সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 26 এপ্রিল, 2026

একতা ডেস্ক : [এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২ নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।] (৭) [পার্টির জন্মের বছরখানেক পর ‘প্রাদেশিক কমিটির’ এবং ‘ঢাকা জেলা কমিটির’ ১৯৪৯ সালের কয়েকটি সার্কুলার, রিপোর্ট, ইশতেহার আজ এখানে মুদ্রিত হলো। দেশের সে সময়ের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও পার্টির কাজের পদ্ধতি- ধারা সম্পর্কে একটি চিত্র এখান থেকে পাওয়া যায়। মনে রাখা প্রয়োজন যে আলোচ্য সময়কালে পার্টি তার দ্বিতীয় কংগ্রেসে গৃহীত ‘বাম বিচ্যুতির’ লাইন অনুসরণ করছিল।] । এক। ১২/০৪/৪৯ মে দিবস সম্বন্ধে সার্কুলার ১লা মে দুনিয়ার শ্রমিক ও শোষিত জনসাধারণের নিকট স্মরণীয় দিন। এই দিনটাতে সর্বত্র শ্রমিকরা হিসাব-নিকাশ করিয়া আগামী বৎসরের লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুত হয়। আমাদের দেশেও এই দিনটির গুরুত্ব বিরাট। .... প্রত্যেক পার্টি ইউনিটকে এই দিনটি পালন করিতেই হইবে। এই বৎসরের বিশেষ অবস্থার দিকে নজর রাখিয়া আমাদের প্রচার চালাইতে হইবে। প্রতি জায়গায় এই দিনটা নিম্নলিখিতভাবে কার্যকরী করিতে হইবে। ১. রক্ত পতাকা উত্তোলন। ব্যারাকে, বস্তিতে, গ্রামে এবং যত বেশী জায়গায় সম্ভব রক্ত পতাকা উঠাইতে হইবে। পুরান কাপড় রং করিয়া কিংবা লাল কাগজ দিয়া যত বেশীসংখ্যক পতাকা তৈয়ার করিয়া ইহা করিতে হইবে। ২. হাতে লিখা পোষ্টার ও ইস্তাহারের ব্যাপকভাবে বিলী করিতে হইবে। তাহার মধ্যে থাকিবে- যোগ্য মজুরী, জমি, শিক্ষা ও গণতান্ত্রিক অধিকারের জন্য ব্যপক সংগ্রামের আহ্বান। ইস্তাহার ছাপানোর চেষ্টা করা হইতেছে। সম্ভব না হলে হাতে লিখা পোষ্টার ও ইস্তাহার দিয়াই কাজ চালাইতে হইবে। ৩. সমস্ত জায়গায়ই সভা করিবার ও শোভাযাত্রা বাহির করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করিতে হইবে। যেখানে ইহা করা কিছুতেই সম্ভব হইবে না সেখানে স্কোয়াড প্রচার এবং বৈঠক করিয়া মে দিবসের তাৎপর্য বুঝাইতে হইবে। .... সমস্ত পার্টি ইউনিটকে স্থানীয় অবস্থা অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে মে দিবস পালন করিতে হইবে এবং পরের কিস্তিতে ইহার বিস্তৃত রিপোর্ট পাঠাইতে হইবে। জিলা সম্পাদকমণ্ডলী ১২/৪/৪৯ । দুই। ডি.সি. সার্কুলার, (১৮/৪/৪৯) -------------------------- মে দিবসে পোষ্টারের বিষয়বস্তু (যত পারেন নিম্নোক্তভাবে পোষ্টার দিন)। মে দিবসে ঘোষণা করুন- ১. অত্যাচারী ধনিকের শোষণ ও পাকিস্তান সরকারের জুলুম ও গুণ্ডামী বরদাস্ত করব না ২. বাঁচার মতো নিম্নতম মজুরী চাই ৩. সকলের জন্য কাজ ও শিক্ষা চাই ৪. সস্তায় চাউল ও বস্ত্র চাই ৫. কৃষকের হাতে জমি চাই ৬. সভা সমিতি