জনপ্রতিরোধই এই চুক্তি আটকে দিতে পারে

Posted: 26 এপ্রিল, 2026

(যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে গত ৯ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তীকালীন ইউনূস সরকারের আমলে বহুবিতর্কিত বাণিজ্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই স্বার্থবিরোধী চুক্তি দেশের অর্থনীতি, কৃষি-শিল্প, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ও ঝুঁকিতে ফেলবে। চুক্তির বিভিন্ন ধারা, প্রভাব ও চুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে অর্থনীতিবিদ এম এম আকাশের সঙ্গে কথা বলেছেন ধ্রুব দাশ।) ধ্রুব দাশ: বাণিজ্যিক চুক্তিতে আমরা কি পেলাম কম, হারালাম বেশি? এম এম আকাশ: বাণিজ্যিক চুক্তিতে আমরা পেলাম কম, হারালাম বেশি। পেলাম কম কী অর্থে? আপাতদৃষ্টিতে মনে হতে পারে আমেরিকাতে আমাদের গার্মেন্টস সেক্টরের মার্কেটেড আউটপুট এর বাজার ওরা রক্ষা করলো, কিন্তু সেটা ট্যারিফ কমিয়ে রক্ষা করলো তা না; শেষ পর্যন্ত ১৫% যোগ ১৯% ট্যারিফ আমাদের দিতেই হবে। তার মানে খুব যে সুবিধাজনক প্রেফারেনশিয়াল অ্যাক্সেস দিলো তা কিন্তু নয়। সুতরাং জাস্ট আমাদের বিক্রি সম্ভব এইটুক হয়তো হলো। কিন্তু আমরা হারালাম যেটা, সেটা হলো এই বিক্রির জন্য আমরা আমাদের ১৮ কোটি মানুষের মার্কেট পুরো ওদের হাতে ফ্রি ছেড়ে দিলাম। ওদের ডেফিসিট ওরা কমাবে অনেক বেশি। এবং শুল্কের হিসাবে ওদের রপ্তানি থেকে আমরা যে শুল্ক আয় করব, ওরা আমাদের রপ্তানি থেকে তার চেয়ে অনেক বেশি শুল্ক আদায় করবে। তার মানে নেট সেন্সে আমরা ওর কাছ থেকে যা পাবো, তার চেয়ে বেশি দিলাম। তার মানে আমরা একার্থে আমেরিকাকে অর্থ ও সুবিধা দিলাম বেশি পেলাম কম। ওদের জন্য- ওদের ঘাটতি মেটানোর জন্য অনেকটা চাপ দিয়ে ব্ল্যাকমেইল করে ওরা বাড়তি সুবিধা নতজানু সরকারের কাছ থেকে আদায় করে নিলো। আরেকটা ব্যাপার ওরা আমাদের বাধ্য করলো যে, আমরা আমাদের ফ্রি স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড যেটা করতাম যেমন ধরুন–আমাদের তেল দরকার, আমরা যেখানে সবচেয়ে কম দাম পাবো সেখান থেকে কিনবো- এটা ওরা আটকে দিলো। চায়না, রাশিয়া এদের থেকে আনতে হলে ওদের অনুমোদন নিতে হবে। আরেকটা যেটা করলো- অসমতা, সেটা হলো ওদের পণ্য যখন আমাদের ভেতরে ঢুকবে তখন আমরা ওটার কোয়ালিটি চেকআপ করতে পারবো না। কিন্তু আমাদের পণ্য যখন ওদের ওখানে ঢুকবে তখন ওরা কিন্তু কোয়ালিটির নামে নন-ট্যারিফ ব্যারিয়ার দিয়ে ওটাকে আবার আটকে দিতে পারে। সুতরাং চুক্তির সবগুলো দিক যদি আমরা একত্রিতভাবে দেখি, তাহলে আমরা অনেক বেশি হারালাম, অনেক কম পেলাম। ধ্রুব দাশ: ইন্টেরিম গভর্নমেন্টের সময়ে করা এই চুক্তির ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক বিষয়ের থেকে রাজনৈতিক বিষয় বেশি প্রাধান্য পেয়েছে কি? আপনার কি মনে হয়? এম এম আকাশ: হ্যাঁ, এই চুক্তিটা শুরুই হয়েছির চীনের বিরুদ্ধে ট্যারিফ যুদ্ধের ঘোষণার মাধ্যমে, ভূ-রাজনৈতিক কারণে। আমেরিকা প্রথম থেকে চাচ্ছে বাংলাদেশ যেন চীন, ভারত, রাশিয়া, সম্মিলিত ব্রিকস- এই পরিমণ্ডলে চলে না যায়। সেটার জন্য এমন চুক্তি তাকে করতে হবে যেন আমরা আমেরিকার ওপর আরও নির্ভরশীল