বাণিজ্য চুক্তি বাতিল করতে সরকারকে বাধ্য করতে হবে

Posted: 03 মে, 2026

একতা প্রতিবেদক : দেশের ১৩টি বাম-গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের সমন্বয়ে গঠিত সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট গত ২৭ এপ্রিল যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বাতিলের দাবিতে জাতীয় সংসদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করে। সেখানে গিয়ে তারা স্পিকারের সাথে সাক্ষাৎ করে এবং স্মারকলিপি দেয়। সেইসাথে সংসদ সদস্যদেরকে খোলা চিঠি দেয়। স্পিকারকে দেওয়া স্মারকলিপিতে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার কর্তৃক ৯ ফেব্রুয়ারি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত ‘অ্যাগ্রিমেন্ট অন রেসিপ্রোকাল ট্রেড (এআরটি)’ নামক বাণিজ্যচুক্তিকে অসম ও অন্যায্য এবং বাংলাদেশের জন্য অধীনতামূলক বলে আখ্যা দেয় সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট। স্মারকলিপিতে বলা হয়, চুক্তিটি বাস্তবায়িত হলে বাংলাদেশ শুধু অর্থনেতিকভাবেই ক্ষতিগ্রস্ত হবে না, এতে নিরাপত্তা, জাতীয় স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্বও ক্ষুণ্ন হবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী প্রয়োজন থাকুক বা না থাকুক প্রতিযোগিতামূলক আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে বেশি দামে বাংলাদেশকে যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে হবে। এর ফলে বাংলাদেশের কৃষি ও শিল্পখাত মারাত্মক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। বিভিন্ন সেক্টরে কর্মরত অনেক মানুষ বেকার হয়ে যাবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী বিনা-দরপত্রে মার্কিন কোম্পানি বোয়িং-এর কাছ থেকে উড়োজাহাজ কিনতে হবে। কিনতে হবে সামরিক সরঞ্জাম। বাংলাদেশের বাজারে যুক্তরাষ্ট্র ৬ হাজার ৭১০টি পণ্যে শুল্ক-সুবিধা পাবে। এর ফলে বাংলাদেশ বছরে ১ হাজার ৩২৭ কোটি টাকার রাজস্ব হারাবে। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যস্বার্থ ক্ষুণ্ন হয় এরকম কোনো দেশের সাথে অর্থাৎ চীন, রাশিয়া ইত্যাদি দেশের সাথে বাংলাদেশ কোনো বাণিজ্যচুক্তি করতে পারবে না। এ শর্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের উপর সরাসরি হস্তক্ষেপের শামিল। স্মারকলিপিতে উল্লেখ করা হয়, সংবিধানের ১৪৫(ক) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী বিদেশি রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পাদিত সব চুক্তি সংসদে উত্থাপন করা আবশ্যক। সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট সংবিধানের উপরোক্ত ধারা বলে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি সংসদে উত্থাপন করার এবং তা বাতিলের দাবি জানায়। জাতীয় সংসদের স্পিকার বরাবর এ আবেদন জানানোর পাশাপাশি সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট সংসদ সদস্যদের কাছে খোলা চিঠি দিয়ে জাতীয় সংসদে বাণিজ্যচুক্তিটি আলোচনার জন্য উত্থাপন করার আহ্বান জানায়। কিন্তু সরকার ও বিরোধীদলের কোনো সংসদ সদস্য বিষয়টি উত্থাপন করেননি। স্বতন্ত্র সংসদ সদস্য রুমিন ফারহানা পয়েন্ট অব অর্ডারে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত বাণিজ্যচুক্তি বিষয়ে সংসদে আলোচনা উত্থাপন করার চেষ্টা করলে বিধির কথা বলে তাকে তা উত্থাপন করতে দেয়া হয়নি। বাংলাদেশের পক্ষে চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের তৎকালীন নিরাপত্তা উপদেষ্টা বর্তমানে বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান সাহেব বলেছেন, চুক্তি স্বাক্ষরে বিএনপি ও জামাতের সম্মতি নেয়া হয়েছিল। সংসদে চুক্তি নিয়ে উভয় দলের সীমাহীন নিরবতাই প্রমাণ করে অধ্যাপক ইউনূস, তারেক রহমান ও শফিকুর রহমান তিনজনের যোগসাজশেই যুক্তরাষ্ট্রের সাথে অসম অধীনতামূলক এই বাণিজ্যচুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি সরকার চুক্তি বাতিলের পরিবর্তে সকল শর্ত মেনে নিয়ে চুক্তি বাস্তবায়ন শুরু করে দিয়েছে। চুক্তির শর্তে থাকা যুক্তরাষ্ট্রের উড়োজাহাজ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চূড়ান্ত চুক্তি সই করার মধ্য দিয়ে সরকার জনগণের আপত্তিকে অগ্রাহ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পাদিত চুক্তি কার্যকর করেছে। ৩০ এপ্রিল ঢাকায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও বোয়িংয়ের মধ্যে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এসব উড়োজাহাজ কিনতে খরচ পড়বে ৩৭০ কোটি ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা। বিএনপি সরকার যে চুক্তি বাতিল করবে না তার ঘোষণা গত ২১ এপ্রিল দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রীর পলিসি অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজি বিষয়ক উপদেষ্টা জাহেদ-উর রহমান। সরকার অবশেষে সে পথেই হাঁটলো। তারা অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের স্বাক্ষরিত চুক্তিকে নিজেদের পবিত্র কর্তব্য হিসেবেই গ্রহণ করেছে। চুক্তি স্বাক্ষরকারী অন্তর্বর্তীকালীন সরকার একটি অনির্বাচিত সরকার। তার এ ধরনের আন্তর্জাতিক চুক্তি করার কোনো এখতিয়ার নাই। তাছাড়া মার্কিন ফেডারেল কোর্ট পাল্টা শুল্ক আরোপ করা অসাংবিধানিক ঘোষণা করেছে, যার সূত্র ধরে মালয়েশিয়া চুক্তি বাতিল করেছে; ভারত স্থগিত করেছে। বিএনপি সরকারে এসেছে ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ স্লোগান দিয়ে সুতরাং যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ নয় বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা তাদের কাজ। ইতোমধ্যে তারা চুক্তি অনুয়ায়ী উড়োজাহাজ ক্রয় করলেও চুক্তি থেকে বেরিয়ে যাওয়ার সুযোগ এখনো রয়েছে। চুক্তির ধারা অনুযায়ী ৬০ দিনের লিখিত নোটিশ প্রদান করে যে কোনো সময় এ চুক্তি থেকে বাংলাদেশে বেরিয়ে যেতে পারবে। দেশের মানুষের প্রত্যাশা নির্বাচিত বিএনপি সরকার এই বাণিজ্য চুক্তি বাতিলে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করবে এবং দেশের অর্থনীতি, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে অগ্রাধিকার প্রদান করবে। অপরদিকে সাম্রাজ্যবাদ ও যুদ্ধবিরোধী জোট চুক্তি বাতিলে সরকারকে বাধ্য করতে দেশব্যাপী সভা-সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সরকার চুক্তি বাতিল না করলে দেশ বাঁচানোর জন্য সরকারকে চুক্তি বাতিলে বাধ্য করতে রাজপথে নেমে আসতে দেশবাসীকে আহ্বান জানিয়েছে। জনগণের শক্তির কাছে গণবিরোধী কোনো শক্তি টিকে থাকতে পারে না ইতিহাস তাই স্বাক্ষী দেয়।