নির্বাচন নিয়ে কোনো তালবাহানা দেশবাসী গ্রহণ করবে না
Posted: 31 আগস্ট, 2025
খুলনা সংবাদদাতা :
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক, বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেছেন, গত ৫৪ বছরে মানুষের মুক্তি আসেনি। মানুষের মুক্তি নিশ্চিত করতে গণতান্ত্রিক অসাম্প্রদায়িক বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়তে সমাজ বিপ্লব সম্পন্ন করতে হবে।
তিনি এজন্য দেশের বিভিন্ন বামপন্থি দল সংগঠন ও সচেতন ব্যক্তিবর্গকে নীতিনিষ্ঠ রাজনীতির পতাকাতলে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান।
নির্বাচনী রোডম্যাপ ঘোষণাকে ইতিবাচক হিসাবে উল্লেখ করে প্রিন্স বলেন- নির্বাচন কমিশন ও সরকারের নির্বাচনমুখী দৃশ্যমান কাজের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি করতে হবে। নির্বাচন বিরোধী যেকোন অপতৎপরতা সরকারকেই রুখে দাঁড়াতে হবে। নির্ধারিত সময়ে নির্বাচনের বাইরে অন্য কোন তালবাহানা গ্রহণযোগ্য হবে না। গত ২৮ আগস্ট বিকালের দিকে খুলনা শহীদ হাদিস পার্কের কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে জাতীয় পতাকা ও দলীয় পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে পার্টির দ্বাদশ খুলনা জেলা সম্মেলনের উদ্বোধনী সমাবেশে তিনি এসব কথা বলেন।
সিপিবি খুলনা জেলার সভাপতি মনোজ দাসের সভাপতিত্ব সমাবেশে আরও বক্তব্য রাখেন, জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক এস এ রশিদ, শেখ আব্দুল হান্নান, শাহদাৎ হোসেন, অশোক সরকার, মিজানুর রহমান বাবু প্রমুখ।
বক্তারা বলেন, মুক্তিযুদ্ধকে বিতর্কিত করে কেউ পার পাবে না। ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা ছিল গণতান্ত্রিক বৈষম্যহীন সমাজ গড়ে তোলা। আজ যারা মুক্তিযুদ্ধ-ইতিহাস-ঐতিহ্যকে বিতর্কিত করছে তারা প্রকারান্তরে ২০২৪ এর গণঅভ্যুত্থানকে প্রশ্নের মুখে ফেলছে।
রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, গণঅভ্যুত্থানের পর আমাদের সামনে গণতান্ত্রিক ও বৈষম্যের সমাজ গঠনের সংগ্রামকে অগ্রসর করার যে সুযোগ সৃষ্টি হয়েছিল আজ সরকারের ভূমিকা এবং মুক্তিযুদ্ধবিরোধী সাম্প্রদায়িক শক্তি কারণে তা প্রশ্নবিদ্ধ হতে চলেছে। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পেতে দেশের সচেতন জনগণকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। তিনি মব সন্ত্রাসের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, আমরা যে কর্তৃত্ববাদী স্বৈরাচারী সরকারের অবসান করলাম তা নতুন করে স্বৈরাচারী ব্যবস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য নয়। তিনি সরকারকে এদের বিষয় কঠোর অবস্থান গ্রহণের আহ্বান জানিয়ে বলেন- সরকার না চাইলে কেউ মব সন্ত্রাস করতে পারবে না।
সিপিবির সাধারণ সম্পাদক বলেন, একসময়ের শিল্পনগরী খুলনা আজ মৃত নগরীতে পরিণত হয়েছে। খালিশপুর থেকে শুরু করে রুপসা অঞ্চলে এই কর্মচাঞ্চল্য ফিরিয়ে আনতে এ অঞ্চলের মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করতে বন্ধ কলকারখানা বিশেষ করে বন্ধ পাটকল চালু করা সহ নতুন নতুন শিল্প কারখানা গড়ে তোলার দিকে নজর দিতে হবে। তিনি খুলনাকে দক্ষ সমতাভিত্তিক নগরী হিসাবে গড়ে তোলার আহ্বান জানান।
