন তিনি রাত কাটাতেন, সেই পরিবারের সদস্যরা পরের দিন কমিউনিস্ট হয়ে যেত।
গোপালগঞ্জের শেষের দিকে বেশিরভাগ সময় থাকতেন সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা ডাক্তার অরুণ কান্তি বিশ্বাসের বাড়িতে। ঘুরে বেড়াতেন শহরময় ন্যাপ-কমিউনিস্ট পার্টি কিংবা ছাত্র ইউনিয়নের নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে।
সোভিয়েত পতনের পরে আমাদের দেশে সুবিধাবাদি পার্টির মধ্যে ঘাপটি মেরে থাকা বিলোপবাদীদের বিরুদ্ধে কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি লড়াইয়ে ছিলেন, সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়েছেন মূলধারার পার্টিকে ফিরিয়ে আনতে। কঠিন হৃদয়ের এই মানুষটিও কিন্তু পুরানা পল্টনের ভবন ভাগাভাগি মেনে নিতে চোখের জল ফেলেছেন, আবার ইস্পাত কঠিন দৃঢ়তা নিয়ে পার্টিকে রক্ষা করতে আমাদেরকে উৎসাহিত করেছেন, উজ্জীবিত রাখতেন।
বয়সের কারণেই ২০০০ সাল থেকে মাঝে মধ্যে অসুস্থ থাকতেন। কমিউনিস্ট পার্টির তত্ত্বাবধানে পিজি হাসপাতালে কিছুদিন চিকিৎসাধীনও ছিলেন। একটু সুস্থ হলে আবার সেই জেলায়, উপজেলা পার্টি ভিত্তি এলাকায় ঘুরে বেড়ানোর শুরু করতেন। শারীরিক সক্ষমতার বিষয়ে বলে এভাবে না ঘুরতে অনুরোধ জানালে অতিরিক্ত চ্যালেঞ্জ করে বলতেন, “আয় পারলে আমার সাথে পাঞ্জা ধর!” দাদার সাথে পাঞ্জা ধরতে আমরা খুব সাহস করতাম না কারণ প্রতিবারই আমরা পরাজিত হতাম।
মৃত্যুর পূর্বে শেষবার গোপালগঞ্জে এসে ডাক্তার অরুণের বাড়িতে উঠেছিলেন। এসেই অরুণ দাকে বলেছিলেন, আমাকে খবর দিতে। অরুণদা ফোন করে আমাকে বললেন, দাদা আসছে। সন্ধ্যায় দাদা আমাকে দেখে খুব খুশি। বললেন, ‘আমি এখনই রেডি হচ্ছি আজকে আমাকে শওকতের বাসায়, মিঠুর বাসায়, খোকনের বাসায় নিয়ে যাবি।’
একটি রিকশা নিয়ে দুজনে বেরিয়ে পড়লাম। পথে সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রেফাউল হক মঞ্জুর প্রগতি প্রসাধনীর সামনে রিকশা থামিয়ে মনজু ভাইকে ডেকে বললেন, তার অতিপ্রয়োজনীয় ব্যবহার জন্য নস্যি জোগাড় করে রাখতে। সব নেতাকর্মীদের বাড়িতে ঘুরে রাত ৯টা নাগাদ দাদা আর আমি দুজনে দাদার প্রিয় খাবার মিষ্টি খেতে বসলাম দত্ত মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে। সন্দেশ আর দধি। রাত দশটার দিকে ডাক্তার অরুণের বাসায় পৌঁছে দিয়ে দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম- দাদার প্রয়োজনীয় কিছু লাগবে কিনা। দাদা আমাকে বললেন, হাতাওয়ালা সাদা রঙের (দাদু গেঞ্জি বলে এখন যেটাকে) একটা গেঞ্জি, আরেকটি গামছা কিনে দিতে।
পরদিন অফিস শেষ করে দুইটা গেঞ্জি, একটা গামছা আরেকটা সাদা চেক লুঙ্গি কিনে প্যাকেট করে নিয়ে গেলাম দাদার কাছে। আমার ভাবনায় ছিল পরবর্তীতে যখন আবার দাদার লাগবে অন্য কাউকে বলতে হবে সেজন্য আমিই কিনে নিয়ে যাই। প্যাকেটটা দাদার হাতে দিলাম।
কিন্তু প্যাকেট খুলেই তিনি রুদ্রমূর্তি ধারণ করলেন, প্যাকেটটি ছুড়ে মারলেন। আমি হতবিহ্বল এবং কিংকর্তব্যবিমূঢ় হলাম। ততক্ষণে ডাক্তার অরুণের স্ত্রী আমাদের গীতা বৌদি চলে এসেছেন। আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে?
আমি বৌদিকে সব ঘটনা খুলে বললাম। বৌদি বললেন, দাদাকে ক্ষমা করে দেন। আমি দুই পা জড়িয়ে কান্নাকাটি করছি আর দাদা চিৎকার করে বলছিলেন, “তোর টাকা বেশি হয়েছে সেজন্য অতিরিক্ত জিনিস এনে তুই টাকার গরম দেখাস! একজন অমিতব্যয়ী কি করে কমিউনিস্ট হয়!” শেষ পর্যন্ত গীতা বৌদির অনুরোধে আর আমার কান্না-কাটির জন্য সেদিনের মত রেহাই পেলাম।
কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জির সবচেয়ে প্রিয় স্লোগান ছিল “দুনিয়ার মজদুর এক হও”। ২০০১ সালের পহেলা মে মানব ইতিহাসের শ্রেষ্ঠ শ্লোগান যখন সারা দুনিয়ার কলে কারখানায় শহরে-বন্দরে উচ্চারিত হচ্ছিল সেই দিন মেহনতি মানুষের বিজয়ের এই দিনে বাংলার বাউল কমিউনিস্ট সহজিয়া বিপ্লবী কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জির জীবনের খেরো খাতার শেষ পাতা বন্ধ করলেন।
যাবার সময়েও সর্বস্বত্যাগী এই মানুষটি চিকিৎসা বিজ্ঞানের উৎকর্ষে ঢাকা মেডিকেল কলেজে নিজের দেহদান করার ব্যবস্থা করে গিয়েছিলেন। সবকিছুতেই তার জীবনের পূর্ণতা স্নিগ্ধতায় ভালোবাসায়।
লাল পতাকা, ফুলের আর ছবির মতো দেহটি ছিল ছোট্ট একটা গাড়িতে সেই গাড়িটিকে ঘিরে আমরা ছিলাম শরীয়তপুর, মাদারীপুর আর গোপালগঞ্জের কমরেডরা। আমরা সেদিন সন্তোষ ব্যানার্জির যাত্রার সময় স্লোগান দিয়েছিলাম- কমরেড সন্তোষ ব্যানার্জি জিন্দাবাদ আর তার প্রিয় স্লোগান “দুনিয়ার মজদুর এক হও”। শেষ যাত্রাটি শুরু হয়েছিল কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালের মধ্য দিয়ে।
লেখক : সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, গোপালগঞ্জ জেলা কমিটি, সিপিবি