করা, পত্রিকা প্রকাশ প্রভৃতি গণতান্ত্রিক অধিকার চাই ৭. শ্রমিক, কৃষক, ছাত্র ও অন্যান্য রাজনৈতিক বন্দীর মুক্তি চাই ৮. কৃষক শ্রমিকদের ওই সোভিয়েত রুশের সাথে বন্ধুত্ব চাই ৯. বর্মা ও মালয়ে হস্তক্ষেপ চলবে না ১০. বৃটিশ কমনওয়েলথ ছাড়তে হবে দুনিয়ার মজুর এক হও! ইনকিলাব জিন্দাবাদ! লাল ঝাণ্ডা কি জয়! কমিউনিষ্ট পার্টি জিন্দাবাদ! । তিন। পর্যালোচনা ---------- মেয়ে অপমান ও আমাদের কর্তব্য। সংকট ও মেয়েদের মধ্যে ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ ঢাকা জেলা কমিটির পর্যালোচনা ২৬/৭/৪৯ অর্থনৈতিক সংকটের ধাক্কা সবচেয়ে জোরে আসিয়া চাপিয়াছে মেয়েদের উপর। শ্রমিক, ক্ষেতমজুর, গরীব কৃষক ঘরের মেয়েরা পুরুষদের খাবার দিয়া যাহা থাকে তাহা নিজেরা খান। প্রায় প্রতিদিনই তাহারা আধপেটা খাইয়া থাকেন। কোন কোনদিন একেবারে অনাহারে থাকেন। .... গরীব ঘরের মেয়েদের মধ্যে ব্যাপকভাবে অনাহার-অর্ধাহার চলিয়াছে। অনাহার ও অর্ধাহার থাকাটাই গরীব মেয়েদের মধ্যে বর্তমানে রেওয়াজ হইয়া দাঁড়াইয়াছে। কাপড়ের অভাবে হাজার হাজার মহিলা আজ নেংটা ও অর্ধ-নেংটা। ক্ষেতমজুর, গরীব কৃষক ও মজুর শ্রেণী অর্থের অভাবে মেয়েদের কাপড় কিনিয়া দিতে পারে না। .... কোন কোন সময় কাপড়ের অভাবে একসাথে বাড়ির সকল মেয়েরা ঘর হইতে বাহির হইতে পারে না। লীগ সরকার আজ মেয়েদের ভুখা ও নেংটা রাখিয়া বর্বর যুগের দিকে নিয়া যাওয়ার ষড়যন্ত্র করিতেছে। লীগ নেতাদের শরিয়তের ধাপ্পাবাজীর কথা আজ নগ্নভাবে প্রকাশ হইয়া গিয়াছে। ... দেশের এই বিপ্লবী পরিস্থিতিতে মেয়েদের মধ্যেও ক্রমবর্ধমান বিক্ষোভ শুরু হইয়াছে। গরীব মেয়েদের মধ্যে এই বিক্ষোভ আরও ব্যাপক ও গভীর। তাই দেখা যায়, সর্বত্র মেয়েরা আজ দেশ-বিদেশের সংবাদ জানার জন্য কত ব্যগ্র। .... কোন বৈঠক বা সভা ডাকিলে মেয়েরা সেই বৈঠক বা সভার আলোচনা শুনার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করেন। সামাজিক পর্দা প্রথা ভাঙিয়া মেয়েরা আগাইয়া যায়। পুরুষরা সভায় না গেলে মেয়েরা তাহাদিগকে জোর করিয়া সভায় পাঠাইয়া দেয় এবং সভা হইতে ফিরিয়া আসিলে মেয়েরা সবকিছু শুনিতে চায়। । চার। মেয়ে ফ্রন্টে আমাদের কাজ ------------------------ গত দ্বিতীয় পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তাবে বলা হইয়াছে- “ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক সংকট। ছাঁটাই ও বরখাস্তের হুমকি ও নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের চড়া দামের সময় মেয়ে ফ্রন্টের মূল কাজ হইবে-শ্রমিক, কৃষক, চাকুরীজীবী মেয়ে এবং শ্রমিক ও নিম্ন মধ্যবিত্ত কর্মচারীদের সাথে সংযোগ স্থাপন করা এবং তাহাদিগকে সংগ্রামের জন্য অনুপ্রাণিত ও সংগঠিত করা। আগামীদিনে জনতার এই সংগ্রামী