দর্শনের বুনিয়াদি প্রশ্ন ও দার্শনিক পদ্ধতি
এবং দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আওতা
Posted: 18 জানুয়ারী, 2026
আমাদের পারিপার্শ্বিক জগতের সবকিছুই হয় বস্তুগত নয় ভাবগত। বিষয়গতভাবে যেগুলোর অস্তিত্ব আছে সেগুলো বস্তুগত। এগুলো মানব-চৈতন্যের বাইরে অর্থাৎ এসবের অস্তিত্ব মানুষের চেতনার উপর নির্ভর করে না। যেমন-পৃথিবী, মহাবিশ্ব ও সামাজিক ব্যাপারগুলো।
অন্যদিকে যেগুলো মানুষের চেতনায় বিরাজ করে বা যুক্ত থাকে মানুষের মানসিক ক্রিয়াকলাপের সাথে সেগুলো হলো ভাবগত বা আত্মিক। যেমন- চিন্তা, অনুভূতি, ভাবাবেগ ইত্যাদি। ভাবগত ও বস্তুগত ছাড়া পৃথিবীতে কোনো কিছু নেই।
এই বস্তুগত ও ভাবগতর মধ্যে একটা সুনির্দিষ্ট সম্পর্ক আছে। বস্তু ও চেতনার মধ্যে এই সম্পর্কের সারমর্মের প্রশ্নটিই দর্শনের বুনিয়াদি প্রশ্ন।
এই বুনিয়াদি প্রশ্নের দুটি দিক আছে। প্রথমটা হচ্ছে বস্তু চেতনার জন্ম দেয়, না চেতনা থেকে বস্তুর জন্ম হয় ? দ্বিতীয়টা হচ্ছে জগৎকে জানা সম্ভব কি না ?
(ক) প্রথম বুনিয়াদি প্রশ্ন প্রসঙ্গে
পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ চিন্তাবিদরা বহুবছর ধরে অসংখ্য তত্ত্ব ও ধারা যুক্ত করে প্রকৃতির সারকে বোঝার চেষ্টা করেছেন দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে। বস্তুবাদী শিবির এবং ভাববাদী শিবির। যে দার্শনিকরা মনে করেন, বস্তু মুখ্য এবং চেতনা গৌণ অর্থাৎ বস্তু থেকে চেতনার উদ্ভব, তাদের নিয়ে বস্তুবাদী শিবিরটি গঠিত। তারা বলেন বস্তু চিরন্তন। বস্তু কারো দ্বারা সৃষ্ট হয়নি। পৃথিবীতে কোনো অতিপ্রাকৃত শক্তি, দৈব শক্তি নেই। চেতনা হলো বস্তুর বিকাশের ফল। মানুষের উদ্ভবের সাথে চেতনার উদ্ভব ও বিকাশ হয়।
অন্যদিকে যে দার্শনিকরা মনে করেন চেতনাই মুখ্য আর বস্তু গৌণ তাদের নিয়ে গঠিত ভাববাদী শিবিরটি। তাদের মতে, চেতনার অস্তিত্ব রয়েছে বস্তু থেকে পৃথকভাবে অর্থাৎ বস্তু-নিরপেক্ষভাবে। তাঁরা আরো মনে করেন, চেতনা বস্তুজগৎকে সৃষ্টি ও পরিচালনা করে। তাঁরা আবার দুইভাগে বিভক্ত ক. বিষয়ীমুখ ভাববাদী খ. বিষয়মুখ ভাববাদী।
ক. বিষয়ীমুখ ভাববাদীরা মনে করেন, জগৎ সৃষ্ট হয় ব্যক্তিমানুষের বিষয়ীর চৈতন্যের দ্বারা; আত্মগত চেতনার দ্বারা।
খ. বিষয়মুখ ভাববাদীরা মনে করেন জগৎ সৃষ্ট হয় কোনো এক ধরনের বিষয়গত চৈতন্যের দ্বারা। পৃথিবী ও মানুষের বাইরে এক আত্মিক শক্তির দ্বারা।
দর্শনের বুনিয়াদী প্রশ্নের উত্তরে বলতে হয় বস্তুবাদ এবং ভাববাদের বাইরে কোনো দর্শন নেই। এই দুই পক্ষের মধ্যে দর্শনের সকল প্রশ্ন ও সমস্যাকে নিয়ে এক আপোসহীন সংগ্রাম চলছে।
