ঐতিহাসিক তে-ভাগা সংগ্রামের কথা

Posted: 04 জানুয়ারী, 2026

[৩১ ডিসেম্বর বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি)’র সাবেক সভাপতি, ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের লড়াকু সৈনিক, টংক আন্দোলনের মহানায়ক, মুক্তিযুদ্ধকালীন অস্থায়ী সরকারের উপদেষ্টা, আজীবন বিপ্লবী কমরেড মণি সিংহের ২৬তম মৃত্যুবার্ষিকী। মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে কমরেড মণি সিংহের লেখা জীবন-সংগ্রাম গ্রন্থ থেকে ঐতিহাসিক তে-ভাগা সংগ্রাম অংশটুকু অপরিবর্তিত রূপে দেয়া হলো] -সম্পাদক ১৯৪৬ সালের ডিসেম্বর এবং ১৯৪৬-৪৭ সালে তখনকার পূর্ববাংলা (বাংলাদেশ) ও আজকের পশ্চিমবঙ্গে বর্গা কৃষকদের তে-ভাগা আন্দোলন ও সংগ্রাম হয়েছিল। ওটা ছিল যেমন বিরাট তেমনই জঙ্গী। উনিশটি জেলায় ওই সংগ্রাম হয়। এই জেলাগুলো হচ্ছে-দিনাজপুর, রংপুর, ময়মনসিংহ, যশোর, খুলনা, ঢাকা, চট্টগ্রাম, বগুড়া, পাবনা, ফরিদপুর, হাওড়া, হুগলি, বীরভূম, বাঁকুড়া, মালদহ, নদীয়া, চব্বিশ পরগনা, মেদিনীপুর ও জলপাইগুড়ি। ষাট লক্ষ বর্গা বা ভাগচাষী হিন্দু, মুসলমান, উপজাতি, নারী-পুরুষ জীবনকে তুচ্ছ করে ওই সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন। বাংলার মাটি হিন্দু, মুসলমান ও উপজাতি কৃষকের রক্তে লালে লাল হয়ে এশিয়ার বিখ্যাত এক কৃষক আন্দোলনের সৃষ্টি করেছিল। সারা পৃথিবীতে যতগুলো বড় কৃষক আন্দোলন হয়েছে বাংলার তে-ভাগা আন্দোলন তার অন্যতম। এটা আজ আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত। এই আন্দোলনের ফল হিসেবে পশ্চিমবঙ্গে পরে ভাগচাষের আমূল পরির্তন হয়েছে। (সেখানে উৎপন্ন ফসলের তিন ভাগ চাষী আর একভাগ মালিক পেয়ে থাকে।) কিন্তু বাংলাদেশে আজও ভাগচাষ প্রথার কোনো সংস্কার হয়নি। প্রকৃতির বিস্ময়কর সৃষ্টি উর্বরা বাংলাদেশ নদীমাতৃক বাংলাদেশ। ভূমি এখানে অত্যন্ত উর্বর। কৃষকের লাঙ্গলের ফলায় ফলায় দেশজুড়ে এখানে ফসলের অকৃপণ সমারোহ। কিন্তু যে চাষী ফসলের প্রাণোচ্ছলতায় দেশ ভরে তোলে-সে যুগ যুগ ধরে নির্যাতিত, নিপীড়িত, বঞ্চিত, দরিদ্র ও অভুক্ত। তবে এই নিপীড়ন কৃষকরা নীরবে মুখ বুজে সহ্য করেনি। অগ্নিশিখার মতো বারবার জ্বলে উঠেছে। বীরের মতো লড়াই করেছে। সেই শিখা সময়ে সময়ে স্তিমিত হয়েছে সত্য; কিন্তু ওই জ্বলন্ত শিখাকে কোনোদিন চিরতরে নেভানো যায়নি। অনুকূল বাতাসে তা বার বার জ্বলে উঠে শাসক-শোষকদের হৃৎকম্প জাগিয়েছে।” আন্দোলনের সূচনা ১৯৪৬-৪৭ সালে বাংলার প্রাদেশিক কৃষক সভা ও কমিউনিস্ট পার্টির নেতৃত্বে তে-ভাগার সংগ্রাম শুরু হয়। আন্দোলনের বজ্রকণ্ঠ আওয়াজ ছিল-“ইনক্লাব জিন্দাবাদ। নিজ খোলানে ধান তোল, আধির বদলে তে-ভাগা চাই।” অর্থাৎ মোট উৎপন্ন ফসলের দুভাগ পাবে ভাগচাষী, একভাগ পাবে মালিক। আরো স্লোগান ছিল-“জান দেব তবু ধান দেব না”; “ভাগচাষীদের উচ্ছেদ করা চলবে না”; “জমিদারি প্রথার উচ্ছেদ চাই”; “সাম্রাজ্যবাদ ধ্বংস হোক” প্রভৃতি। পূর্বের প্রথা অনুযায়ী ধান উঠত জোতদারের খোলানে। এবার ধান উঠবে ভাগচাষীর বাড়িতে। সংঘবদ্ধভাবে শৃঙ্খলার সঙ্গে ধান কাটা হবে, কেউ আলাদাভাবে ধান কাটবে না। একদল নারী-পুরুষ ভলান্টিয়ার ধান কাটবে, আর একদল লাঠি, বল্লম, তীর, ধনুক নিয়ে পাহারা দেবে। তে-ভাগা আন্দোলনের প্রত্যেক কেন্দ্রে শক্তিশালী ভলান্টিয়ার বাহিনী গঠিত হয়। বর্গা বা ভাগচাষীদের মধ্যে ছিল হিন্দু, মুসলমান ও উপজাতি কৃষক সবাই। জোতদার ছিল হিন্দু, মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের লোক। পূর্ববাংলায় মুসলমান জোতদাররাই ছিলেন সংখ্যায় বেশি। তাঁদের জমিও ছিল বেশি। পক্ষান্তরে পশ্চিমবাংলায় হিন্দু জমিদারের সংখ্যা ছিল সর্বাধিক। কিন্তু বাংলায় পূর্ব ও পশ্চিমবঙ্গের সব জেলায় তে-ভাগা আন্দোলন গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি। যেসব জেলায় জোতদাররা ভাগচাষীদের অর্ধ-দাসের মতো ব্যবহার করত এবং শোষণ ও জুলুম ছিল মাত্রাতিরিক্ত, সেইসব জেলা ছিল সংগ্রামের পীঠস্থান। দিনাজপুর জেলায় বিশেষ করে ঠাকুরগাঁও মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) তে-ভাগা আন্দোলন ব্যাপকতা লাভ করে। এটা ছিল তে-ভাগা আন্দোলনের মূল কেন্দ্র। দিনাজপুর জেলায় ৩০টি থানার মধ্যে ২২টি থানায় তে-ভাগা আন্দোলন দ্রুত এগিয়ে যায়। রংপুর জেলায় নীলফামারী মহকুমায় (বর্তমানে জেলা) আন্দোলন হয় তীব্র। যশোর জেলায় আন্দোলন হয় নড়াইল মহকুমায় (বর্তমানে জেলা)। পাবনা জেলার একাংশে তে-ভাগা আন্দোলন গড়ে উঠেছিল। ময়মনসিংহ জেলার চারটি স্থানে আন্দোলনের উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়। এখানে মূল আন্দোলন ছিল টংক আন্দোলন। ঢাকা জেলার কুকুটিয়া অঞ্চলে তে-ভাগা আন্দোলন গড়ে ওঠে। জোতদার-পুলিশের মিলিত হামলা রংপুরের নীলফামারী মহকুমায় তে-ভাগা সংগ্রাম শুরু। শত শত কৃষক অতি শৃঙ্খলার সঙ্গে যৌথভাবে ধান কেটে ভাগচাষীদের বাড়িতে তুলছিল। এই অভিনব দৃশ্য দেখে জোতদাররা নীরব হয়ে বসে থাকেনি। প্রথম