অংশের দুঃখ-দুর্দশা এমনভাবে বাড়িবে যে কোন সময় ইহা ফাটিয়া পড়িবে।” (পার্টির প্রস্তাব, পৃষ্ঠা, ১০৪) জিলার মেয়ে ফ্রন্টের মূল দুর্বলতা ও ত্রুটিগুলি নিম্নলিখিতভাবে প্রকাশ পাইয়াছে- ১. শ্রেণী সংগ্রামের ভিত্তিতে মেয়েদের সংগঠিত করার চেষ্টা নাই .... পরিকল্পনা নাই। মেয়ে ফ্রন্টের কাজের সবচেয়ে জোর দেওয়া প্রয়োজন শ্রমিক ও কৃষক মেয়েদের মধ্যে। .... ২. জিলার মেয়ে কমরেডরা সবাই আসিয়াছেন মধ্যবিত্ত শ্রেণী হইতে। মার্কসবাদ লেনিনবাদী শিক্ষায় তাহারা শিক্ষিত হন নাই। তাই শ্রেণীচ্যুত হইয়া সত্যিকারের কমিউনিষ্ট হইতে পারেন নাই। শ্রমিক, ক্ষেতমজুর ও গরীব কৃষক মেয়েদের সাথে নিবিড় সংযোগ ও তাহাদের সংগ্রাম পরিচালনা করা এবং সাথে সাথে মার্কসবাদ-লেনিনবাদী শিক্ষা গ্রহণ- এইভাবে সত্যিকারের কমিউনিষ্ট হওয়া যায়। ৩. মেয়ে কমরেডরা অত্যন্ত পরনির্ভরশীল। .... যে কোন একটা ব্যাপারে পার্টির পুরুষ কমরেডদের দিকে চাহিয়া থাকেন। নিজেদের ব্যবস্থা নিজেদের করিয়া পার্টির এই গোপন যুগে বিপ্লবী কাজ করিয়া যাইতে হইবে। ৫. গত ১ বৎসরে জিলা কমিটি মেয়ে আন্দোলনকে পরিচালিত করার ব্যাপারে .... মেয়ে কর্মীদের ঠিকভাবে সাহায্য করেন নাই। ফলে জিলার সর্বত্র পুরুষ কমরেডরা মেয়েদের জঙ্গীভাবকে চক্ষের সামনে দেখিয়াও উদাসীন থাকিয়া গিয়াছেন। মোটকথা জিলা পার্টি শোষিত জনতার এক অর্ধাংশকে বাদ দিয়া চলিয়াছে। । পাঁচ। বর্তমানে মেয়ে ফ্রন্টের কাজের কয়েকটি প্রস্তাব ১) ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ শহরের মেয়ে মজুর, নার্স, শিক্ষয়িত্রী প্রভৃতি চাকুরীজীবী মেয়েদের সাথে অবিলম্বে সংযোগ স্থাপন করিতে হইবে। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক দাবীর উপর তাহাদের সংগ্রাম পরিচালিত করিতে হইবে। ঢাকা শহরে একজন মেয়ে কমরেডকে সারাক্ষণের কর্মী হইয়া এই কাজে আত্মনিয়োগ করিতে হইবে। .... তাছাড়া ছাত্রী সংঘের সামান্য মেয়ে কমরেডদেরও গরীব মেয়েদের আন্দোলনে অংশগ্রহণ করিতে হইবে। ২) .... গ্রাম অঞ্চলে ক্ষেতমজুর ও গরীব কৃষক মেয়েদের সাথে সংযোগ স্থাপন করিয়া তাহাদিগকে জমি ও মজুরীর জন্য নিজস্ব শ্রেণীর লড়াইতে সমাবেশ করিতে হইবে, ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জ হইতে ২ জন মেয়ে কমরেডকে এখন সারাক্ষণের কর্মী হইয়া গ্রামে চলিয়া যাইতে হইবে। ৩) দক্ষিণ মানিকগঞ্জে আগামী দুই মাসের মধ্যে ক্ষেতমজুর ও গরীব কৃষক জঙ্গী নিয়া একটি পার্টি গ্রুপ করিতে হইবে .... ৪) মেয়ে কমরেডদের জন্য শিক্ষার পরিকল্পনা নিতে হইবে। কমিউনিষ্ট ইস্তাহার, পার্টি প্রস্তাব ও জিলা রিপোর্টের উপর মেয়েদের নিয়া ক্লাস নিতে হইবে। প্রত্যেকটি মেয়ে কমরেডকে উপরিউক্ত বইগুলি ও ‘বলশেভিক পার্টি’র ইতিহাস বারে বারে পড়িতে হইবে। [চলবে]