হই। আমেরিকা থেকেই সয়াবিন কিনতে হবে, আমেরিকা থেকে গম কিনতে হবে, আমেরিকা থেকে বোয়িং কিনতে হবে- বেশি দাম হলেও কিনতে হবে! এই ধরনের বিদেশ চুক্তি তখনই একটা দেশ করে যখন সে রাজনৈতিকভাবেও সেই দেশের বশ্যতা মেনে নেয়। এবং ওই দেশের যে স্ট্র্যাটেজিক ডিজাইন তার সঙ্গে সে তাল দিতে রাজি হয়, যে মাল্টিল্যাটারাল ফ্রি ট্রেড বা স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড আমরা স্বাধীনভাবে করতাম এখন আর তা হবে না, আমার গ্রুপের লোক আমার অধীনে থেকে ট্রেড করবে- সেইরকম একটা বশ্যতা চাপিয়ে দেওয়ার একটা চুক্তি। টাইমিংটা এখানে খুব ইমপর্টেন্ট, এই চুক্তিটা গণতান্ত্রিক সরকার থাকলে এত সহজ হতো না; আমার ধারণা সেটা হাসিনা সরকারই থাকুক আর বিএনপি সরকারই থাকুক–এত সহজে তা হবে না বা হতো না। গণতান্ত্রিক সরকার থাকলেও এটা হওয়া কঠিন, যদি না আমেরিকা এবং ইন্ডিয়া একত্রিত হয়ে বাংলাদেশের ওপর ভূরাজনৈতিক চাপ দিতে শুরু করে। এক্ষেত্রে কিন্তু একটা তফাত লক্ষ্যণীয়, দেখেন, ইন্ডিয়া কিন্তু আমেরিকার সব চুক্তি পুরোপুরি মানেনি। রাশিয়া থেকে ঠিকই তেল আনছে এবং ট্রাম্প কিন্তু ইন্ডিয়ার সঙ্গে একটা বারগেইন করতে গিয়ে পিছিয়ে আসতে বাধ্য হয়েছে, কিন্তু বাংলাদেশকে সেই বারগেইনিং করার সুযোগ দেওয়া হয়নি এবং অন্তর্বর্তীকালীন সরকারও সেরকম শক্ত অবস্থান নেয় নি। বাংলাদেশকে চিঠি লিখতে হয়েছে আমেরিকার কাছে, অনুমতি চাইতে হয়েছে। ট্রাম্পের ফিলোসফি হচ্ছে ব্ল্যাকমেইল বা থ্রেট- যদি মেনে নেয় তাহলে আরও চাপো, আরও বিচ্ছিন্ন করো এবং আল্টিমেটলি চায়নাকে পরাজিত করো। এইটা হচ্ছে তার খেলার মেইন কৌশল বা লক্ষ্য। সেই কারণে সে একদিক দিয়ে চাপ দিয়ে না পারলে আরেক দিক দিয়ে চাপ দেবে, আবার একটু ব্যাক করবে, আবার একটু খেলবে; কিন্তু তার মূল লক্ষ্য থেকে সে বিরত হবে না। কিন্তু বাংলাদেশের যে ইকোনমি এখনো আছে, তার যে রাইজিং চান্স, সেটা হলো ইস্ট এশিয়ান মডেলে। সেই পথেই তাকে চীন, ভিয়েতনাম বা মালয়েশিয়া এদের কাছ থেকে শিক্ষা নিয়ে জাতীয় স্বার্থে সর্বোচ্চ দর কষাকষি করে পরিচালিত হতে হবে। ইস্ট এশিয়ান মডেলে যদি এগোতে চায় তাহলে তাকে ম্যানুফ্যাকচারিং ইন্ডাস্ট্রি তৈরি করতে হবে। ভূমি সংস্কার করতে হবে, কর্মমুখী শিক্ষা, বৈষম্য নিয়ন্ত্রণ ও ধনী হাউজগুলিকে সুশাসনের অধীনে আনতে হবে। কিন্তু আগে আমেরিকা ভূরাজনৈতিক কারণে এসব সুযোগ সাউথ কেরিয়া, চীন ও ভিয়েতনামকে দিলেও এখন আমেরিকা চাচ্ছে এমনকি উদীয়মান দেশগুলির থেকে সব ক্যাপিটাল ও ব্রেইন তার দেশে নিয়ে গিয়ে তার দেশে যে ডি-ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজেশন হয়েছে সেটাকে আবার ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজ করে তার লোকদের চাকরি দিতে। কিন্তু বাংলাদেশ তো ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজ ও বহুমুখীন হলে ওই মার্কেটগুলো আর আমেরিকা পাবে না। এবং বাংলাদেশ যদি কম দামে করে তাহলে আরও পাবে না, চীন যদি আরও কম দামে করে তাহলেও আরও পাবে না। আজ দেখা যাচ্ছে আমেরিকা তার কম্পিটিটিভনেস হারিয়েছে। তার ইকোনমিক কম্পিটিটিভনেস নাই, তার যে লেবার কস্ট, তার যে হাই-টেক কস্ট, এবং সেগুলো কন্টিনিউ করার জন্য