কেন অনয়দের ডাকসুতে বিজয়ী দেখতে চাই?

Posted: 24 আগস্ট, 2025

১৯৭৩-এর পহেলা জানুয়ারি, ভিয়েতনামে মার্কিন আগ্রাসনের প্রতিবাদে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মার্কিন দূতাবাস অভিমুখে একটি মিছিল বের হয় ছাত্র ইউনিয়ন ও ডাকসুর নেতৃত্বে। সেই মিছিলে পুলিশ গুলি বর্ষন করলে শহীদ হন কমরেড মতিউল ও মির্জা কাদের। আহত হন আরো অনেকে। সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার খবর। মির্জা কাদের ও মতিউলের মরদেহের সামনে শেখ মুজিবের ডাকসুর আজীবন সদস্যপদের কাগজটি ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করা হয় এই বলে- যেই পিতার হাতে ছাত্র গুলিতে নিহত হয় সেই পিতার কোন অধিকার নেই ডাকসুতে থাকার। ডাকসু ও ছাত্র ইউনিয়ন সবসময়ই সরব ছিল সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসনের বিরুদ্ধে। সাম্রাজ্যবাদের প্রহরী বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের নির্দেশনায় তৎকালীন স্বৈরাচারী এরশাদের সময় প্রস্তাবিত হয় কুখ্যাত মজিদ খান শিক্ষানীতি, যা প্রয়োগ হলে দরিদ্র্য ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের জন্য শিক্ষা অধিকার প্রাপ্তি অসম্ভব করে ফেলতো। এই কুখ্যাত শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র ইউনিয়ন ও অন্যান্য প্রগতিশীল ছাত্র সংগঠন দ্বারা গঠিত ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ লাগাতার আন্দোলন সংগ্রাম চালিয়ে যায়। তাদের উপর নেমে আসে সকল প্রকার রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন। ১৯৮৩ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ মজিদ খানের কুখ্যাত শিক্ষানীতি প্রত্যাহার, বন্দি মুক্তি ও গণতান্ত্রিক অধিকারের দাবি ও গণমুখী, বৈজ্ঞানিক ও অসাম্প্রদায়িক শিক্ষানীতির দাবিতে ছাত্র জমায়েত ডাকে। হাজার হাজার শিক্ষার্থীদের শান্তিপূর্ণ মিছিলটি হাইকোর্টের গেটের সম্মুখে ব্যারিকেডের সামনে বসে পড়ে এবং ছাত্রনেতারা তারের ওপরে উঠে বক্তব্য দেওয়া শুরু করে। এসময় পুলিশ বিনা উসকানিতে মিছিলের ভিতর ট্রাক ঢুকিয়ে দিয়ে রঙিন গরম পানি ছেটাতে থাকে, বেধড়ক লাঠিচার্জ, ইট-পাটকেল ও বেপরোয়া গুলি ছুড়তে শুরু করে। গুলিবিদ্ধ হন জয়নাল, এরপর গুলিবিদ্ধ জয়নালকে বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে মারা হয়। এসময় দিপালীও গুলিবিদ্ধ হন এবং পুলিশ তার লাশ গুম করে ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ নিহত ও আহতদের অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে নিয়ে আসতে চাইলে ঘটনাস্থলে ঢুকতে দেওয়া হয়নি। ওইদিন নিহত হয়েছিলেন জয়নাল, জাফর, কাঞ্চন, দীপালীসহ আরও অনেকে। সরকারি হিসাবেই তখন গ্রেফতার করা হয় ১৩৩১ জন ছাত্র-জনতাকে। বাস্তবে এই সংখ্যা আরও বেশি ছিল। খোঁজ মেলেনি অনেকেরই। সাম্রাজ্যবাদ ও তার আগ্রাসী গণবিরোধী নীতির বিরুদ্ধে সকল প্রতিবাদের আঁতুড়ঘর ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধের আগুন কি আর আগের মতো উত্তাপ ছড়াতে পারছে? অন্তত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গত এক দশকের চিত্র সেটা বলে না। তৃতীয় বিশ্বের