ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ জনগণের
আকাঙ্ক্ষা পূরণ করতে পারবে কী
Posted: 19 এপ্রিল, 2026
একতা প্রতিবেদক :
রক্তাক্ত জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের প্রেক্ষাপটে নানা চড়াই-উৎরাই, সংশয়-শঙ্কা পেরিয়ে অনুষ্ঠিত নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ তার মেয়াদের একমাস পার করেছে। এই একমাসের কার্যক্রমে জাতীয় সংসদের কাছ থেকে জাতি কী পেয়েছে?
এ সংসদের প্রথম দিনটিই শুরু হয়েছে আশাভঙ্গ দিয়ে। প্রথম দিনেই জাতি প্রত্যক্ষ করেছে জাতীয় সংগীতের অবমাননা। স্বাধীনতাবিরোধী জামাত-এনসিপি জোটভুক্ত সংসদ সদস্যরা দাঁড়তে গড়িমসি করে জাতীয় সংগীতের প্রতি ঔদ্ধত্যপূর্ণভাবে চরম অবজ্ঞা প্রদর্শন করেছে। এছাড়া একাত্তরের গণহত্যার সহযোগী চিহ্নিত ও দণ্ডপ্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের নামে শোক প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে মুক্তিযুদ্ধের ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের সাথে বেইমানি করেছে সংসদ সদস্যরা। ট্রেজারি বেঞ্চের প্রস্তাবের ভিত্তিতে সংসদের সভাপতিমণ্ডলীর পাঁচ সদস্যের একজন হিসেবে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত (পরবর্তীতে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ক্যাঙ্গারু কোর্টে মুক্তিপ্রাপ্ত) কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধী, আলবদর এটিএম আজহারুল ইসলামকে অন্তর্ভুক্ত করে মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের অবমাননা করেছে জাতীয় সংসদ।
জনগণ স্বাধীনতাবিরোধী দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিকে ক্ষমতার বাইরে রাখতেই বিএনপিকে দুই তৃতীয়াংশ আসনে জয়লাভ করিয়ে ক্ষমতাসীন করেছে। জনগণকে আশ্বস্ত করে তারা বলেছিল ’৭১, স্বাধীনতা, মুক্তিযুদ্ধকে সমুন্নত রাখবে। কিন্তু জাতীয় সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও স্বাধীনতাবিরোধী শক্তির জাতীয় সঙ্গীত অবমাননা মোকাবিলাসহ মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের মর্যাদা রক্ষায় তারা ব্যর্থ হয়েছে।
বর্তমান জাতীয় সংসদ তার প্রথম অধিবেশনে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে জারি করা ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে কয়েকটি বিলে একাধিক অধ্যাদেশ অন্তর্ভুক্ত করে মোট ৯১টি বিল হুবহু পাস করেছে। এরমধ্যে জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ ও জুলাই গণঅভ্যুত্থানকারীদের দায়মুক্তি দিয়ে করা জুলাই গণঅভ্যুত্থান (সুরক্ষা ও দায় নির্ধারণ) অধ্যাদেশটি রয়েছে।
জাতীয় সংসদ সচিবালয় অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্টের বিচারক নিয়োগ অধ্যাদেশ, সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় অধ্যাদেশ, ২০২৫ এবং সুপ্রিম কোর্ট সচিবালয় (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ এই চারটি অধ্যাদেশ বাতিল করা হয়েছে। সংবিধান অনুযায়ী অধ্যাদেশ সংসদে উত্থাপনের ৩০ দিনের মধ্যে অনুমোদন না করায় কার্যকারিতা হারিয়েছে ষোলটি অধ্যাদেশ।
সেগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ- ২০২৫ সালের রাজস্ব নীতি ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত দুটি, গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার সংক্রান্ত দুটি, গণভোট অধ্যাদেশ, দুর্নীতি দমন কমিশন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মাইক্রোফাইন্যান্স ব্যাংক অধ্যাদেশ, তথ্য অধিকার (সংশোধন) অধ্যাদেশ, কাস্টমস (সংশোধন) অধ্যাদেশ, আয়কর (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসামরিক বিমান চলাচল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ ট্রাভেল এজেন্সি (নিবন্ধন ও নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ।
