লেনিন-উত্তর কমিউনিস্ট পার্টি

Posted: 10 আগস্ট, 2025

কমিউনিস্ট পার্টি বৈশ্বিক ও জাতীয় স্তরে ১৭৮ বছর (১৮৪৭-২০২৫) অতিক্রম করেছে। ১৮৩৭ সালে উইলহেলম উইটলিং– প্যারিসে নির্বাসিত একজন জার্মান দরজি শ্রমিক ‘ন্যায়নিষ্ঠদের সমিতি’ (League of Just) প্রতিষ্ঠা করেন। বলা যেতে পারে, ঐতিহাসিক গুরুত্বের বিবেচনায় এটাই কমিউনিস্ট পার্টির প্রথম বীজ বপন। ১৮৪৭ সালে ১ম কংগ্রেসে (লন্ডন) মার্কস-এঙ্গেলস ন্যায়নিষ্ঠদের লীগকে ষড়যন্ত্রমূলক রূপ থেকে মুক্ত করে নতুনভাবে পুনর্গঠন করেন এবং পুরোনো নাম বদলিয়ে এর নাম রাখা হয় কমিউনিস্ট লীগ। ১৮৪৮ সালে এই লীগের জন্য মার্কস-এঙ্গেলস কর্তৃক প্রণীত ইশতেহার পরে বিশ্বব্যাপী কমিউনিস্ট ইশতেহার নামে পরিচিতি লাভ করে। ১৮৪৭-১৮৫২ ছয় বছর স্থায়ী এই কমিউনিস্ট লীগই হলো কমিউনিস্ট কর্মসূচিভিত্তিক শ্রমিক শ্রেণির প্রথম আন্তর্জাতিক সংগঠন। কমিউনিস্ট লীগই মার্কস-এঙ্গেলস এর পার্টি সংক্রান্ত ভাবনার প্রথম সুস্পষ্ট প্রকাশ। ১৮৫২ সালে কমিউনিস্ট লীগকে আনুষ্ঠনিকভাবে ভেঙে দেওয়া হয়। কারণ কতগুলি তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক প্রশ্নের মীমাংসা করা তখন সম্ভব হয়নি। পরবর্তীকালে আবার ইউরোপে শ্রমিক আন্দোলনের জোয়ার এলে মার্কস-এঙ্গেলসের প্রেরণায় ১৮৬৪ সালে লন্ডনে গড়ে উঠে শ্রমিকশ্রেণির আন্তর্জাতিক সংগঠন–প্রথম আন্তর্জাতিক। এখানেই মার্কস শ্রমিকশ্রেণির পার্টি গঠনের মূলনীতি তুলে ধরেন। এর আগেই লেনিন-মার্কস-এঙ্গেলসের শিক্ষার আলোকে পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্ব গড়ে তোলেন। ১৮৮৩ সালে মার্কসের মৃত্যু হলে এর ৬ বছর পর ১৮৮৯ সালে এঙ্গেলসের নেতৃত্বে ২য় আন্তর্জাতিক গঠিত হয়। কিন্তু ১৮৯৫ সালে তার মৃত্যুতে এর সুবিধাবাদী নেতৃত্ব মার্কসবাদের মূলনীতিকে বর্জন করে। শ্রমিকশ্রেণির আদর্শের প্রতি বিশ্বাসঘাতকতা করে নিজ নিজ দেশের সাম্রাজ্যবাদী সরকারের যুদ্ধের পক্ষে সমর্থন জানায়। ২৫ বছর পর (১৮৮৯-১৯১৪) এই আন্তর্জাতিকের অবসান ঘটে ১৯১৪ সালে। ১৯১৯ সালে লেনিনের উদ্যোগে আবির্ভাব ঘটে ৩য় আন্তর্জাতিকের। এই আন্তর্জাতিকের ১৯২১ সালে অনুষ্ঠিত ৩য় কংগ্রেসে মার্কস-এঙ্গেলসের দিশায় লেনিন দেশে দেশে কমিউনিস্ট পার্টি গড়ে তোলার মূলনীতি (পার্টি সংগঠনের মূলনীতি) তুলে ধরেন– যা আজও সাধারণ অনুসরণযোগ্য। লেনিনের পরবর্তীকালে পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্বের ভান্ডারে আমরা আজ অবধি মৌলিকভাবে নতুন কিছু সংযুক্ত হতে দেখি না। ট্রটস্কি মোটামুটি লেনিনের পার্টি তত্ত্ব কাঠামোর মধ্যে থেকেই কখনো লেনিনের পক্ষে, কখনো লেনিনের বিপক্ষে তৎপর থেকেছেন এবং লেনিনের মৃত্যুর পর পার্টি সংগঠন প্রশ্নে স্তালিনের বিরোধিতায় লিপ্ত হয়েছেন। লেনিনের একনিষ্ঠ অনুসারী হিসেবে স্তালিন লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত ধারণাগুলোকে সংকলিত করে তুলে ধরেন। অন্যদিকে সেই সময়ে হাঙ্গেরী মার্কসবাদী তাত্ত্বিক