কোন দেশকে সাম্রাজ্যবাদী দাসত্বে বাঁধতে নিও লিবারেলিজম কৌশলের প্রাথমিক লক্ষ্যবস্তু থাকে শিল্প উৎপাদনের রাষ্ট্রীয় মালিকানা দুর্বল করে দেয়া এবং সমান্তরালে সে কৌশলে প্রথমেই আঘাত করে শিক্ষা ও চিকিৎসা ব্যবস্থার উপর যেন জনগণ এই দুইটি অধিকার হারিয়ে ফেলে। যেহেতু সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি শুরুতেই আঘাত করে শিক্ষা অধিকার কেড়ে নেয়ার জন্য তাই প্রাথমিক প্রতিরোধটা ছাত্রদেরই গড়ে তুলতে হয় নইলে এর ভয়াবহ প্রভাব হয় সুদূরপ্রসারী। ধরা যাক, সাম্রাজ্যবাদের নিও লিবারেল প্রহরী বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ ঋণের শর্ত দিলো শিক্ষা খাতে সুবিধা ও বাজেট বরাদ্দ সংকুচিত করতে। এর ফলে দেশে যারা দরিদ্র, সুবিধা বঞ্চিত এবং অনাগ্রসর আছে তারা শিক্ষাব্যয় বহনে অসামর্থ্য হয়ে শিক্ষা থেকে ছিটকে পড়বে এতে শুধু শিক্ষিতের হার হ্রাস পাবেই না বরং যেহেতু শিক্ষা বিলাসী পণ্যে পরিণত হয়েছে ফলে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ শুধু উচ্চবিত্ত ও উচ্চমধ্যবিত্ত পাচ্ছে। পরিণতিতে দেখা যাবে শুধু উচ্চবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরাই পরবর্তীতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদে এবং নীতি নির্ধারণ পর্যায়ে অধিষ্ঠিত হচ্ছে এবং তাদের শ্রেণি চরিত্রের কারণে তারা শুধু তাদের শ্রেণির স্বার্থই দেখবে এবং বিশাল নিম্নবিত্ত ও নিম্ন মধ্যবিত্তের অধিকার ও সুযোগ অবহেলিত হয়ে দেশে একটা পর্যায়ে শ্রেণি বৈষম্য প্রকট হবে যা একটা সুস্থ রাষ্ট্রের চেহারা কোনভাবেই হতে পারে না। অন্যদিকে যারা উচ্চবিত্ত বা উচ্চমধ্যবিত্ত নয় তারা তাদের সন্তানদের চরম ব্যয়বহুল শিক্ষার খরচ মেটাতে দুর্নীতির আশ্রয় গ্রহণ করতে বাধ্য হবে এবং তাতে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি বৃদ্ধি পাবে। অথচ যদি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সচেতন প্রতিরোধ সংগ্রাম দিয়ে নিও লিবারেল পলিসি প্রয়োগের আগে প্রতিহত করা যায় তবে এই পরিস্থিতি সৃষ্টিই হয় না। সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিল। মার্কিন সপ্তম নৌবহর ভারত মহাসাগর থেকে বঙ্গোপসাগরে প্রবেশ করছিলো পাক হানাদারদের সহায়তা করার জন্য, কিন্তু সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েত ইউনিয়নের সাবমেরিন বহর তাদের প্রতিহত করলে তারা বাধ্য হয় পিছু হটতে। ব্রিটিশ নৌবহরও ভূমধ্যসাগর অঞ্চল থেকে রওনা দিয়েছিলো মার্কিন নৌবহরকে সহায়তা প্রদানে কিন্তু সপ্তম নৌবহর পিছু হটায় তারাও ফিরে যায়। ফলে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের ইতিহাসে এক বিরাট পরাজয়ের গ্লানি আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধ। এ কারণে সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি বিভিন্ন কৌশলে চাইবে আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধকে মুছে দিতে আর সেই কৌশলের অন্যতম প্রয়োগ হবে পাঠ্যপুস্তকে পরিবর্তন। একটি জাতির শিক্ষাব্যবস্থা থেকে তার ইতিহাস, অর্জন, ঐতিহ্য মুছে ফেলতে পারলে সেই জাতিকে দাসত্বে বাঁধা সহজতর হয়ে যায়। কিন্তু ছাত্ররা