তার যে রিসোর্স দরকার, সেটাও বাইরে থেকে তাকে কিনতে হচ্ছে- ইন্ডিয়া থেকে নিতে হচ্ছে, চায়না থেকে নিতে হচ্ছে। মানে ইন দ্য ফাইনাল ফেজ অফ জিওপলিটিক্স, আমেরিকা রিষষ নব গোয়িং ডাউন, চায়না রিষষ নব রাইজিং আপ; এবং এই সিচুয়েশনে আমেরিকা মরিয়া হয়ে দুর্বল দেশগুলোর ওপর অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে অতিরিক্ত সুবিধা নিতে চাচ্ছে। এবং আমরা একমাত্র তখনই এটাকে ঠেকাতে পারবো যখন আমরা রিয়্যালাইনমেন্ট করবো। আমরা যদি খালি বলি যে আমরা আমেরিকার কথা শুনলাম না, কিন্তু আমরা বিকল্প যদি না খুঁজি- তখন আমার এই যে গার্মেন্টস সেক্টরের গার্মেন্টস রপ্তানি হতো এটা কমে যাবে। তখন আমাকে আমার গার্মেন্টসের অন্য মার্কেট খুঁজে বের করতে হবে। আমাকে একই সঙ্গে আমেরিকার সঙ্গে ফাইটে যেতে হবে আর চায়না, ইন্ডিয়া, ব্রাজিল, রাশিয়ার সঙ্গে ফ্রেন্ডশিপে যেতে হবে। আমাদের এই মুহূর্তে এমন একটা স্মার্ট গভর্মেন্ট লাগবে যে আমেরিকার সঙ্গে এই খেলায় স্ট্রংলি বারগেইন করবে, ন্যাশনালিস্ট ইন্টারেস্ট মেইনটেইন করে বারগেইন করবে। ধ্রুব দাশ: বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটার বাধ্যবাধকতা দেওয়া হয়েছে চুক্তিতে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ওপর শুল্ক ছাড়ে কমবে রাজস্ব। সব মিলিয়ে তাহলে চুক্তিটি আসলে কতটা বাস্তবসম্মত? এম এম আকাশ: একদমই বাস্তবসম্মত নয়। আমরা যদি একটা ইন্ডিপেন্ডেন্ট ন্যাশনাল ইকোনমি হতাম বা এখনো যদি সরকার সে মনোবাসনা সত্যিই রাখে ও তা দাঁড় করাতে চায়, সিম্পলি আমরা যদি ইন্ডাস্ট্রিয়ালাইজ করতে চাই- যদি আমরা আমাদের ওয়ার্কফোর্সটাকে ইউজ করতে চাই, তাহলে তো আমরা ওদের পরামর্শ মতো ওদের পছন্দনীয় হাই-টেক, ওদের ইনভেস্টমেন্ট, ওদের শর্তে করতে পারবো না। আমাদের সঙ্গে যাদের মিলে, যাদের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক পরস্পর পরিপূরক–যারা আমাদের কাছ থেকে প্রচুর কেনে এবং আমাদের প্রচুর বিক্রি করে, এবং যেই বিক্রিটা দামে সস্তা, তাদের সঙ্গে আমাদের ব্যবসা করতে হবে। তাছাড়া আমরা জানি যে, আমাদের ৫০% এখন ওপেন ইকোনমি। সমগ্র অর্থনীতির ৫০% যদি আমরা আমাদের ন্যাশনাল ইন্টারেস্টে করতে না পারি, আমেরিকান গাইডেড ইন্টারেস্টে করতে বাধ্য হই, তাহলে আমরা তো আস্তে আস্তে আরো ডেফিসিট হবো এবং আমেরিকা তার ডেফিসিট কমাবে। এখন চিন্তা করুন, বাংলাদেশ ইজ অ্যা সারপ্লাস এগেইনস্ট আমেরিকা। কিন্তু যখন আদি কলোনিয়াল পিরিয়ড ছিল, তখন ইম্পেরিয়ালিজম ওয়াজ সারপ্লাস এগেইনস্ট কলোনি। এখনটা পুরো উল্টে গেছে। আমরা তখন বলতাম যে, ‘মায়ের দেওয়া মোটা কাপড় মাথায় তুলে নে রে ভাই’, আমরা ট্যারিফ ইম্পোজ করতাম, আমরা দেশি শিল্প রক্ষা করতাম, আমাদের ইন্ডাস্ট্রি ডেভেলপ করতাম। এখন অবশ্য অদৃষ্টের পরিহাসে আমেরিকা রক্ষা করতে চায় ওর ইন্ডাস্ট্রি, সেই জন্য আমার সস্তা কম্পিটিটিভ জিনিস ও নেবে না। এটার ওপর ট্যারিফ বসাবে। আর আমাকে যদি ট্যারিফ সুবিধা দেয়, তাহলে বলবে যে, ওর জন্য বাজার সুবিধা অনেক বেশি দিতে হবে। ধ্রুব দাশ: বিষয়টা কি ইন্টারেস্টিং হলো না? যে আমেরিকা সবসময় মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বলে, ফ্রি