সিপিবির পথ পরিক্রমণের তথ্য-কণিকা

Posted: 19 এপ্রিল, 2026

একতা ডেস্ক : [এই কলামটি সাপ্তাহিক একতার ৫৬ বর্ষের ৩২ নং সংখ্যা থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করা হচ্ছে।] (৬) । এক। (১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫০ তারিখে পার্টির প্রাদেশিক কমিটির কাছে ময়মনসিংহের পাহাড়ী এলাকার পার্টির নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহের খবরা-খবর জানিয়ে আঞ্চলিক কমিটির পাঠানো রিপোর্টের কিছু অংশ) (বানানরীতি অপরিবর্তিত) “সর্বাগ্রে আপনাদের বৈপ্লবিক কর্মকৌশলের কথা স্মরণ করিয়া আমাদের বিপ্লবী অভিনন্দন গ্রহণ করিতে অনুরোধ করি। .... আশা করি আপনারাও ময়মনসিংহের মত একটা বিরাট জেলার ৬০ লক্ষ অধিবাসী শোষিত, নির্যাতিত, অত্যাচারিত জনতার কাছ হইতে অনেক কিছু শিখিবার সাহায্য পাইবেন। খাঁটি মার্কসবাদীরা এইভাবেই পরস্পরের সাহায্যে কোটি কোটি অত্যাচারিত জনতাকে মুক্তির পথে লইয়া যাইতে সক্ষম হয়। আজ ময়মনসিংহের উত্তর অঞ্চল হাজং এলাকায় ইহাই সম্ভবপর হইয়াছে। “ .... পি.সি. এবং জোনাল কমিটির নেতৃত্বে গত ৬ই হইতে ১০ই জানুয়ারী পর্যন্ত জেলা কমিটির সভা শেষ করি। ৬ নং এ.পি এলাকার নিরাপদ স্থানে শত্রুকে ফাঁকী দিয়া জেলা কমিটির মিটিং সুষ্ঠুভাবে পরিচালনা করি। .... জেলা কমিটির আমূল পরিবর্তন এবার সব দিক দিয়াই দেখা দিয়াছে। মার্কস্ লেনিন স্ট্যালিনবাদের শ্রমিকশ্রেণীর দৃষ্টিভঙ্গীতে জেলা কমিটির গঠনমূলক কাজ সুসম্পন্ন হইতে না হইতেই জিলার ছাত্র ফ্রন্টে বিরাট বিক্ষোভ পূর্ব পাকিস্তানে পূর্বপাকিস্তান নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার বিরুদ্ধে ফাটিয়া পড়িতে থাকে। .... পাহাড় এলাকার জনতার বিক্ষোভ আজ চূড়ান্ত রাজনৈতিক সংগ্রামে পরিণত হইয়া এলাকা দখলের সংগ্রামে অংশ গ্রহণ করিতেছে। .... ঐ দিন যখন ৭ জন পুলিশ রাস্তায় গার্ড দিতেছিল তখন সংগঠিত কয়েকজন জঙ্গী বাহিনী সাথে ৩০/৩৫ জন জনতা মিলিয়া তাদেরকে বহুদূরে তাড়াইয়া দিয়া চলিয়া আসে। পুলিশ বাহিনী দৌড়াইয়া ঊর্ধ্বশ্বাসে ক্যাম্পে চলিয়া যায়। ভীরু পুলিশেরা সংগঠিত জনতা দেখিয়া গুলি চালাইতেও সাহস করে না। .... জঙ্গীরা দৈনন্দিন গেরিলা কায়দার কৌশল অবলম্বন করিতেছে। .... ১৫ই জানুয়ারী ৯ নং এর জঙ্গী ক্যাম্প আক্রমণ হয়। ৭ জন জঙ্গী কাংশাতে এক পাহাড়ে হেড কোয়ার্টার ঠিক করিয়া এলাকার কাজ আরম্ভ করিতে থাকে। ভাড়াটিয়া পুলিশ দল দিনের বেলায় অতর্কিতে আক্রমণ চালায়। ৭ জন জঙ্গী বাহিনীর মধ্যে ৩ জন অন্যত্র কাজে গিয়াছিল। সেই সময় তাদের অপেক্ষায় না থাকিয়া মাত্র ৪ জন জঙ্গীই ২০ জন পুলিশ বাহিনীর সঙ্গে আধ ঘন্টার উপর পাথর চালাইয়া প্রতিরোধ করে। ৩ জন পুলিশ আহত হয়, জঙ্গীরা কেহ আহত হয় নাই। অবশেষে পাথর নিঃশেষ হইলে জঙ্গীরা গেরিলা কায়দায় আত্মরক্ষা করে। .... “.... পুনরায় ১০ই জানুয়ারী ৮/৯ জন পুলিশ আনসার সহ ১৫/১৬ জন মিলিয়া দুই দিক দিয়া হঠাৎ আক্রমণ চালায়। আমাদের জঙ্গী সংখ্যায় ছিল ২০ জন। ৪০/৪৫ মিনিট তুমুল লড়াই হয়, ১৫০ রাউন্ড গুলি চালায়। আমাদের জঙ্গীরা দৃঢ়তার সহিত লড়াই করিয়া ২ জন আনসারকে আহত করে। আমাদের জঙ্গীরা গাছ ও পাহাড়ের উপর আশ্রয় লইয়া পুলিশ আনসারদের তাড়াইয়া দেয়।.... “.... কাংশার নিকট হইতে মুসলমান জনতার মেয়েরা ছুটাছুটি করিতেছে দেখিয়া তাহাদেরকে কমিউনিস্ট মনে করিয়া পুলিশ গুলী চালায়। এক জন মুসলমান মহিলা আহত হয়। গরীব মুসলমান মেয়েটিকে অন্যায়ভাবে আক্রমণ করিয়াছে দেখিয়া সাধারণ জনতার মধ্যে নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার পুলিশ বাহিনীর উপর ঘৃণার আগুন জ্বলিতে শুরু করিয়াছে।.... “ .... জমিদারী জোতদারী উচ্ছেদ লড়াই শুরু হইয়াছে.... “.... (ক) গত জুলাই আগস্ট হইতে সারা পাহাড় এলাকায় জমিদারী উচ্ছেদ ও খাজনা বন্ধের প্রচার ব্যাপকভাবে চলিতেছে। .... প্রচারের সঙ্গে সঙ্গে ক্ষিপ্ত জনতা জমিদারের কর্মচারীদের গ্রামে আসিয়া খাজনা পুণ্যাহ কালেকশন করিতে নিষেধ করিতেছে। লনুয়া পাড়া, গচ্ছিয়া পাড়া, নলগড়া, বন্দর কাটা, নাগের পাড়া প্রভৃতি গ্রামের বিক্ষুব্ধ জনতা পুণ্যাহর জট্ পোড়াইয়া ফেলিয়াছে। .... এবার ফসলের সময় খাজনা তহশিলে আসিলে তাদেরকে এ্যরেষ্ট করিয়া কর্মচারীদের তাড়াইয়া দিয়া হয়। জমিদার কামাখ্যা আহত অবস্থায় গরুর গাড়ী করিয়া বালুর ঘাট পৌঁছায়। হালুয়া ঘাটের মুসলমান জনতা এই সংবাদ পাইলে পর জমিদার কামাখ্যা চৌধুরীকে নিন্দাবাদ করে এবং টিটকারী দিয়া কমিউনিস্ট পার্টিকে সমর্থন জানায়। হাজং, গারো, বাগাই, মুসলমান গরীব কৃষকেরা সকলেই উৎসাহিত হয়। “.... (খ) সারা পাহাড় এলাকায় জোতদারের খামার উচ্ছেদ শুরু হইয়া গিয়াছে এবং চলিবে। বৎসরের প্রথম দিক হইতেই চূড়ান্তভাবে জোতদার ও ধনী কৃষকের খামার উচ্ছেদ শুরু হইয়াছে। ৭ নং এলাকার জঙ্গী জনতা ২৯শে জানুয়ারী বাহাশলীর চূড়ার প্রভাত মণ্ডলের বাড়ীর ৬টি টিনের ঘর দখল করিয়াছে। .... প্রায় ১৭৫ বিঘা জমি দখলে