যদি সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে সচেতন ও সোচ্চার থাকে তবে সাম্রাজ্যবাদ এখানেও সপ্তম নৌবহরের মতো পিছু হটতে বাধ্য হবে। অর্থাৎ জাতিকে দাসত্বের শৃঙ্খলে বাঁধা পড়া থেকে রক্ষা করার ঐতিহাসিক দায়িত্বও ছাত্রদের ওপর। এই কারণেই সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি বহু কৌশলে, বিভিন্ন এজেন্সির মাধ্যমে, লিবারেল ও সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামকে দুর্বল করতে চাচ্ছে, মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে নর্মালাইজ করতে চাচ্ছে। যেহেতু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় দেশের ইতিহাসের সকল জাতীয় আন্দোলন ও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই সংগ্রামের আঁতুড়ঘর, তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এই লড়াইকে স্তিমিত করার জন্য অপচেষ্টা সবচেয়ে বেশি। আর সেই জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সংগ্রামের দূর্গ হিসেবে আবারও গড়ে তোলার বিকল্প আর কিছুই নাই। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের ইতিহাস মানেই সাম্রাজ্যবাদবিরোধী লড়াই সংগ্রামের ইতিহাস। আগের প্রজন্মের লড়াকু কমরেডদের মতোই এনামুল হাসান অনয় সেই ধারাবাহিকতায় একজন আদর্শিক সংগ্রামী। চব্বিশের স্বৈরাচারবিরোধী অভ্যুত্থানে অনয় ছিলেন নির্ভীক অগ্রবাহিনী। শহীদ মিনারে তাঁর স্লোগানের সাথে একাত্ম হয়ে গলা মিলিয়েছিলো ছাত্রদের পাশাপাশি শ্রমিক জনতাও। অভ্যুত্থান পরবর্তীতে দেশের সংকট আরো প্রকট আকার ধারণ করলে অনয় আরো বেশি কর্মশক্তি ও প্রত্যয় নিয়ে আন্দোলন সংগ্রামে সরব থাকেন। সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তি যখন দেশের বন্দর ও করিডোর দখলে নেয়ার অশুভ পাঁয়তারা করে তখন এর প্রতিবাদে বামপন্থীদের রোডমার্চ কর্মসূচীতে অনয় তার ছাত্র ইউনিয়নের কমরেডদের নিয়ে সবসময় মিছিলে স্লোগানে সরব ছিলেন ভ্যানগার্ড হিসেবে। এছাড়াও সাম্রাজ্যবাদবিরোধী প্রতিটি মিছিল সমাবেশে অনয়ের স্লোগান কণ্ঠ যেন বাঘের হুংকার। ডাকসুর অন্যান্য প্যানেলের সাথে অনয় এখানেই নিজের সাহসী পার্থক্য গড়ে দিয়েছে। সাম্রাজ্যবাদী অপশক্তির বহুমাত্রিক অপতৎপরতা বাংলাদেশে তার বিষ নিঃশ্বাস ফেলছে। জুলাই ২৪ পরবর্তী বাংলাদেশের শাসন কাঠামো ও রাজনৈতিক অঙ্গনে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের সরাসরি নাক গলানো এখন আর গোপন কিছু নয়। দেশের সর্বস্তরের মানুষ এখন দেশের স্বার্থবিরোধী যে কোন সিদ্ধান্ত বা পদক্ষেপে এখন আমেরিকার গন্ধ পায়। মানবতাবিরোধী, গণহত্যাকারী, দখলদার ইসরায়েলের পৃষ্ঠপোষক, ইরাক, লিবিয়া, আফগানিস্তানের ধ্বংসকারী, বিশ্বব্যাপী কোটি কোটি বেসামরিক মানুষের হত্যাকারী, মুক্তিযুদ্ধ বিরোধী মার্কিন সাম্রাজ্যবাদকে বাংলাদেশের মানুষ সহজভাবে গ্রহণ করে না এবং দায়মুক্তি দেয় না। ফলে সাম্রাজ্যবাদ প্রতিরোধ সংগ্রামের সম্মুখের সেনাপতি অনয় শুধু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লড়াই সংগ্রামের ঐতিহাসিক প্রতিনিধিই নয়, একইসাথে সারা দেশের মানুষের মার্কিন সাম্রাজ্যবাদবিরোধী সচেতনতারও প্রতিনিধি।