কিছু শিশুদের জন্য গণিত কঠিন কেন? মস্তিষ্কের স্ক্যান দিল নতুন সূত্র
Posted: 19 এপ্রিল, 2026
একতা বিজ্ঞান ডেস্ক :
অনেক শিশুর জন্য গণিত বিষয়টি অন্যদের তুলনায় বেশি কঠিন হয়ে ওঠে। দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক ও গবেষকরা এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজে আসছেন-কেন কিছু শিশু গণিত শেখায় বেশি সমস্যায় পড়ে? সাম্প্রতিক এক স্নায়ুবিজ্ঞান গবেষণা এ বিষয়ে নতুন কিছু সূত্র দিয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে, গণিতে শেখার সমস্যায় ভোগা শিশুদের মস্তিষ্ক গণিতের প্রতীক বা সংখ্যাকে ভিন্নভাবে প্রক্রিয়া করে।
গবেষণাটি প্রকাশিত হয়েছে বৈজ্ঞানিক সাময়িকী জার্নাল অব নিউরোনায়েন্স এ। গবেষণাটি পরিচালনা করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের সান হোসে স্টেট ইউনিভার্সিটির কগনিটিভ নিউরোসায়েন্টিস্ট হাইসাং চ্যাং এবং তার সহকর্মীরা।
গবেষণায় দ্বিতীয় ও তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরীক্ষা করা হয়। অংশগ্রহণকারী শিশুদের মধ্যে কিছু ছিল যাদের গণিত শেখায় সমস্যা রয়েছে, আর কিছু ছিল যাদের গণিত দক্ষতা স্বাভাবিক। গবেষণার সময় শিশুদের ১ থেকে ৯ পর্যন্ত দুটি সংখ্যা দেখিয়ে জিজ্ঞেস করা হয়, কোন সংখ্যাটি বড়। তাদের উত্তর দিতে কয়েক সেকেন্ড সময় দেওয়া হয়। একই সঙ্গে শিশুদের মস্তিষ্কের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করতে এমআরআই স্ক্যান ব্যবহার করা হয়।
গবেষণায় দেখা যায়, গণিত শেখায় সমস্যাগ্রস্ত শিশুরা উত্তর দেওয়ার সময় তুলনামূলকভাবে কম সতর্ক ছিল এবং ভুল করার পরও তারা নিজেদের গতি কমায়নি। অন্যদিকে, যেসব শিশু গণিতে স্বাভাবিক দক্ষ, তারা ভুল করার পর কিছুটা সময় নিয়ে পরবর্তী প্রশ্নের উত্তর দেয় এবং আরও সতর্কভাবে সমস্যা সমাধান করে।
গবেষকদের বিশ্লেষণে দেখা যায়, গণিতে সমস্যায় থাকা শিশুদের ক্ষেত্রে মস্তিষ্কের মিডল ফ্রন্টাল জাইরাস নামের একটি অংশে তুলনামূলক কম কার্যকলাপ দেখা যায়। এই অংশটি সংখ্যাগত তথ্য প্রক্রিয়াকরণ, মনোযোগ ধরে রাখা এবং আচরণ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে সম্পর্কিত। আবার ভুল শনাক্ত করা এবং নিজের কাজ পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সম্পর্কিত আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ অ্যান্টেরিয়র সিঙ্গুলেট কর্টেক্স-এও কম সক্রিয়তা দেখা যায়।
তবে গবেষণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, যখন একই ধরনের সমস্যা সংখ্যার পরিবর্তে ডট বা বিন্দুর মাধ্যমে দেখানো হয়, তখন এই পার্থক্যগুলো আর দেখা যায় না। অর্থাৎ গণিত শেখায় সমস্যাগ্রস্ত শিশুরা তখন প্রায় একইভাবে সমস্যা সমাধান করতে পারে, যেমনটি করে স্বাভাবিক দক্ষতার শিশুরা।
বেলজিয়ামের কেএউ ল্যুভেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাবিষয়ক স্নায়ুবিজ্ঞানী বার্ট ডে স্মেডট, যিনি এই গবেষণায় সরাসরি যুক্ত ছিলেন না, বলেন যে সংখ্যার প্রতীক বোঝা অনেক শিশুর জন্যই বড় চ্যালেঞ্জ। তাঁর মতে, সংখ্যাকে প্রতীক হিসেবে বোঝা এবং তা ব্যবহার করার প্রক্রিয়াই অনেক সময় শিশুদের জন্য কঠিন হয়ে ওঠে।
গবেষকদের মতে, এই গবেষণা দেখায় যে গণিত শেখার বিষয়টি শুধু একটি নির্দিষ্ট মস্তিষ্কের অংশের ওপর নির্ভর করে না। বরং মনোযোগ, তথ্য বিশ্লেষণ, ভুল শনাক্তকরণ এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের সঙ্গে জড়িত একাধিক মস্তিষ্ক অঞ্চল একসঙ্গে কাজ করে। বিজ্ঞানীরা আশা করছেন, ভবিষ্যতে এই ধরনের গবেষণা শিশুদের শেখার সমস্যাগুলো আরও ভালোভাবে বোঝার পথ খুলে দেবে এবং তাদের জন্য কার্যকর শিক্ষা সহায়তা ব্যবস্থা তৈরিতে ভূমিকা রাখবে।
গবেষক হাইসাং চ্যাং মনে করেন, এই গবেষণার ফলাফল ভবিষ্যতে শিক্ষাব্যবস্থায় নতুন দৃষ্টিভঙ্গি আনতে পারে। বিশেষ করে গণিতে সমস্যাগ্রস্ত শিশুদের জন্য এমন শিক্ষণ পদ্ধতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে, যেখানে সমস্যা সমাধানের কৌশল, ধৈর্য এবং ভুল থেকে শেখার অভ্যাস গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।