১৫টি অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে বিল হিসাবে সংসদে উত্থাপন করা হয়। এগুলো হলো- ২০২৫ সালের নারী ও শিশু নির্যাতন দমন (সংশোধন) অধ্যাদেশ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ, সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ, কোড অব ক্রিমিনাল প্রসিডিউর (সেকেন্ড অ্যামেন্ডমেন্ট), জাতীয় উপাত্ত ব্যবস্থাপনা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ, মানবদেহে অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সংযোজন অধ্যাদেশ, পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ, ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৬ সালের মানব পাচার ও অভিবাসী চোরাচালান প্রতিরোধ ও দমন অধ্যাদেশ, ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা অধ্যাদেশ, বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ (সংশোধন) অধ্যাদেশ, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী অবসর সুবিধা (সংশোধন) অধ্যাদেশ এবং বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শিক্ষক ও কর্মচারী কল্যাণ ট্রাস্ট (সংশোধন) অধ্যাদেশ।
সন্ত্রাসবিরোধী অধ্যাদেশ সংসদে বিল হিসাবে গ্রহণ করায় আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড নিষিদ্ধ থাকছে।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০২৫ হুবহু গ্রহণ করে সংসদে বিল পাস করা হয়েছে। জামায়াতী সংসদ সদস্যদের প্রতিবাদ উপেক্ষা করে, মুক্তিযুদ্ধের সংজ্ঞা হিসেবে বিলে বলা হয়, “মুক্তিযুদ্ধ অর্থ ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৬ মার্চ হইতে ১৬ ডিসেম্বর পর্যন্ত একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের জনগণের জন্য সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষায় হানাদার ও দখলদার পাকিস্তানি সশস্ত্র বাহিনী এবং তাহাদের সহযোগী রাজাকার, আল-বদর, আল-শামস্, তৎকালীন মুসলিম লীগ, জামায়াতে ইসলামী, নেজামে ইসলাম এবং দালাল ও শান্তি কমিটির বিরুদ্ধে পরিচালিত যুদ্ধ।”
জাতীয় সংসদে বাংলাদেশ শ্রম (সংশোধন) অধ্যাদেশ ২০২৫ সংশোধিত আকারে বিল হিসাবে উত্থাপিত ও গৃহিত হয়। এটি শ্রম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বা শ্রমিকদের গণতান্ত্রিক শ্রম আইনের আকাঙ্ক্ষা পূরণ করেনি। শ্রমিকদের সামাজিক সুরক্ষা প্রাপ্তির সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। মর্যাদাপূর্ণ কাজ, জীবনবিকাশ উপযোগী জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, সার্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা এবং কর্মপরিবেশ ও শ্রমের মূল্য নির্ধারণে স্বাধীনভাবে দরকষাকষির অধিকার নিশ্চিত করা হয়নি।
