২০২৫ : বিশ্ব ডুবেছে বন্যায়
পুড়েছে দাবানলে
Posted: 04 জানুয়ারী, 2026
একতা পরিবেশ ডেস্ক :
২০২৫ সালে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে একদিকে যেমন ভয়াবহ বন্যার দেখা মিলেছে, তেমনি একরের পর একর পুড়েছে দাবানলে। প্রকৃতির এমন বৈরিতা জলবায়ু সংকটকে আরও স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে।
দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া থেকে শুরু করে মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আমেরিকা একাধিক অঞ্চলে এই বছর বন্যা ছিল সবচেয়ে বড় জলবায়ু বিপর্যয়। অন্যদিকে আমেরিকা ও ইউরোপে দেখা গেছে নজিরবিহীন এবং বিধ্বংসী দাবানল, যা অনেক দেশেই পূর্বের সকল রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে।
বন্যার বিধ্বংসী রূপের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনকে প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করছেন গবেষকেরা। তাপমাত্রা বাড়ার ফলে বাতাসে আর্দ্রতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যার ফলে অল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হচ্ছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ, নদী দখল, বন উজাড় ও অপর্যাপ্ত নিষ্কাশন ব্যবস্থা।
নেপালের ত্রিভুবন বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সহকারী অধ্যাপক পবন ভট্টরাইয়ের মতে, এটি ছিল চরম আবহাওয়া ও দীর্ঘদিনের মানবিক ভুল সিদ্ধান্তের ফল। আমরা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহের জায়গায় শহর গড়ে তুলেছি, ফলে বৃষ্টি হলেই তা ভয়াবহ বন্যায় রূপ নিচ্ছে।
বন্যার উল্লেখযোগ্য ভয়াবহতা
ইন্দোনেশিয়া : ডিসেম্বরে ভয়াবহ বন্যায় আচেহ ও সুমাত্রা অঞ্চলে নিহত হয়েছেন অন্তত ৯৬১ জন। বন উজাড় ও অবৈধ কাঠ কাটাকে বিপর্যয়ের বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন বিশেষজ্ঞরা।
পাকিস্তান : জুন থেকে আগস্ট পর্যন্ত বন্যায় নিহত হয়েছেন ৭০০ জনের বেশি। পাঞ্জাবে প্রায় পাঁচ লাখ মানুষকে সরিয়ে নিতে হয়েছিল।
যুক্তরাষ্ট্র : ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে বন্যা ও আকস্মিক বন্যায় মৃত্যু হয়েছে ২৪২ জনের। শুধু টেক্সাসেই জুলাই মাসের বন্যায় প্রাণ গেছে শতাধিক মানুষের।
থাইল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা: থাইল্যান্ডে বন্যায় প্রাণ গেছে অন্তত ২৭৬ জনের। শ্রীলঙ্কায় ঘূর্ণিঝড় ‘দিতওয়াহ’র প্রভাবে বন্যা ও ভূমিধসে নিহত হয়েছেন অন্তত ৫৬ জন।
মরক্কো: ২০২৫ সালে দেশটিতে হঠাৎ বন্যায় অন্তত ৩৭ জনের মৃত্যু হয়। ক্ষতিগ্রস্ত হয় বহু ঘরবাড়ি ও দোকান। দুর্বল অবকাঠামো ও নিষ্কাশন ব্যবস্থার ঘাটতি তদন্ত করছে কর্তৃপক্ষ।
নেপাল ও ভারত : অক্টোবরে নেপাল ও ভারতের দার্জিলিং অঞ্চলে বন্যা ও ভূমিধসে অন্তত ৫০ জনের মৃত্যু হয়। তুলনামূলক কম বৃষ্টিপাত হলেও অতিমাত্রায় স্থানীয় ভারী বৃষ্টির কারণে ক্ষয়ক্ষতি ছিল ব্যাপক।