গেওর্গি লুকাচ অন্যান্য কিছু বিষয়ে মাঝেমধ্যে বিরোধিতা করলেও লেনিনের পার্টি তত্ত্বকেই মেনে নিয়েছিলেন। এক্ষেত্রে তিনি লেনিনকে ‘প্রয়োগের তত্ত্ববিদ’ রূপে অভিহিত করেছেন। সেই সঙ্গে লেনিন কীভাবে প্রয়োগমুখি জ্ঞান তত্ত্বের আলোকে বৈচিত্র্যপূর্ণ সামগ্রিকতার মধ্যে পার্টি গড়ে তুলেছিলেন সে বিষয়টি তুলে ধরেছেন। এ প্রসঙ্গে তার একটি বক্তব্য উল্লেখযোগ্য “লেনিন এবং অল্প যে কয়েকজন বিপ্লবের বাস্তবতা ঘোষণা করেছিলেন, ইতিহাস তাকে ন্যায়সংগত বলে প্রমাণ করেছে।” বিখ্যাত ফরাসি মার্কসবাদী তাত্ত্বিক লুই আলথুজারও পার্টি প্রশ্নে লেনিনের এই জ্ঞানতাত্ত্বিক অবস্থানকে স্বীকৃতি দিয়েছেন। তবে পার্টি প্রশ্নে লেনিনের চিন্তা-তৎপরতা-সমালোচনামূলক বিকল্প ভাবনা আসে রোজা লুক্সেমবুর্গের কাছ থেকে। তিনি ছিলেন কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের বিপ্লবী নেত্রী, লেনিনের সহযোদ্ধা এবং জার্মান কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা। রোজার অভিযোগটি ছিল “লেনিনের পার্টি সংক্রান্ত ধারণায় কেন্দ্রিকতার ওপর অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপ করা হয়েছে। লেনিন সর্বোচ্চ কেন্দ্রিকতার মাধ্যমে পার্টি কেন্দ্রের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করতে চান এবং এর ফলে সমাজের বিপ্লবী পরিস্থিতি থেকে বিপ্লবীদের কেন্দ্র বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে। অতিকেন্দ্রিকতা ও বিপ্লবের জন্য খুঁটিনাটি পরিকল্পনা জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত ভূমিকাকে নাকচ করবে।” শেষ জীবনে মৃত্যুর আগে আগে তিনি এ ধারণা থেকে অনেকখানি সরে আসেন এবং লেনিনের পার্টি সূত্রায়নকে মোটা দাগে মান্যতা দেন। আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম সংগ্রামী তাত্ত্বিক ও ইতালির কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা বিপ্লবী নেতা আন্তোনিও গ্রামসী পরিবর্তিত নতুন পরিস্থিতির বাস্তবতায় লেনিনীয় পার্টির তত্ত্ব কাঠামো আরও সমৃদ্ধ করেছেন। পার্টি প্রশ্লে গ্রামসী ইতালীয় রেনেসাঁর রাজনৈতিক তাত্ত্বিক ম্যাকিয়াভেলির লেখা ‘দ্য প্রিন্স’কে পাঠ ও উপস্থাপন করলেন নতুন প্রেক্ষাপটে। ম্যাকিয়াভেলি তাঁর ঐ লেখায় সে সময়ে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ার ক্ষেত্রে ইতালির জনগণের জাতীয় সমষ্টিগত আকাঙ্ক্ষাকে একজন কল্পিত রাজপুত্রের (The Prince) নেতৃত্বের মাধ্যমে মূর্ত করে তুলেছিলেন। গ্রামসীর ভাষ্যে শ্রমিকরাজ কায়েমের জন্য তেমনি এক রাজনৈতিক নেতৃত্ব রূপে আধুনিক রাজপুত্র তথা ‘মডার্ন প্রিন্স’ হল কমিউনিস্ট পার্টি। গ্রামসীর পার্টি সংক্রান্ত ভাবনার আর একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো- স্বতঃস্ফূর্ত ও সচেতন নেতৃত্বের ধারণা যা আসলে পার্টি এবং শ্রেণির আন্তঃসম্পর্কের সমতুল্য। এই জটিলতাকে লেনিন, রোজা বা লুকাচ আগেই উপলব্ধি করেছিলেন। গ্রামসীর