শ্রমিক শ্রেণির জয় অনিবার্য

Posted: 03 মে, 2026

মে দিবসের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, তার অধিকার আদায়ের প্রশ্ন। তাই মে দিবস আর শ্রমিক শ্রেণি একে অপরের পরিপূরক। প্রতিদিন তপ্ত রোদে কিংবা কল-কারখানায় খেটে মরেন শ্রমিকেরা। অথচ সেই শ্রমিকরাই তার হাড়ভাঙা শ্রমের সঠিক মজুরি পান না। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি আদায়ের দিন ‘মে দিবস’। দিবসটি বিশ্বের শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি মানুষের অধিকার আদায় আর আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার দিন। শ্রমিকদের রক্তঝরা এক আন্দোলনের মধ্য দিয়ে সূচিত হয় মে দিবসের ইতিহাস। ১৮৮৬ সালে আমেরিকার শ্রমিকেরা ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ইতিহাস বদলে দিয়েছিল। ৮ ঘণ্টা কাজের আন্দোলনের সূচনা হয় ১৮৬৬ সালের আগস্ট মাসে। সেসময় আমেরিকার ৬০টি ট্রেড ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা দেশটির বালটিমোরে মিলিত হয়ে গঠন করেন ‘ন্যাশনাল লেবার ইউনিয়ন’। এই ইউনিয়ন পুঁজিবাদী দাসত্ব থেকে শ্রমিকশ্রেণির মুক্তির লড়াইয়ের ডাক দেয়। এ আন্দোলনের মূল স্লোগান ও দাবি ছিল ৮ ঘণ্টা কাজ, ৮ ঘণ্টা বিশ্রাম এবং ৮ ঘণ্টা আনন্দ ও সংগ্রাম’। এই ‘৮ ঘণ্টার আন্দোলন’ আমেরিকায় ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। এই আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় ১৮৮৬ সালের ১ মে আমেরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের শ্রমিকেরা ন্যায্য মজুরি আর দৈনিক ৮ ঘণ্টা কাজের দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করে। ধর্মঘটের একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদের মিছিলে পুলিশবাহিনী এলোপাতাড়ি গুলি চালায়। এতে অনেক শ্রমিক নিহত ও আহত হন। ক্রমশ শ্রমিকদের বিক্ষোভ সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে। একপর্যায়ে আন্দোলনরত শ্রমিকদের দাবি মেনে নিতে বাধ্য হয় সরকার। এরপর ১৮৮৯ সালে ‘ফরাসি বিপ্লবে’র শতবার্ষিকীতে ফ্রান্সের রাজধানী প্যারিসে বিশ্বের ৪৬৭ জন শ্রমিক প্রতিনিধি সমবেত হন। সেখানে এঙ্গেলস-এর নেতৃত্বে গঠিত হয় ‘দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক’। এই সম্মেলনকেই প্রথম কংগ্রেস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই কংগ্রেসে আমেরিকার শ্রমিকশ্রেণির ৮ ঘণ্টার লড়াইকে স্বীকৃতি দিয়ে প্রতিবছর ১ মে ‘আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস’ হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। এরপর থেকে বিভিন্ন দেশের কমিউনিস্ট-বামপন্থি শ্রমিক সংগঠন মে দিবস পালন করে আসছে। অর্থাৎ আমেরিকার শিকাগো শহর থেকে মে দিবস বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। সারা পৃথিবীর শ্রমজীবী মানুষ শ্রমদাসত্ব থেকে মুক্তির স্বপ্ন নিয়ে মে দিবস পালন করে। এখন ২০২৬ সাল, বাংলাদেশের শ্রমিকশ্রেণির দিকে ফিরে তাকালে দেখা যাবে, ১৪০ বছর পরেও শ্রমিকদের অবস্থার তেমন কোনো উন্নতি হয়নি। শ্রমিকদের এখনো নিম্নতম মজুরিতে কাজ করতে হয়, তারমধ্যে আবার সঠিক সময়ে বেতন, বোনাস পায় না, অসহনীয় পরিবেশে কাজ করতে হয়। অন্যদিকে প্রতিবছর আগুনে পুড়ে, ভবন ধসে মারা যায় অনেক শ্রমিক। শ্রমিকের জীবন সস্তা বলে, এসব মৃত্যুর মূল কারণ জনসম্মুখে আসে না। শুধুমাত্র বেঁচে থাকার জন্য, পেটে দু’মুঠো খাবারের আশায় শ্রমিকেরা মুখবুজে দিনের পর দিন সব কষ্ট সহ্য করে। তাই মে দিবস রাষ্ট্রীয় মর্যাদা পেলেও, যাদের রক্তে রাঙানো ইতিহাস, সেই শ্রমিকশ্রেণি ও মেহনতি মানুষেরা এখনও বেঁচে থাকার সঠিক মর্যাদা আর অধিকার অর্জন করেনি। তাই বছরের পর বছর মে দিবস শ্রমিকদের মুক্তির বার্তা নিয়ে আসলেও অধিকাংশ শ্রমিক সেই মুক্তির স্বাদ গ্রহণ করতে পারেনি। আবার এমন অনেক শ্রমিক আছেন, যারা জানেন না, মে দিবস কী? কেন মে দিবস পালন করা হয়? বুর্জোয়া শাসকগোষ্ঠী শ্রমিকদের কাছ থেকে মে দিবসের তাৎপর্য আড়াল করে রাখে। যাতে করে শ্রমিকশ্রেণি প্রতিবাদী চরিত্র ধারণ করতে না পারে। মে দিবসের লড়াই মানে শুধু ৮ ঘণ্টা শ্রমের দাবির আন্দোলন নয়। এ লড়াইয়ের মূলকথা শ্রমিকের ওপর মালিকপক্ষের শোষণের অবসান ঘটিয়ে শোষণমুক্ত সমাজ গড়ে তোলা। মে দিবস মুক্তির সংগ্রামের দিন, অধিকার আদায়ের, নতুন করে শপথ গ্রহণের দিন।