বুরকিনা ফাসো : অস্থিরতার ভেতর ‘আফ্রিকার চে গুয়েভারার’ প্রত্যাবর্তন
Posted: 07 সেপ্টেম্বর, 2025
একতা ডেস্ক :
আফ্রিকার পশ্চিমাংশে ছোট্ট দেশ বুরকিনা ফাসো আজ ভয়ংকর অস্থিরতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছে। চরমপন্থীদের আক্রমণ, প্রাক্তন পশ্চিমা মিত্রদের সঙ্গে সম্পর্কের অবনতি, আর ক্রমবর্ধমান মানবিক সংকট দেশটিকে টেনে নিচ্ছে অন্ধকারে। তবু এই অন্ধকারে নতুন আলো হিসেবে জেগে উঠছে একজন কিংবদন্তি বিপ্লবী-থমাস সাঙ্কারা। যিনি মৃত্যুর চার দশক পরেও নতুন প্রজন্মের কাছে অনুপ্রেরণা, যাকে অনেকে ডাকেন ‘আফ্রিকার চে গুয়েভারা’।
সাঙ্কারার প্রত্যাবর্তন
গত সপ্তাহে রাজধানী ওয়াগাডুগুতে শত শত তরুণ জড়ো হয়েছিল তার সমাধিসৌধের উদ্বোধনে। এক যুবক উচ্ছ্বাসে চিৎকার করে বলেন, “আমি বিপ্লবের চালক!”– আর সেই চিৎকার যেন ভেসে যাচ্ছিল সাঙ্কারার সেই পুরোনো জিপের চারপাশে, যেটি তিনি রাষ্ট্রপতি থাকাকালীন ব্যবহার করতেন।
১৯৮৩ সালে মাত্র ৩৩ বছর বয়সে এক সামরিক অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসেন থমাস সাঙ্কারা। তিনি ছিলেন একজন ক্যারিশমাটিক মার্কসবাদী, যিনি ঘোষণা করেছিলেন- বুরকিনা ফাসোকে নিজস্ব শক্তিতে টিকে থাকতে হবে। অল্প সময়েই তিনি বিশ্ব রাজনীতির আলোচনায় উঠে আসেন। তবে ১৯৮৭ সালে তারই ঘনিষ্ঠ মিত্র ব্লেইস কম্পাওরে নতুন অভ্যুত্থান ঘটিয়ে তাকে হত্যা করেন এবং পরবর্তী প্রায় তিন দশক ক্ষমতায় থেকে যান।
আজ তার মৃত্যুর প্রায় চল্লিশ বছর পরও সাঙ্কারার উত্তরাধিকার বুরকিনা ফাসোকে নাড়া দিচ্ছে। তিনি ছিলেন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী, ছিলেন প্যান-আফ্রিকান আন্দোলনের অন্যতম কণ্ঠ। তার ভাবনা ও সংগ্রামের প্রতিফলনেই আজকের তরুণেরা আবারও জড়ো হচ্ছে ওয়াগাডুগুতে।
নতুন সামরিক শাসক ও বিপ্লবের প্রতীক
সাঙ্কারার সমাধিসৌধ নকশা করেছেন প্রখ্যাত স্থপতি ফ্রান্সিস কেরে, আর এর পৃষ্ঠপোষক বর্তমান সামরিক নেতা ক্যাপ্টেন ইব্রাহিম ট্রাওরে। ২০২২ সালে অভ্যুত্থানের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসার পর থেকেই ট্রাওরে নিজেকে নতুন সাঙ্কারা হিসেবে তুলে ধরতে চাইছেন। তার বক্তৃতায় বারবার ফিরে আসছে বিপ্লবী স্লোগান-“মাতৃভূমি অথবা মৃত্যু, আমরা জিতব!”।