মতে বিশুদ্ধ ‘স্বতস্ফূর্ততা’ বা বিশুদ্ধ ‘সচেতনতা’ বলে কিছু নেই। অনুসন্ধান করে দেখা না হলেও প্রত্যেক স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মধ্যেও যেমন সচেতন নেতৃত্বের উপাদান থাকে। বিপরীতে সব সচেতন তৎপরতার মধ্যে স্বতঃস্ফূর্ততার সংমিশ্রণ থাকে। তাই ‘স্বতস্ফূর্ততা’ এবং ‘সচেতনতা’ পরস্পর সাংঘর্ষিক বা বিপরীত নয় বরং একের অন্যটিতে উত্তরণযোগ্য। গ্রামসীর বিচারে পার্টি হবে গণভিত্তি সম্পন্ন, ব্যাপক শ্রমজীবীদের সঙ্গে নানাভাবে সম্পৃক্ত, যেটা ছাড়া নিজস্ব (organic) বুদ্ধিজীবীদের দ্বারা সর্বহারার আধিপত্যও কায়েম করা সম্ভব হবে না। গ্রামসীর মতে গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতার মধ্যেই কেবল স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগের সঙ্গে সচেতন বিপ্লবী পার্টির আন্তঃক্রিয়া দেখা যায়। এ হলো আন্দোলনের মধ্যে ‘কেন্দ্রিকতা’-অর্থাৎ সত্যিকার সংগ্রামের পার্টির অব্যাহত নিজেকে খাপ খাওয়ানো, ওপরের নির্দেশের সঙ্গে তলার চাপের সামঞ্জস্য বিধান করা, সর্বস্তরের কর্মীদের মধ্য থেকে উঠে আসা বিষয়গুলি নেতৃত্ব কাঠামোর মধ্যে অনুপ্রবেশ ঘটানো–যা কি না লাগাতার অভিজ্ঞতার সঞ্চয়কে নিশ্চিত রাখে। পার্টি প্রশ্নে মাও সে-তুংয়ের অবদান মাও সে-তুং চিন্তাধারা বা মাওবাদ নামক তত্ত্ব কাঠামোর অন্তর্ভুক্ত। যদিও এ নিয়ে নানা প্রশ্ন, সমালোচনা, বিতর্ক ছিল ও এখনো চলছে। তবে নিঃসন্দেহে চীনের মত পশ্চাদপদ একটি দেশে বিপ্লবী পার্টি গড়ে তুলে ক্ষমতা দখল করে সমাজতান্ত্রিক বিনির্মাণের দিকে এগিয়ে যাবার ক্ষেত্রে মাও-এর ভূমিকা স্মরণীয় হয়ে থাকবে। লেনিনের বিপ্লবী পার্টি সংক্রান্ত তত্ত্ব-কাঠামো সৃজনশীলভাবে অনুসরণ করে তিনি কৃষকনির্ভর গণধর্মী বিপ্লবী পার্টি গড়ে তোলেন। বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অনুপস্থিতি ও আধা সামন্তবাদী সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্বের বিরুদ্ধে চীনা বিপ্লব দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংগ্রামের রূপ নেয়। এক্ষেত্রে তিনি নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লবের তত্ত্ব তুলে ধরেন। এই নয়া গণতান্ত্রিক বিপ্লব হলো–সাম্রাজ্যবাদ, সামন্তবাদ, মুৎসুদ্দী পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে সর্বহারা শ্রেণির নেতৃত্বে শ্রমিক-কৃষক মৈত্রীর ভিত্তিতে ব্যাপক জনগণের দ্বারা চালিত বিপ্লব। পার্টির অধীনস্ত বিপ্লবী সামরিক বাহিনী-গণমুক্তিফৌজের মাধ্যমে ‘গ্রাম দিয়ে শহর ঘেরাও’ করে তিনি এই বিপ্লব সম্পন্ন করেন। মূলতঃ কৃষকদের নিয়ে গঠিত একটি বিপ্লবী বাহিনীকে কীভাবে সর্বহারার শ্রেণিচেতনাসম্পন্ন সুশৃঙ্খল ও গণসম্পৃক্ত নতুন রূপের গণবাহিনীতে পরিণত করা যায়–সে সমস্যার সমাধান করেছিলেন মাও পার্টি গঠনের ধারায়। মতাদর্শগতভাবে পার্টি গড়ার ওপর গুরুত্ব দিয়ে মাও বলেছেন–পার্টি সদস্যদের শুধু সাংগঠনিকভাবে নয়, মতাদর্শগতভাবেও