হিন্দুত্ববাদীরা যেভাবে বদলে দিচ্ছে ভারতের পরিচয়
Posted: 04 জানুয়ারী, 2026
ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি চলতি বছরে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভাষণটি দিয়েছিলেন গত আগস্টে, দেশের স্বাধীনতা দিবসে। ওই ভাষণটি দিতে এমন একটি সংগঠনের মঞ্চকে ব্যবহার করে সংগঠনটিকে সম্মানিত করেছিলেন তিনি, যা শুধু তাঁর জীবনই নয়, গোটা ভারতকে নতুন পরিচয়ে গড়ে তুলছে।
মোদির ১১ বছরের শাসনকালে কট্টর ডানপন্থী হিন্দু জাতীয়তাবাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ বা আরএসএসের প্রতি এটিই ছিল তাঁর সবচেয়ে জোরালো ও প্রকাশ্য স্বীকৃতি। মোদি যখন একজন কিশোর, তখন থেকেই তাঁর ব্যক্তিগত ও পেশাজীবন গড়ে তুলেছে এই সংগঠন। চলতি বছর আরএসএস যখন তাদের শতবর্ষ উদ্যাপন করেছে, তখন মোদির এই স্বীকৃতি এটা দেখিয়ে দেয় যে সংগঠনটি কীভাবে আজ ভারতে ক্ষমতার নেপথ্যের এক নিয়ন্ত্রক শক্তিতে পরিণত হয়েছে।
ভারতে মুসলমানদের দীর্ঘ শাসন এবং ঔপনিবেশিক শাসনের পর হিন্দু গৌরব নতুন করে জাগিয়ে তোলার লক্ষ্যে একটি ছায়া সংগঠন হিসেবে আরএসএসের জন্ম। গত শতকের ত্রিশ ও চল্লিশের দশকে সংগঠনটির প্রথম দিকের নেতারা ইউরোপের ফ্যাসিবাদী দলগুলোর জাতীয়তাবাদী মডেল থেকে খোলাখুলিভাবেই অনুপ্রেরণা নিয়েছিলেন। মহাত্মা গান্ধী হত্যায় অভিযুক্ত হওয়াসহ একাধিকবার নিষেধাজ্ঞার মুখে পড়ার পরও আএসএস টিকে থাকে। আর ধীরে ধীরে বিশ্বের সবচেয়ে বড় ডানপন্থী শক্তিতে রূপ নেয়।
নরেন্দ্র মোদিকে আরএসএসের সবচেয়ে যোগ্যতাসম্পন্ন সদস্যদের একজন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। এক দশকের বেশি সময় ধরে তিনি জাতীয় ক্ষমতার কেন্দ্রে অবস্থান করায় আরএসএস এমন সব সাফল্য ও প্রসার পেয়েছে, যা সংগঠনটির অনেক নেতার ভাষায় আগে কখনো কল্পনাও করা যেত না। শক্ত হাতে শাসন করা এই প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আরএসএসের মাঝেমধ্যে টানাপোড়েন দেখা দিলেও সংগঠনটি এখন তাদের দীর্ঘদিনের স্বপ্নের একেবারে কাছাকাছি। স্বপ্নটি হলো ভারতের ধর্মনিরপেক্ষ চরিত্র থেকে সরিয়ে নিয়ে একটি শক্তিশালী হিন্দু-ফার্স্ট বা হিন্দুদের অগ্রাধিকার দেওয়া একটি রাষ্ট্রে রূপান্তর করা।
আরএসএস ভারতের সরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর গভীরে ঢুকে প্রতিষ্ঠানগুলোকে এতটাই নিজেদের প্রভাববলয়ের মধ্যে এনেছে যে নরেন্দ্র মোদি ক্ষমতা থেকে বিদায় নিলেও সংগঠনটির প্রভাব সেখানে দীর্ঘ সময় ধরে থেকে যাবে। বিপুলসংখ্যক সহযোগী গোষ্ঠীর মাধ্যমে আরএসএস ভারতের সমাজ, সরকার, আদালত, পুলিশ, গণমাধ্যম ও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ভেতরে প্রবেশ করেছে। এসব স্থানে নিজেদের প্রধান প্রধান সদস্যদের বসিয়েছে। তারা রাজনৈতিক ক্যারিয়ার গড়ে তোলে, আবার ভেঙেও দেয়। হিন্দু জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে তরুণদের নিজ নিজ সমাজে গুরুত্ব ও প্রভাব অর্জনের একটি পথ দেখিয়েছে আরএসএস। এভাবে দেশজুড়ে আনুগত্য আদায় করেছে তারা।
যদিও আরএসএস এখনো নিজেদের একটি গোপন সংগঠন হিসেবে তুলে ধরার পুরোনো ধারাটা বজায় রেখেছে, তারপরও সাম্প্রতিক বছরগুলোয় তারা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রকাশ্য। সংগঠনটির সদস্য এবং প্রভাব আজ দৃশ্যমান সর্বত্র।
