জাগো বাহে কোনঠে সবাই

Posted: 26 এপ্রিল, 2026

পহেলা মে। মহান মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের প্রতীকী দিন। তাদের বিজয়-উৎসবের দিন, আন্তর্জাতিক সংহতির দিন। সেদিন শ্রমিকের বুকের রক্তে লাল হয়ে ওঠা ঝাণ্ডা পরিণত হয়েছিল শ্রমিক শ্রেণির রক্ত পতাকায়। ‘দুনিয়ার মজদুর এক হও’ স্লোগানটি হয়ে উঠেছিল সব দেশের সব শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের সাধারণ বিশ্বজনীন রণধ্বনি। কমরেড জসিমউদ্দীন মণ্ডল বলতেন, “বছরের তিনশ পয়ষট্টি দিনের মধ্যে প্রায় সবগুলো দিনই হলো ‘কোট-টাই-পেন্টালুন’ পরা ‘বড়লোকদের’ দিন। কেবল একটি দিন- পহেলা মে-মে দিবসকে ‘দাদ আলা-পা ফাটা’ ‘ছোটলোকদের’ দিন হিসেবে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।” যাদের তথাকথিত ‘ছোটলোক’ বলে গণ্য করা হয় তারাই আমাদের দেশের ‘নিরানব্বই’ শতাংশ মানুষ। তাদের প্রকৃত ‘দাম’ ও মর্যাদা আসলে ‘ছোট’ নয়। বরঞ্চ তাদের অবদানই সবচেয়ে ‘বড়’। এসব মুটে-মজুর-জেলে-কিষাণ-শ্রমিক-কর্মচারীরাই আমাদের দেশের অর্থনীতি চালু রেখেছে। আমাদের যেটুকু প্রবৃদ্ধি-সমৃদ্ধি, প্রধানত তারাই তাকে সম্ভব করে তুলছে। দেশের মেহনতি কৃষক ও ক্ষেতমজুররা, গার্মেন্টসসহ ছোট বড় কলকারখানা-প্রতিষ্ঠানের শ্রমিকরা, এবং হাড়ভাঙা পরিশ্রম করা প্রবাসী শ্রমজীবীরাই দেশের ‘পঁচানব্বই’ শতাংশ সম্পদের স্রষ্টা। অথচ তারা পায় তাদের সৃষ্ট সম্পদের মাত্র ‘পাঁচ’ শতাংশ। আর, যারা নতুন সম্পদ সৃষ্টির বদলে অন্যের সম্পদ লুটেপুটে খায়, সেই অবশিষ্ট ‘কোট-টাই-পেন্টালুন’ পরা লুটেরা ধনিক ও তাদের পা-চাটা পেয়াদারা নিয়ে নেয় সেই সম্পদের ‘পঁচানব্বই’ শতাংশ। এরকম বেইনসাফি ও বঞ্চনা মেনে নেয়া যায় না। কিন্তু তথাপি তা সম্ভব হচ্ছে লুটেরাদের দ্বারা এই ‘ছোটলোকদের’ রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনীতি থেকে দূরে সরিয়ে রাখতে পারার কারণে। লুটেরা শোষকরা, নানান চেহারায়-রূপে-বেশে পার্মানেন্টভাবে দখল করে রেখেছে রাষ্ট্রক্ষমতার ‘ড্রাইভিং সিটিটি’। কবি সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন– “চিমনির মুখে শোনো সাইরেন- শঙ্খ, গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে, তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য জীবনকে চায় ভালবাসতে। শতাব্দি লাঞ্ছিত আর্তের কান্না প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা; মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না- পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা।” প্রধানত: মেহনতি মানুষের আত্মদানের মধ্য দিয়ে একাত্তরে আমাদের দেশ স্বাধীন হয়েছিল। কিন্তু ৫৪ বছর ধরে দেশ পরিচালিত হচ্ছে লুটেরা বুর্জোয়া শ্রেণির স্বার্থরক্ষাকারী শক্তি দ্বারা। তারা তীব্র পারস্পরিক গোষ্ঠীদ্বন্দ্বে লিপ্ত হয়ে দেশে অরাজকতা, নৈরাজ্য, অধঃপতন ও ধ্বংসের বিপদকে ডেকে আনছে। নারী-শিশু ধর্ষণ-হত্যার বীভৎসতা ভয়ঙ্কর মাত্রায় ছড়িয়ে পড়ছে, মাদকাসক্তির বিস্তার ঘটছে, নীতি-নৈতিকতার