পার্টিতে যোগ দেওয়া উচিত এবং অবিরামভাবে তাদের পেটিবুর্জোয়া ধ্যান-ধারণা থেকে মুক্ত হয়ে সর্বহারার ধ্যান-ধারণা আত্মস্থ করা তাদের কর্তব্য। পার্টির ভেতর থেকেই, নেতৃত্বের মধ্য থেকেই সংশোধনবাদী ও পুঁজিবাদী প্রবণতা প্রাধান্যশীল হয়ে উঠতে পারে–এ আশঙ্কা থেকেই মাও পার্টিতে সমালোচনা-আত্মসমালোচনার পদ্ধতিতে শুদ্ধি অভিযান পরিচালনা করেছিলেন। তাঁর এই বিশেষ অবদান ইতিহাসে ‘মহান সাংস্কৃতিক বিপ্লব’ রূপে অভিহিত–যা নানা বিরোধিতা ও সমালোচনার মুখোমুখি হয়। পার্টি নেতৃত্বের মধ্যে দ্বন্দ্ব-বিরোধ ও তার মীমাংসার ক্ষেত্রে তত্ত্বগত দিক নির্দেশনা মাও দিয়েছেন। দ্বন্দ্বের দুই রূপ– বৈরী ও অবৈরী- চিহ্নিত করে তার সমাধানের পথও তার কাছে আমরা পাই। হো চি মিন পরাধীন ভিয়েতনামে গেরিলাযুদ্ধের মাধ্যমে বিজয়ী হয়ে সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের যে শিক্ষা সঞ্চিত করেছেন, তাঁর অবদানও পার্টি তত্ত্ব-জ্ঞানের ভান্ডারে অমূল্য সংযোজন। মার্কস-এঙ্গেলস-এর বিশ্ববীক্ষার আলোকে যে লেনিনীয় পার্টি তত্ত্ব-কাঠামো গড়ে উঠেছে তা আজও দেশে দেশে পাথেয়। অবশ্য এই তত্ত্বভাণ্ডার নানা জনের অবদানে এবং বিপ্লব ও বিপ্লবী আন্দোলনের অভিজ্ঞতার দ্বারা আরো সমৃদ্ধ হয়ে চলেছে। তবে ৫০-এর দশক থেকে বিশ্বের কতগুলি বিপ্লব, বিপ্লবী পার্টি ও বামপন্থী আন্দোলনের ক্রম বিকাশ আমরা লক্ষ্য করি যা মার্কসবাদী লেনিনবাদী পার্টির তত্ত্বকে হুবহু অনুসরণ করে না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ফিদেল ক্যাস্ত্রোর নেতৃত্বে কিউবান বিপ্লব, বলিভিয়ায় গেরিলা যুদ্ধের দ্বারা ক্ষমতা দখলের লক্ষ্যে চে গুয়েভারার মহৎ অভিযান, চিলিতে সালভাদোর আলেন্দের নেতৃত্বে পপুলার ফ্রন্টের মাধ্যমে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টা, উরুগুয়েতে টুপামরোস–জাতীয় মুক্তি ফ্রন্টের মার্কসবাদী-লেনিনবাদী শহুরে গেরিলা বাহিনীর সাময়িক সাফল্য এবং সর্বোপরি ফ্রান্সের প্যারিসে ১৯৬৮ সালের মে মাসে পার্টি নেতৃত্বকে প্রত্যাখ্যান করে ছাত্র-যুব বিপ্লব। অনুরূপভাবে ফিলিপাইন, কলোম্বিয়া, এঙ্গোলাসহ আরো কতগুলি দেশে আমরা এ ধরনের সশস্ত্র বিপ্লব প্রচেষ্টা দেখি যা ঠিক লেনিনের তত্ত্ব কাঠামোর মধ্যে পড়েনা। যদিও কিউবার বিপ্লব ছাড়া বিপুল আত্মত্যাগ সত্ত্বেও কোনোটিই কাক্সিক্ষত বিজয় অর্জন করতে পারেনি। এরই ধারাবাহিকতায় আন্তর্জাতিক কমিউনিস্ট আন্দোলনে চীন-সোভিয়েত বিভক্তি এবং তৎপবর্তী বিশ্ব সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিপর্যয়ের প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্র অভিমুখী নতুন ধরনের বিপ্লবী পার্টি ও বামপন্থার উদ্ভব প্রত্যক্ষ করি। ল্যাতিন আমেরিকার দেশগুলি বলশেভিক পার্টির মডেল বাছবিচারহীনভাবে গ্রহণ না করে পরিবর্তনশীল বাস্তবতায় সংযোজন-বিয়োজনের মাধ্যমে ‘একবিংশ শতাব্দীর সমাজতন্ত্র’ নির্মাণের দিকে অগ্রসর হয়। এক্ষেত্রে রণনীতি ও রণকৌশলের