শ্রেণি চেতনার সংকট ও নগরের
প্রান্তিক মেহনতি মানুষের লড়াই
Posted: 19 এপ্রিল, 2026
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট ও প্রগতিশীল আন্দোলনের ইতিহাসে এক দীর্ঘস্থায়ী সীমাবদ্ধতা হলো এর নেতৃত্বের একটি বড় অংশের ‘মধ্যবিত্ত সুলভ চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য’। এই বৈশিষ্ট্য নগরের অতি-শোষিত রিকশা শ্রমিক ও হকারদের আন্দোলনকে বিচার করার ক্ষেত্রে প্রায়ই এক ধরনের তাত্ত্বিক ও দৃষ্টিভঙ্গিগত সংকটের জন্ম দেয়।
মার্কসীয় দর্শনে সর্বহারার মুক্তির কথা বলা হলেও, বাস্তব রাজনীতির ময়দানে দেখা যায় যে, রাজপথের এই বিশাল অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতের মেহনতি মানুষের প্রতি কতিপয় তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মীর দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় সহমর্মিতার বদলে এক ধরনের নিস্পৃহতা বা সংশয়ে পর্যবসিত হয়। এই নেতিবাচক বা নিষ্ক্রিয় মনোভাবের মূল কারণ হলো সংশ্লিষ্ট কর্মীদের নিজস্ব শ্রেণি-অবস্থান, সাংগঠনিক কাজে যথাযথভাবে যুক্ত না থাকা এবং তাত্ত্বিক চর্চায় রয়ে যাওয়া এক ধরনের সীমাবদ্ধতা। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, শিক্ষিত মধ্যবিত্ত পটভূমি থেকে আসা কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মী রিকশা বা হকারদের আন্দোলনকে কেবল ‘আইনশৃঙ্খলার সংকট’ বা ‘নাগরিক ভোগান্তি’ হিসেবে দেখার বুর্জোয়া ফাঁদে পা দেন। তারা ভুলে যান যে, পুঁজিবাদ কেবল কারখানার চার দেয়ালের ভেতর শোষণ চালায় না, বরং নগরের প্রতিটি মোড়ে মেহনতি মানুষকে নিংড়ে নেয়। এই বিচ্যুতি আসলে ভ্লাদিমির লেনিনের সেই সতর্কবার্তাকেই স্মরণ করিয়ে দেয়, যেখানে তিনি বলেছিলেন– “বিপ্লবী তত্ত্ব ছাড়া বিপ্লবী আন্দোলন সম্ভব নয়।” কিন্তু যখন তত্ত্ব জীবনের জীবন্ত অভিজ্ঞতা ও প্রান্তিক মানুষের সংগ্রাম থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে, তখন তা কেবল তাত্ত্বিক বিলাসিতায় পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে থাকে।
এই সংকটের একটি অন্যতম কারণ হচ্ছে শ্রমিকশ্রেণিকে কেবল ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রলেতারিয়েত’ বা প্রথাগত কলকারখানার শ্রমিকের ছাঁচে দেখার একরোখা প্রবণতা। কার্ল মার্কস ‘দ্য এইটিন্থ ব্রুমেয়ার অফ লুই বোনাপার্ট’-এ ‘লুম্পেন প্রলেতারিয়েত’ সম্পর্কে যে সতর্ক আলোচনা করেছিলেন, অনেক সময় হকার বা রিকশা শ্রমিকদের সেই নেতিবাচক কাতারে ফেলে দেওয়ার একটি ভুল প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। অথচ তারা বুঝতে ব্যর্থ হন যে, তৃতীয় বিশ্বের এই নব্য-উদারবাদী অর্থনীতিতে হকার এবং রিকশা শ্রমিকরা লুম্পেন নয়, বরং তারা নগরের অর্থনীতির সচল রাখার প্রধান কারিগর।
