সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে

Posted: 26 এপ্রিল, 2026

একতা প্রতিবেদক : সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে দুর্নীতিমুক্ত করে সুবিধাভোগীদের সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছে বাংলাদেশ ক্ষেতমজুর সমিতি। পাশাপাশি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষিকার্ড’-এর সুবিধা যাতে প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো পায় তাও নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে সংগঠনটি। গত ২৪ এপ্রিল রাজধানীর মুক্তিভবনে অনুষ্ঠিত কেন্দ্রীয় কমিটির সভা থেকে এ আহ্বান জানানো হয়েছে। সভায় সভাপতিত্ব করেন সংগঠনের সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান। কেন্দ্রীয় কমিটির রিপোর্ট উত্থাপন করেন সাধারণ সম্পাদক অর্ণব সরকার। সংগঠন ও আন্দোলন সংগ্রাম বিষয়ে আলোচনা করেন কার্যকরী সভাপতি অ্যাড. আনোয়ার হোসেন রেজা। রিপোর্টের ওপর কেন্দ্রীয় নেতৃবৃন্দ আলোচনা করেন। সভার শুরুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন সহ সাধারণ সম্পাদক কল্লোল বনিক। সভায় অতিথি হিসেবে আলোচনা করেন, সংগঠনের সাবেক সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। এছাড়াও আলোচনায় অংশ নেন সংগঠনের সহ সভাপতি পরেশ কর, আব্দুল মান্নান, সাহা সন্তোষ, ডা. তপন বসু, দেলোয়ার হোসেন, হারুন আলী বারী, সদস্য অ্যাড. রফিকুল ইসলাম অপু, শাহাদাত হোসেন খোকা, হাফিজার রহমান, খ ম মেরাজ, আব্দুর রউফ, এমদাদুল হক মিলন, আমির হোসেন, রোকেয়া বেগম, সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, কাজী মনিরুজ্জামান, শহীদুল ইসলাম প্রমুখ নেতৃবৃন্দ। সভায় মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম বলেন, দেশের গ্রামীণ অর্থনীতির মেরুদণ্ড ক্ষেতমজুর ও গ্রামীণ মজুর। তাঁদের অনেকের বসতভিটাও নেই। দৈহিক শ্রমশক্তিই তাঁদের জীবিকা নির্বাহের প্রধান উপায়। ক্ষেতে সারা বছর কাজ না থাকায় কেউ কেউ রিক্সা-ভ্যান-ভটভটি চালান, কেউবা পরিযায়ী শ্রমিক হিসাবে অন্য গ্রামে বা শহরে বিভিন্ন কাজে যান। সারাবছর নিশ্চিত কাজ না থাকায় তাদেরকে নিরাপত্তাহীন জীবন কাটাতে হয়। তিনি বলেন, যেসব গ্রামীণ মজুর সামান্য জমি লিজ নিয়ে আলু, পেঁয়াজ চাষ করেছিল তাঁরা তাঁদের ফসলের দাম পায়নি। তাঁরা আর্থিকভাবে ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন। সরকারকে লাভজনক দামে এসব দরিদ্র বর্গাচাষীদের ফসল ক্রয় করতে হবে। জেলায়-উপজেলায় কোল্ড স্টোরেজ নির্মাণ ও কম খরচে যাতে কৃষকরা তাদের ফসল রাখতে পারেন তার দাবি জানান তিনি। সভাপতি ডা. ফজলুর রহমান বলেন, ক্ষেতমজুরদের পরিবারের সদস্যরা পুষ্টিকর খাদ্য না খেতে পারার কারণে তাঁরা পুষ্টির অভাবে ভোগেন। পুষ্টিহীনতা ও রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকায় তাঁরা বিশেষ করে শিশু সন্তানেরা প্রতিরোধযোগ্য সংক্রামক ব্যাধিতে সহজেই আক্রান্ত হয়। সাম্প্রতিক সময়ে ইতিমধ্যে প্রায় ২১ হাজার শিশু হামে আক্রান্ত হয়েছে এবং দুই শতাধিক শিশুর মৃত্যু হয়েছে যার অধিকাংশই দরিদ্র পরিবারের। তিনি