শ্রমিকশ্রেণির আপনজন সহিদুল্লাহ চৌধুরী

Posted: 04 জানুয়ারী, 2026

সহিদুল্লাহ চৌধুরী শ্রমিকশ্রেণির কাতার থেকে একজন প্রকৃত কমিউনিস্ট বিপ্লবী হয়ে উঠেছিলেন, স্বল্প শিক্ষিত এই শ্রমিক নেতা ৭০ এর দশকে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য, ৮০ র দশকে সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য, প্রেসিডিয়াম সদস্য, ১৯৯৩ সালে পার্টির বিশেষ কংগ্রেসে পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৪২ সালের ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার নবীনগর থানার কনিকাড়া গ্রামে একটি দরিদ্র পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন সহিদুল্লাহ চৌধুরী। ১৯৫৪ সালে তাঁর বয়স যখন মাত্র ১২ বছর সেই সময় যুক্তফ্রন্টের নির্বাচনে কাজ করেছিলেন তিনি। তখন তিনি সবেমাত্র পঞ্চম শ্রেণিতে পড়েন। সংসারের দারিদ্র্যতার কারণে পঞ্চম শ্রেণিতেই আটকে যায় তার লেখাপড়ার অধ্যায়। পড়ালেখা করার প্রবল ইচ্ছা থাকলেও পড়ালেখা আর চালিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়নি। এরপর ১৯৫৮ সালের অক্টোবর মাসে আইয়ুব খান দেশে মার্শাল ল জারি করলে ঢাকার ডেমরা এলাকায় চলে আসেন সহিদুল্লাহ চৌধুরী। তখন ডেমরা এলাকায় লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে চাকরি করতেন তার এক বড় ভাই আবদুল মালেক। বড় ভাইয়ের কাছে লতিফ বাওয়ানী জুট মিলে একটি চাকরির ব্যাবস্থা করে দিতে বললে তখন কোনো ব্যাবস্থা করে দেননি আবদুল মালেক। এরপর ঢাকায় বিভিন্ন ধরণের কাজ করে ৫ বছর অতিবাহিত করার পর বড় ভাই আবদুল মালেকের বদৌলতে লতিফ বাওয়ানীতে চাকরি পান সহিদুল্লাহ চৌধুরী। ১৯৬৪ সালের জুন মাসে শ্রমিকদের বেতনের শতকরা ৬০ শতাংশ বোনাস ও বেতন ৬৪ টাকা থেকে ৮১ টাকায় উন্নীত করতে একটি ধর্মঘট আন্দোলন শুরু হয় সেই আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন আদমজী জুট মিলের শ্রমিক নেতা হাশেম মোল্লা। তিনি ছিলেন লেবার ফেডারেশনের সমর্থক আর লেবার ফেডারেশন ছিল আইয়ুব খান সমর্থিত। সেই ধর্মঘট ২১ দিন চলার পর মালিক পক্ষ শ্রমিকদের দাবি পূরণে ২ মাসের সময় নেন কিন্তু এরমধ্যে কোনো সুরাহা হয়নি। তখন হাশেম মোল্লার হাত থেকে সেই আন্দোলন ছুটে গিয়ে বামপন্থিদের হাতে চলে যায়। আবুল বাশার, আব্দুল মান্নান, সাইদুর রহমানের নেতৃত্বে ঐ বছর আগস্ট মাসে পুনরায় ধর্মঘট শুরু হয় আর সেই ধর্মঘট ৫৬ দিন দীর্ঘ হয়। ঐ সময় প্রথমবারের মতো শ্রমিক আন্দোলনে সম্পৃক্ত হন সহিদুল্লাহ চৌধুরী এবং পরিচিতি লাভ করেন। তখনি নিষিদ্ধ ঘোষিত কমিউনিস্ট পার্টির সাথে সম্পৃক্ত হন। চাকরিরত অবস্থায় ডেমরার যে এলাকাটিতে একটি মেসে থাকতেন সহিদুল্লাহ চৌধুরী সেখানে প্রায় সহস্রাধিক হিন্দু লোকের বসবাস ছিলো। তাদের সাথে খুবই ভালো সম্পর্ক ছিলো তার। জুটমিলে চাকরি করার দুই বছরের মাথায় ১৯৬৫ সালে ভারতের কাশ্মীরে হযরত মোহাম্মদ (সা.)