খেলাঘর শৈশব গড়ার এক আলোকিত অভিযাত্রা

Posted: 03 মে, 2026

বাংলাদেশের শিশু কিশোরদের সৃজনশীল বিকাশ, মানবিক মূল্যবোধ, বিজ্ঞানমনস্ক এবং সাংস্কৃতিক চেতনায় গড়ে তোলার ক্ষেত্রে ‘খেলাঘর’ একটি অনন্য নাম। ৭৪ বছরের দীর্ঘ পথ চলায় এই সংগঠনটি শুধু মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং শিশু-কিশোরদের মাঝে একটি প্রগতিশীল সামাজিক আন্দোলন হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে। খেলাঘরের জন্ম হয়েছিল এমন এক সময়ে যখন শিশুদের জন্য সংগঠিত মূল্যবোধ ভিত্তিক চর্চার ক্ষেত্র ছিল একেবারেই সীমিত। সেই শূন্যতা পূরণ করতেই খেলাঘর হাতে নিয়েছিল এক সাহসী উদ্যোগ- পাড়ায় পাড়ায় খেলাঘর গড়ে তোলার মধ্য দিয়ে শিশুদের আনন্দ, সাহিত্য চর্চা, শিক্ষা এবং সৃজনশীলতার সমন্বয়ে একটি সুন্দর ভবিষ্যৎ নির্মাণের স্বপ্ন। আজ ৭৪ বছর পর দাঁড়িয়ে আমরা গর্বের সাথে বলতে পারি, সেই স্বপ্ন অনেকাংশেই বাস্তবায়িত হয়েছে। এই দীর্ঘ যাত্রায় খেলাঘর পাড়া-মহল্লা, গ্রাম-গঞ্জে, শহর ও শহরতলীতে প্রায় ৫০০ শাখা আছে। আসরের স্বেচ্ছাসেবী, নিঃশর্ত ও নিবেদিত কর্মী-সংগঠকের নিবিড় পরিচর্যা অসংখ্য শিশু-কিশোরের মনে দেশপ্রেম, নৈতিকতা, সহমর্মিতা এবং সাংস্কৃতিক চেতনার বীজ বপন করেছে। খেলাধুলা, সাহিত্য চর্চা, সংগীত, নাটকসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের মাধ্যমে তারা শিশু কিশোরদের সুস্থ দেহ-মন ও সুস্থ বিকাশের পথ সুগম করেছে। বাল্যবিবাহ, মাদক ও সাম্প্রদায়িকতাকে ‘না’ বলতে শিখিয়েছে। নির্যাতন-নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে সরব থাকার জন্য বয়স ভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে। বিশেষ করে বর্তমান সময়ে, যখন প্রযুক্তিনির্ভর জীবন শিশুদের বাস্তব সামাজিক মেলবন্ধন থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে, তখন সময় উপযোগী কর্মসূচি খেলাঘরের মত সংগঠনের ভূমিকা আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা কেবল মাত্র জ্ঞান অর্জনের ক্ষেত্র নয়, এটি শিশু-কিশোরদের নৈতিক, সাংস্কৃতিক ও মানসিক বিকাশের ভিত্তি। চারুকলা ও সংগীত শিক্ষা সেই বিকাশে অন্যতম উপাদান। শিশু-কিশোরদেরকে সৌন্দর্যবোধ, মানবিকতা ও দেশপ্রেম জাগিয়ে তুলে। শিক্ষা গ্রহণের ক্ষেত্রে মনোসংযোগ আত্মনিয়ন্ত্রণ সম্বনিত চেতনা তৈরি করে। বিশ্বের অনেক দেশে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে এই শিক্ষাগুলো আবশ্যক শিক্ষা হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এই সংগঠনটি জাতীয় পর্যায়ে যেমন ভূমিকা রেখে চলেছে, তেমনি আন্তর্জাতিকভাবে আমাদের হাজার বছরের বাঙালি সংস্কৃতি তুলে ধরেছে স্পেনের বার্সেলোনায়, ভারতে, রাশিয়ার মস্কো, অরলিয়নক এবং দেশে অনুষ্ঠিত চীনের বসন্ত উৎসবে। খেলাঘর শিশু-কিশোরদের প্রতিভা যেভাবে দেশে-বিদেশে তুলে ধরছে তা সত্যি প্রশংসনীয়। বিশেষ করে প্রগতি ও অসাম্প্রদায়িকতার চেতনায় লালিত এই সংগঠনটি বৃহৎ পরিসরে কর্মপরিধি বাড়াতে পেরেছে তা একটি সুস্থ ও মানবিক