বলেন, গ্রামের প্রায় সকল মজুরসহ দরিদ্র মানুষ এনজিও/মহাজনদের কাছে ঋণগ্রস্ত। এই ঋণের কিস্তি পরিশোধে তারা তটস্থ থাকেন, কেউ পালিয়ে বেড়ান, এমনকি আত্মহত্যাও করেন। গ্রামের দরিদ্র অসহায় পরিবারের সদস্যরা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা থেকেও বঞ্চিত। সভায় অ্যাড. আনোয়ার হোসেন রেজা বলেন, ক্ষেতমজুরগণ বৃদ্ধ বয়সে বা অসুস্থতায় কর্মক্ষমহীন হলে তাঁদের খেয়ে না খেয়ে ও বিনা চিকিৎসায় দিনাতিপাত করতে হয়। সরকার বয়ষ্কভাতার মাধ্যমে মাসে মাত্র ৬৫০ টাকা দেন, যা দিয়ে একজন মানুষের তেমন কিছুই হয় না। আমাদের দাবি ষাটোর্ধ্ব মজুরদের বিনা জামানতে মাসিক দশ হাজার টাকা পেনশন দিতে হবে। পাশাপাশি কাবিখা, ভিজিডি, বয়ষ্ক ভাতা, বিধবা ভাতাসহ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে দুর্নীতিমুক্ত করে সুবিধাভোগীদের সংখ্যা ও ভাতার পরিমাণ বাড়াতে হবে। রিপোর্টের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় কমিটির নেতৃবৃন্দ বলেন, বর্তমান সরকার গ্রামের দরিদ্র পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড ও কৃষিকার্ডের মাধ্যমে সুবিধা দেওয়ার ঘোষণা দিয়ে তার কাজও শুরু করেছেন। কিন্তু এই প্রকল্পে অতীতের মতো যাতে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, দলীয়করণ না হয় এবং প্রকৃত দরিদ্র পরিবারগুলো এই সুবিধা পায় তাও সরকারকে নিশ্চিত করতে হবে। চাল, তেলসহ নিত্যপণ্যর দাম দিন দিন বেড়েই চলেছে উল্লেখ করে নেতৃবৃন্দ বলেন, গ্রাম-শহরের গরিব মানুষদের রেশনিং চালু করে নিত্যপণ্য সরবরাহ করার দাবি জানান। বর্তমানে ধান কাটার মৌসুমে ক্ষেতমজুররা যাতে কম খরচে নিরাপদে এক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত ও নিরাপদে কাজ করে বাড়ি ফিরে আসতে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানান নেতৃবৃন্দ। নেতৃবৃন্দ আরো বলেন, এছাড়া বজ্রপাতে প্রতিবছরের মতো এবারও মজুরদের মৃত্যু হচ্ছে। বজ্রপাত থেকে মানুষকে বাঁচাতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবস্থা সরকারকে করতে হবে। তাদের মধ্যে সচেতনতা বাড়ানো ও নিহতদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপুরণ দেওয়ার দাবি করা হয় সভায়। নেতৃবৃন্দ বলেন, কৃষিকাজে নিয়োজিত এবং তাঁদের প্রায় অর্ধেক নারী। নারীদের পুরুষের চেয়ে কম মজুরি দেওয়া হয়। নেতৃবৃন্দ সমকাজে নারী-পুরুষের সমমজুরি নিশ্চিতের দাবি করেন। সভায় ক্ষেতমজুরদের জন্য রেশন, পেনশন চালু, বিভিন্ন প্রকল্পের বরাদ্দ বাড়ানোর পাশাপাশি হাওর-বাওড়, জলাশয়, খাল-বিল ইজারার বাতিল করে প্রকৃত মৎস্যজীবীদের মধ্যে বরাদ্দ দেওয়ার দাবিতে আন্দোলন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়। সভায় আসন্ন জাতীয় বাজেটে সামাজিক নিরাপত্তা খাতের বিভিন্ন প্রকল্প ও কর্মসূচির মাধ্যমে গ্রামীণ দরিদ্র মানুষের জন্য বরাদ্দ বৃদ্ধির দাবিতে আগামী ১৮ মে, সোমবার ঢাকায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে সমাবেশ ও প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি প্রদান কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়।