এ কেমন নিরপেক্ষতা?
Posted: 25 জানুয়ারী, 2026
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আগে ভোটের মাঠে সম্পূর্ণ উল্টো হাওয়া বইছে। এবার নির্বাচনের সামগ্রিক তৎপরতার মধ্যে সরকারের পক্ষপাতিত্ব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সংসদ সদস্য নির্বাচনে সেটা রাখঢাক করে করা হলেও গণভোটের বেলায় সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রকাশ্য প্রচারণায় নেমে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, মানুষকে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে প্রভাবিত করতে রাষ্ট্রযন্ত্রের সব প্রতিষ্ঠানকে ব্যবহার করা হচ্ছে।
আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে চারটি প্রশ্নে গণভোট আয়োজন করা হয়েছে। কিন্তু চারটি প্রশ্নে আলাদা করে মত দেওয়ার সুযোগ নেই। একসঙ্গে ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ বলতে হবে। অর্থাৎ, কেউ যদি একটি বা দু’টি বিষয়ের পক্ষে থাকেন এবং বাকিগুলোর বিপক্ষে থাকেন- তাহলেও তার আলাদাভাবে মত দেওয়ার সুযোগ নেই। তাকে হয় সবগুলোর পক্ষে অথবা সবগুলোর বিপক্ষে ভোট দিতে হবে। এ কারণে গণভোটের এই ব্যবস্থা শুরুতেই প্রশ্নবিদ্ধ।
তার ওপর মানুষকে নিরপেক্ষভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ না দিয়ে সরকারের উপদেষ্টা থেকে শুরু করে সর্বস্তরের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা প্রভাবিত করার চেষ্টায় নেমে পড়েছেন। উপদেষ্টারা গণভোটে ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে জনমত তৈরি করতে জেলায় জেলায় সফর করে গরম গরম বক্তৃতা দিচ্ছেন। শুধু তা-ই নয়, ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস রেডিও-টেলিভিশনের মাধ্যমে জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণও দিয়েছেন।
ফেসবুকে প্রধান উপদেষ্টার অফিসিয়াল পেজে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে উৎসাহ দিয়ে বিভিন্ন ফটোকার্ড শেয়ার করা হচ্ছে। সরকারের টাকায় ভিডিও চিত্র বানিয়ে জনগণকে ‘হ্যাঁ’ ভোট দিতে আহ্বান জানানো হচ্ছে। ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলে কী কী পাওয়া যাবে, ‘না’ ভোট দিলে কিছুই পাওয়া যাবে না– এমন প্রচারও চালাচ্ছে অন্তর্বর্তী সরকার।
এনজিওগুলোকেও গণভোটের প্রচার চালানোর নির্দেশনা দিয়েছে সরকার। ব্যাংক ও সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষে প্রচার চালাতে বলা হয়েছে। একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার এভাবে কোনো নির্বাচনে একপাক্ষিক অবস্থান নিতে পারে কি না-তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো– যেসব সরকারি কর্মকর্তা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষকরা ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারণা চালাচ্ছেন, তারাই কিন্তু নির্বাচনে প্রিজাইডিং কর্মকর্তা, পোলিং কর্মকর্তাসহ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করবেন। অথচ তাদের সবাইকে সরকারের পক্ষ থেকে গণভোটের ‘সচেতনতামূলক’ প্রচার চালানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই প্রচারণার মধ্যে রয়েছে, ‘সব সংস্কার বাস্তবায়নে হ্যাঁ ভোট দিন; না ভোটে কিছুই মিলবে না’। ‘পরিবর্তনের জন্য হ্যাঁ ভোট দিন’। যারা আগে থেকেই একটি পক্ষে প্রচার চালাচ্ছেন তারা কীভাবে ভোটের দিন নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করবেন? সরকারের দেওয়া নির্দেশনাই তো বলে দিচ্ছে, এই ভোটে তাদের কী করতে হবে?
শুধু তাই নয়, সরকারের এই অবস্থান সংসদ নির্বাচনেও প্রভাব ফেলতে পারে। পরোক্ষভাবে সরকার কিন্তু যারা ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে তাদের ভোট দিতে বলেই দিচ্ছে। ফলে এই প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে কতোটা অবাধ ও নিরপেক্ষ ভোট হবে তা নিয়ে প্রবল সংশয় রয়ে যাচ্ছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, নির্বাচনের সময়ে অন্তর্বর্তী সরকারের ভূমিকা সব দিক থেকেই নিরপেক্ষ হওয়া উচিত ছিল। কিন্তু বাস্তবে তারা পক্ষপাতিত্বে নেমেছে। শুধু যে ‘হ্যাঁ’ ভোটের পক্ষ, তা নয়। শুরু থেকেই স্বাধীনতাবিরোধী মৌলবাদী শক্তির প্রতি এই সরকারের দুর্বলতা দেখা যাচ্ছে। সরকারের এই পক্ষপাতিত্ব নির্বাচনে লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নষ্ট করছে। সার্বিক পরিস্থিতিতে অনেকের মধ্যেই এমন আশঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, গণভোটের পাশাপাশি জাতীয় নির্বাচন নিয়েও কারসাজি হতে পারে। সব মিলিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’-কে জেতাতে সরকারের সক্রিয় প্রচারণা পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়াকেই বিতর্কের মুখে ঠেলে দিয়েছে।