-এর একটি বিষয় নিয়ে ভারত ও পাকিস্তানে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা ছড়িয়ে পড়ে। সেই দাঙ্গা তখন পূর্ব পাকিস্তানেও প্রবেশ করে। এর সুযোগ নেয় ডেমরা এলাকার পাটকল মালিকেরা। মালিকপক্ষ কিছু বিপথগামী শ্রমিক ও বহিরাগতদের মাধ্যমে সেই দাঙ্গা বাওয়ানী জুট মিলের শ্রমিকদের মাঝে ছড়িয়ে দেয়। সেদিন ছিলো ১৯৬৫ সালের ১৪ জানুয়ারি। ঐদিন ধর্মের নামে ৫০০ জন মানুষকে বীভৎসভাবে হত্যা করে আর সেই হত্যাকান্ডের দৃশ্য সহিদুল্লাহ চৌধুরীর মনকে ব্যাপকভাবে নাড়া দেয়। ঐদিন তিনি ভেবেছিলেন আসলে ধর্মের নামে একটি অপ্রয়োজনীয় বিষয়ের মাধ্যমে সমাজে মানুষে মানুষে বিভেদের দেয়াল সৃষ্টি করে রাখা হয়েছে যাদের সাথে একসাথে কাজ করেছে, একসাথে ঘুমিয়েছে ধর্মের নামে তাদেরকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে। সেই দিন থেকেই ধর্মের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলেন তিনি। ১৯৬৬ সালের ছয় দফা আন্দোলনে অংশ নেন তিনি। ১৯৬৭ সালে পাটকল শ্রমিকদের আন্দোলনের সামনের কাতারে চলে আসেন তিনি। বাওয়ানী জুট মিলের শ্রমিকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠেন। ঐ বছরেই তিনি লতিফ বাওয়ানী জুট মিলের শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। ১৯৬৮ সালে কমিউনিস্ট পার্টির গোপন কংগ্রেসের প্রতিনিধি হন। ১৯৬৯ এর ছাত্রদের ১১ দফা আন্দোলনে শ্রমিকদের নিয়ে অংশগ্রহণ করেন। তারপর থেকেই এদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে অংশগ্রহণ, দেশমুক্ত হওয়ার পর বিধ্বস্ত মিল চালু করার উদ্যোগ গ্রহণ করেন। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশের শ্রমিক আন্দোলনে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেন। ১৯৭২ সালে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্রের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন। বাংলাদেশের সমস্ত প্রগতিশীল-গণতান্ত্রিক আন্দোলনের সামনের কাতারের সৈনিক ছিলেন সহিদুল্লাহ চৌধুরী। সহিদুল্লাহ ভাইয়ের সাথে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৬৯ সালে। ঘূর্ণিঝড়ে ডেমরা এলাকার ঘরবাড়ি, কলকারখানা বিধ্বস্ত হয়ে গিয়েছিলো। ঘূর্নিঝড়ে কুমিল্লার মুরাদনগর, হোমনার বাড়িঘর স্কুল কলেজ উড়ে গিয়েছিলো। আমি রিলিফ দেয়ার জন্য জীতেন ঘোষ ও মাওলানা আহমেদুর রহমান আজমীর সাথে মুরাদনগর