ক্ষেত্রে ধস নেমেছে, দুরাচার-দুষ্কর্ম-অপরাধে দেশ ছেয়ে গেছে। এসবই হলো তাদের লুটপাটের অর্থনীতি ও রাজনৈতিক নীতি-দর্শনের মৌলিক গলদ ও দেউলিয়াপনার নিদর্শন। কিন্তু নিজেদের মধ্যে ‘গলা কাটা বিবাদে’ লিপ্ত থাকলেও, তারা উভয়পক্ষই একমত হয়ে, কোনো অবস্থাতেই যেন ‘পঁচানব্বই’ শতাংশ তথাকথিত ‘ছোটলোকরা’ রাষ্ট্রক্ষমতা ও রাজনীতিতে সামনে আসতে না পারে, ছলে-বলে-কৌশলে তা ঠেকিয়ে রাখতে তৎপর। কারণ, তা ঠেকিয়ে রাখতে না পারলে, যে ‘অর্থনৈতিক-সামাজিক’ ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা তাদের ‘লুটপাট ও অনাচারের রাজত্ব’ বহাল রেখেছে, তা ধসে পড়বে। তারা মেহনতি মানুষের রাজনৈতিকভাবে সচেতন হয়ে ওঠা ও সেই ভিত্তিতে তাদের জাগরণকে ভয় পায়। কারণ তারা জানে যে সেটি তাদের জন্য ‘জান ধরে টান দেয়ার’ মতো ‘অস্তিত্ব রক্ষার’ ইস্যু। তাই, প্রকৃত তাৎপর্য নিয়ে শ্রমিকরা যেন ‘মে দিবসকে’ তার প্রকৃত তাৎপর্যের আলোকে পালন করতে না পারে, সেজন্য তারা শুরু থেকেই নানা ফন্দিফিকিরের আশ্রয় নিয়ে চলেছে। সেক্ষেত্রে তাদের একটি ফন্দি হলো, ‘মে দিবস’ পালনকে ‘আনুষ্ঠানিকতার’ মধ্যে বন্দি করে ফেলা। পাকিস্তান যুগের সরকার মে দিবস পালন করাকে গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করতো। মে দিবস পালনকে বিবেচনা করা হতো কমিউনিস্ট-অন্তর্ঘাত, বিদ্রোহ-বিপ্লবের প্রস্তুতি কাজ, পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য ‘খাতারনাক’ ইত্যাদি কর্মকাণ্ড হিসেবে। প্রবল নজরদারি ও রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে সেসময় আমাদের মে দিবস পালন করতে হতো। দালাল অথবা সংস্কারবাদী ট্রেড ইউনিয়নকে মে দিবসে সভা করার সুযোগ দেয়া হতো। আমরা তাদের আয়োজিত বৈকালিক শ্রমিক সভায় উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের সাথে কিছুটা সময় কাটানো ও তাদের সাথে কথাবার্তা বলার চেষ্টা করতাম। সন্ধ্যার পরে, নিষিদ্ধঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির তৃণমূলের গ্রুপ বা শাখার উদ্যোগে নিভৃত কোনো ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে গোপনে মে দিবসের সভা করতাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে মে দিবস পালন করা হয়ে থাকে রাষ্ট্রীয়ভাবে। দিনটি ১৯৭২ সাল থেকেই সরকারি ছুটির দিন। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির পাশাপাশি শ্রমিকরা তাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে প্রকাশ্যে ঢাক ঢোল পিটিয়ে আনন্দ উল্লাস সহযোগে সমাবেশ-মিছিল-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকালে ও সন্ধ্যায়, শহরের কেন্দ্রে ও নিজ নিজ এলাকায়, মে দিবস পালন করে থাকে। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে পাকিস্তান আমলের নিরবচ্ছিন্ন অসংখ্য সংগ্রামে এবং সর্বোপরি মুক্তিযুদ্ধে এদেশের শ্রমিক শ্রেণির অমূল্য অবদানের ফলশ্রুতিতে। মে দিবসকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদা দিলেও, এর পেছনে রয়েছে যাদের রক্তে রাঙানো সংগ্রাম, সেই শ্রমিক ও মেহনতি মানুষেরা এদেশে এখনো রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই তাদের ন্যূনতম মর্যাদা ও অধিকার লাভ করেনি। মে দিবসকে মাকাল ফল বানিয়ে রাখা হয়েছে। উপরে-উপরে আনুষ্ঠানিকতায় বাহারি ছাপ লাগলেও ভেতরটা অন্তঃসারশূন্য করে রাখা হয়েছে। এদেশের শাসকরা শ্রমিকদের ‘মানুষ’ হিসেবে গণ্য করে না। একজন শ্রমিক মরলো কি বাঁচলো, তাতে মালিক বা সরকারের যেন কিছুই আসে যায় না। গার্মেন্টসের কোনো একজন শ্রমিক- রহিমা, সালেহা, মকবুল মরলে, পরদিনই ২০০/৫০০ টাকায় আরেকজন হালিমা, মাজেদা, শামসুলকে পাওয়া যাবে। ‘মানুষ’ হিসেবে তাদের গণ্য করা হয় না। তাদের মূল্য কেবল এই কারণে যে তারা শ্রম-শক্তির জোগানদাতা। মানুষের শ্রম-শক্তি এমন একটি ‘পণ্য’ যার ব্যবহার দ্বারা মালিকরা এককভাবে এই উদ্বৃত্ত মূল্য নিয়ে নেয়। মালিকানার এই ‘অধিকারকে’ বুর্জোয়া রাষ্ট্র তার পুলিশ-মিলিটারি-আইন-কানুন, বিচারালয়, প্রশাসন ইত্যাদির মাধ্যমে সুরক্ষার ব্যবস্থা করে। সৃষ্টি হয় ‘মজুরি-দাসত্বের’ আধুনিক শোষণব্যবস্থা- পুঁজিবাদ- বাজার অর্থনীতি ভিত্তিক অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা অপসারণ করে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে ‘মজুরি-দাসত্ব’ থেকে শ্রমিক মুক্তি পাবে না, তাদের ওপর শোষন-বঞ্চনার অবসানও হবে না। তাই, মে দিবসে শোষণমুক্তির জন্য, সমাজতন্ত্রের জন্য বজ্রধ্বনি নিনাদিত করা শ্রমিকদের প্রধান কর্তব্য। এই মূল বিপ্লবী আওয়াজের সাথে সাথে এই মুহূর্তের সবচেয়ে জরুরি দাবি- এ ইস্যুগুলো নিয়েও শ্রমিকের স্লোগানে-স্লোগানে মে দিবসের রাজপথ উত্তাল করতে হবে। যেসব অসহনীয় সমস্যার প্রবল চাপে দেশের শ্রমিকরা আজ দিশেহারা, তা নিয়ে তোলপাড় তুলতে হবে। দ্রব্যমূল্য তেমনই একটি সমস্যা। শ্রমিকের কিনে খাওয়া সব জিনিসের দাম পাগলা ঘোড়ার মতো লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে, কিন্তু সেই অনুপাতে মজুরি বা আয় বাড়ে না। ফলে প্রকৃত আয় কমতে কমতে আজ তলানিতে পৌঁছে গেছে। প্রায় সব পর্যায়ের ও স্তরের মানুষই আজ এই সমস্যায় জর্জরিত। গ্রাম ও শহরের সব শ্রমজীবী মানুষের জন্য কন্ট্রোল দামে রেশন ব্যবস্থায় অত্যাবশ্যক নিত্যব্যবহৃত সামগ্রী সরবরাহের বহুদিনের দাবিটির প্রতি রাষ্ট্র কখনোই নজর দেয়নি। এবার মে দিবসে এই দাবিতে এমন তোলপাড় সৃষ্টি করতে হবে যেন সরকার এই দাবিটি মানতে বাধ্য হয়। বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাছে এবারের মে দিবসে আরেকটি প্রধান দাবি হলো ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ হিসেবে ৩০ হাজার টাকা নির্ধারণ। দারিদ্র্যসীমার ওপরে থাকতে হলে একজন মানুষের অন্ততঃ ২১০০ কিলো ক্যালরি খাদ্য মানের সমপরিমাণ আহার গ্রহণ করা অপরিহার্য। এটুকু নিশ্চিত করতে দৈনিক খরচ প্রয়োজন হয় ২২০ টাকার বেশি। একজন শ্রমিককে তার আহারের পেছনে ব্যয় করতে হয় তার আয়ের ৪৫%। অবশিষ্ট ৫৫% প্রয়োজন হয় বাসস্থান, চিকিৎসা, কাপড়-চোপড় ইত্যাদির জন্য। সেই হিসাবে অবশিষ্ট এসবের জন্য প্রয়োজন হয় আরো ২৫০ টাকার মতো। অর্থাৎ দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকার জন্য একজন শ্রমিককে শুধু তার একার জন্যই দৈনিক ন্যূনতম মোট ৪৫০ টাকা আয় করা অত্যাবশ্যক হয়। পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় যে, এদেশে একজন শ্রমিককে তার আয় দিয়ে গড়ে ২.