যুগপোযোগী সংস্কার আনলেন তারা। ব্রাজিলের কমিউনিস্ট পার্টি পাওলো ফ্রেইরির ‘নিপীড়িতের শিক্ষা পদ্ধতি’র (Pedagogy of the oppress) আলোকে ভ্যানগার্ড পার্টি তত্ত্বকে অন্ধ অনুসরণ না করে গণশিক্ষা আন্দোলন গড়ে তোলে। নিকারাগুয়ায় সান্দিনিস্তারা তাদের বিপ্লবী লড়াইয়ে ‘মুক্তির ধর্মতত্ত্ব’ (Liberation Theology) এর অনুসারীরা যাজকদের অংশীদার করে নিল। গুয়াতেমালার রাজনৈতিক সংগঠন গরিবদের গেরিলা সেনাবাহিনী (Army of the Poor) আদিবাসীদের অন্তর্ভূক্ত করে এবং তাদেরকে বিপ্লবের অন্যতম মৌলিক চালিকা শক্তিরূপে স্বীকৃতি দেয়। এল সালভাদোরে কমিউনিস্ট গেরিলা কম্যান্ডান্ট হোরসে স্ক্যফিক হানদাল ঘোষণা করলেন–লাতিন আমেরিকার বিপ্লবী শক্তি কেবল কমিউনিস্টরা নয়, নতুন নতুন বিপ্লবী সামাজিক শক্তিরও উদ্ভব ঘটেছে যাদেরকেও নেতৃত্বে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। ভেনিজুয়েলায় জনগণের প্রয়োজন মেটাতে, জনগণের ব্যবস্থাপনায় ও জনগণের মালিকানায় উৎপাদন–এই তিন বাহুকে মিলিয়ে ‘ত্রিভূজ সমাজতন্ত্র’ (Triangular Socialism)-এর দিকে অগ্রসর হয়। নেতৃত্বসহ সর্বস্তরে বিপুল সংখ্যক নারীদের অংশগ্রহণও লাতিন আমেরিকায় সমাজতন্ত্র অভিমুখী অভিযাত্রায় নারীমুক্তিকামী উপাদান সংযুক্ত করেছে। ল্যাটিন আমেরিকার বিপ্লবী নেত্রী ও মার্কসবাদ তাত্ত্বিক মার্তা হার্নেকর বিগত কয়েক দশকের এই নতুন পরিবর্তনগুলি অনুসন্ধান করেছেন। তিনি বিভিন্ন দেশের পার্টিগুলির লেনিনীয় তত্ত্ব কাঠামোকে যান্ত্রিক, খন্ডিত ও অন্ধভাবে অনুসরণের ভুল-ত্রুটি-বিচ্যুতির কিছুকিছু তুলে ধরেছেন। সংকট, দুর্বলতা ও এ অবস্থা থেকে উত্তরণের ক্ষেত্রে মার্তার অভিমত হল: গণতন্ত্রের উপর পর্যাপ্ত গুরুত্ব প্রদান। কেননা এ যাবৎ গণতান্ত্রিক বিশেষণ প্রয়োগ করা হতো সমাজ-গণতন্ত্রীদের ক্ষেত্রে–যেনবা কমিউনিস্ট বিপ্লবী শক্তি সমূহ গণতান্ত্রিক নয়। আসলে গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের প্রিয় পতাকাগুলির অন্যতম। গণতন্ত্রের সংগ্রাম সমাজতন্ত্রের সংগ্রাম থেকে পৃথক নয় বরং কেবল সমাজতন্ত্রের মধ্যেই গণতন্ত্র পূর্ণ বিকশিত হতে পারে। জনগণ যাতে মনে করে তারাই নায়ক, সেজন্য জনগণকে সহায়তা করতে হবে। কেবল শ্রমজীবী শ্রেণি নিয়ে চিন্তিত ‘মজুরিপন্থি’ (Workerist) কর্মপন্থার বদলে নতুন বিষয়ের বহুত্বকে মান্যতা দিতে হবে এবং বৈষম্যের শিকার সকল পক্ষের (নারী, আদিবাসী, বৃদ্ধ, প্রতিবন্ধী, যৌনকর্মী, লিঙ্গবৈচিত্র, প্রান্তিক ও দলিত জনগোষ্ঠী ইত্যাদি) স্বার্থরক্ষায় দাঁড়াতে হবে, নিচমুখী সামরিক নেতার ধরন বদলে গণ শিক্ষক হতে হবে, যা জনগণের সঞ্চিত সকল বিচক্ষণ শক্তিকে মুক্ত করতে পারে। লাতিন আমেরিকার এই নয়া দিগন্ত লেনিনবাদী পার্টি ও বিপ্লবী আন্দোলন বিকশিত করার ক্ষেত্রে একটি সৃজনশীল গবেষণাগার রূপে উদ্দীপনার সৃষ্টি করেছে। যদিও এর পক্ষ-বিপক্ষ রয়েছে এবং তা থাকাই স্বাভাবিক। লেনিন এবং তৎপরবর্তী পার্টি ভাবনাকে আক্রমণ শতবর্ষের