আন্তোনিও গ্রামসি তাঁর ‘প্রিজন নোটবুকস’-এ ‘হেজেমনি’ বা সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কথা বলেছেন। আমাদের অনেক কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মী অবচেতনভাবে বুর্জোয়াদের তৈরি করা ‘আধুনিক ও পরিচ্ছন্ন নগরীর’ সেই কৃত্রিম আধিপত্যের কাছে নতিস্বীকার করেন, যা মূলত গরিব মানুষকে উচ্ছেদ করে ধনীদের জন্য স্বর্গ তৈরি করতে চায়। ফলে যখন একজন হকার ফুটপাতে বসার অধিকার চায় বা একজন রিকশাচালক উচ্ছেদের বিরুদ্ধে রাস্তা অবরোধ করে, তখন একদল কর্মী শ্রমিকদের পক্ষে বলিষ্ঠভাবে না দাঁড়িয়ে পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের ‘উচ্ছেদ ও তথাকথিত শৃঙ্খলা’র যুক্তিকেই মান্যতা দেন। এই ধরনের আচরণ শ্রমিকদের মধ্যে বামপন্থার প্রতি অনাস্থা তৈরি করে এবং তাদের অন্যান্য প্রতিক্রিয়াশীল ও বিদ্যমান বুর্জোয়া রাজনীতির সহজ শিকারে পরিণত করে।
বুর্জোয়া হেজিমনির কাছে নতিস্বীকারকারীরা ভুলে যান কমিউনিস্টদের এই লড়াই কেবল উচ্ছেদ প্রতিরোধের লড়াই নয়; বরং এটি একটি বিকল্প ও মানবিক নগর পরিকল্পনার লড়াই। অনেকেই মনে করেন, হকার বা রিকশা থাকলে শহর অচল হয়ে পড়বে কিংবা সৌন্দর্য নষ্ট হবে। এটি একটি ভুল ধারণা। কমিউনিস্টদের বৈজ্ঞানিক ও জনবান্ধব নগর পরিকল্পনা অনুযায়ী, হকার ও রিকশা শ্রমিকদের উচ্ছেদ না করে বরং তাদের সুশৃঙ্খলভাবে পুনর্বাসন ও নির্দিষ্ট জোনে ভাগ করার মাধ্যমে একটি বাসযোগ্য সুন্দর নগরী গড়ে তোলা সম্ভব। হকারদের জন্য নির্দিষ্ট মার্কেট, ফুটপাতে হাঁটার জায়গা রেখে সুন্দর কিয়স্ক (করড়ংশ) বা নির্দিষ্ট সময়সীমা নির্ধারণ করে দিলে যেমন পথচারীদের সুবিধা হয়, তেমনি হাজার হাজার মানুষের জীবিকাও রক্ষা পায়। একইভাবে, রিকশার জন্য আলাদা লেন বা সুপরিকল্পিত রুট পারমিটের ব্যবস্থা থাকলে যানজট হ্রাস পায় এবং পরিবেশবান্ধব যাতায়াত নিশ্চিত হয়। কমিউনিস্ট আন্দোলনের কর্মীকে মনে রাখতে হবে, নগরীর সৌন্দর্য কেবল দালানকোঠা বা চওড়া রাস্তায় নয়, বরং নগরীর আসল সৌন্দর্য লুকিয়ে আছে তার প্রতিটি নাগরিকের অন্ন, বস্ত্র ও কর্মসংস্থানসহ জীবনমান উন্নয়নের নিশ্চয়তার মধ্যে। মেহনতি মানুষকে উচ্ছেদ করে যে ‘ক্লিন সিটি’র স্বপ্ন বুর্জোয়ারা দেখায়, তা আসলে একটি অমানবিক ও বৈষম্যমূলক কাঠামো। প্রকৃত কমিউনিস্ট আন্দোলন এমন একটি নগরের পরিকল্পনা দেয় যেখানে হকার, রিকশা শ্রমিক এবং উচ্চবিত্ত- সবারই সম্মানজনক সহাবস্থান থাকবে।
কমিউনিস্ট আন্দোলনে এই মধ্যবিত্তসুলভ মানসিকতা ও পরিকল্পনাহীনতার প্রভাব অত্যন্ত ক্ষতিকর। এটি কেবল আন্দোলনের জনভিত্তিকেই সংকুচিত করে না, বরং আন্দোলনের বিপ্লবী চরিত্রকেও জনবিচ্ছিন্ন করে দেয়। ফ্রাঞ্জ ফানো তাঁর ‘দ্য রেচেড অফ দ্য আর্থ (জগতের লাঞ্ছিত নামে অনুবাদকৃত) গ্রন্থে অত্যন্ত জোরালোভাবে বলেছিলেন যে, শহরের প্রান্তিক ও সর্বহারা মানুষরাই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় বিস্ফোরক শক্তি। কিন্তু যখন আন্দোলনের কর্মীরা এই শক্তির সাথে দূরত্ব বজায় রাখে, তখন তারা মূলত নিজেদেরই পঙ্গু করে ফেলে। রিকশা শ্রমিক ও হকাররা রাজপথে অসীম লড়াই করার ক্ষমতা