৫ জন মানুষের ভরণ-পোষণ করতে হয়। সে হিসেবে তার দৈনিক ১,১২৫ টাকা অর্থাৎ মাসে ৩৩,৭৫০ টাকা রোজগার করা প্রয়োজন। শ্রমিকরা ‘জাতীয় ন্যূনতম মজুরি’ হিসেবে ৩০ হাজার টাকা দাবি করেছে। কোনোক্রমে নিছক দারিদ্র্যসীমায় বেঁচে থাকার জন্য এটি হলো সঙ্গতিপূর্ণ ন্যূনতম দাবি। এ দাবিকে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো কোটি-কোটি শ্রমজীবী মানুষের আপেক্ষিক দারিদ্র্য বৃদ্ধি করে, তাদের রক্ত নিংড়ানো শ্রম প্রসূত উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাৎ করে, মুনাফার পাহাড় গড়ার সুযোগ করা। এবারের মে দিবসে এদেশের শ্রমিকদের সামনে আরেকটি বড় ইস্যু হলো ‘শ্রম আইন’। শ্রম আইন নিয়ে বহুদিন ধরে তালবাহানা চলছে। শ্রম আইনের খসড়াটি সম্পর্কে মালিকদের সংগঠন সোজাসাপটা জানিয়ে দিয়েছে যে- সেটি যেহেতু যথেষ্ট পরিমাণে মালিকবান্ধব নয়, তাই সেটি গ্রহণযোগ্যনয়। এক্ষেত্রে কথা হলো- কে না জানে যে শ্রমিকের স্বার্থরক্ষার জন্য শ্রম আইন করা হয়। সেটি মালিকবান্ধব না হয়ে তা শ্রমিকবান্ধব হবে- এটিই হলো স্বাভাবিক। শ্রম আইন কেন আরো শ্রমিক বিরোধী ও মালিকবান্ধব হলো না- এমন প্রশ্ন যে আদৌ তোলা যেতে পারে, সেটিই একটি অবাক হওয়ার মতো ‘তামাশার’ বিষয় নয় কি? অবশেষে সরকার যে নতুন শ্রম আইন ও তার বিধি-বিধান ঘোষণা করেছে সেখানে মালিকদের অনেক ‘আবদার’ মেনে নেয়া হলেও শ্রমিকের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে রক্ষা করা হয়নি। শ্রমিকদের জীবনে কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তাহীনতা আরো একটি ভয়ঙ্কর বিপজ্জনক সমস্যা হয়ে উঠেছে। বয়লার বিস্ফোরণে, নির্মাণকাজ করতে গিয়ে, কারখানায় অগ্নিদগ্ধ হয়ে, সেফটি ট্যাঙ্ক পরিষ্কার করতে গিয়ে, বাসা-বাড়িতে ঝি-এর কাজ করতে গিয়ে- এভাবে প্রায় সব ক্ষেত্রেই মালিকের অবহেলা-নির্যাতনে মৃত্যু হচ্ছে শ্রমিকদের। গত সপ্তাহে রানা প্লাজা ট্র্যাজেডির ১৩ বছর পার হলো। রানা প্লাজায় সহস্রাধিক শ্রমিক চাপা পড়ে মৃত্যুবরণ করেছিল। শ্রমিকের জীবন তার কর্মস্থলে যে কতোটা অনিরাপদ, তা এই একটি ঘটনার মধ্য দিয়েই প্রত্যক্ষ হয়েছিল। শ্রমিক ও মেহনতি মানুষদের ভাত-কাপড়ের সমস্যাসমূহের শেষ নেই। তাই, উন্নত জীবনের জন্য শ্রেণি সচেতন হয়ে রুটি-রুজির জন্য সংগ্রাম করা ছাড়া তাদের কোনো গত্যন্তর নেই। সংগঠিত শ্রমিক শ্রেণিসচেতন শ্রমিক সংগঠিত হয়ে পথে নামলে তাদের রুখার ক্ষমতা কারো নাই। দেশের অন্যান্য সব অংশের মানুষ তাদের বেঁচে থাকার অধিকার ও শোষণ-বঞ্চনা থেকে মুক্তির সংগ্রামে শ্রমিক শ্রেণির ওপর নির্ভর করতে পারে। তাদের প্রতি দায়িত্ব পালনে শ্রমিক শ্রেণিকে সচেতন থাকতে হবে। তাছাড়া, দেশ-বিদেশের ঘটনাবলি সম্পর্কে সে তার চোখ বন্ধ করে রাখতেও পারে না। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্ব ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণ, নিরপেক্ষ নির্বাচন ও ভোটাধিকার, সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়ানো ইত্যাদি বিষয়গুলো শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোকে সমর্থন জানিয়ে সংহতি গড়ে তোলার কাজটিও আমাদের দেশসহ সব দেশের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এবারের মে দিবসে লুটপাটতন্ত্র রুখে দাঁড়ানো, সাম্রাজ্যবাদী ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ, এবং সাম্প্রদায়িক অপশক্তি মোকাবিলায় সংগ্রাম জোরদার করা এখন বিশেষ জরুরি কর্তব্য হয়ে উঠেছে। সাম্প্রদায়িক ধর্ম ব্যবসায়ী জামাতিরা শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য এবং মানুষের দৃষ্টি তার ভাত-কাপড়, রুটি-রুজির ইহলৌকিক সমস্যাগুলো থেকে অন্যদিকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে পবিত্র ধর্মের অপব্যবহার করে চলেছে। শ্রমিকদের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো, ধর্মীয় পরিচয় বিবেচনা করে মালিক কখনো শ্রমিকের মজুরির হার কম বেশি করে না। মালিকের কাছে শ্রমিকের শ্রম-শক্তিই হলো কাক্সিক্ষত সম্পদ, যা কিনে নিয়ে তা ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য সে মুনাফা হিসেবে আত্মসাৎ করে। সেই শ্রম-শক্তি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ-খ্রিস্টান যেকোনো ধর্মাবলম্বী মানুষেরই মধ্যে হোক না কেন, তাতে মালিকের কিছু যায় আসে না। শোষণের ক্ষেত্রে মালিক ধর্ম পরিচয়কে হিসাবে নেয় না। অথচ শ্রমিকরা যেন শ্রেণি হিসেবে এক হওয়ার পথে যেতে না পারে সেজন্য জামাতিসহ সাম্প্রদায়িক অপশক্তিগুলো মালিকের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদের ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চিন্তায় আচ্ছন্ন করে রাখতে চায়। সমস্যার পাহাড় জমতে জমতে মানুষ আজ দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থায় পৌঁছে গেছে। কে ঘুচাবে তাদের জীবনের এই দুঃসহ অবস্থা? ইতিহাস এ কথা বলে যে, মেহনতি মানুষই এই বঞ্চনা ও সংকট থেকে পরিত্রাণের পথ তৈরি করতে পারে। সেজন্য তাদের বাম-প্রগতিশীল যুক্তফ্রন্ট গঠন করে রাষ্ট্রক্ষমতা হাতে নিয়ে দেশের অর্থনৈতিক সামাজিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন সাধন করতে হবে। সেজন্য দেশবাসীর লড়াই-সংগ্রামে নতুন দিনের সূচনা করা আজ ‘ইতিহাসের দাবি’। দেশবাসীকে, বিশেষত দেশের শ্রমজীবী মানুষকে, সেই নতুন দিনের জন্য সংগ্রাম সূচনার ঘোষণা নিয়ে এবারের মে দিবস পালন করতে হবে। দেশের গ্রাম ও শহরের সব মানুষ, বিশেষত শ্রমিক ও মেহনতি মানুষের কানে আজ এই বার্তা পৌঁছে দিতে চাই, ডাক দিয়ে বলতে চাই–“জাগো বাহে, কোনঠে সবাই”। এবার শুরু হোক তবে শোষণমুক্তির শেষ লড়াই!