দিকে জোতদাররা নানা রকম গুজব ছড়িয়ে ভাগচাষীদের নৈতিক শক্তি ভেঙে দিতে চেয়েছিল। কিন্তু তাতে তারা সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। পরে গুণ্ডাবাহিনী লেলিয়ে দেয়। গুণ্ডার দল কৃষক ভলান্টিয়ারদের লাঠির ঘায়ে ধরাশায়ী হয়ে যেদিকে পারে পালিয়ে যায়। পরে জোতদাররা বন্দুক আমদানি করল। রংপুর জেলার ডিমলা থানার খগাখড়ি বাড়িতে জোতদাররা পাঁচটি বন্দুক নিয়ে অতর্কিত আক্রমণ করে এবং কৃষক নেতা তগনারায়ণকে হত্যা করে ও বাচ্চা মামুদকে গুরুতরভাবে জখম করে। জোতদাররা মনে করেছিল তারা এই হত্যাকাণ্ডের দ্বারা কৃষকদের দমিয়ে দিতে পারবে। দমানো দূরের কথা, কৃষকরা প্রতিশোধের জন্য উত্তেজিত হয়ে ওঠে। কৃষকরা বন্দুক উপেক্ষা করে জোতদারদের গুণ্ডাবাহিনীর ওপর হামলা চালায়। গুলি ছুড়ে আরো কয়েকজনকে আহত করা হয়। কিন্তু তাতেও তাঁরা দমেনি। অবস্থা বেগতিক দেখে জোতদারদের গুণ্ডাবাহিনী পলায়ন করে। স্বভাবতই অতঃপর জোতদারদের ও ধনীদের স্বার্থ রক্ষার্থে দ্রুত সেখানে পুলিশের আবির্ভাব ঘটে। পুলিশের আকস্মিক আবির্ভাবে সবাই হতবাক হয়ে গেল। এত তাড়াতাড়ি পুলিশ কী করে এলো? বস্তুত আগে থেকে ষড়যন্ত্র ও যোগাযোগের ফলেই এত দ্রুত পুলিশের আমদানি হয়েছিল। পুলিশ এসে তগনারায়ণের মৃতদেহ কেড়ে নিল। কিন্তু পরের দিন ২৮ মাইল হেঁটে এক ঐতিহাসিক মিছিল নীলফামারীতে উপস্থিত হলো। তখন ছিল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার অবস্থা। ওই দাঙ্গাকে উপেক্ষা করে ২৫ হাজার লোকের এক মিছিল নীলফামারীতে উপস্থিত হলো। আওয়াজ উঠল, “হিন্দু-মুসলমান ভাই ভাই, মেহনতি মানুষের জাতিভেদ নাই, জোতদারি ষড়যন্ত্র ধ্বংস কর, তে-ভাগা আইন পাস কর” প্রভৃতি। দাঙ্গার আশঙ্কা সেখানে এভাবে শেষ হয়ে গেল। অনেক জায়গায় প্রতিরোধের মুখে দালালরা প্রাণ নিয়ে পালিয়ে আসতে বাধ্য হলো। এরপর সশস্ত্র পুলিশের শক্তি বৃদ্ধি করা হতে থাকল। সশস্ত্র পুলিশ দিনাজপুর জেলার পতিরাম থানার খাঁ-পুরে কৃষক নেতা চিয়ার সাঁই সমেত ২৬ জনকে হত্যা করে। ১৯৪৭ সালের জানুয়ারি মাসে চিরিরবন্দরে (দিনাজপুর) শিবরাম (সাঁওতাল) ও নিঃস্ব কৃষক সমিরউদ্দিনকে পুলিশ গুলি করে হত্যা করে। ১৯৪৭ সালে নালিতাবাড়ির কাছে জোতদার বিনোদ পাল গুণ্ডা লেলিয়ে সর্বেশ্বর ডালুকে হত্যা করে। এটা ছিল টংক এলাকার মধ্যে। এখানে ঐক্যবদ্ধ কোনো তে-ভাগা আন্দোলন হয়নি। বিভিন্ন জেলায় বিভিন্ন সময়ে জোতদার-জমিদারের দালাল, গুণ্ডাবাহিনী ও পুলিশ ভাগচাষীদের বাড়িঘর