মহাবিশ্ব গঠনে ‘স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল’ নিয়ে নতুন ধারণা
Posted: 19 এপ্রিল, 2026
একতা বিজ্ঞান ডেস্ক :
মহাবিশ্বের মৌলিক গঠন কেমন-এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছেন পদার্থবিদরা। সাম্প্রতিক এক তাত্ত্বিক গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমন একটি ধারণা তুলে ধরেছেন, যা মহাবিশ্বের কাঠামো সম্পর্কে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি দিতে পারে। গবেষকদের মতে, মহাবিশ্বের স্থান ও সময়ের মিলিত কাঠামোতে ‘স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল’ নামে এক ধরনের বিশেষ গঠন থাকতে পারে।
কোয়াসিক্রিস্টাল হলো এমন এক ধরনের গঠন যা দেখতে সুশৃঙ্খল হলেও এর প্যাটার্ন কখনো নিয়মিতভাবে পুনরাবৃত্তি হয় না। সাধারণ স্ফটিক বা ক্রিস্টালে একটি নির্দিষ্ট নকশা বারবার পুনরাবৃত্তি হয়। যেমন মেঝের টাইলস বা দেয়ালের ওয়ালপেপারে একই নকশা বারবার দেখা যায়। কিন্তু কোয়াসিক্রিস্টালের ক্ষেত্রে এমন পুনরাবৃত্তি নেই, যদিও এর গঠন সুশৃঙ্খল থাকে।
এ ধরনের কোয়াসিক্রিস্টাল বাস্তব জগতেও পাওয়া গেছে। বিজ্ঞানীরা উল্কাপিণ্ডে এবং ইতিহাসের প্রথম পারমাণবিক বোমা পরীক্ষার ধ্বংসাবশেষেও এ ধরনের গঠন শনাক্ত করেছেন। তবে নতুন গবেষণায় বিজ্ঞানীরা দেখিয়েছেন, এই ধারণাটি শুধু পদার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়-এটি স্থান ও সময়ের সমন্বিত কাঠামোতেও প্রযোজ্য হতে পারে।
আইনস্টাইনের বিশেষ আপেক্ষিকতার তত্ত্ব অনুযায়ী, মহাবিশ্বকে বোঝার জন্য স্থান এবং সময়কে আলাদা করে দেখা যায় না। এ দুটিকে একত্রে ‘স্পেসটাইম’ বা স্থান-সময় বলা হয়। নতুন গবেষণায় পদার্থবিদরা ধারণা দিয়েছেন যে এই স্পেসটাইম নিজেই কোয়াসিক্রিস্টালের মতো একটি গঠন ধারণ করতে পারে।
গবেষণাটি এখনো তাত্ত্বিক পর্যায়ে রয়েছে এবং এটি অনলাইন গবেষণা ভাণ্ডার ধৎঢরা-এ জমা দেওয়া হয়েছে। গবেষণার সহলেখক কানাডার পেরিমিটার ইনস্টিটিউটের পদার্থবিদ সোটিরিস মিগডালাস বলেন, মহাবিশ্বের স্থান-সময় কাঠামো নিজেই হয়তো কোয়াসিক্রিস্টালের মতো আচরণ করতে পারে।
গবেষণায় বিজ্ঞানীরা গণিতের সাহায্যে একটি বিশেষ মডেল তৈরি করেছেন। তারা উচ্চমাত্রিক একটি বিন্দুসমষ্টি থেকে চার মাত্রিক একটি অংশ নির্বাচন করে সেটিকে প্রক্ষেপণ করার মাধ্যমে এই গঠন কল্পনা করেন। এই প্রক্ষেপণের ঢাল একটি অমূলদ সংখ্যা- যেমন পাই-যা দুইটি পূর্ণসংখ্যার ভগ্নাংশ হিসেবে প্রকাশ করা যায় না। এই বৈশিষ্ট্যের কারণে তৈরি হওয়া গঠনটি কখনো একইভাবে পুনরাবৃত্তি হয় না, কিন্তু তবুও তা সুশৃঙ্খল থাকে।
এই ধারণার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো এটি লরেঞ্জ সিমেট্রি নামের একটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। লরেঞ্জ সিমেট্রি অনুযায়ী, পদার্থবিজ্ঞানের নিয়ম একজন স্থির পর্যবেক্ষক এবং আলোর গতির কাছাকাছি গতিতে চলা পর্যবেক্ষকের জন্য একই থাকে। সাধারণ স্ফটিক বা কোয়াসিক্রিস্টাল এই নিয়ম পুরোপুরি মানে না। কিন্তু নতুন প্রস্তাবিত স্পেসটাইম কোয়াসিক্রিস্টাল এই সমতা বজায় রাখতে পারে।
গবেষকদের মতে, এই ধারণা কোয়ান্টাম গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষের কোয়ান্টাম তত্ত্ব বোঝার ক্ষেত্রেও সহায়ক হতে পারে। কিছু তত্ত্ব অনুযায়ী খুব ক্ষুদ্র স্তরে স্পেসটাইম অসংখ্য বিন্দু দিয়ে গঠিত। কোয়াসিক্রিস্টালের মতো কাঠামো সেই বিন্দুগুলোকে সাজানোর একটি সম্ভাব্য উপায় হতে পারে।
এছাড়া স্ট্রিং তত্ত্বের ক্ষেত্রেও এই ধারণার প্রভাব থাকতে পারে। স্ট্রিং তত্ত্ব অনুযায়ী মহাবিশ্বে মোট ১০টি মাত্রা থাকতে পারে। আমরা যদিও তিনটি স্থানিক মাত্রা এবং একটি সময়মাত্রা অনুভব করি, তবু বাকি মাত্রাগুলো অত্যন্ত ক্ষুদ্র আকারে ‘কুঁকড়ে’ থাকতে পারে। কোয়াসিক্রিস্টালের ধারণা ব্যবহার করে এই অতিরিক্ত মাত্রাগুলোর সম্ভাব্য বিন্যাস ব্যাখ্যা করা যেতে পারে বলে মনে করছেন গবেষকরা।
তবে বিজ্ঞানীরা স্বীকার করছেন, এই ধারণা এখনো অনেকটাই অনুমানভিত্তিক এবং এর সত্যতা যাচাই করতে আরও গবেষণা প্রয়োজন। তবুও অনেক পদার্থবিদ এই ধারণাকে অত্যন্ত আকর্ষণীয় বলে মনে করছেন, কারণ এটি মহাবিশ্বের মৌলিক কাঠামো বোঝার নতুন পথ খুলে দিতে পারে।