হোমনা হয়ে ডেমরায় গিয়েছিলাম। ঐ সময় শহীদ ভাইয়ের সাথে দেখা। উনি আমাদেরকে দুপুরের খাবারের ব্যবস্থা করলেন। খাওয়া শেষে আমি এবং আজমী ভাই চট্টগ্রামের দিকে যাত্রা করি। জীতেন দা চলে গেলেন ঢাকা। পরে শ্রমিক আন্দোলনসহ বহু সংগ্রামের সাথী হয়েছি। ১৯৮৪ সালে বিয়ে করে আমার স্ত্রীকে নিয়ে উঠেছিলাম উনার টিনশেডের বাসায়। যাক সে অনেক স্মৃতি। শ্রমিকের চাকরি করতে গিয়ে পুঁজি-পুঁজিপতির শোষণ যে কি নির্মম তাঁর মধ্যে এই উপলব্ধি সৃষ্টি হয়। শ্রমিকের দাবি-দাওয়া নিয়ে আন্দোলনে যতই যুক্ত হতে থাকেন তখন নানা রকমের শ্রমিক নেতাদের সাথে পরিচয় হয়। শ্রমিক এলাকায় নিষিদ্ধ ঘোষিত শ্রমিকশ্রেণির পার্টি সক্রিয় ছিলো। কমিউনিস্ট পার্টির কর্মী ও নেতাদের সাথে পরিচয় ঘটে। শ্রমিক আন্দোলনের প্রতি তাদের নিষ্ঠা ও আন্তরিকতায় তিনি আকৃষ্ট হয়ে উঠেন। পরিচয় ঘটে কমরেড নাসিম আলী খান, অনীল মূখার্জী, সুনীল রায়দের সাথে ফলে শ্রমিক আন্দোলনের দাবি-দাওয়ার অর্থনীতিবাদি আন্দোলনের পর্যায় থেকে তার চেতনা ক্রমান্বয়ে সমাজ বদলের গুনগত চেতনায় রুপান্তরিত হয়। শ্রমিক নেতা হিসেবে শ্রমিকের দাবি-দাওয়া নিয়ে মালিক-সরকার-শ্রমিক নেতৃত্বের ত্রিপক্ষীয় আলোচনায় বসে মালিক ও সরকারের শ্রমিক স্বার্থের বিরোধিতা করতে দেখেছেন ফলে সমাজ ও রাষ্ট্র যে শ্রেণী নিরপেক্ষ নয় কোনো না কোনো শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা করে এই বুঝ তার কাছে দিনদিন পরিষ্কার হয়ে উঠে। সহিদুল্লাহ চৌধুরী শ্রেণিচ্যুত শ্রমিক শ্রেণির প্রতিনিধি ছিলেননা। তিনি নিজে শ্রমিক ছিলেন। সামাজিক অবস্থানগত কারণে সর্বহারাদের ভিতরের মানুষ ছিলেন। তাদের অংশ ছিলেন বলেই তাদের দুঃখ, কষ্ট, বেদনা ভিতর থেকে ধরতে পারতেন। শ্রেণিচ্যুত মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত কমরেডদের ন্যায় শ্রমিকদের দুঃখ কষ্ট বেদনা নিয়ে উপরভাসা বা আরোপিত ভালোবাসা পোষণ করতেন না। শ্রমিক মেহনতি মানুষের আন্দোলনকে নেতা হওয়ার, ক্ষমতার সিঁড়ি হিসেবে ব্যবহার করেননি। সমাজ বদলের হাতিয়ার হিসেবে দেখেছেন আমৃত্যু। সমাজের প্রান্তিক অবস্থান থেকে উঠে আসা শ্রমিক নেতা কমরেড সহিদুল্লাহ চৌধুরী তাঁর প্রখর বুদ্ধিদীপ্ত চেতনা, ধীর শক্তি, শৃঙ্খলা, শিল্প-শ্রমিক অর্থীনীতি সম্পর্কে জ্ঞান, সাংগঠনিক দক্ষতা, রাজনৈতিক কৌশল নির্ধারণে তাঁর পরামর্শ ও অবদান তাঁকে জাতীয় নেতার কাতারে দাঁড় করিয়েছিলো। শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষের ও গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল আন্দোলনের অগ্রগতির মধ্যেই সহিদুল্লাহ চৌধুরী বেঁচে থাকবেন। লেখক : সাবেক সভাপতি, সিপিবি