আরএসএসের রাজনৈতিক আধিপত্য ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারতকে ধর্মীয়ভাবে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত করেছে। সংগঠনটির যে দর্শন রয়েছে, তাতে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমান ও খ্রিষ্টানকে বিদেশি আক্রমণকারীদের বংশধর হিসেবে দেখা হয়। আরএসএস মনে করে, এই মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের তাদের নিজ নিজ স্থানে ফিরে যেতে হবে।
আপনারা যখন গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনে মোদির ভারতীয় জনতা পার্টির আধিপত্য দেখবেন, আপনারা আসলে আরএসএসের রাজনৈতিক ব্যবস্থা কাজ করতেই দেখছেন। এই ব্যবস্থার মাধ্যমে সংগঠনটি দলের প্রার্থীদের ভাগ্য ও ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করছে। আবার আপনি যখন দেখবেন হিন্দু উগ্রবাদীরা মুসলিম পাড়ার দিকে মিছিল নিয়ে যাচ্ছে বা গির্জায় হামলা করছে, তখন আসলে আপনারা আরএসএসের সহযোগী সংগঠনগুলোর আধিপত্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির প্রয়োগই দেখছেন।
আরএসএসের এই রাজনৈতিক আধিপত্য ১৪০ কোটি মানুষের দেশ ভারতকে ধর্মীয়ভাবে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি বিভক্ত করেছে। সংগঠনটির যে দর্শন রয়েছে, তাতে ভারতের প্রায় ২০ কোটি মুসলমান ও খ্রিষ্টানকে বিদেশি আক্রমণকারীদের বংশধর হিসেবে দেখা হয়। আরএসএস মনে করে এই মুসলিম ও খ্রিষ্টানদের তাদের নিজ নিজ স্থানে ফিরে যেতে হবে।
গত শতকের আশির দশকে আরএসএসের রাজনৈতিক শাখায় দায়িত্ব দেওয়া হয় মোদিকে। এর আগে তিনি সংগঠনটির একজন সংগঠক হিসেবে পরিচিতি পান। আরএসএসকে একটি বিশাল নদীর সঙ্গে তুলনা করেছেন মোদি। এই নদী থেকে অসংখ্য শাখাপ্রশাখা বেরিয়ে ভারতের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রবাহিত হচ্ছে। ভারতীয় সমাজ যখন পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে, এমন একটি কঠিন সময়ে ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ রক্ষার জন্য আরএসএসের প্রশংসা করেছেন মোদি।
লালকেল্লায় বৃষ্টিভেজা স্বাধীনতা দিবসের ভাষণে প্রধানমন্ত্রী মোদি বলেছিলেন, ‘সেবা, নিষ্ঠা, সংগঠিত থাকা ও অতুলনীয় শৃঙ্খলা-এগুলোই এর (আরএসএস) বৈশিষ্ট্য।’
ওপরে ওপরে আরএসএস একটি বড় সমাজসেবামূলক সংগঠন। এর সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে উঠেছে পাড়া–মহল্লাভিত্তিক ছোট ছোট বিভিন্ন দলের মাধ্যমে। ছোট এই দলগুলোয় শারীরিক অনুশীলন ও আধ্যাত্মিক চর্চার মধ্য দিয়ে আজীবনের জন্য ‘বয় স্কাউটের’ মতো সদস্য তৈরি করা হয়। এই দলগুলোই আরএসএসের সদস্য সংগ্রহের প্রধান জায়গা এবং সামাজিক কাঠামো নতুন করে গড়ে তোলার শক্তি। এই স্তর থেকেই আরএসএস পরিকল্পিতভাবে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে নিজেদের প্রভাব ছড়িয়ে দেয়।
বিজেপি নিজেদের বিশ্বের সবচেয়ে বড় রাজনৈতিক দল বলে দাবি করে। এই দলের সদস্য সংখ্যা ১০ কোটির বেশি। আর আরএসএসের রয়েছে বহু শাখা। এর মধ্যে আছে বড় ছাত্রসংগঠন, শ্রমিক ইউনিয়ন, কৃষক সংগঠন, পেশাজীবীদের নেটওয়ার্ক, ধর্মীয় সংগঠন ও দাতব্য প্রতিষ্ঠান। নিয়মিত সমন্বিত বৈঠকের মাধ্যমে এসব সহযোগী সংগঠন আরএসএসের হিন্দু এজেন্ডাকে রাজনৈতিক শক্তিতে রূপ দিতে কাজ করে। এর লক্ষ্য হলো ভারতের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাদের দৃষ্টিভঙ্গি স্থায়ীভাবে প্রতিষ্ঠা করা। সংক্ষেপিত