বস্তুবাদ সব সময়ই প্রগতিশীল। বিজ্ঞান সম্মত এক বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গি ।এটি পৃথিবীকে সঠিকভাবে ব্যখ্যা করে অর্থাৎ পৃথিবী যেভাবে আছে সেইভাবে। মানবজাতির প্রগতির স্বার্থে, অর্থনৈতিক, বৈজ্ঞানিক ও সাংস্কৃতিক বিকাশের স্বার্থে প্রগতিশীলরা বস্তুবাদকে ব্যবহার করে।
ভাববাদ পারিপার্শ্বিক জগৎকে ব্যাখ্যা করে অবৈজ্ঞানিকভাবে। এটি ভ্রান্ত ব্যাখ্যা। ভাববাদ ব্যবহৃত হয় প্রতিক্রিয়াশীলদের দ্বারা তাদের ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত স্বার্থে। শোষকদের সেবা করাই এই দর্শনের কাজ।
(খ) দ্বিতীয় বুনিয়াদি প্রশ্ন প্রসঙ্গে
দর্শনের দ্বিতীয় বুনিয়াদি প্রশ্নটি হচ্ছে জগৎকে জানা সম্ভব কিনা ? এর জবাব দিতে গিয়ে বস্তুবাদীরা যুক্তি দেন, জগৎকে জানা সম্ভব। মানুষ তার পারিপার্শ্বিক জগৎকে উপলব্ধি করতে পারে। এর প্রমাণ জগতের ব্যবহারিক রূপান্তর। পৃথিবী বদলাতে মানুষ তার অর্জিত জ্ঞানকে কাজে লাগাচ্ছে।
অন্যদিকে ভাববাদীরা মনে করেন জগৎকে জানা সম্ভব নয়। এঁদের বলা হয় অজ্ঞাবাদী। বিষয়ীমুখ ভাববাদীরা নিজের চিন্তা, অনুভূতি নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। জগৎকে জানার বিজ্ঞানসম্মত চেষ্টা করেন না। আর বিষয়মুখ ভাববাদীরা এক অস্তিত্বহীন অতিপ্রাকৃত পরমাত্মার, পরম ভাবের উপর নির্ভর করেন। বর্তমানে সকল ধনিক সম্প্রদায় এই দর্শনকে পছন্দ করেন। এটা তাদের শোষণের পক্ষে কাজে লাগে। বৈপ্লবিক রূপান্তর সাধনে বাধা দেয়।
দার্শনিক পদ্ধতি
দর্শনের বুনিয়াদি প্রশ্নের মতো আরো একটি প্রশ্ন আছে। সেটি হচ্ছে, পৃথিবী কি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, না বিকশিত হচ্ছে? দর্শনের এই প্রশ্নের উত্তর দেয়া হয়েছে পরস্পর বিপরিত দুই পদ্ধতিতে। এর একটি হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদ, আর অন্যটি হচ্ছে অধিবিদ্যা। পদ্ধতি হলো লক্ষ্য অর্জনের উপায় যার সাথে যুক্ত থাকে নির্দিষ্ট নীতিসমূহ, তত্ত্বগত গবেষণা ও ব্যবহারিক কাজের ধরন, এসব মিলিয়েই হয় একটি পদ্ধতি। কোনো বৈজ্ঞানিক বা ব্যবহারিক সমস্যা সমাধানে একটি নির্দিষ্ট পদ্ধতির প্রয়োজন পড়ে। কোনো একটি বিশেষ সমস্যার ক্ষেত্রে একটি পদ্ধতির প্রয়োগ হয় না কেবল, পদ্ধতিটির প্রয়োগ হয় প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার সকল ক্ষেত্রে। প্রয়োগ হয় বিশ্বজনীন সমস্যাগুলোর ক্ষেত্রে।
দ্বান্দ্বিক পদ্ধতি
(ক) দ্বান্দ্বিকতার প্রবক্তারা মনে করেন, সমস্ত পদার্থ, প্রক্রিয়া ও ব্যাপারসমূহ পরস্পর সম্পর্কিত। সেগুলোর মধ্যে একটা মিথষ্ক্রিয়া ঘটে এবং সেগুলো একটি অপরটিকে শর্তে আবদ্ধ করে।