ট্রেডের কথা বলে, এটা কি মুক্তবাজার অর্থনীতির বিরোধী হয়ে গেল না? এম এম আকাশ: এটা অবশ্যই একটা শিফট। ডব্লিউটিও (ডঞঙ) থেকে শিফট, মুক্তবাজার অর্থনীতি থেকে শিফট এবং এটা সেলফ-কন্ট্রাডিক্টরি। ট্রাম্পের যে নিওলিবারেলিজম সে নিওলিবারেলিজম তো এসেছে এভরিথিং ফর মার্কেট এর নামে। কিন্তু মজা হলো যে, এভরিথিং মার্কেটে দিলে মার্কেটের যে রুল অফ কম্পিটিশন, তাতে আমেরিকা আজ হেরে যাচ্ছে। তাদের আবার আসলে দুটো ইন্টারেস্ট- একটা হলো এভরিথিং ফর দ্য মার্কেট, কিন্তু আরেকটা হলো আমেরিকা ফার্স্ট, ম্যাক্সিমাম প্রফিটটা হতে হবে আমেরিকার। কিন্তু চীনের প্রতিযোগিতা ক্ষমতা বেড়ে যাওয়ার পর এখন দুটো ইন্টারেস্ট কন্ট্রাডিক্ট করে যাচ্ছে। আমেরিকা ফার্স্ট হতে হলে তাকে মার্কেট কম্পিটিটিভনেস এলাও করলে তা চলছে না, বিশেষ করে চায়নার সঙ্গে। চায়নার রাইসটাকে তাকে কনটেইন করতে হচ্ছে। কিন্তু ইকোনমিক্যালি সে কনটেইন করতে পারছে না। সুতরাং সে দুর্বলদের নিজের ছায়ায় নিতে চাচ্ছে। এখন আমরা যদি পুরোটাই ওদের কাছে নতি স্বীকার করি অথবা পুরোটাই যদি চায়নার দিকে চলে যাই, তাহলে হয়তো আমাদের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট পুরোপুরি রক্ষিত হবে না। কিন্তু আমরা দুপক্ষের সঙ্গেই বারগেইন করতে পারি। বারগেইন করে আমরা যেসব জায়গায় সবচেয়ে কম দাম পাবো সেখান থেকে কিনবো, যেসব জায়গায় আমাদের অনেক বেশি ট্যারিফ দিতে হচ্ছে সেখানে বিক্রি করবো না। আমরা যদি সমস্ত ডিম একটা বাস্কেটে রাখি, তাহলে তো আমরা একটির উপরে অধিক নির্ভরশীল হয়ে পড়বো। আমাদের ডাইভার্সিফাই মার্কেটে যেতে হবে, ডাইভার্সিফাই ডেস্টিনেশনে যেতে হবে এবং পলিটিক্যাল অ্যালাইনমেন্ট আমাদের চেঞ্জ করতে হবে। কারো সঙ্গেই ‘জি হুজুর’ পলিটিক্সে আমাদের থাকলে চলবে না। এখন ওরা যদি একটা ঘাঁটি তৈরি করে ফেলতে পারে বাংলাদেশের কোথাও এবং যদি মিলিটারি অ্যালায়েন্স করে ফেলতে পারে, মিলিটারি চুক্তি করে ফেলতে পারে, তখন তারা পলিটিক্সকেও কন্ট্রোল করতে পারে। এবং তাদের তো একটা নতুন থিওরি হচ্ছে ‘রেজিম চেঞ্জ’–অর্থাৎ যে আমার পক্ষে নয়, সে আমার বিপক্ষে। যদি আমি ওর সবকিছুর পক্ষে না হই তাহলে সে মনে করবে আমি ওর বিপক্ষে। এবং দাবি করবে তার বিপক্ষে যে রেজিম আছে, সেই রেজিমকে তার চেঞ্জ করার অধিকার আছে। সেটা একটা “অরেঞ্জ রেভলুশন” দিয়ে হোক, একটা “গ্রিন রেভলুশন” দিয়ে হোক, একটা অন্য কিছু দিয়ে হোক, সে সেটা করার চেষ্টা চালাবে। এখন ইম্পেরিয়ালিজম একা ডাইরেক্টলি কাজ করতে পারে না, তার নিওকলোনিয়াল এজেন্ট লাগে। সেই এজেন্টকে সে ধরে। পাশাপাশি সাধারণ ক্যাপিটালিস্টরা যারা এই এক্সপোর্ট ওরিয়েন্টেড ইন্ডাস্ট্রিয়া লাইজেশনের মাধ্যমে কিছুটা উপরে উঠে এসেছে, তাদের সঙ্গে তখন এদের কনফ্লিক্ট শুরু হয়- যেটা ওই সাউথ কোরিয়াতে কিছুটা হয়েছিল, যেটা সিঙ্গাপুরে হয়েছে, যেটা থাইল্যান্ডে, ইন্দোনেশিয়ায় এখন একটু একটু হচ্ছে। তখন তাদের মধ্যে যদি ন্যাশনালিস্ট পলিটিক্স থাকে, তাহলে তারা ওই পরনির্ভরশীলতার বৃত্ত থেকে বা আমেরিকাকে ইউজ করে উপরে উঠে তারপরে আমেরিকাকে ফেলে দিয়ে আবার ইন্ডিপেন্ডেন্ট ইকোনমি করার চেষ্টা করেছে- এখন সেটার সুবর্ণ সুযোগ। কারণ এখন আমেরিকা