বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংকট, ইন্টেরিম সরকার ও নির্বাচন

Posted: 14 সেপ্টেম্বর, 2025

বাংলাদেশ রাষ্ট্র আজ এক অদ্ভুদ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সংকটের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। এই সংকট কেবল বর্তমান ইন্টেরিম বা অন্য রাজনৈতিক দলের দ্বন্দ্বের ফল নয়; বরং রাষ্ট্রের ভেতরে বহুদিন ধরে জমে ওঠা বিরোধ, শ্রেণি বিরোধ, এবং আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী শক্তির হস্তক্ষেপের সামগ্রিক প্রতিফলন। যে সমাজতান্ত্রিক আদর্শের ভিত্তিতে মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল, সেই লক্ষ্য থেকে রাষ্ট্র অনেক দূরে সরে গেছে। বড় অবস্থায় বাংলাদেশকে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে গণতন্ত্র নয়, বরং শাসকশ্রেণির ক্ষমতার কৌশল ও আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী স্বার্থই প্রধান নিয়ামক হয়ে আছে। রাজনৈতিক অচলাবস্থা ও ইন্টেরিম সরকারের প্রশ্ন বাংলাদেশের সাম্প্রতিক রাজনীতিতে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে, ইন্টেরিম সরকার বা অন্তর্বর্তীকালীন শাসনব্যবস্থা। ক্ষমতাসীন দল নির্বাচন কমিশনকে নিয়ন্ত্রণে রাখার মাধ্যমে নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে প্রহসনে পরিণত করেছে এমন অভিযোগ অনেক রাজনৈতিক দলের এবং অন্যদের। । ইন্টেরিমের বাইরে যারা, তাদের পক্ষ হতে দাবি হচ্ছে, একটি নিরপেক্ষ সরকার ছাড়া দেশে সুষ্ঠু নির্বাচন সম্ভব নয়, তেমনী ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার দোসররা যে রাতের নির্বাচন বা প্রহসণের নির্বাচন করেছিলো তা আবার সদের্পে ফিরে আসে কীনা! এখানে প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচনের চরিত্র কী? মার্কসের ভাষায়, “রাষ্ট্র হলো শাসকশ্রেণির আধিপত্য বজায় রাখার একটি যন্ত্র”। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নির্বাচন ব্যবস্থাও মূূলত: পুঁজিবাদী শাসকশ্রেণির ক্ষমতা পালাবদলের ক্ষেত্র হয়ে উঠেছে। যে দলই ক্ষমতায় থাকুক না কেন, তাদের নীতিমালার কেন্দ্রে থাকে মূলত বড় পুঁজিপতিদের স্বার্থ, কর্পোরেট গ্রুপ, গার্মেন্টস মালিক এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক শক্তির চাপ। সুতরাং ইন্টেরিম সরকার প্রশ্নটি আসলে গণতান্ত্রিক অধিকারের প্রশ্ন হলেও, এর ভেতরে লুকিয়ে আছে গভীর শ্রেণিসংঘাত। যা কিছু অনিবার্য ঘটনার ইঙ্গিত বহন করছে বৈকি। ইন্টেরিম সরকার কাকে দায়ী করে গঠন করা হবে? যদি সেটি হয় আবারো শাসকশ্রেণিরই আরেক রূপ, তাহলে জনতার মুক্তি কোথায়? এ প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের মার্কসীয় দৃষ্টিতে রাষ্ট্রের চরিত্রকে বিশ্লেষণ করা যেতে পারে। নির্বাচন ও গণতন্ত্রের সংকট বাংলাদেশের নির্বাচন বহুদিন ধরেই ক্ষমতার লড়াইয়ের হাতিয়ার মাত্র। ১৯৯১,র পর থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র চালু হলেও প্রকৃত অর্থে জনতার অংশগ্রহণ নিশ্চিত হয়নি। টাকা, পেশিশক্তি, প্রশাসনের প্রভাব সব মিলিয়ে নির্বাচন জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষার বদলে পরিণত হয়েছে ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর বৈধতা আদায়ের এক প্রক্রিয়ায়। মার্কস ও এঙ্গেলস বলেছেন, “প্রতিটি সমাজের শাসকশ্রেণি তাদের শ্রেণিস্বার্থ অনুযায়ী রাষ্ট্রের আইন ও প্রতিষ্ঠানকে সাজায়।” বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নির্বাচনী ব্যবস্থা সেই বাস্তবতাকেই প্রতিফলিত করে। শাসকশ্রেণি ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নির্বাচনকে নিয়ন্ত্রণ করে রাখে, আর বিরোধী দলগুলো সেই একই রাষ্ট্রযন্ত্রের ভেতর প্রবেশ করতে চায় ক্ষমতা কুক্ষিগত করার জন্য। ফলে গণতন্ত্র হয়ে দাঁড়ায় নামমাত্র। যার কোনো প্রকার দায়-দায়িত্ব নেই। এমনটা বাংলার জনগন মোটেও প্রত্যাশা করেনা। অর্থনৈতিক বাস্তবতা ও রাজনৈতিক টানাপোড়েন বর্তমানে বাংলাদেশ অর্থনৈতিক মন্দার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। বৈদেশিক ঋণের বোঝা, ডলার সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুর্নীতি, গার্মেন্টস শিল্পের ওপর নির্ভরশীলতা সব মিলিয়ে রাষ্ট্রের অর্থনীতি এক সংকটজনক অবস্থায়। বাংলাদেশ একটি “নির্ভরশীল পুঁজিবাদী অর্থনীতি”। অর্থাৎ, এটি স্বাধীনভাবে উৎপাদন ও বাজার নিয়ন্ত্রণ করতে পারে না; বরং আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (ওগঋ), বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক, এবং উন্নত পুঁজিবাদী দেশগুলোর স্বার্থানুযায়ী চলতে হয়। রাজনীতির সাথে এই অর্থনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে জড়িত। ক্ষমতাসীন দল আন্তর্জাতিক ঋণ গ্রহণ করে রাষ্ট্র চালাতে গিয়ে জনগণের ওপর কর বাড়াচ্ছে, জ্বালানি-বিদ্যুতের দাম বাড়াচ্ছে, কৃষি ও ক্ষুদ্র উৎপাদন খাতকে অবহেলা করছে। ফলে কৃষক-শ্রমিক মধ্যবিত্ত সবাই ক্রমেই চাপে পড়ছে। এই চাপ রাজনৈতিক অস্থিরতাকে আরও তীব্র করে তুলছে। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও বাংলাদেশের ভূমিকা বাংলাদেশের ভূ-রাজনৈতিক অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র–তিনটি শক্তিই এখানে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করতে চায়। ভারত ঐতিহাসিকভাবেই বাংলাদেশের রাজনীতিতে প্রভাবশালী ভূমিকা রাখে। অন্যদিকে, চীন সাম্পতিক সময়ে অবকাঠামো উন্নয়ন ও বাণিজ্যের মাধ্যমে প্রবল প্রভাব বিস্তার করছে। আর যুক্তরাষ্ট্র তার কৌশলগত স্বার্থ রক্ষা করতে চায়, যার ভেতর আছে ইন্দো-প্যাসিফিক স্ট্র্যাটেজি। এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের শাসকশ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা টিকিয়ে রাখতে, একদিকে ভারতের ওপর নির্ভরশীল, অন্যদিকে চীনের বিনিয়োগ ও যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে রপ্তানির সুযোগ ধরে রাখতে চায়। ফলে রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি জনস্বার্থ নয়, বরং শাসকগোষ্ঠীর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার হয়ে দাঁড়িয়েছে। শ্রমিক-কৃষক ও সাধারণ মানুষের অবস্থান বাংলাদেশের রাজনৈতিক আলোচনায় সবসময়েই উপেক্ষিত থাকে শ্রমিক-কৃষকের প্রশ্ন। অথচ মার্কস বলেছেন, “শ্রমিক শ্রেণি মুক্ত হবে শ্রমিক শ্রেণির নিজস্ব সংগ্রামের মাধ্যমে।” বাংলাদেশের শ্রমিকরা আজও ন্যায্য মজুরি থেকে বঞ্চিত। গার্মেন্টস শ্রমিকরা আন্তর্জাতিক বাজারে পুঁজিপতিদের মুনাফা বাড়ালেও নিজেরা বেঁচে থাকার মতো জীবন পাচ্ছে না। কৃষকরা ন্যায্য দাম পাচ্ছে না, জমি গিলেছে ইটভাটা ও চলছে শিল্পের নামে দখলে মহড়া। বর্তমান রাজনৈতিক সংকটেও শ্রমিক-কৃষকের কণ্ঠ অনুপস্থিত। ইন্টারিম সরকার বা নির্বাচন এসব বিতর্কে তাদের স্বার্থের জায়গা কোথায়? প্রকৃতপক্ষে শ্রমিক-কৃষক জনগণের শক্তি সংগঠিত না হলে এই রাষ্ট্রযন্ত্র কখনো তাদের মুক্তি দিতে পারবে না। মার্কসয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে করণীয় মার্কস আমাদের শেখায় রাজনৈতিক পরিবর্তন কেবল শাসকগোষ্ঠীর হাতবদল নয়; বরং অর্থনৈতিক ভিত্তি পরিবর্তনের সঙ্গে যুক্ত। বাংলাদেশে তাই কেবল ইন্টারিম সরকার বা নির্বাচনী সংস্কার যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন, শ্রমিক-কৃষকের সংগঠনকে শক্তিশালী করা। অর্থনৈতিক কাঠামোতে মৌলিক পরিবর্তন আনা, ভাড়া নির্ভর অর্থনীতি থেকে উৎপাদনমুখী অর্থনীতিতে রূপান্তর। আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদী শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা কমানো। প্রকৃত গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য জনগণের সরাসরি অংশগ্রহণমূলক ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এখনকার সংকট আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে শুধু শাসকদলের পতন নয়, বরং শাসকশ্রেণির আধিপত্য ভেঙে নতুন রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলা ছাড়া মুক্তি নেই। উপসংহার বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এক গভীর অচলাবস্থায় পৌঁছেছে। ইন্টেরিম সরকার, নির্বাচন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এসবই আসলে রাষ্ট্রের শ্রেণিচরিত্রকে প্রতিফলিত করছে। এই রাষ্ট্র জনগণের রাষ্ট্র নয়; এটি শাসকশ্রেণির রাষ্ট্র। তাই কেবল শাসকদল পরিবর্তন বা নির্বাচন সংস্কার নয় প্রকৃত পরিবর্তন আসবে যখন শ্রমিক-কৃষক শ্রেণি সংগঠিত হয়ে রাষ্ট্রক্ষমতায় অংশ নেবে। মার্কস যেমন বলেছিলেন “দার্শনিকরা কেবল পৃথিবীকে নানাভাবে ব্যাখ্যা করেছেন, কিন্তু মূল প্রশ্ন হলো একে পরিবর্তন করা।” আজ বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আমাদের সেই পরিবর্তনের দিকেই আহ্বান জানাচ্ছে। লেখক : সাংবাদিক