ভেঙে ফেলে, মেয়েদের ধর্ষণ করে এবং গ্রামে গ্রামে বিভীষিকার রাজত্ব কায়েম করে। সারা প্রদেশে ৩ হাজার ১১২ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, হত্যা করা হয় ৫০ জনকে। এই নৃশংস অত্যাচারের কোনো অজুহাত ছিল না, কারণ কৃষকরা কোনো জোতদারের বাড়ি আক্রমণ করেনি। কেবল কায়েমি স্বার্থবাদীদের স্বার্থরক্ষার জন্যই সরকার এরূপ বর্বর নির্যাতন চালিয়েছিল। তে-ভাগা সংগ্রামের বৈশিষ্ট্য তে-ভাগা সংগ্রামের কতগুলো বিশেষ দিক আছে, বিশেষত্ব আছে। ১৯৪৬-৪৭ সালে মুসলিম লীগের জোয়ারের ফলে জনসাধারণের ওপর মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িকতার রাজনীতির বিরাট প্রভাব সৃষ্টি হয়েছিল। শুধু তাই নয়, ১৯৪৬ সালের ১৬ আগস্টকে মুসলিম লীগ প্রত্যক্ষ সংগ্রাম দিবস ঘোষণা করে। সংগ্রাম হিন্দুর বিরুদ্ধে। কলকাতা এবং অন্যান্য জায়গায় সে সময় বীভৎস সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার সূত্রপাত হয়। তার ক্ষত তখনো শুকিয়ে যায়নি। এই অবস্থার পটভূমিতে কৃষক সমিতি হিন্দু, মুসলিম ও উপজাতি কৃষকের এক বড় অংশকে তে-ভাগার সংগ্রামে সক্রিয় অংশগ্রহণ করাতে সক্ষম হয়। তাঁরা শুধু সক্রিয় অংশ গ্রহণই করেননি চিয়ার সাঁইয়ের মতো নেতা, সমিরউদ্দীনের মতো নিঃস্ব কৃষক বীরের মতো অকুতোভয়ে লড়াই করে শহীদ হয়েছেন। এই সময়ে মুসলিম লীগের সাম্প্রদায়িক জিগিরে মুসলমান সমাজের প্রায় সব শিক্ষিত ব্যক্তি পাকিস্তানের সমর্থক হয়ে পড়েন। অন্যদিকে হাতে গোনা যায় এমন কয়েকজন শিক্ষিত মুসলমান নেতা কৃষক আন্দোলনের দিকে আকৃষ্ট হন। তাঁরা হচ্ছেন-হাজী মোহাম্মদ দানেশ (দিনাজপুর), আলতাব আলী (ময়মনসিংহ), মোহাম্মদ ইয়াকুব মিয়া (কুমিল্লা), মুন্সী জহিরউদ্দিন (ময়মনসিংহ), ডা. আবদুল কাদের (বগুড়া), কছিম মিয়া (রাজশাহী) ও নূরজালাল মিয়া (যশোর) প্রমুখ। এসব শিক্ষিত ব্যক্তি ছাড়াও বিভিন্ন জেলায় আন্দোলনের মধ্য থেকে নেতা গড়ে ওঠে। চিয়ার সাঁই, নিয়ামত আলী, জামসেদ আলী চাটি, বাচ্চা মামুদ (দিনাজপুর, রংপুর), সাবির মণ্ডল, মন্তাজউদ্দিন, মজিদ মিয়ার (ময়মনসিংহ) নাম এই সংগ্রামে উল্লেখযোগ্য। রাজবংশীদের মধ্যে বহু নেতা ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন কম্পরাম সিং, তাঁকে ১৯৫০ সালে রাজশাহী জেলের খাপড়া ওয়ার্ডে গুলি করে হত্যা করা হয়। আরো ছিলেন রূপনারায়ণ রায় (তিনি ১৯৪৬ সালে যুক্ত বাংলার আইন পরিষদের সদস্য ছিলেন। নকশালপন্থিরা তাঁকে ১৯৭৩ সালের ২৩ মার্চ হত্যা করে), আভরণ সিং, রাম সিং (দিনাজপুর), তগনারায়ণ, দীন দয়াল, কালাচাঁদ (রংপুর)। ময়মনসিংহে হাজংদের মধ্যে প্রথম শ্রেণির নেতা হচ্ছেন ললিত সরকার, বিপিন গুণ, পরেশ সরকার, কাঙাল দাস, গজেন্দ্র রায়, নয়াম সরকার প্রমুখ। শিক্ষিত হিন্দু মধ্যবিত্ত থেকে আসা এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নেতা কৃষক আন্দোলন গড়ে তোলার জন্য সচেষ্ট ছিলেন। এসব বিপ্লবী চিন্তাধারার কর্মী অত্যন্ত পরিশ্রম ও ত্যাগ স্বীকার করে আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। আরেকটি বিশেষত্ব হচ্ছে মেয়েদের এক বিরাট অংশ তে-ভাগা আন্দোলনে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেন। শুধু যে তাঁরা ভলান্টিয়ার ছিলেন তাই নয়, তাঁদের মধ্যে দুর্র্ধষ ও কৌশলী নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়েছিল। রাজবংশী মেয়ে ভা-নী পুলিশের এক জমাদারের হাত থেকে বন্দুক ছিনিয়ে নিয়ে তাকে সারারাত এক ঘরে আটকে রাখেন। দিনাজপুরের রানীশংকাইলের রাজবংশী কৃষকবধূ জয়মণির প্রতাপ ছিল দোর্দণ্ড। তাঁর দলের আক্রমণে অনেক সময় পুলিশ পলায়ন করতে বাধ্য হয়েছে। তিনি সামান্য লেখাপড়া জানতেন। এমন আরেকজন নেত্রী ছিলেন দিনাজপুরের দীপপুরী। তিনি ভলান্টিয়ারদের উৎসাহ দিয়ে নিজেই লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে পুলিশকে আক্রমণ করেন। পুলিশ পিছু হটে পলায়ন করে। দিনাজপুরের আরো অনেকের নাম করা যায়, যেমন শিখা বর্মণ, মাতি বর্মণী, জয় বর্মণী। কৃষক আন্দোলনের একজন দুর্র্ধষ নেত্রী ছিলেন সরলাদি। তিনি ছিলেন এক নমঃশূদ্র কৃষক মহিলা। যশোর জেলার নড়াইল মহকুমার গোয়াখোলা গ্রামে ছিল তাঁর বাড়ি। নড়াইলে যে তে-ভাগা আন্দোলন গড়ে ওঠে তার কেন্দ্র ছিল বাকড়িগ্রাম। সরলাদির যেমন ছিল সাহস, তেমনি গায়ে ছিল জোর। পুরুষরাও তাঁর কাছে হার মানত। সরলাদি আড়াইশ-তিনশ মেয়ের একটি ঝাঁটা বাহিনী সংগঠিত করেছিলেন। ঝাঁটার মুখে দুই-দুইবার পুলিশ বাহিনীকে মাফ চেয়ে সরে পড়তে হয়। ভলান্টিয়ার বাহিনী ঢাল-সড়কি নিয়ে পাহারা দিত। অনেক সময় পুলিশ তাদের ব্যূহ ভেদ করতে ব্যর্থ হয়ে ফিরে যেত। পুলিশ সরলাদিকে ধরার জন্য চেষ্টা করেছে, কিন্তু প্রতিবারই তিনি বুদ্ধির জোরে পুলিশকে ফাঁকি দিয়ে বেষ্টনী ভেদ করে চলে গেছেন। সরলাদি আজ আর বেঁচে নেই। কিন্তু তাঁর বিস্ময়কর কাহিনী সেখানকার কৃষকরা শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেন। সাফল্য ও ব্যর্থতা ১৯৪৬ সালে