বেশি সময় ধরে চললেও সাম্প্রতিককালে তা নতুন রূপ পরিগ্রহ করেছে। আর যারা সমালোচনা করছেন তারা সবাই যে সমাজতন্ত্রের শত্রু এবং পুঁজিবাদের বন্ধু তা নয়। ‘অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট’-এর ‘ওয়ান পারসেন্ট বনাম নাইনটিনাইন পারসেন্ট’ আন্দোলন, আরব বসন্ত, তাহরির স্কোয়ার অভ্যুত্থান লিবিয়া-তিউনিশিয়া-তুরস্কের গণবিস্ফোরণ, দিল্লীর কেজরিওয়ালের আমজনতা আন্দোলন এই সমালোচনাকে আরো উৎসাহিত করছে। আর এই আক্রমণের মূল (অনেক সময় গোপন) লক্ষ্যবস্তু হল লেনিনের অগ্রগামী পার্টির ধারণা। এই পর্বে প্রথাগত বুর্জোয়া পেটি বুর্জোয়া সমালোচনা নয়, ভ্যানগার্ড পার্টির বিরুদ্ধে সমালোচনা মুখর হলেন নানা বিপ্লবী ও র্যা ডিকেল বুদ্ধিজীবীরা। নয়া মার্কসবাদী, পশ্চিমা মার্কসবাদী, উত্তর মার্কসবাদী, ফ্রাঙ্কফুর্ট স্কুল, উত্তর উপনিবেশবাদী, উত্তর-আধুনিক ভাবুকরা–যারা (মুষ্টিমেয় ব্যতিক্রম বাদে) আবার বিপ্লবী তৎপরতার সঙ্গে যুক্ত নন, কেবল একাডেমিক চর্চায় লিপ্ত–তাদের তরফে। সাম্প্রতিক কালে তীব্র হলেও এর উদ্ভব আসলে ৬০ দশকে। সোভিয়েত কেন্দ্রীক স্তালিন ও স্তালিন উত্তর বিতর্ক, হাঙ্গের ও চেকোস্লোভাকিয়ায় সোভিয়েত হস্তক্ষেপ তাদের মধ্যে স্বপ্নভঙ্গের বেদনা জাগায়। কিন্তু তারা সমাজতন্ত্র বিনির্মাণের দুর্গম, জটিল, দ্বন্দ্ব-সংঘাতময় দূরহতাকে উপলব্ধি না করে বিপ্লবের তত্ত্বের প্রয়োগের ক্ষেত্রে ‘বিশুদ্ধতার পুজারি’তে (Purity fatigue) পরিণত হন। সমাজতন্ত্রের অভিজ্ঞতার ভুল-ত্রুটি-দুর্বলতার সঠিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণে আগ্রহী না হয়ে কেবল সরল সমালোচনায় নিজেদের সঁপে দিলেন। শিশু সমেত ময়লা কাঁথা ছুড়ে ফেলার মত তারা পার্টি তত্ত্বকেই খারিজ করে বসেন। এদের মনে ক্রমশঃ এই ধারণা দানা বাঁধলো যে–পার্টি হল আত্মগতবাদ সর্বস্ব, স্বেচ্ছাচারী, জনগণকে হটিয়ে দিয়ে জনগণের বিকল্প, শ্রেণির স্থান দখলকারী, মুষ্টিমেয় নেতৃত্বের কতৃত্বাধীন। এভাবে তারা পার্টি তত্ত্ব ও নীতিকেই বাতিল ঘোষিত করেন। ফুকো থেকে অ্যালান বাদিউ সকলেই এই বিভ্রান্তি জ¦রে আক্রান্ত হলেন। মার্কসবাদী পন্ডিত ও মাও ভক্ত চার্লস বেটেলহাম পার্টি ও সমাজতন্ত্রের বিকৃতির জন্য স্তালিন নয়–লেনিনকেই অপরাধী বানালেন ১৯১৭ সালের বিপ্লবের পরেই সংসদ ভেঙ্গে দেবার দায়ে। এর পাশাপাশি বিজ্ঞান-প্রযু্ক্তিগত বিপ্লবের ফলে পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থায় কাঠামোগত নানা অভূতপূর্ব পরিবর্তন শ্রমিকশ্রেণীর মধ্যেও নানা বৈচিত্র্যতা আনলো। আর এসব মিলিতভাবে তাদের পার্টি বিহীন বিপ্লবের বিকল্প তত্ত্ব নির্মাণের দিকে প্রলুব্ধ করলো। এ ক্ষেত্রে কেউ কেউ হাল ছেড়ে কোনো বিকল্প নেই–বলে উদার গণতান্ত্রিক পুঁজিবাদেই পথ খুঁজতে থাকে। আবার অনেকে বহু বিকল্প থাকার কথা বলে সুনির্দিষ্ট কোনো বিকল্প পথ দেখাতে না পেরে অরাজনৈতিক, স্বেচ্ছাশ্রমধর্মী ও এনজিও কর্মকান্ডের দাওয়াই বাতলায়। যেমন, সুশীল