আসিয়াছে। এখন সংগ্রাম কমিটির মারফত ইহা ভূমিহীন কৃষকদের বণ্টন করা হইবে। ৬ নং এলাকায় ৩১ জানুয়ারী হইতে খামার উচ্ছেদ শুরু হইয়াছে। ঐ দিন কমরেড সুরেন্দ্র ও রাসমণি শহীদ দিবসে এখানে জমায়েত হওয়া সারা এলাকার প্রায় ৩০০ জঙ্গী জনতা রাস পাড়াতে ভরত চন্দ্র সাহার খামারে ৬টি টিনের ঘরে আগুন লাগাইয়া দেয়। সঙ্গে বিজয় সাহা, বুদিয়া সাহা, সুরেন সাহা ও হরেন্দ্র সাহা প্রভৃতির খামার পোড়াইয়া দিয়াছে। উক্ত ১১টি জোতদারের নিকট হইতে ২০/২৫ হাজার বিঘা জমি আটকাইয়া রাখিয়াছে, এখন জমি বণ্টনের কাজ শুরু হইবে। .... । দুই। (একই সময়ের [১৯৫০] পার্র্টির প্রচারিত একটি হ্যান্ডবিলের কিয়দাংশ) “মৈমনসিংহ-এর হাজং এলাকায় নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার পাশবিক অত্যাচারের জবাব দাও সভা-মিছিল- হরতাল দ্বারা অত্যাচারের বিরুদ্ধে রুখিয়া দাঁড়াও নূরুল আমীন মন্ত্রীসভাকে খতম কর “মৈমনসিংহ জেলার কলমাকান্দা, দুর্গাপুর, হালুয়াঘাট, নালিতাবাড়ী— এই চারিটি থানার হাজং এলাকার হাজার হাজার ক্ষেতমজুর ও গরীব কৃষক গত ৮ মাস যাবত চাষীর হাতে জমি, খাদ্য ও টংক প্রথার অবসানের দাবীতে এক গৌরবময় লড়াই চালাইতেছেন। “কৃষকদের এই হক লড়াইকে রক্তের বন্যায় ডুবাইয়া দেওয়ার জন্য লীগের নূরুল আমীন মন্ত্রীসভা সেই এলাকায় চালাইয়াছে এক দানবীয় অত্যাচার। “গত ৮ মাস যাবত ব্রেনগান-রাইফেলধারী এক হাজার ফৌজ দ্বারা ঐ অঞ্চলকে ঘেরাও করিয়া রাখা হইয়াছে। খুনী নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার হুকুমে ফৌজ সেই এলাকায় গত ৮ মাসে কৃষকগণের উপর দেড় হাজার রাউণ্ড গুলি বর্ষণ করিয়াছে ও খুন করিয়াছে ৪২ জন স্ত্রী-পুরুষকে ও আহত করিয়াছে স্ত্রী-পুরুষ-শিশু নির্ব্বিশেষে অগণিত কৃষককে। দস্যু নূরুল আমীন মন্ত্রীসভা কৃষকের খুনে ঐ চারটি থানার সবুজ মাঠ লাল করিয়া দিয়াছে। “বর্বর নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার ব্রেনগান-রাইফেল সজ্জিত ফৌজ নিরস্ত্র ভুখা গ্রামবাসীদের উপর অবিরত হামলা করিয়া দুইশত গ্রামের কৃষকদের সব কিছু লুট করিয়া নিয়া গিয়াছে। লীগ মন্ত্রীসভার এই পাশবিক নির্যাতন হইতে মেয়েরাও রেহাই পান না। কৃষক মেয়েদেরও ক্যাম্পে ধরিয়া নিয়া অমানুষিক ভাবে মার দেওয়া হইয়াছে। কোন কোন স্থানে খুনী নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার ফৌজ কৃষক মেয়েদের উপর পাশবিক অত্যাচারও করিয়াছে। “বর্তমানে বর্বর নূরুল আমীন মন্ত্রীসভার