(খ) তাঁরা আরো বলেন, সবকিছু প্রতিনিয়ত গতি ও বিকাশের অবস্থায় আছে, এ ছাড়া কোনো কিছুই নেই। বিকাশ সম্বন্ধে তাঁরা প্রথমতঃ বলেন, বিকাশের উৎস হচ্ছে সবকিছুর মধ্যে বিরাজিত তার আভ্যন্তরিক দ্বন্দ্ব। প্রত্যেক পদার্থের মাঝে সহজাতভাবে আছে দুই বিপরীতের সংগ্রাম। এই দ্বন্দ্ব বাইরে থেকে ঢোকানো হয় না এটা প্রকৃতি ও সমাজের ভেতরেই রয়েছে। দ্বিতীয়তঃ ডায়লেকটিকস বিকাশকে দেখে, পরিমাণগত পরিবর্তন থেকে গুণগত পরিবর্তন রূপে। গুণগত পরিবর্তন মানে নতুন পদার্থ বা ঘটনার উদ্ভব, আরো শক্তি বৃদ্ধি। তৃতীয়তঃ পুরনো সব সময় নতুনকে স্থান ছেড়ে দেয় অর্থাৎ বিকাশের একটি পর্যায় আরেকটি পর্যায়কে স্থান ছেড়ে দেয় সার্বিকভাবে।
(গ) ডায়লেকটিকস পৃথিবীকে দেখে যেমন আছে তেমনভাবে। পৃথিবীর পরিবর্তনের কথা বলে, নতুনের জয়ের কথা বলে দ্বন্দ্ববাদ প্রগতিশীল বৈপ্লবিক শক্তিগুলোকে সাহায্য করে পুরনোকে ভেঙ্গে নতুনকে প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে।
(ঘ) আজকে বিশ্বময়, এক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি হিসেবে ডায়লেকটিস-এর প্রয়োজন জ্ঞানার্জন ও কর্মপ্রয়োগের মাধ্যমে বিকাশের জন্য। এছাড়া আত্মিক জীবনের বিকাশেও এ পদ্ধতি অপরিহার্য।
অধিবিদ্যাগত পদ্ধতি
(ক) অন্যদিকে অধিবিদ্যার পক্ষ অবলম্বনকারীরা ধরে নেন যে, পৃথিবী অপরিবর্তনীয়, প্রকৃতি ও সমাজ কখনো বদল হয় না।
(খ) তারপর বস্তু ও ব্যাপারগুলোর একটি অপরটির সাথে কোনো সংযোগ নেই। সবকিছুর অস্তিত্ব থাকে বিচ্ছিন্নভাবে।
(গ) বিকাশের প্রক্রিয়াকে তারা দেখেন বর্তমানে যা আছে, তার হ্রাস-বৃদ্ধি হিসেবে। তাঁদের মতে বিকাশ হয় বিভিন্ন পদার্থের বাহ্যিক সংঘর্ষের মাধ্যমে অথবা এক দৈব শক্তির দ্বারা।
(ঘ) অধিবিদ্যা বিকাশের প্রগতিশীল চরিত্রকে স্বীকার করে না। স্বীকার করে না নতুনের অবশ্যম্ভাবী বিজয়কে। এই পদ্ধতি প্রগতির বিপক্ষে সংগ্রামে রক্ষণশীল ও প্রতিক্রিয়াশীল শক্তিগুলোর স্বার্থে ব্যবহৃত হয়। এটি সংশোধনবাদ ও মতান্ধতার ক্ষেত্রে তত্ত্বগত সমর্থন দেয়। সুতরাং দেখা যাচ্ছে অধিবিদ্যা হচ্ছে দ্বন্দ্ববাদের সম্পূর্ণ বিপরীত এক দার্শনিক পদ্ধতি।
দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদের আওতা
একটি বিজ্ঞান হিসেবে দর্শনের বিষয়বস্তু যুগে যুগে পরিবর্তিত হয়ে আসছিলো। প্রথমে পৃথিবীর সব জ্ঞান দর্শনের আওতায় ছিলো। প্রাচীন দার্শনিকরা প্রকৃতি-বিজ্ঞানীও ছিলেন। নতুন নতুন বিশেষ বিজ্ঞানেও বিশেষজ্ঞ ছিলেন। তখন অনেক বিশেষ বিজ্ঞানের উদ্ভব হয়েছিলো। যেমন- জ্যোতির্বিদ্যা, পদার্থবিদ্যা, বলবিদ্যা, জীববিদ্যা, রসায়ন ও অন্যান্য আরো বিজ্ঞানের শাখা। সেই সাথে বিজ্ঞানগুলো থেকে দর্শন পৃথক হয়ে গিয়েছিলো। সকল বিজ্ঞানের উপর