প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে
কেটেছে ২০২৫ সাল
Posted: 04 জানুয়ারী, 2026
একতা প্রতিবেদক :
বিদায় নেওয়া ২০২৫ সালে দাবদাহ-ঝড়-প্লাবন-ভূমিকম্প-শীতের প্রকোপ, কাঁপন ধরিয়েছিল সারাদেদশে। বিশেষ করে দেশের ভেতরে ঘটে যাওয়া একশ বছরের মধ্যে বড় মাত্রার ভূমিকম্প মানুষের মনে তীব্র আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। বিশেষ করে এই ভূমিকম্পে ঘুম হারাম করে দিয়েছিল রাজধানীবাসীর। অন্যদিকে বছরের শুরু ও শেষ দুই দিকেই ছিল প্রচণ্ড শীতের প্রকোপ, যা মানুষকে রীতিমতো কাঁপিয়ে ছেড়েছে। ২০২৬ সালের শুরুতেই উত্তরবঙ্গের জেলাগুলোয় জেঁকে বসে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ। শীতের প্রভাবে কাঁপছে দেশের প্রায় ৩৪ জেলা।
২০২৫ সালের জানুয়ারির মাঝামাঝি সময়ে পঞ্চগড়ের তেঁতুলিয়ায় তাপমাত্রা নেমে আসে ৪ দশমিক ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসে, যা গত কয়েক বছরের রেকর্ড ভেঙে দেয়। ঘন কুয়াশার কারণে দিনের বেলায় হেডলাইট জ্বালিয়ে যানবাহন চলাচল করতে হয়েছে।
এ ছাড়া ডিসেম্বরের শেষ ভাগে দিন ও রাতের তাপমাত্রার পার্থক্য পাঁচ ডিগ্রির নিচে নেমে আসায় সারা দেশেই প্রচণ্ড শীত অনুভূত হয়। তীব্র শীতে শ্বাসকষ্ট ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত হয়ে বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধদের প্রাণহানির ঘটনাও ঘটে।
শীতের প্রভাবে বোরো ধানের বীজতলা ও রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যা বছরের শুরুতেই কৃষকদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলে দেয়।
শীত বিদায় নিতে না নিতেই এপ্রিলের শুরু থেকে দেশজুড়ে শুরু হয় নজিরবিহীন দাবদাহ। ২০২৫ সালের এপ্রিল ছিল গত ৫০ বছরের মধ্যে উষ্ণতম মাস। চুয়াডাঙ্গা ও যশোরে টানা ১০ দিন তাপমাত্রা ৪৩ ডিগ্রি সেলসিয়াসের ওপরে অবস্থান করে। ঢাকাতেও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি ছাড়িয়ে যায়, যা মেগাসিটির জনজীবনকে স্থবির করে দেয়।
তীব্র গরমে দেশে প্রথমবারের মতো দীর্ঘমেয়াদি ‘হিট অ্যালার্ট’ জারি করা হয়। শ্রমজীবী মানুষ ও রিকশাচালকদের ভোগান্তি চরমে পৌঁছায়। হিটস্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে সারা দেশে অন্তত শতাধিক মানুষের মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। জলবায়ু বিজ্ঞানীরা এই তীব্র তাপপ্রবাহকে ‘হিট ডোম’ ইফেক্ট হিসেবে ব্যাখ্যা করেন।
তাপপ্রবাহের রেশ কাটতে না কাটতেই শুরু হয় কালবৈশাখী ঝড় ও বজ্রপাতের প্রকোপ। ২০২৫ সালে বজ্রপাতে নিহতের সংখ্যা ১০০ ছাড়িয়ে যায়। বিশেষ করে হাওর অঞ্চল ও উত্তরাঞ্চলের জেলাগুলোতে ধান কাটার মৌসুমে বজ্রপাত আতঙ্কের নাম হয়ে দাঁড়ায়।
বঙ্গোপসাগরে এ বছরও বেশ কয়েকটি ঘূর্ণিঝড় সৃষ্টি হলেও এর বেশিরভাগই স্থলভাগে আঘাত হানেনি। যেগুলো স্থলভাগে উঠে আসে, সেগুলোও ছিল তুলনামূলক দুর্বল। ফলে আগের বছরগুলোর তুলনায় এ বছর ঘূর্ণিঝড়ে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হয়নি।
বর্ষা মৌসুমে হিমালয়ের পাদদেশে অতিবৃষ্টির ফলে বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চল ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলে দেখা দেয় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যা (ফ্ল্যাশ ফ্লাড)। জুলাই মাসে ব্রহ্মপুত্র, যমুনা ও কুশিয়ারা নদীর পানি বিপদসীমার অনেক ওপরে দিয়ে প্রবাহিত হয়।
২০২৫ সালেও সিলেট ও সুনামগঞ্জ পুনরায় বন্যার কবলে পড়ে। শহরের প্রধান সড়কগুলো নৌকা চলাচলের উপযোগী হয়ে ওঠে। একই সঙ্গে কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট ও গাইবান্ধার চরাঞ্চল মাসব্যাপী পানির নিচে তলিয়ে থাকে। বন্যায় কয়েক লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়ে এবং গবাদিপশুর খাদ্যের তীব্র সংকট দেখা দেয়।
বাংলাদেশ ও পার্শ্ববর্তী দেশগুলোয় একাধিকবার মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি না হলেও এসব কম্পন বড় কোনো দুর্যোগের পূর্বাভাস কি না, তা নিয়ে ভূতাত্ত্বিকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়।
বিদায় বছরে প্রায় ১০টি মৃদু ও মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্প অনুভূত হয়। এর মধ্যে অন্তত চারটির উৎপত্তিস্থল ছিল দেশের ভেতরে, যার বেশিরভাগই রাজধানীর আশপাশের এলাকায়। গত বছরের নভেম্বরে নরসিংদীর মাধবদীতে রিখটার স্কেলে ৫ দশমিক ৭ মাত্রার ভূমিকম্পে দেশজুড়ে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। ওই ভূমিকম্পে রাজধানীসহ বিভিন্ন স্থানে চারজনের প্রাণহানি ঘটে। কোথাও কোথাও মাটিতে ফাটল ধরে, ভবন হেলে পড়া ও ফাটল ধরার ঘটনাও ঘটে।
একশ বছরের মধ্যে দেশের ভেতরে উৎপত্তি হওয়া ভূমিকম্পগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি মাত্রার ভূমিকম্প ছিল মাধবদীরটি। তাই এখনই সর্বোচ্চ সতর্কতা প্রয়োজন বলে জানিয়েছে ভূমিকম্প পর্যবেক্ষণ কেন্দ্রের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা রুবায়েত কবীর।
বর্ষাকালে বৃষ্টি কম হওয়া এবং শরৎকালে অতিবৃষ্টির কারণে কৃষকরা সময়মতো ফসল বপন করতে পারেননি। এ ছাড়া সুন্দরবনও হুমকির মুখে পড়েছে। বঙ্গোপসাগরের পানির উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে ভবিষ্যতে উপকূলীয় এলাকা বিলীন হওয়ার আশঙ্কাও বেড়েছে। বৈচিত্র্যময় আবহাওয়া আর জলবায়ুর পরিবর্তনের ফলে ঋতুচক্র তার স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলছে। এক কথায়- প্রাকৃতির ট্রাজেডি নিয়ে কেটেছে ২০২৫ সাল।