অ্যাজ আ হোল ওয়ার্ল্ডে ওনলি ওয়ান পোল না। আগে ছিল আমেরিকা ওয়ান পোল, সোভিয়েত ইউনিয়ন অ্যানাদার পোল। আমেরিকা ওয়াজ দেন দ্য স্ট্রঙ্গার পোল। চায়না তখন আমেরিকার সঙ্গে সোভিয়েতের বিরুদ্ধে যোগাযোগ করলো। করে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে থেকে অতীতে তার যা লাভ হয়েছে তার চেয়ে তার বেশি লাভ হলো। লাভ হয়ে যাওয়ার পর এখন সে আমেরিকাকে ছেড়ে দিচ্ছে। দিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন এখন আবার চায়নার সঙ্গেই আছে। এখন এই ভূ-রাজনীতিতে ডেভেলপিং কান্ট্রিগুলো এবং এশিয়ান কান্ট্রিগুলো নিউ পাওয়ার হবে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিতে এবং ওয়ার্ল্ড ইকোনমি হবে মাল্টিপোলার। এই মাল্টিপোলার ওয়ার্ল্ডে ন্যাশনালিস্টরা নানারকম ভাবে অপারেট করতে পারবে। তাদের ভূমিকা সাধারণতঃ দেখা যায় দোদুল্যমান। আর যেসব দেশ ছোট গোষ্ঠীতন্ত্র বা সামরিক প্রভুত্বের বা আগ্রাসনের অধীনে থাকবে, তাদের তো আর উপায় নাই- তাদের তাই হয় দেশপ্রেমের ভিত্তিতে আত্মসম্মান রক্ষা করতে শেষ মরিয়া চেষ্টা করতে হবে, নয়তো মরতে হবে। ধ্রুব দাশ: বাংলাদেশ এই মুহূর্তে আসলে কী করতে পারে? নতুন যে সরকার এসেছে, এই চুক্তির ব্যাপারে তাদের করণীয় কী? এম এম আকাশ: প্রথম দিকে আমি যখন এই চুক্তি নিয়ে আলাপ শুরু করি, তখন এরকম একটা কথা ছিল যে এই চুক্তিতো এখনও স্বাক্ষরিত হয়নি, ৯০ দিনের একটা গ্রেস পিরিয়ড আছে, এই সরকার এটা- এই চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন করতে পারে। কিন্তু সাধারণত চুক্তি যদি একবার স্বাক্ষর হয়ে যায়, তখন ওটা বাতিল করা অনেক কঠিন। গত ১৪ মার্চ রাজধানীতে ক্যাব ও ঢাকা স্ট্রিম আয়োজিত এক সেমিনারে ফরিদা আক্তারকে (সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা) আমি জিজ্ঞেস করেছিলাম যে- আপনি কেন এটার ব্যাপারে আপত্তি করলেন না? তখন উনি জবাব দিয়েছিলেন, এই চুক্তিতে নন-ডিসক্লোজার ক্লজ ছিল, সব জানা যায় নি, তবু আমি আপত্তি করেছিলাম; আমাকে বলেছে যে যেহেতু নন-ডিসক্লোজার ক্লজ আছে, সেজন্য পুরো চুক্তি তোমাকে দেখানো যাবে না। তখন উনি বলেছিলেন- আমার মন্ত্রণালয়ের অংশটুকু তো আমাকে দেখাবেন। তখন তাকে ওই অংশটুকু দেখানো হয়েছিল। তিনি বললেন আমাকে যেই অংশটুকু দেখানো হয়েছিল, সেখানে একটা অসমতা আছে। চুক্তিতে আছে যে বিএসটিআই-এর কোনো নিষেধাজ্ঞা এখানে বহাল থাকবে না। আমেরিকানরা পণ্যের গুণগত মান সম্পর্কে যে রায়, ডিসিশন অ্যাবাউট কোয়ালিটি, সেটাই মেনে নিতে হবে। এটার প্রতিবাদ ফরিদা আক্তার করেছিলেন বলে তিনি জানিয়েছিলেন। যাই হোক পরবর্তীতে আমি বিস্মিত হয়ে দেখলাম যে এই চুক্তির মহানায়ক যে চার-পাঁচজন, তার মধ্যে একজন হলো খলিলুর রহমান, সেই খলিলুর রহমানকে বিএনপি তার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় প্রধান করলো। তখনই আমি তাই বলেছিলাম ‘ডন সেজ অ্যাবাউট ডাস্ক’- সকালবেলায়ই বোঝা যায় সন্ধ্যাবেলায় কী হবে। ধ্রুব দাশ: চুক্তির ভবিষ্যৎ কী? এম এম আকাশ: আমি ভবিষ্যদ্বক্তা নই। আমার মনে হয় যে কোনো ন্যাশনালিস্ট ইকোনমি যেখানে জনগণের ভয়েস আছে, যে দেশের জনগণ বেশি দামে জিনিস কিনতে চায় না এবং বেশি দামে অন্যের জিনিস কিনে নিজের দেশের ইন্ডাস্ট্রি এবং উৎপাদনকে লণ্ডভণ্ড করতে চায় না, সেখানে এই ধরনের চুক্তি বাস্তবায়ন করা সহজ নয়। জনপ্রতিরোধই সেখানে এই চুক্তি আটকে দিতে পারে। এবং যেহেতু বিকল্প আছে- চায়না, রাশিয়া, ইন্ডিয়া একটা নতুন ইকোনমিক পাওয়ার আছে- আমরা আমেরিকা থেকে পদাঘাত খেলে একদম নিচে ডুবে মরে যাবো না, অন্য জায়গায় যেতে পারবো; সেজন্য এই চুক্তির ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। ধ্রুব দাশ: আপনি একটু আগে বললেন চুক্তির সাথে সম্পৃক্ত একজন এখন পররাষ্ট্রমন্ত্রী। তাহলে এই সরকারের কাছ থেকে আপনি চুক্তি বাতিল করার ক্ষেত্রে কতটা আশাবাদী? এম এম আকাশ: আমি তাদের দোদুল্যমানতার চেয়ে জনগণের চেতনা ও সংগ্রামের ওপরই বেশি ভরসা রাখি। হ্যাঁ, আমি সেটাই বলেছি যে, জনগণকে এই চুক্তির কুফলগুলো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে হবে। এই চুক্তি তোমার কৃষি ও শিল্পকে ধ্বংস করে ফেলতে পারে। তোমার গার্মেন্টসে যেটুক সুযোগ দিচ্ছে তার চেয়ে অনেক বেশি নিয়ে নিচ্ছে। এই চুক্তি তোমার পলিসি সার্বভৌমত্ব ধ্বংস করে দিচ্ছে। এগুলো দেখিয়ে অ্যান্টি-ইম্পেরিয়ালিস্ট, অ্যান্টি-নিওলিবারেল ব্রডেস্ট ইউনাইটেড ফ্রন্ট তৈরি করতে হবে। জনগণের সচেতন প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলতে হবে। ধ্রুব দাশ: নভেম্বরে এলডিসি থেকে গ্র্যাজুয়েশন হওয়ার কথা। সরকার তিন বছরের সময় চাচ্ছে। এই মুহূর্তে আমাদের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা কী হওয়া উচিত? এম এম আকাশ: গ্র্যাজুয়েশনে গ্র্যাজুয়ালি যেতে হবে। এখনকার দুনিয়া হচ্ছে কম্পিটিটিভ অ্যান্ড ন্যাশনালিস্ট অ্যান্ড মাল্টিপোলার- এই তিনটা জিনিস আমাদের মনে রাখতে হবে। এখনকার দুনিয়া হচ্ছে মাল্টিপোলার, দ্যায়ার আর মাল্টিপল চান্সেস অফ স্ট্র্যাটেজিক ট্রেড ইনিশিয়েটিভ। এবং সেটা সেই কান্ট্রি নিতে পারে যার সেই ইকোনমিক আন্ডারস্ট্যান্ডিং আছে, ক্যালকুলেশন আছে এবং যার নেগোশিয়েটাররা স্মার্ট এবং যার পলিটিক্যাল অথরিটিও স্মার্ট অ্যান্ড ন্যাশনালিস্ট। ওরকম যদি না থাকে, তাহলে সে হবে দোদুল্যমান, ভুলভাল করবে, চুক্তিতে যাবে, যুদ্ধে জড়ায়ে পড়বে বা অতিরিক্ত কনসেশন দেবে। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ যেহেতু অতীত থেকেই কম-বেশি দোদুল্যমান আমেরিকার প্রশ্নে- আমেরিকা এবং ইন্ডিয়া যেদিকে যায়, দুদেশ একদিকে থাকলে, তারা উভয়ে তাদের প্রভাব বলয়ের বাইরে যেতে ভয় পায়। বাংলাদেশ এবং বাংলাদেশের দুটো মেইন পলিটিক্যাল পার্টি, উভয়ই সাম্রাজ্যবাদের সহযোগী বুর্জোয়াদের পার্টি, তারা তাদের কাছেই অধিকাংশ ক্ষেত্রে আত্মসমর্পণ করে। এখানে ফরচুনেট বিষয়টি হচ্ছে যে ইন্ডিয়া এখন পর্যন্ত টোটালি আমেরিকার কাছে আত্মসমর্পণ করছে না এবং রাশিয়া, চায়না এবং ইন্ডিয়ার সঙ্গে একটা ঐতিহাসিক দীর্ঘ সম্পর্ক বিদ্যমান দেখা যাচ্ছে। চায়নার তো ট্রেড ডেফিসিট হয় নাই। আমেরিকা বলেছে আমি তার ওপরে ৩০০% ট্যাক্স বসিয়ে দিলাম, আমার মার্কেট থেকে চায়নাকে আমি তাড়িয়ে দিলাম। চায়না বললো ভালো কথা, আমি ইউরোপ, ইন্ডিয়া, ব্রাজিল এখানে বিক্রি করবো এবং করে তার সারপ্লাস বেড়ে হয়ে গেছে, আগের চেয়ে বেশি। সুতরাং চায়না তো ডিপেন্ডেন্ট হচ্ছে না। মিলিটারিলি হয়তো লেস পাওয়ারফুল, কিন্তু ইকোনমিক্যালি ডিপেন্ডেন্ট না। সুতরাং চায়না এবং ইন্ডিয়া যদি একদিকে থাকে, ব্রিকস যদি থাকে, তাহলে আমাদের খুব একটা চিন্তা করার কিছু নাই। ধ্রুব দাশ: সেক্ষেত্রে বাংলাদেশ তো এখনো ব্রিকসের সহযোগী সদস্যও না। ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণে দেন-দরবার হবে কিভাবে? এম এম আকাশ: আমি বলেছি যে সবসময় টার্মস অফ নেগোশিয়েশনটা ইম্পর্টেন্ট। চায়নার সঙ্গে আমার কী টার্মস অফ নেগোশিয়েশন হচ্ছে, ভারতের সঙ্গে আমার কী টার্মস অফ নেগোশিয়েশন হচ্ছে- এখন এটুকু আমরা বলতে পারি যে আমেরিকার সঙ্গে আমাদের টার্মস অফ নেগোশিয়েশনটা খুব নেগেটিভ। সুতরাং এটা আমাদের অল্টারনেটিভ খুঁজতে হবে। কিন্তু কোন টার্মস অফ নেগোশিয়েশনে আমরা অল্টারনেটিভটাকে বেছে নেবো, সেটা আমাদের ন্যাশনাল ইন্টারেস্ট রক্ষা করে করতে হবে। ধ্রুব দাশ: কমিউনিস্ট পার্টি আসলে এখানে কী রোল প্লে করছে বা চুক্তিটাকে কীভাবে দেখছে... এম এম আকাশ: কমিউনিস্ট পার্টিতো অলওয়েজ বলেছে যে সে নিওলিবারেলিজম বিরোধী নিওলিবারেলিজমের মেইন ফেস ট্রাম্প, রিগ্যান আর আগে ছিল ব্রিটেনের মার্গারেট থ্যাচার- এই নিওলিবারেল ইকোনমি সারভাইভ করবে না। ক্যাপিটালিজম ওয়ার্ল্ডে ক্রাইসিস হবে, রিয়্যালাইনমেন্ট হবে এবং নন-অ্যালাইন্ড কান্ট্রিগুলো আগে যেরকম নেইদার আমেরিকা নর সোভিয়েত ইউনিয়ন ছিল, ওরকম থাকতে পারবে না। তারা মাল্টিপোলারের সঙ্গে ন্যাশনাল অবস্থান বজায় রেখে স্ট্র্যাটেজিক সম্পর্ক রক্ষা করে অগ্রসর হবে। সেটাই কমিউনিস্ট পার্টির আগের পজিশন ছিল, এখনো আমার মনে হয় সেই পজিশনই আছে। সোভিয়েত ইউনিয়ন যখন ভেঙে যায়, তখন একটা সমঝোতা বা ইকুইলিব্রিয়াম হয়েছিল বা ডিসিশন হয়েছিল যে ওয়ারশ-ও ভেঙে গেলে ন্যাটো-ও ভেঙে যাবে। কিন্তু সেটা তো হলো না। ন্যাটো থেকে গেল, ওয়ারশ ভেঙে গেল। তাতে একটা ইমব্যালেন্স হলো। ইমব্যালেন্সের সুযোগ নিয়ে এই নিওলিবারেলিজম তার আগলিফেস নিয়ে উপরে ওঠা শুরু করলো। সেই সময় কমিউনিস্ট পার্টিগুলো বলেছিল যে আচ্ছা, তাহলে রাশিয়া, চায়না এদের সঙ্গে আমাদের মিত্রতা করতে হবে, যদিও এরা আগের মতো কমিউনিস্ট ইন্টারন্যাশনালিজমে বিলিভ করে না। কিউবাকে সাবসিডি দিয়ে গেছে সোভিয়েত ইউনিয়ন দীর্ঘদিন, কোনোকিছু না পেয়েই। চায়না তো আর সেরকম দেবে না। সুতরাং এখানে এই মাল্টি প্লেয়োর গেমে যে নিউ ওয়ে অফ ইন্টাররিলেশনশিপ উইথ লেসার ইভিল (ষবংংবৎ বারষ) অথবা নিউট্রালাইজিং প্লেয়ারস, সেই জিনিসটা কোন কোন কমিউনিস্ট পার্টি আগেই বুঝতে পেরেছিল। এবং সেই প্রেডিকশনটা তাদের কংগ্রেস দলিলে ছিল, যে আমাদের এই রিয়্যালাইনমেন্টটা করতে হবে। এটা নিয়ে বিতর্ক ছিল, কেউ কেউ বলতেন সোভিয়েতরা/চাইনিজরা তোএকটা ইম্পেরিয়ালিস্ট কান্ট্রি হয়ে গেছে। এটা নিয়ে বিতর্ক ছিল যে সোভিয়েত ইউনিয়ন তো এখন পুতিনের অধীনে একটা এগ্রেসিভ কান্ট্রি হয়ে গেছে। কিন্তু আমাদের দেশের কমিউনিস্টরা আমরা ভেবেছি যে গ্রেটার ডেঞ্জার অফ নিওলিবারেলিজম এবং ইম্পেরিয়ালিজমকে ঠেকানোর জন্য এদের সঙ্গেও আমাদের ডিলে যেতে হবে। কিন্তু আরেকটা বড় ইম্পর্টেন্ট