সমাজ তৎপরতা, অ্যাডভোকেসী, নেটওয়ার্কিং ক্যাম্পেইন, সেমিনার, ডায়ালগ, পরিচয় রাজনীতি (Identity Politics)। আর্জেন্টিনার আরনেস্তো লাকলাউ (Ernesto Laclau) ও তার সহযোদ্ধা চান্তাল মৌফে (Chantal Mouffe) ক্ষমতা দখল না করেই দুনিয়াকে বদলানোর নিদান দেন। তাদের মতে পুঁজিবাদী রাষ্ট্র টিকে আছে শ্রমিকশ্রেণির উদ্বৃত্ত আত্তীকরণের মাধ্যমে। তাই শ্রমিকরা এ ক্ষেত্রে নিজেদের প্রত্যাহার করলে এ ব্যবস্থা এমনিই ধসে পড়বে–বিপ্লব বা পার্টির দরকার হবে না। কিন্তু কার বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই, কে শত্রু, কে মিত্র, কোথা থেকে শুরু করতে হবে ও কে করবে, পুঁজিবাদের শোষণ-বৈষম্য-নিপীড়নের বিরুদ্ধে লড়াইটা কীভাবে হবে–ক্ষমতা দখলের প্রশ্নে এসব মৌলিক প্রশ্নের জবাব তাদের কাছে নেই। অনেকে শ্রমিক শ্রেণির মুক্তিকামী বিপ্লবী ঐতিহাসিক ভূমিকার উপর আর আস্থা রাখতে পারলেন না। এমনকি কেউ কেউ শ্রমিকশ্রেণীর বিশ্বময় সজীব-সরব সংগ্রামী অস্তিত্বকে দেখতে ও বুঝতে চাইলেন না। ডানদিকের ড্যানিয়েল বেল–শ্রমিকশ্রেণির মৃত্যু ঘোষণা করলেন। অন্যদিকে বামপন্থী আন্দ্রে গজ তাদেরকে বিদায় জানালেন। আরেকদল আরো আগেই ঘোষণা দেন–“আমরা মার্কসবাদের চেয়ে আরো বৈপ্লবিক তত্ত্ব চাই।” আরব বসন্তের সময় ইতালির বিপ্লবী বুদ্ধিজীবি আন্তোনিয় নেগ্রী গার্ডিয়ান পত্রিকায় লিখলেন–“এরকমই একটা কিছু আমরা চেয়েছিলাম।” কারণ তার মতে পুঁজিবাদ, ক্ষমতা-এসব এখন নৈর্ব্যক্তিক, বাস্তব রূপহীন। এখন অনুক্ষমতা, জৈবক্ষমতা, অনুসংগ্রাম, ডিজিটাল লেবার বা প্ল্যাটফরম ইকোনমির যুগ। শ্রমিকশ্রেণিও তাই নৈর্ব্যক্তিক, খণ্ড-বিখণ্ড ও নানা রূপী। ফলে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে শ্রমিক শ্রেণীর সমষ্টিগত সংগ্রামও নৈর্ব্যক্তিক, অবয়বহীন। পুঁজি এখন এমপায়ার বা সাম্রাজ্য। আমরা জানি শ্রমজীবিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে লড়ে ও এখনো লড়ছে। নানারূপী স্বতঃস্ফূর্ত গণবিক্ষোভও দেশে দেশে গড়ে উঠছে। কিন্তু এসবের কোনোটাই কাঙ্খিত লক্ষ্য অর্জন করতে পারেনি। বরং ফলাফল প্রত্যাশার বিপরীতেই চলে গিয়েছে। অকুপাই ওয়াল স্ট্রিট থেকে দিল্লীর কেজরিওয়ালের আমজনতার আন্দোলনের পরিণতিই এর প্রমাণ। এসব বিকল্প আসলে এক ধরনের নিষ্ক্রিয় বিপ্লবীপনার দিকে ঠেলে দেয়া। অন্যদিকে পুঁজিবাদের সরকারি মুখপাত্ররা দেখবার চেষ্টা করে-শ্রমিকদের আর সমষ্টিগত শ্রেণি প্রতিরোধের দরকার নেই। সরকারি-বেসরকারি নানা উদ্যোগের মাধ্যমে কিংবা আত্মকর্মসংস্থানের মাধ্যমে তাদের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটছে। তারা এখন পুঁজিবাদের শিকার নয়, বরং তারা একে মোকাবিলা করছে। এসব পথবিকল্পের দিকে মনোযোগী অনুসন্ধান চালালে আমরা দেখতে পাবো যে, এ সবের অনেকখানিই নতুন বোতলে পুরানো মদ। মার্কস থেকে লেনিন–এই দীর্ঘ যাত্রাপথে অগ্রগামী পার্টিবিরোধী এই সব সমালোচনা বারংবার নানা রূপে উত্থাপিত