ফিলিস্তিন: ইসরায়েলি আগ্রাসনে বাস্তুচ্যুত গাজার প্রায় ২০ লাখ মানুষের জন্য গত বছরে বন্যা ও তীব্র শীত নতুন বিপর্যয় ডেকে এনেছে। টানা ভারী বৃষ্টি ও ঠান্ডায় অন্তত ১৪ ফিলিস্তিনি নিহত হন, যাদের মধ্যে এক নবজাতকও ছিল।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বন্যার বিরুদ্ধে লড়াই নয়, বরং বন্যার সঙ্গে বসবাসের উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। নদীকে জায়গা দিতে হবে, উন্নত আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে এবং নগর পরিকল্পনায় জলবায়ু বাস্তবতাকে গুরুত্ব দিতে হবে।
তাদের মতে, ২০২৫ সালের অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা না নিলে ২০২৬ সালেও বিশ্বকে একই ধরনের বা আরও ভয়াবহ বন্যার মুখোমুখি হতে হতে পারে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট তীব্র তাপপ্রবাহ এবং শুষ্ক আবহাওয়াকে ২০২৫ জুড়ে বিশ্বে ভয়াবহ দাবানল পরিস্থিতির প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।
গত বছরে উল্লেখযোগ্য দাবানল ও এর প্রভাবগুলো হলো:
যুক্তরাষ্ট্র: জানুয়ারিতে লস অ্যাঞ্জেলেস এবং ক্যালিফোর্নিয়া ইতিহাসে অন্যতম বিধ্বংসী দাবানল। এতে লস অ্যাঞ্জেলেস মেট্রোপলিটন এলাকায় প্রায় ১৬,০০০ স্থাপনা ধ্বংস হয়েছে এবং ৩০ জন প্রাণ হারিয়েছেন।
এ বিপর্যয়ে আনুমানিক অর্থনৈতিক ক্ষতি ২৫০ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
কানাডা : ২০২৫ সাল অক্টোবর পর্যন্ত কানাডায় ৬ হাজারের বেশি দাবানলে প্রায় ৮৩ লাখ হেক্টর এলাকা পুড়ে গেছে। দেশটির ইতিহাসে দ্বিতীয় ভয়াবহতম দাবানল মৌসুম হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে বছরটি।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন: ২০২৫ সাল ইউরোপের জন্য রেকর্ডকৃত ইতিহাসে সবচেয়ে খারাপ দাবানলের বছর ছিল । এ সময়ে ১০ লাখ হেক্টরেরও বেশি বনভূমি ভস্মীভূত হয়েছে।
সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলির মধ্যে আছে স্পেন, যেখানে ৩.৯৩ লাখ হেক্টর জমি দাবানলে পুড়ে গেছে এছাড়া এবং পর্তুগালে ২.৭৮ লাখ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ।
দক্ষিণ কোরিয়া: মার্চ মাসে দেশটির দক্ষিণ-পূর্ব ও মধ্যাঞ্চলে মাত্র এক সপ্তাহে ১ লাখ হেক্টরের বেশি এলাকা পুড়ে যায় এবং ৩২ জন নিহত হন।
আফ্রিকা: ২০২৫ সালের প্রথমার্ধেই বিশ্বব্যাপী পুড়ে যাওয়া ১০০ মিলিয়ন হেক্টর জমির মধ্যে প্রায় অর্ধেক (৫৩ মিলিয়ন হেক্টর) ছিল আফ্রিকা মহাদেশে। মূলত সাবানা অঞ্চলে কৃষি কাজের জন্য লাগানো আগুন থেকে এসব দাবানলের সৃষ্টি হয়।
সব মিলিয়ে নভেম্বর পর্যন্ত বিশ্বব্যাপী দাবানল থেকে প্রায় ১৩৮০ মেগাটন কার্বন বায়ুমণ্ডলে মিশেছে।
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন যে, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে আগুন লাগার এই সম্ভাবনা আগের তুলনায় বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করে বলছেন, জলবায়ু বিপর্যয় ঠেকাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় নীতিগত পরিবর্তন ও প্রস্তুতি না নিলে ২০২৬ সালে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হতে পারে।