কেবল কথায় নয়, প্রতীকের রাজনীতিতেও সাঙ্কারাকে পুনর্জীবিত করেছেন তিনি। একটি প্রধান সড়কের নামকরণ করা হয়েছে সাঙ্কারার নামে, তাকে জাতির বীর হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে, আর রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে আয়োজন করা হয়েছে এই সমাধিসৌধ। প্রধানমন্ত্রী জিন ইমানুয়েল ওউদ্রাগো এই প্রসঙ্গে ট্রাওরের বক্তব্য পড়ে শোনান- “বিপ্লবের শিখাকে জীবন্ত রাখা এবং দাসত্ব ও সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের শৃঙ্খল ভাঙার জন্য ক্যাপ্টেন থমাস সাঙ্কারার লড়াইয়ের কথা বিশ্বকে মনে করিয়ে দেওয়া।”
সংকটে জর্জরিত বাস্তবতা
তবে সাঙ্কারার উত্তরাধিকার যতই অনুপ্রেরণাদায়ী হোক না কেন, বাস্তবতা ভিন্ন। অভ্যুত্থানের পর সামরিক নেতারা নিরাপত্তা সংকট মোকাবেলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। কিন্তু আজ দেশের ৬০ শতাংশেরও বেশি এলাকা সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে। দুই মিলিয়নের বেশি মানুষ বাস্তুচ্যুত, আর প্রায় ৬.৫ মিলিয়ন মানুষ বেঁচে থাকার জন্য মানবিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল।
মানবাধিকার সংস্থাগুলো বলছে, সামরিক নেতৃত্ব কার্যত সেন্সরশিপ চালু করেছে। ভিন্নমত দমনের অভিযোগ বাড়ছে। একদিকে জিহাদি গোষ্ঠীর হামলায় সাধারণ মানুষ মরছে, অন্যদিকে সরকারি বাহিনীর অভিযানেও ঘটছে হত্যাকাণ্ড।
উত্তরাঞ্চলের রাজধানী ডোরির এক শিক্ষার্থী বলেন, “আমরা শহরের কেন্দ্রস্থলে কিছুক্ষণের জন্য বাইরে যেতে পারি, তবে সাবধানতার সঙ্গে।”
বাকস্বাধীনতা ও চলাচলের সীমাবদ্ধতা তাকে দমবন্ধ পরিস্থিতিতে ফেলেছে। গ্রেপ্তারের ভয়েই তিনি নাম প্রকাশ করেননি।
ওয়াগাডুগুর বাইরে বাস্তবতা আরও কঠিন। গ্রামীণ এলাকাগুলোতে প্রতিটি মুহূর্তে নিরাপত্তাহীনতার ছায়া। এমনকি মৌলিক পণ্যের দামও অস্বাভাবিক বেড়ে গেছে। এক শিক্ষক বলেন, “দুটি বুরকিনা ফাসো আছে-একটি যেখানে সন্ধ্যার পর জনশূন্য নীরবতা নেমে আসে, আরেকটি যেখানে এখনো সন্ধ্যার বাতাসে মানুষ প্রাণ খুঁজে পায়।”
বুরকিনা ফাসো আজ দ্বিমুখী বাস্তবতার মধ্যে দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে তরুণ প্রজন্ম অতীতের সাঙ্কারার কাছ থেকে আশা খুঁজে নিচ্ছে; অন্যদিকে বর্তমান বাস্তবতা ভয়ংকর অনিশ্চয়তায় ভরা। ইব্রাহিম ট্রাওরে কি সত্যিই নতুন সাঙ্কারায় রূপ নেবেন, নাকি সাঙ্কারার নাম কেবল ক্ষমতার প্রতীকে পরিণত হবে-এ প্রশ্ন এখনো খোলা।
কিন্তু অস্বীকার করার উপায় নেই, থমাস সাঙ্কারা আজও জীবন্ত। তার স্বপ্ন, তার ভাষণ, তার সংগ্রাম-সবকিছুই আফ্রিকার তরুণদের মনে এক বিপ্লবের সম্ভাবনা জাগিয়ে রাখছে। হয়তো সাঙ্কারাই দেখিয়ে দেবেন, অস্থিরতা আর ভয়ের মাঝেও পরিবর্তনের আলো খুঁজে পাওয়া যায়।
(আফ্রিকা নিউজ থেকে অনুবাদিত)