ব্যাংক রেজল্যুশন বিল, ২০২৬ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। এই বিলটি হচ্ছে বিচারহীনতার সংস্কৃতির নতুন সংস্করণ। পাস হওয়া বিলের ১৮(ক) ধারায় বলা হয়েছে, আপাতত বলবৎ অন্য কোনো আইন কিংবা এ আইনের অন্যান্য বিধানে যা কিছু থাকুক না কেন, ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ ২০২৫-এর আওতায় তালিকাভুক্ত হওয়ার আগের শেয়ার ধারক অথবা ধারকরা অথবা বাংলাদেশ ব্যাংক উপযুক্ত বিবেচিত ব্যক্তি ওই ব্যাংকের শেয়ার, সম্পদ-দায় পুনঃধারণ বা ধারণ করার জন্য রেজল্যুশন কর্তৃপক্ষ হিসেবে বাংলাদেশ ব্যাংক বরাবর আবেদন করতে পারবে। তবে শেয়ার পুনঃধারণের আবেদন করার ক্ষেত্রে একটি পৃথক অঙ্গীকারনামা দিতে হবে। নতুন আইনের আওতায় একীভূত হওয়া বা একীভূতকরণের তালিকায় থাকা ব্যাংকগুলোর সাবেক পরিচালক বা মালিকরা সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংকের বিনিয়োগ করা অর্থের মাত্র সাড়ে ৭ শতাংশ অগ্রিম পরিশোধ করে ব্যাংকের মালিকানা ফিরে পেতে পারবে। বাকি ৯২.৫ শতাংশ অর্থ ১০ শতাংশ সরল সুদে দুই বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে। এর মানে দাঁড়ায় যারা আগে ব্যাংক থেকে অর্থ পাচার করেছে বা বেনামি ঋণ নিয়েছে, তারা এখন সেই পাচার করা অর্থের সামান্য অংশ দিয়ে পুনরায় ব্যাংকের নিয়ন্ত্রণ নিতে পারবে। ব্যাংক লুটপাটের জন্য শাস্তির পরিবর্তে কিস্তিতে মালিকানা ফিরে পাবার সুযোগ ব্যাংক লুটপাটকারীদের জন্য নতুন সরকারের এক বড় উপহার। ব্যাংকিং খাতে সংকট সৃষ্টির জন্য দায়ী লুটেরাগোষ্ঠীকে জবাবদিহির আওতায় আনার পরিবর্তে পুরস্কৃত করবে এই আইন। এস আলম, নাসা গ্রুপের মত লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষার জন্যই অধ্যাদেশে যে কঠোরতর বিধানসমূহ ছিল তা সংশোধন করে জাতীয় সংসদে এ বিল আনা হয়েছে এবং তা পাস করা হয়েছে।
শ্রম অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে সংসদে বিল পাস করা হয়েছে শ্রমিক স্বার্থকে ক্ষুণ্ন করে মালিকদের স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য। ব্যাংক রেজল্যুশন অধ্যাদেশ সংশোধিত আকারে পাস করা হয়েছে লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীর স্বার্থ সংরক্ষণ করার জন্য। লুটেরা ধনিকগোষ্ঠীর দলগুলোর কাছে ভিন্ন কোনো প্রত্যাশা নাই। সংসদে সরকারি দল, বিরোধী দল উভয়ই লুটেরা ধনিকদের স্বার্থে রক্ষাকারী। তার ওপর বিরোধী দল দেশের স্বাধীনতাবিরোধী। এত আন্দোলন, এত রক্তের বিনিময়ে প্রাপ্ত সংসদ সাধারণ মানুষের জীবনমানের পরিবর্তনে কাজে লাগবে বলে মনে হয় না।
মানুষ এখনই আক্ষেপ করে বলছে এত রক্তের বিনিময়ে কী পেলাম, যে লাউ, সেই কদু। নতুন সংসদ জনগণকে আশ্বস্ত করতে পারছে না। এ সংসদ দিয়ে তাদের আকাঙক্ষা পূরণ হবে কিনা তা নিয়ে জনগণ সন্দিহান।
ফলে জামাত-এনসিপি জোট অথবা অন্য কেউ কী বললো না বললো সেটা মূখ্য নয়। যেহেতু সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে তাই ‘ঐকমত্য হওয়া’ বিষয়গুলো, ‘নোট অব ডিসেন্ট’গুলো এবং ঐকমত্য কমিশনে আলোচিত না হওয়া কমিশনগুলোর মানুষের জীবন-মান পরিবর্তনকারী সংস্কারসমূহ স্বউদ্যোগে বিল হিসেবে সংসদে পাস করানো তাদের নৈতিক দায়িত্ব। দল হিসেবে বিএনপিকেই সংস্কারের উল্লিখিত বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে। এর ব্যত্যয় হলে জাতির কাছে তারা ‘গণবিরোধী’ হিসেবে চিহ্নিত হবে।
সিপিবিসহ বামপন্থি শক্তিকে ‘ব্যবস্থা বদলের’ এজেন্ডা নিয়ে আমূল বিপ্লবী পরিবর্তন বা সংস্কারের জন্য সংগ্রাম এগিয়ে নিতে হবে। পঁচানব্বই শতাংশ মানুষের জীবন পরিবর্তনের জন্য কমিউনিস্ট-বামপন্থিদের এগিয়ে আসতে হবে। শ্রমিক-কৃষক-ক্ষেতমজুর-গ্রামীণ মজুর-শ্রমজীবী মানুষ-প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সমন্বয়ে ‘নয়া যুক্তফ্রন্ট’ গঠন করে রাজপথে ও সমানতালে নির্বাচনের মাঠে লড়াই গড়ে তুলতে হবে। শ্রমজীবী মানুষের সরকার গড়তে লড়াই ভিন্ন পথ নাই।