রাখে। এই শ্রমিকদের উপেক্ষা করার অর্থ হলো একটি সম্ভাব্য গণবিপ্লবের মূল চালিকাশক্তিকে স্বেচ্ছায় বিসর্জন দেওয়া। এই বিচ্ছিন্নতার ফলে যাদের বিপ্লবী দল হওয়ার কথা, তারা ক্রমান্বয়ে ক্ষুদ্র ও জনবিচ্ছিন্ন চক্রে পরিণত হতে পারে। যেখানে তত্ত্ব আছে কিন্তু সেই তত্ত্ব প্রয়োগ করার মতো জীবন্ত মানুষের অভাব। এটি একটি বিপ্লবী দলের বিকাশের পথকে রুদ্ধ করে দেয় এবং রাজপথকে প্রতিক্রিয়াশীল ও বিদ্যমান বুর্জোয়া শক্তির হাতে ছেড়ে দেয়।
এই সংকট থেকে উত্তরণের পথ হলো ‘শ্রেণিবিচ্যুতি’ বা ডি-ক্লাসিং (De-classing)। মাও সে তুং যেমনটি বারবার তাগিদ দিয়েছিলেন যে, বুদ্ধিজীবীদের উচিত শ্রমিকের কাতারে গিয়ে তাদের কাছ থেকে জীবন ও সংগ্রামের শিক্ষা গ্রহণ করা। কমিউনিস্ট হিসেবে যদি সফল হতে হয়, তবে কর্মীদের ব্যক্তিগত ড্রইংরুম রাজনীতি ও মধ্যবিত্ত মানসিকতা ত্যাগ করে রিকশা গ্যারেজ এবং ফুটপাতের হকারদের জীবন সংগ্রামের কাছে যেতে হবে। নগরের কর্পোরেট সৌন্দর্য বা তথাকথিত শৃঙ্খলার চেয়ে শ্রমিকের পেটের লড়াই এবং তাদের পরিকল্পিত পুনর্বাসনকে বড় করে দেখতে হবে। রিকশাচালকের ভাঙা গলার স্লোগান বা হকারের ধুলোমাখা জীবনের মধ্যেই খুঁজে নিতে হবে সমতার সমাজের নতুন ইশতেহার। শ্রমিকদের চেতনা ও জ্ঞানগত মান বৃদ্ধি করতে ভূমিকা রেখে বিকল্প সাংস্কৃতিক হেজিমনি তৈরি করতে হবে। নীতি নির্ধারণী পর্যায়ে সরাসরি এই শ্রমিকদের মধ্য থেকে নেতৃত্ব তুলে আনতে হবে।
যতদিন পর্যন্ত আন্দোলনের কর্মীরা তাদের নিজস্ব ‘শ্রেণিগত সংস্কার’ ভেঙে রাজপথের এই রুক্ষ ও সাহসী শ্রমিকদের সাথে একাত্ম হতে না পারবে এবং তাদের জীবিকা নিশ্চিত করে একটি মানবিক নগরীর রূপরেখা জনসমক্ষে তুলে ধরতে না পারবে, ততদিন পর্যন্ত তাদের ‘বিপ্লব’ কেবল কাগুজে-দলিলেই সীমাবদ্ধ থাকবে। রিকশা ও হকারদের আন্দোলনকে যারা বিরূপ চোখে দেখেন, তাদের মনে রাখা উচিত- বিপ্লব কোনো ড্রয়িংরুমের সেমিনার নয়, এটি শোষিত মানুষের বজ্রমুষ্টির লড়াই। তাই ফ্রাঞ্জ ফানো’র ‘দ্য রেচেড অফ দ্য আর্থ’ (জগতের লাঞ্ছিত নামে অনুবাদকৃত) গ্রন্থের শেষ ভাগের কয়েকটি লাইনের সেই ঐতিহাসিক আহ্বানের মাধ্যমেই আমাদের পথ চলতে হবে- কমরেডগণ, আসুন এক্ষুণি এই মুহূর্তে আমরা আমাদের পথ বদলে ফেলার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করি। যে নিচ্ছিদ্র অন্ধকারের মধ্যে আমরা নিমজ্জিত, তাকে কাটিয়ে উঠতে হবে, পেছনে ফেলে আসতে হবে তাকে। যে নতুন দিন সমাগত তাতে আমরা থাকব দৃঢ়, পরিণামদর্শী এবং স্থির-প্রতিজ্ঞ।
রিকশা ও হকারদের অধিকার আদায়ের লড়াই কেবল তাদের একার নয়, এটি একটি বৈষম্যহীন ও সত্যিকারের সুন্দর সমাজ গড়ার লড়াই। এই লড়াইয়ে জয়ী হতে হলে আমাদের শ্রমিকের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে দাঁড়াতে হবে, তবেই সূচিত হবে প্রকৃত মুক্তি।
লেখক : সংগঠক, কেন্দ্রীয় কমিটি, সিপিবি ও যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক, রিকশা-ভ্যান-ইজিবাইক শ্রমিক ইউনিয়ন