ভেনেজুয়েলায় মাদুরোকে সরানো যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কি এতটা সহজ হবে!
Posted: 04 জানুয়ারী, 2026
একতা বিদেশ ডেস্ক :
ভেনেজুয়েলা ও যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক এখন আর কেবল কূটনৈতিক টানাপোড়েন নয়; এটি কার্যত এক দীর্ঘস্থায়ী ‘যুদ্ধাবস্থায়’ রূপ নিয়েছে। সামরিক সংঘর্ষ সরাসরি শুরু না হলেও অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা, তেলবাণিজ্যে অবরোধ, সমুদ্রপথে নজরদারি ও নৌযানে হামলা এবং রাজনৈতিক চাপ—সব মিলিয়ে পরিস্থিতি যুদ্ধকালীন উত্তেজনার কাছাকাছি। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই উত্তেজনা আবারও বেড়েছে, যা আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলোতে নতুন করে আলোচনার কেন্দ্রে এসেছে।
এই সংঘাতের কেন্দ্রে আছেন ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলা মাদুরো। এখন প্রশ্ন হচ্ছে-ষাটোর্ধ্ব মাদুরো ক্ষমতা ছাড়লে কি ভেনেজুয়েলার সব সমস্যার সমাধান হবে? নাকি তাঁর বিদায় আরও বড় অস্থিরতার পথ খুলে দেবে? এই প্রশ্নের উত্তর সরল নয়, কারণ সংকটটি কেবল একজন শাসকের নয়; এটি রাষ্ট্রব্যবস্থা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থের জটিল সমীকরণ।
ভেনেজুয়েলার বর্তমান সংকটের শিকড় খুঁজতে গেলে হুগো চাভেজ-পরবর্তী রাজনৈতিক ধারাবাহিকতা, দেশটির তেলের ওপর অতিনির্ভরশীল অর্থনীতি এবং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দীর্ঘদিনের বৈরিতার কথা বলতে হয়। ২০১৩ সালে চাভেজের মৃত্যুর পর মাদুরো ক্ষমতায় আসেন। এরপর থেকেই নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হওয়া, বিরোধী দল দমন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর দলীয়করণ—এই তিন অভিযোগ তাঁর শাসনের বিরুদ্ধে উঠতে থাকে।
যুক্তরাষ্ট্র শুরু থেকেই মাদুরোর সরকারকে অবৈধ বলে দাবি করে আসছে। ২০১৯ সালে বিরোধী নেতা হুয়ান গুয়াইদোকে অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের স্বীকৃতি দেওয়া সেই দ্বন্দ্বকে আরও তীব্র করে তোলে। যদিও গুয়াইদোকে নিয়ে তৈরি সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত ব্যর্থ হয়, তবু সে সময় থেকে বিশেষ করে তেল খাতকে লক্ষ্য করে যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হয়।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স ও এপির প্রতিবেদন মতে, এই পরিস্থিতিকে অনেক বিশ্লেষক ‘যুদ্ধাবস্থা’ বলছেন মূলত তিনটি কারণে। প্রথমত, যুক্তরাষ্ট্র ভেনেজুয়েলার তেল রপ্তানি কার্যত অবরুদ্ধ করে দিয়েছে। দ্বিতীয়ত, ক্যারিবীয় সাগরে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতি ও নজরদারি বেড়েছে। তৃতীয়ত, মাদুরো সরকারের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে মাদক পাচার ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ এনে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের বিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা চলছে।
যুদ্ধ এখানে সরাসরি বোমা বা ক্ষেপণাস্ত্রের মাধ্যমে নয়; বরং অর্থনীতি ও কূটনীতির মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞরা একে ‘হাইব্রিড কনফ্লিক্ট’ বলছেন, যেখানে নিষেধাজ্ঞা নিজেই একটি অস্ত্র।
যুক্তরাষ্ট্রের যুক্তি হলো—নিষেধাজ্ঞা মাদুরো সরকারকে দুর্বল করবে। কিন্তু বাস্তবে এর বড় ধাক্কা গিয়ে পড়েছে সাধারণ মানুষের ওপর। ভেনেজুয়েলায় খাদ্যসংকট, ওষুধের অভাব ও মুদ্রাস্ফীতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে লাখ লাখ মানুষ দেশ ছেড়ে প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোতে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে।
এই মানবিক সংকট আবার মাদুরোর জন্য রাজনৈতিক হাতিয়ারও হয়েছে। তিনি বারবার যুক্তরাষ্ট্রকে ‘অর্থনৈতিক যুদ্ধ’-এর জন্য দায়ী করে জাতীয়তাবাদী আবেগ উজ্জিবিত করতে পারছেন। ফলে নিষেধাজ্ঞা একদিকে সরকারকে চাপে ফেললেও, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণভাবে শাসন টিকিয়ে রাখার শক্তিও জুগিয়েছে।