নির্দ্দেশে ফৌজের দল গ্রামের পর গ্রাম পুড়াইয়া দিতেছে। ২৫শে জুলাই রাতে ফৌজের দল দুর্গাপুর থানার চেরখালি গ্রাম আক্রমণ করিয়া গ্রামটিকে পুড়াইয়া দেয়। তার ৬ দিন পরে ৩১শে জুলাই রাতে লীগ সরকারের ফৌজের দল কলমাকান্দা থানার জাগীরপাড়া গ্রামে হানা দিয়া ঘুমন্ত গ্রামবাসীদের উপর গুলি চালাইয়া ৯ জন স্ত্রী-পুরুষকে খুন করিয়াছে ও আগুন দিয়া সমস্ত গ্রামটিকে পুড়াইয়া দিয়াছে।.... “ । তিন । (পার্টির নেতৃত্বে একদিকে যেমন চলছে সশস্ত্র কৃষক বিদ্রোহ, একই সাথে ভাষার অধিকারের জন্য ১৯৪৮ সাল থেকে গড়ে উঠতে থাকা যুগান্তকারী ভাষা আন্দোলনে সংগঠিত রাজনৈতিক শক্তি হিসাবে পার্টির ভুমিকা শুরু থেকেই ছিল অগ্রণী ও প্রধান। এখানে প্রকাশিত সে সময়ের (১৯৫২ সালের) একটি বিবৃতি ও একটি পার্টি সার্কুলারে তার স্পষ্ট প্রকাশ দেখা যায়। ) বিবৃতিঃ .... .... “ (বাংলা ভাষার অধিকার ও সকল ভাষার সমান মর্য্যাদা কায়েম করুন পাকিস্তান কমিউনিস্ট পার্টির পূর্ববঙ্গ সংগঠনী কমিটি নিম্নলিখিত বিবৃতিটি প্রকাশ করেছ।) “ পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী জনাব নাজিমুদ্দীন গত ২৭শে জানুয়ারী ঢাকায় বক্তৃতা দান কালে “উর্দুই পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হইবে” বলিয়া যে ঘোষণা করিয়াছেন আমরা তাহার তীব্র নিন্দা করিতেছি। “ ১৯৪৮ সালে পূর্ববঙ্গের প্রধানমন্ত্রী থাকাকালীন জনাব নাজিমুদ্দীন প্রবল গণ-আন্দোলনের চাপে বাংলা ভাষা সম্পর্কে যে ওয়াদা করিয়াছিলেন, এই ঘোষণা জাতির জন্মগত অধিকার ও মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার কাড়িয়া নিতে উদ্যত হইয়াছেন। নিজের শোষণের সুবিধার জন্য জনগণকে পশ্চাৎপদ রাখার উদ্দেশ্যে ইংরেজ আমাদের দেশে ইংরেজী ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চালু করিয়া জনগণের শিক্ষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির পথ রুদ্ধ করিয়াছিল। পাকিস্তানের বর্তমান প্রতিক্রিয়াশীল শাসক গোষ্ঠীও জনগণকে নিরক্ষর ও পশ্চাৎপদ রাখিয়া সাম্রাজ্যবাদী ও সামন্তবাদী শোষণ ব্যবস্থাকে অব্যাহত রাখার জন্য বাংলার উপর আরবী হরফ চাপানো ও উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করিয়া জনগণের শিক্ষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির পথ রুদ্ধ করিয়া দিতে চাহিতেছে। “ভাষার ক্ষেত্রে এই প্রতিক্রিয়াশীল নীতিকে যুক্তিসঙ্গত করার জন্য লীগ নেতারা বলিয়া থাকেন যে, “ইসলামী তমদ্দুন” ও “জাতীয় সংহতির” জন্য একমাত্র উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা করা দরকার। “কিন্তু এই যুক্তি অসার। যেখানে পাকিস্তানে বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির বাস, যেখানে পাকিস্তানের অর্ধেকের বেশী লোক বাংলা ভাষায় কথা বলেন, যেখানে সমস্ত দেশ অন্ধকারে ডুবিয়া আছে, সেখানে “ইসলামী তমদ্দুনের” নাম কেবল উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা হিসাবে চাপাইয়া দিলে সমস্ত জনগণের শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির পথ রুদ্ধ হইয়া যাইবে। “যদি প্রত্যেকের ভাষাকে সম-মর্য্যাদা দেওয়া না হয়, যদি বিভিন্ন ভাষাভাষি জনগণকে নিজের মাতৃভাষায় শিক্ষালাভ ও রাষ্ট্রের কাজ চালাইবার অধিকার দেওয়া না হয়, তাহা হইলে বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির ভিতর সংহতির পরিবর্তে আসিবে জাতিগত, প্রদেশগত রেশারেশি ও বিভেদ। পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতির ভাষা ও কৃষ্টিগত উন্নতির উপরই পাকিস্তানের সামগ্রিক উন্নতি ও সংহতি নির্ভর করে। পাকিস্তানের বিভিন্ন ভাষাভাষি জাতি যেমন- বাঙালী, পাঞ্জাবী, পাঠান, সিন্ধি, বেলুচি-প্রত্যেকেই নিজ নিজ ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি অনুযায়ী উন্নতি লাভ করুক, সমস্ত ভাষা যেমন-উর্দু, বাংলা, পুস্তু, পাঞ্জাবী, সিন্ধি সমস্ত ভাষাকেই রাষ্ট্রে সমান অধিকার দেওয়া হোক-ইহাই পাকিস্তানবাসী সকল জাতির কাম্য। পাকিস্তানের সকল ভাষাভাষি ব্যক্তির দাবী। এই দাবীর পিছনে বাঙালী-অবাঙালী সকল জনসাধারণকে সমবেত হওয়ার জন্য আমরা আহ্বান জানাইতেছি। “ ভাষার ক্ষেত্রে লীগ সরকারের স্বেচ্ছাচারী নীতিকে ব্যর্থ করার জন্য বাঙালী-অবাঙালী সকলের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাই আজ প্রয়োজন। ঢাকার ছাত্রছাত্রী ও নাগরিকগণ ৩০শে জানুয়ারী ধর্মঘট ও শোভাযাত্রা করিয়া প্রধান মন্ত্রীর উদ্ধত ঘোষণার সমুচিত জবাব দিয়াছেন ও বাংলা ভাষার ন্যায় অধিকার কায়েম করার সংকল্প গ্রহণ করিয়াছেন। ৩১শে জানুয়ারী বিভিন্ন দলের মিলিত সভায় বাংলাভাষার অধিকারের দাবী ঘোষণা করা হইয়াছে এবং ব্যাপক আন্দোলন গড়িয়া তোলার জন্য সর্বদলীয় কমিটি গঠন করা হইয়াছে। আগামী ৪ঠা ফেব্রুয়ারী ঢাকা শহরে ধর্মঘট পালন করিয়া ভাষার আন্দোলনকে শক্তিশালী করার জন্য সকল দল ও প্রতিষ্ঠান আহ্বান জানাইয়াছেন। আমরা জনসাধারণের এই সংগ্রামকে মোবারকবাদ জানাইতেছি। এই আন্দোলনকে সফলভাবে পরিচালিত করার জন্য প্রদেশের সর্বত্র শহরে ও গ্রামে সর্বদলীয় শহর কমিটি ও মহল্লা কমিটি গঠন করুন।” ২ ফেব্রুয়ারী, পূর্ব্ববঙ্গ সংগঠনী কমিটি, পাকিস্তানের কমিউনিস্ট পার্টি । চার । পূর্ববঙ্গ সংগঠনী কমিটি (পিএসসি) সার্কুলার নং-১০ “প্রিয় কমরেডস, প্রধানমন্ত্রীর রাষ্ট্রভাষা সম্পর্কিত উক্তির প্রতিবাদে ও ‘বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার’ দাবিতে ৩০শে জানুয়ারি ইউনিভার্সিটি ছাত্রদের নেতৃত্বে প্রথম প্রতীক ধর্মঘট, সভা শোভাযাত্রা হয় এবং ৪ঠা ফেব্রুয়ারি ঢাকা শহরের সাধারণ ধর্মঘটের সিদ্ধান্ত লওয়া হয়। ৩১শে জানুয়ারি ‘রাষ্ট্রভাষা আন্দোলন’ পরিচালনার জন্য একটি ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ গঠিত হয়।.... “.... সকল দল ও প্রতিষ্ঠানের যুক্ত প্রচেষ্টায় রাষ্ট্রভাষার দাবিতে ৪ঠা ফেব্রুয়ারীর সাধারণ ধর্মঘট দারুণভাবে সাফল্য মণ্ডিত হইয়াছে- সমস্ত স্কুল কলেজে পরিপূর্ণ হরতাল পালিত হইয়াছে। ইউনিভার্সিটি প্রাঙ্গণে বিরাট সভা হইয়াছে এবং সভার পর প্রায় দেড় থেকে দুই মাইল লম্বা বিরাট এক শোভাযাত্রা সারা ঢাকা শহর প্রদক্ষিণ করে। ঢাকা শহরে এত বড় শোভাযাত্রা পূর্বে আর কখনও হয় নাই। সেখানে প্রধান আওয়াজ ছিল ‘বাংলাভাষাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করতে হবে’। “এই দাবিকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য ‘সর্বদলীয় রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ ও ‘ইউনিভার্সিটি রাষ্ট্রভাষা কমিটি’ ২১শে ফেব্রুয়ারী সারা প্রদেশব্যাপী সাধারণ ধর্মঘট পালন করার আহ্বান জানাইয়াছেন। সারা প্রদেশব্যাপী রাষ্ট্রভাষার আন্দোলনকে পরিব্যাপ্ত করার জন্য ২১শে ফেব্রুয়ারী সাধারণ ধর্মঘটের আহ্বানকে সাফল্যমণ্ডিত করিয়া তোলা খুবই জরুরী।.... “ .... ১৯৪৮ সালে ‘ভাষা আন্দোলন’ পূর্ববঙ্গে একটি শক্তিশালী গণ আন্দোলন হিসাবে গড়িয়া ওঠে। ১৯৪৮ সালের আন্দোলন হইতেও এবারের আন্দোলন অনেক বেশী শক্তিশালী হওয়ার সম্ভাবনা দেখা যাইতেছে। কারণ প্রতিক্রিয়াশীল লীগ সরকারের স্বরূপ পূর্বের চেয়ে অনেক বেশী জনসাধারণের নিকট প্রকাশ হইয়া পড়িয়াছে ও পড়িতেছে। এই সময়ে রাষ্ট্রভাষার আন্দোলন সঠিকভাবে পরিচালিত হইলে পূর্ববঙ্গের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার এবং বাঙালী ও অন্যান্য জাতির আত্মনিয়ন্ত্রণাধিকারের আন্দোলন শক্তিশালী হইয়া আগাইয়া যাইবে।.... ” [চলবে]