জাতীয় ঐক্যমত কমিশনের উদ্দেশ্যে রুহিন হোসেন প্রিন্স বলেন, আর কালক্ষেপন না করে যে সব বিষয়ে সবদল একমত হয়েছে, এসব বিষয়ে ঘোষণা দিয়ে কার্যক্রম অগ্রসর করুন। মনে রাখতে হবে সংবিধান সংশোধন করার বিষয়ে একমাত্র নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই বিবেচনা করতে পারেন। এর বাইরে অন্য কিছু করতে চাইলে তা দেশবাসী গ্রহণ করবে না।
তিনি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে অর্জিত সংবিধানের মূল মূলনীতি ছলে বলে কৌশলে বাদ দেওয়ার যে কোন ষড়যন্ত্র দেশবাসী রুখে দাঁড়াবে। তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অনেক কিছু নিয়ে আলাপ হল কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের জাতীয় ন্যূনতম মজুরি, কৃষক ক্ষেতমজুরের স্বার্থ নিয়ে কোন কথা বলো না।
তিনি বলেন, তেঁতুল গাছ লাগিয়ে মিষ্টি আম চাইলে যেমন লাভ হয় না তেমনি বড়লোকের স্বার্থ রক্ষাকারী দলগুলোর কাছ থেকে সাধারণ মেহনতি মানুষের স্বার্থ রক্ষা চাইলে তাও কাজে লাগবে না। এজন্য তিনি গরিব মেহনতি মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে নিজেদের রাজনৈতিক দল কমিউনিস্ট পার্টিতে সমবেত হওয়ার আহ্বান জানান।
একই সাথে সরকারকে বাণিজ্য চুক্তির নামে আমেরিকার সাথে গোপন চুক্তি, রাখাইনে করিডোর দেওয়া, বিদেশীদের বন্দর দেওয়াসহ জনগণের স্বার্থবিরোধী সব কার্যক্রম থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানান সিপিবির সাধারণ সম্পাদক।
সমাবেশের পূর্বে দীর্ঘক্ষণ ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান অনুষ্ঠিত হয়। বৃষ্টির মধ্যেও খুলনা মহানগরসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে শত শত মানুষ লাল পতাকা হাতে মিছিল করে এই সমাবেশে যোগ দেন।
সমাবেশ শেষে মিছিল নগরীর বিভিন্ন সড়ক প্রদক্ষিণ করে।
সম্মেলনের উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে গত ২৯ আগস্ট সকাল সাড়ে নয়টায় খুলনা প্রেসক্লাব মিলনায়তনে সিপিবি জেলা কাউন্সিল মনোজ দাসের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয়। সভায় অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সিপিবির কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক ও বাম গণতান্ত্রিক জোটের কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক রুহিন হোসেন প্রিন্স ।
সভার শুরুতে শিক্ষক প্রদীপ সাহা, প্রকৌশলী সুখেন রায়, সহিদুল ইসলাম, শ্যামল রায়, শাহিনা আক্তারকে কাউন্সিল পরিচালনার জন্য সভাপতিমণ্ডলী নির্বাচন করা হয়। সভার শুরুতে শোক প্রস্তাব উত্থাপন করেন সুতপা বেদজ্ঞ। জেলা কমিটির রিপোর্ট উত্থাপন করেন এস এ রশিদ।
কাউন্সিলে আলাপ আলোচনার মধ্য দিয়ে জেলা কমিটির কার্যক্রমের রিপোর্ট ও আয় ব্যায়ের হিসাব সংশোধনীসহ অনুমোদন করা হয়। এছাড়া কংগ্রেসের উত্থাপিত পার্টির ঘোষণা ও কর্মসূচি এবং রাজনৈতিক প্রস্তাব সম্পর্কে প্রতিনিধিরা তাদের অভিমত ব্যক্ত করেন।
এরপর গোপন ব্যালটের মাধ্যমে কাউন্সিলরদের ভোটে ২১ জন কেন্দ্রীয় কংগ্রেস প্রতিনিধি ও ৩৩ সদস্যের জেলা কমিটি নির্বাচন করা হয়। সারাদিন অনুষ্ঠিত এই কাউন্সিলে খুলনার বিভিন্ন উপজেলা ও শাখা কমিটির প্রায় অর্ধ শতাধিক প্রতিনিধি আলোচনায় অংশ নেন।