আবার টংক আন্দোলনের সঙ্গে সঙ্গে ময়মনসিংহ জেলার নেত্রকোণায় সিংহের বাংলা গ্রামে, রামেশ্বরপুরে, কিশোরগঞ্জের চাতল ও টংক এলাকার মধ্যে হালুয়াঘাটের এক অংশে কৃষক সমিতি ও কমিউনিস্ট পার্টির মিলিত নেতৃত্বে তে-ভাগা আন্দোলন শুরু হয়। রামেশ্বরপুরে সেতু রায় ছিলেন নেতা, তিনি ছিলেন স্থানীয় লোক। এখানে আন্দোলনের শক্তিতে আমরা একটি আপস সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হই। আধিয়ারেরা পাবে নয় আনা, আর মালিক পাবে সাত আনা। হালুয়াঘাটেও আমরা আপস সিদ্ধান্তে পৌঁছি। কৃষক পাবে দশ আনা আর মালিক পাবে ছয় আনা। এটা টংক এলাকার মধ্যে ছিল বলে এখানে আমাদের সংগঠন ছিল শক্তিশালী। কাজেই আপসরফায় বেগ পেতে হয়নি। আন্দোলন হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টি ও কৃষক সভার নেতাদের ওপর দমনপীড়ন নেমে এলো। নেতারা সবাই আত্মগোপন অবস্থায় চলে গেলেন। ময়মনসিংহ জেলায় কংগ্রেস ও মুসলিম লীগ উভয়েই তে-ভাগা আন্দোলনের বিরুদ্ধে ছিল। লীগের নেতা গিয়াসউদ্দীন পাঠান (মরহুম) মন্তব্য করলেন, “কমিউনিস্টরা এমন এক আওয়াজ তুলেছে যে, এ ব্যাপারে হাঁ করাও বিপদ, আবার না করাও বিপদ।” তাঁরা মাথা খাটাতে লাগলেন। অনেক মাথা খাটিয়ে গিয়াসউদ্দীন পাঠান কিশোরগঞ্জের চাতলে উপস্থিত হলেন। তিনি চাতলে একটি সভা ডাকলেন। তাঁর বক্তব্যের মর্ম হচ্ছে, “শুনেন মিয়ারা, আমরা কিছুদিনের মধ্যে পাকিস্তান আনছি। পাকিস্তান কী? মুসলমানের সেই বাদশাহি জামানা! তখন তে-ভাগা তো তুচ্ছ, আপনারা চৌ-ভাগা পাবেন, চৌ-ভাগা! কয়েকটা কমিউনিস্টের পাল্লায় পড়ে জেল খাটার বন্দোবস্ত হয়েছে, ছাড়েন এদের পাল্লা। আইন মোতাবেক চলেন। ললিত বাগচীর ধান ললিত বাগচীর বাড়ি দিয়ে আসেন (ললিত বাগচী ছিল এলাকার মূল জোতদার, তার জমিতে তে-ভাগা করা হয়েছিল)।” প্রতিক্রিয়াশীল মুসলিম লীগ নেতার বক্তব্য মুসলিম কৃষকদের মধ্যে যাদুর মতো কাজ করল। ভাগচাষির বাড়িতে জমা করা ধান মুসলিম কৃষকরা মাথায় করে ললিত বাগচীর বাড়িতে পৌঁছে দিল। তে-ভাগা আন্দোলন চাতলে ব্যর্থ হলো। এটা ছিল একটি নতুন এলাকা। আমরা এখানে ভাগচাষিদের শ্রেণিসচেতন করে তুলতে পারিনি। ফলে আমাদের আন্দোলন অঙ্কুরেই বিনষ্ট হয়ে গেল। নিঃস্ব ভাগচাষির শ্রেণিসংগ্রামের মুখে দুই পরস্পরবিরোধী সাম্প্রদায়িক নেতার শ্রেণিস্বার্থের এই অপূর্ব মিলন ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা। নেত্রকোণার সিংহের বাংলা গ্রামে আমরা জয়লাভ করতে পারিনি সত্য, কিন্তু