ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা নেয়ার দাবি
Posted: 03 মে, 2026
একতা প্রতিবেদক :
টানা বৃষ্টির পানিতে বিস্তীর্ণ হাওর অঞ্চলের নিম্নাঞ্চলের পাকা বোরো ধান তলিয়ে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের রক্ষায় দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছে কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ।
পরিষদের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ কৃষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ জহির চন্দনের সভাপতিত্বে এক সভায় নেতৃবৃন্দ বলেন- গত কয়েকদিনের বৃষ্টিতে হাওরাঞ্চলের লক্ষ লক্ষ একর জমির পাকা ধান তলিয়ে গেছে। এখনও হাওরের ৫০ ভাগ ধান কাটা হয়নি। এই বিপুল পরিমাণ ধান ডুবে নষ্ট হলে কৃষকের সর্বনাশ হবে, গোটা দেশ খাদ্য নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে পড়বে। আগাম বৃষ্টির কারণে ধান কাটার জন্য হারভেস্টর মেশিন ব্যবহার করা যাচ্ছে না, অপরদিকে শ্রমিক সংকট এবং বজ্রপাতের ভয়ে ধান কাটায় বিঘ্ন ঘটেছে। সারা বছরের একমাত্র ফসল হারিয়ে কৃষকরা দিশেহারা।
এ সময় বৃষ্টিপাতে বন্যার আশঙ্কার কথা আবহাওয়া দপ্তর পূর্বেই জানিয়েছে। সরকার যদি তা আমলে নিয়ে পূর্ব প্রস্তুতি নিয়ে কৃষকের পাশে দাঁড়াতো তাহলে এত ক্ষয়ক্ষতি হতো না। এখনও দ্রুততার সাথে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সরকারি উদ্যোগে শ্রমিক নিয়ে এসে, সরকারি বিভিন্ন বাহিনী ও প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করে ধান কাটার উদ্যোগ নিলে ক্ষয়ক্ষতি কমানো সম্ভব। বোরো ধান হাওরের একমাত্র ফসল। এই ফসল ঘরে তুলতে না পারলে কৃষক সারা বছর খাদ্য সংকটে ভুগবে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সারা বছর তাদেরকে খাদ্য সহায়তা দিতে হবে।
নেতৃবৃন্দ আরও বলেন, ইতিমধ্যে হাওরে যতটুকু ধান কাটা হয়েছে কৃষক তা মাত্র ৬০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। যদিও তাদের উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রতি মণ ১১০০-১২০০ টাকা। কৃষকের বিপদে আড়তদার, মধ্যস্বত্ত্বভোগীরা বেপরোয়া হয়ে কৃষককে ঠকাচ্ছে। সরকার এখানেও কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করছে না। অবিলম্বে সরকারিভাবে হাওর অঞ্চলের ধান প্রতিমণ অন্তত ১৭০০ টাকা করে ক্রয়ের বিশেষ উদ্যোগ নিতে হবে।
দেশের মোট বোরোধানের ২০-৩০ শতাংশ উৎপাদিত হয় হাওরে। অথচ বিপুল খাদ্যভাণ্ডার রক্ষায় বিশেষ কোনো উদ্যোগ পরিলক্ষিত হয় না। আকস্মিক বন্যা থেকে ফসল রক্ষায় কোটি কোটি টাকা খরচ করে হাওরে প্রতিবছর বাঁধ নির্মাণ করা হয়। এ সকল বাঁধের বেশিরভাগ অপরিকল্পিত, দুর্নীতি-লুটপাটে ভরা, সময়মত কাজ শেষ না হওয়ায় দুর্ভোগ আরও বাড়ে। বাঁধের মাটি ধুয়ে নদীতে পড়ে নদীগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। হাওরে উন্নয়নের নামে অপরিকল্পিত নানা রাস্তা, অবকাঠামো নির্মাণের ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই বন্যা হচ্ছে। দুর্নীতি লুটপাটের হাওর বিনাশী এ সকল কাজের সাথে জড়িতদের বিচারের আওতায় আনা হোক। একইসাথে হাওরের ফসল, কৃষি, কৃষক, পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় স্থানীয় কৃষক, জেলেদের যুক্ত করে বিজ্ঞানসম্মত টেকসই পরিকল্পনা গ্রহণ করা হোক।
নেতৃবৃন্দ হাওরের পাশাপাশি গত কয়েকদিনের ঝড় বৃষ্টিতে সারাদেশে ধান, ভুট্টা ও অন্যান্য ফসলের ক্ষতিগ্রস্ত চাষীদের সহায়তা দিতে সরকারের প্রতি আহবান জানান।
সভায় আলোচনা করেন বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক ফ্রন্টের সভাপতি বজলুর রশিদ ফিরোজ, জাতীয় কৃষক ক্ষেতমজুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেন নান্নু, সমাজতান্ত্রিক ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের সভাপতি তরিকুল ইসলাম, সাধারণ সম্পাদক মনজুর আলম মিঠু, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর ও কৃষক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক অজিত দাস, বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির সাধারণ সম্পাদক অর্ণব সরকার, কৃষক সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবিদ হোসেন, সহসাধারণ সম্পাদক সুকান্ত শফি চৌধুরী, নির্বাহী কমিটির সদস্য রাগিব আহসান মুন্না। সভায় বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতির কার্যকরী সভপতি অ্যাড. আনোয়ার হোসেন রেজাকে নতুন সমন্বয়ক নির্বাচিত করা হয়।
কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদের দাবিসমূহ
১. সরকারি উদ্যোগে হাওরের বাকি ধান কাটার জন্য শ্রমিক, বিভিন্ন বাহিনীর সদস্য এবং নৌকাসহ প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহ করতে হবে।
২. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা করে সারাবছর খাদ্য সহায়তা দিতে হবে।
৩. ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের ব্যাংক, এনজিও, সমিতি, মহাজনী সকল ঋণ মওকুফ করতে হবে।
৪. হাওরের কৃষকদের কাছ থেকে সরকারিভাবে ১৭০০ টাকা মণ দরে ধান কিনতে হবে। হাটে হাটে কৃষক ঠকানো মুনাফাখোর মধ্যস্বত্ত্বভোগী, আড়তদারদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
৫. ঝড়বৃষ্টিতে সারাদেশে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের মূল্য ও উপকরণ সহায়তা দিতে হবে।
৬. হাওরের ইজারা প্রথা বাতিল করে কৃষক ও মৎস্যজীবীদের মাছ ধরার অধিকার দিতে হবে।
এসব দাবিতে ২ মে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে এবং ৭ মে হাওরাঞ্চলের জেলাসমূহে (সুনামগঞ্জ, নেত্রকোনা, মৌলভীবাজার, সিলেট, হবিগঞ্জ, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, কিশোরগঞ্জ) জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে বিক্ষোভ সমাবেশ, মিছিলের কর্মসূচি দিয়েছে কৃষক-ক্ষেতমজুর সংগ্রাম পরিষদ।