চেতনা দরকার, সেটা হলো জনস্বার্থ ও ন্যায্যতা। ইম্পেরিয়ালিজম ওয়ার্ল্ড অর্ডারে জনস্বার্থ ও ন্যায্যতা নষ্ট করে দিচ্ছে। ‘মাইট ইজ রাইট’ (Might is Right)- এই নীতি ফলো করতে চাচ্ছে। আমরা যদি একটু মানবিক পৃথিবী গড়তে চাই, তাহলেতো প্রত্যেক হোয়াইট আমেরিকান ম্যান ইজ ফার্স্টম্যান অফ দ্য ওয়ার্ল্ড অ্যান্ড বাকি সবাই সেকেন্ড ম্যান- এই নীতি তো আর মানবিক নীতি হলো না। সুতরাং আমাদের জনগণকে আত্মসম্ভ্রম, আত্মসচেতনতা এবং আমার ব্যাপারে আমি সিদ্ধান্ত নেবো- রাইট টু সেলফ-ডিটারমিনেশন- এই জিনিসগুলো, এই অধিকারবোধগুলো মানুষের মধ্যে ফিরিয়ে আনতে হবে এবং এটার জন্য সংগ্রাম করতে তাকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে। ধ্রুব দাশ: ভবিষ্যৎ কী দেখেন? এম এম আকাশ: আমি যেটা মনে করি যে আমাদের তরুণ প্রজন্ম এখন একটু দিশেহারা। দিশেহারা এজন্য যে তাদের আগে যে সিম্পল ওয়ার্ল্ড ছিল- সোশ্যালিস্ট, ক্যাপিটালিস্ট এবং সোশ্যালিস্ট সোভিয়েত ইউনিয়নের এবং চায়না নিয়ে একটা শিবির, আর ক্যাপিটালিজম আমেরিকা-ব্রিটেন নিয়ে একটা শিবির- এটা তো ভেঙে গেছে। ভেঙে গিয়ে যে নতুন রিয়্যালিটি হয়েছে, তখন কে এনিমি কে ফ্রেন্ড এটা তারা বুঝতে পারছে না। আরেকটা হলো- তারা ল্যাঙ্গুয়েজ এবং ফর্মের মধ্যে বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বয়ান, ল্যাঙ্গুয়েজ, ফর্ম এবং ওটা দিয়েই মনে করছে যে সঠিক এজেন্সি তৈরি করে দ্রুত বাস্তবকে বদলাতে পারবে। কিন্তু ওটা দিয়ে সাময়িকভাবে বদলানো যায় সাময়িকভাবে কিছু লোককে উত্তেজিত করে নিয়ে হয়তো রাজনৈতিক ক্ষমতায় পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করা যায় না। অর্থনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন করতে গেলে শ্রেণিসংগ্রাম, শ্রেণিকে ঐক্যবদ্ধ করা এবং তার চারপাশে জনগণকে ঐক্যবদ্ধ করে শোষক শ্রেণির বিরুদ্ধে শোষিত শ্রেণির মরণপণ লড়াই- এটাকেই ফান্ডামেন্টাল কন্ট্রাডিকশন করতে হয়। কিন্তু আমাদের তরুণ সমাজ নানা রকম নন-ফান্ডামেন্টাল কন্ট্রাডিকশনকে ফান্ডামেন্টাল বানিয়ে ফেলেছে। কিন্তু বেসিক্যালি একটা সমাজে শোষিত মানুষকে সংগঠিত করতে হবে। সম্পদের ওপর তার অধিকার কায়েম করতে হবে এবং একই সঙ্গে সম্পদ বৃদ্ধিতে তার গণতান্ত্রিক অংশগ্রহণ, তার দায়িত্বশীলতা, তার সচেতনতা, তার অবদান রক্ষা করতে হবে। এবং এটা রক্ষা করার জন্য এমন ইনস্টিটিউশন গড়তে হবে যেন ‘ফ্রম ইচ অ্যাকর্ডিং টু হিজ ক্যাপাসিটি, টু ইচ অ্যাকর্ডিং টু হিজ ওয়ার্ক’ (From each according to his capacity, to each according to his work) দেওয়া যায়। আর সাম্রাজ্যবাদী যুগে এর যে একটি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক দিক রয়েছে, রয়েছে অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ভাবাদর্শগত বহুমুখী সংগ্রামের সমষ্টি এই পুরো জিনিসটা উপলব্ধি করতে হবে। কিন্তু আমরা যদি পোস্ট মডার্নিস্টদের মতো খণ্ড খণ্ড করে মার্ক্সবাদকে গ্রহণ করি, তাহলে আমরা পুরো জিনিসটা থেকে বিচ্ছিন্ন ও খণ্ডীভবন হয়ে যাবো এবং মার্ক্সিজম এর সঠিক প্রয়োগ এদেশে আর সম্ভব হবে না। ধ্রুব দাশ: ধন্যবাদ আপনাকে। এম এম আকাশ: আপনাকেও ধন্যবাদ।