জাতি গঠনে সহায়ক ভূমিকা রাখছে। তবে এই পথ চলা অনেকটাই চ্যালেঞ্জের ছিল। কিন্তু পরবর্তীতে সময়, সামাজিক কাঠামোর রূপান্তর এবং নতুন প্রজন্মের চাওয়া-পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গতি রেখে মিলিয়ে চলার প্রয়োজনীয়তা আজ খেলাঘরের সামনে নতুন করে প্রশ্ন তুলে ধরেছে। এই চ্যালেঞ্জগুলোকে সুযোগে রূপান্তর করেই খেলাঘরকে এগিয়ে যেতে হবে আরো আধুনিক আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং আরো প্রভাবশালী রূপে। কর্মপরিধি কেন্দ্র থেকে শাখা পর্যায়ে বিস্তৃত করতে হবে। আমরা জানি, আজকের শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ, জাতির কর্ণধার। আর সেই ভবিষ্যৎকে সুন্দর, মানবিক এবং সৃজনশীল করে তোলার ক্ষেত্রে খেলাঘরের ভূমিকা অপরিসীম। এই সংগঠনের জ্যেষ্ঠ সংগঠকগণ আমাদের শিখিয়েছেন একসাথে চলতে, মানুষকে ভালবাসতে, এবং দেশকে নিজের হৃদয়ের ধারণ করতে। একটি প্রগতিমুখি মানবজাতি গঠনে ঐক্যবদ্ধ খেলাঘর গড়ে তোলা এখন সময়ের দাবি। এই ৭৪ বছরের পথচলায় খেলাঘরের কর্মীরা সর্বোচ্চ অবদানের স্বাক্ষর রেখেছে ১৯৭১ এর মহান মুক্তিযুদ্ধে। শহীদ আজাদ, শহীদুল্লাহ সাউদ, শান্তনুরা জীবন উৎসর্গ করে দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে ইতিহাস তৈরি করে গেছেন। তাদের রক্তমাখা স্বাধীনতার পতাকা নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে খেলাঘর। প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর এই শুভক্ষণে শ্রদ্ধা ও সম্মানের সঙ্গে স্মরণ করছি সেই বীর-কিশোর শহীদদের। স্বাধীনতা উত্তর রক্ত ভেজা এই মাটির উপর দাঁড়িয়ে শপথ ছিল লাখো শহীদের স্বপ্ন, মানবিক ও একটি অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ আমরা শিশুদের উপহার দিবো। সময় এবং বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সংগঠনের সর্বস্তরের কর্মী ও সংগঠকদের অনুধাবন করা উচিত ভিন্ন ভিন্ন সত্তার পরিসমাপ্তি করে, লক্ষ্য অভিমুখি যাত্রা শুরু করা। ৭৪ বছরের পথচলায় যারা তাদের শ্রম মেধা সময় ও ভালোবাসা দিয়ে খেলাঘরকে সমৃদ্ধ করেছেন তাদের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা। একই সাথে সারাদেশে খেলাঘরের অসংখ্য ভাই-বোন, কর্মী, সংগঠক, অভিভাবক ও শুভানুধ্যায়ীদের জানাই অফুরন্ত ভালবাসা মিশ্রিত শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন। ৭৪তম প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী আমাদের জন্য শুধু উদযাপনের উপলক্ষ্যই নয়, এটি আত্মসমালোচনা ও নতুন করে অঙ্গীকারেরও সময়। ভবিষ্যতে এই সংগঠন জাতীয় মুক্তির সংগ্রামের আলোকে অসাম্প্রদায়িক, বিজ্ঞানমনস্ক মানবিক বোধসম্পন্ন নাগরিক গড়ে তোলার লক্ষ্যকে অটুট রেখে শিশুদের জন্য একটি নিরাপদ, সৃজনশীল ও মানবিক পরিবেশ নিশ্চিত করবে, এটাই প্রত্যাশা। শিশুরাই জাতির ভবিষ্যৎ- এই চিরন্তন সত্যকে ধারণ করে খেলাঘর আন্দোলন এগিয়ে যাক আরো বহু বছর, আরো বহু প্রজন্মের স্বপ্নের আলোকবর্তিকা হয়ে। লেখক : সাধারণ সম্পাদক, কেন্দ্রীয় খেলাঘর আসর