একটি ঘটনা আমার স্মৃতিতে আজও ভাস্বর হয়ে রয়েছে। এখানে মালিকরা ছিলেন হিন্দু ও ভাগচাষিদের অধিকাংশ ছিলেন মুসলমান। ভাগচাষিরা ছিলেন খুব গরিব। অন্যান্য জায়গার মতো এখানে পুলিশ টহল দিয়ে বেড়াচ্ছিল। ভাগচাষিদের মনে ভীতির সঞ্চার করছিল, জেলের ভয় দেখাচ্ছিল। শুধু তাই নয়, আমাদের এক কর্মী নিত্যানন্দকে নির্মম শারীরিক নির্যাতন করেছিল। নেতারা তখন আত্মগোপনে। নিত্যানন্দকে প্রহার করা হয়েছে এই খবর গ্রামে বিদ্যুৎবেগে ছড়িয়ে পড়ে। নিত্যানন্দ ছিল এখানে একজন জনপ্রিয় কর্মী। গ্রামে সবাই ক্ষুব্ধ কিন্তু কোনো প্রতিবাদ মিছিল বের করা সম্ভব হয়নি। কারণ এখানকার সংগঠন ছিল দুর্বল। ভাগচাষিদের মেয়েরা গরিব ও পর্দানশীল। আমাদের সঙ্গে তাঁদের যোগাযোগ বা কথাবার্তা ছিল না। রাজবংশী নমঃশূদ্র বা হাজং মেয়েদের মতো তাঁরা বের হতেন না। কাজেই আমরা তাঁদের সঙ্গে আলোচনা করতে পারতাম না। তাঁরা পর্দার আড়ালে থাকতেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণ করতেন না। তাঁদের মানসিক অবস্থা সম্পর্কে আমরা ছিলাম সম্পূর্ণ অজ্ঞ। এলাকাটিও আমাদের জন্য ছিল অপেক্ষাকৃত নতুন। এই সময় একদিন দুজন সশস্ত্র পুলিশ খুব দাপাদাপির পর এক গরিব কৃষকের বাড়ির বাইরে, এক গাছতলায় বসে বিড়ি ফুঁকছিল। এমন সময় ওই বাড়ি হতে দুজন মুসলমান যুবতী বধূ দুটি দা হাতে রণমূর্তির বেশে বের হয়ে এলেন। তারা সামাজিক রীতিনীতি ভুলে গেলেন। উচ্চ স্বরে চিৎকার করে নিজেদের ভাষায় বললেন, “বান্দির পুতরা, আমরার লুকেরে মারছস্ কে ন, এই দাও দিয়া তরারে জবো কইরা ফালাইবাম!” যুবতীদের আকস্মিক এই রণমূর্তি দেখে হতচকিত ও ভীতসন্ত্রস্ত এই পুলিশদ্বয় রাইফেল ফেলে যে যেদিকে পারল দৌড়ে পালিয়ে গেল। যুবতী দুজন এই অবস্থার জন্য প্রস্তুত ছিল না, তাঁরা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওই সময়ে এই এলাকার সরকারের খুব খয়ের খাঁ এক মুন্সী ঐদিকে আসার সময় যুবতীদের দেখে বললেন, “যা, যা তোরা বাড়ির ভেতরে আবরুর মধ্যে যা।” অনুগত মুন্সী সাহেব সরকারি বন্দুক ওইভাবে পড়ে থাকতে দেখে সরকারি মাল পৌঁছবার জন্য দুই কাঁধে দুই রাইফেল নিয়ে চার মাইল দূরে থানায় উপস্থিত হলো। মুন্সী ভেবেছিলেন, সরকারের এত বড় একটি কাজ করলেন, সেজন্য প্রশংসা তো পাবেনই, এমন কি ইনাম-বখশিশও নিশ্চিতভাবে মিলবে। কিন্তু হায়! ফল বিপরীত হলো। দারোগা মুন্সীকে উত্তম ধোলাই দেওয়ার নির্দেশ দিলেন। উপকার হলো এই যে, তাঁর ব্রিটিশ ভক্তির নেশা চিরতরে ছুটে গেল।