দর্শন এক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করেছিলো, অর্থাৎ তার প্রতিজ্ঞাগুলো চাপিয়ে দিয়েছিলো। সে সময় দর্শনকে বলা হতো বিজ্ঞানগুলোর বিজ্ঞান। ফলে জন্ম নিয়েছিলো এক বিতর্কের। তখন দর্শনের বিষয়বস্তু কি হবে, অন্যান্য বিজ্ঞানের মধ্যে তার স্থান কি হবে, সমাজে দর্শনের ভূমিকা কি হবে, এসব প্রশ্নের এক বিজ্ঞানসম্মত মীমাংসা করেছিলেন মার্কস ও এঙ্গেলস। তারা এটা করেছিলেন দ্বান্দ্বিক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দর্শন দিয়ে।
(ক) মার্কস-এঙ্গেলস আবিষ্কার করেছিলেন যে, দর্শন ও অন্যান্য নির্দিষ্ট বিজ্ঞানের একই উদ্দেশ্য। মূল উদ্দেশ্য হচ্ছে পারিপার্শ্বিক জগৎ বিষয়ে জ্ঞান অর্জন যাকে বলা হয় অবধারণা। তবে তাঁরা দেখিয়েছিলেন যে এ দুইয়ের মধ্যে পার্থক্য আছে গবেষণার ক্ষেত্রে।
(খ) তাঁরা এও বলেছিলেন পৃথিবীতে নিয়ম হিসেবে ‘বিশ্বজনীন’ ও ‘সুনির্দিষ্ট’ দুটুই আছে। এই উভয় নিয়মই একসাথে একই ব্যাপার ও ক্রিয়াসমূহের অভ্যন্তরে কাজ করে। প্রকৃতির পৃথক ক্ষেত্র ও সমাজ বিষয়ক সুনির্দিষ্ট নিয়মগুলো, বিশেষ বিশেষ বিজ্ঞান অধ্যয়ন করে। আর বিশ্বজনীন নিয়মগুলো অধ্যয়ন করে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ, এগুলো এর আওতা।
(গ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ হচ্ছে বিশ্ব দৃষ্টিভঙ্গির তত্ত্বগত ভিত্তি। এই দর্শন মানুষকে প্রকৃতি, সমাজ ও চিন্তার নিয়মগুলো শেখায়। এই জ্ঞান পৃথিবীর বৈপ্লবিক রূপান্তরে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে প্রয়োজন পড়ে।
(ঘ) দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদী দর্শন নির্দিষ্ট বিজ্ঞানগুলো ও সামাজিক কর্মপ্রয়োগের সাথে আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করে। এই দর্শন একদিকে পারিপার্শ্বিক জগতের অস্তিত্বের মূলনীতি বিষয়ে এবং বিকাশের নিয়মগুলো বিষয়ে জ্ঞান দেয় বিশেষ বিজ্ঞানগুলোকে। জ্ঞান দেয় সামাজিক কর্মপ্রয়োগকে। অর্থাৎ দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সুনির্দিষ্ট বৈজ্ঞানিক গবেষণা এবং মানুষের ব্যবহারিক কাজকামকে একমাত্র সঠিক পথে পরিচালিত করে। অন্যদিকে বিশেষ বিজ্ঞানগুলোর উপাত্ত বা ফধঃধ দ্বারা দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদ সমৃদ্ধ হয় এবং বাস্তব রূপ পায়।
সুতরাং জগৎ সম্পর্কে বাস্তব জ্ঞান অর্জন করতে এবং পৃথিবী ও মানুষের সমাজকে বদলাতে গিয়ে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে আজ দ্বন্দ্বমূলক ও ঐতিহাসিক বস্তুবাদ অধ্যয়ন অপরিহার্য কারণ এ দর্শন প্রগতিকামী মেহনতি মানুষের দর্শন।
লেখক : কলামিস্ট