হয়েছে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকে কাউটস্কি-বার্নস্টাইন এবং ১৯০০-১৯১৪ সাল পর্যন্ত পার্টি গঠনের কালপর্বে লেনিন বিরোধী নানা জন কর্তৃক। ইতিহাস লেনিনের পক্ষেই রায় দিয়েছে। কিন্তু বর্তমান ঘরানার লেনিনীয় পার্টি সমালোচনার সবচেয়ে নেতিবাচক দিক হলো–তা ব্যাপক তরুণদের বিপ্লবী সম্ভাবনাকে নস্যাৎ করছে। তাদের ব্যাপক অংশের মধ্যে পার্টিবিরোধী, সংগঠনবিরোধী এক ধরনের নৈরাশ্যবাদী প্রবণতার জন্ম দিচ্ছে। অনেকে আবার নিষ্ক্রিয় বিপ্লবীপনায় আচ্ছন্ন হয়ে আরাম কেদারার বিপ্লবী কিংবা ‘মেইনলাইন’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ‘অনলাইন’ তৎপরতার মাধ্যমে অনেক কিছু করে ফেলার বিভ্রান্তিতে ভুগছে। এরকম একটা সময়ে আজ আমরা দেখছি বিশ্ব জনসংখ্যায় শ্রমিকশ্রেণির সংখ্যাগরিষ্ঠতা দেখছি এবং প্রতিদিন এ সংখ্যা বৃদ্ধি ঘটছে। ২০২০ সালে মজুরি শ্রমিকের সংখ্যা এখন ২০০ কোটি ছাড়িয়ে গেছে। অথচ মার্কস-এঙ্গেলস যখন দুনিয়ার মজদুর শ্লোগান দেন–তখন সারা দুনিয়ায় মজুরি শ্রমিকের সংখ্যা ছিল বিশ্বজনসংখ্যার মাত্র ২ শতাংশ–সর্বোচ্চ ২ কোটি। ভারতে ২০২০ সালের সাধারণ ধর্মঘটে ২৫০ মিলিয়ন শ্রমিক অংশগ্রহণ করে, যা বিশ্ব ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ধর্মঘট। এরকম শ্রমিক গণবিক্ষোভ ও আন্দোলন এখন ছড়িয়ে পড়ছে সর্বত্র এবং মাঝে মধ্যে তীব্র রূপ ধারণ করছে। আজকের এই প্রেক্ষাপটে তাই লেনিনের পার্টি ভাবনাটাকে নতুন করে ঝালিয়ে নিতে হবে। মার্কসের শিক্ষায় যিনি দেখিয়েছেন–স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মাধ্যমে শ্রমিকরা বড় জোর ট্রেড ইউনিয়নে চেতনা পর্যন্ত অর্জন করতে পারে। কিন্তু সমাজ বিপ্লবের তত্ত্ব-জ্ঞান-চেতনা বাইরে থেকে সঞ্চারিত করতে হয়। এটা তাদের অক্ষমতা বা ব্যর্থতা নয়। বরং মার্কস অর্থনৈতিক ও দার্শনিক পান্ডুলিপিতে এর ব্যাখ্যা দিয়ে বলেছেন–পুঁজিবাদ মানুষকে বিচ্ছিন্নতায় আক্রান্ত করে, তার মানব সত্তাকে পশুর স্তরে নামিয়ে নিয়ে আসে। ফলে প্রতিদিনের অস্তিত্ব রক্ষার সংগ্রামে কাতর, শিক্ষণ-জ্ঞান-বিজ্ঞান চর্চার সুযোগ-অবসর ও পরিবেশ থেকে বঞ্চিত শ্রমজীবিদের পক্ষে সমাজ বিপ্লবের উন্নত তত্ত্ব নির্মাণ সম্ভব হয়ে উঠে না। তাই এ ক্ষেত্রে ভূমিকা নেয় পার্টি। শ্রমিক শ্রেণির স্বতঃস্ফূর্ত আন্দোলনের মধ্যে সমাজ বিপ্লবের সচেতনতার বীজ বপন করে। তাছাড়া ইতিহাসে কোনো শ্রেণি অগ্রবাহিনী ছাড়া ক্ষমতায় আসীন হতে ও স্থায়ী হতে পারেনি। তবে এই অগ্রগামী পার্টি নিয়ে যে তর্ক-বিতর্ক-সমালোচনা, তার সুরাহা করা যায় মার্কস-এঙ্গেলস থেকে শুরু করে লেনিন ও লেনিন উত্তর পার্টি ভাবনার মনোযোগী পাঠ আত্মস্থ এবং তার সৃজনশীল প্রয়োগের মাধ্যমে। অবশ্য এর অর্থ এই নয় যে সবকিছু ঠিকঠাক আছে বা সব কথা বলা হয়েছে। বরং লেনিনীয় পার্টি ধারণাকে লোকায়িতভাবে বিকশিত করেই এগিয়ে যেতে হবে। লেখক : সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য, সিপিবি