গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, গণতন্ত্র ও বৈষম্যহীন সমাজ গড়ার পথে হাঁটতে হবে

Posted: 10 আগস্ট, 2025

অন্তর্বর্তী সরকার এক বছর পূর্তিতে বলছেন, সরকারের দ্বিতীয় অধ্যায়ে প্রধান কাজ সুষ্ঠু নির্বাচন। বিগত দিনগুলোতে ভোটাধিকার বঞ্চিত মানুষ দীর্ঘদিন ধরে ভোটের প্রত্যাশায় আছে। আর দেশে গণতন্ত্রের ধারায় চলার পথে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য ভোটের কথা সর্বমহলের প্রত্যাশিত। ওই নির্বাচনের একটা সুনির্দিষ্ট দেখা মেলার আভাস পাওয়া গেলো। আগামী বছর অর্থাৎ ২০২৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে জাতীয় সংসদ নির্বাচন হতে পারে। ‘হতে পারে’–এই কথা বলার কারণ হলো, ‘সব সম্ভবের দেশ বাংলাদেশ’–অতীতে দেখা গেছে ভোটের সব প্রস্তুতি, যেমন মনোনয়ন, প্রার্থী নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার পরও ভোট হয়নি। তাই নির্বাচন সুষ্ঠভাবে শেষ না হওয়া পর্যন্ত যেকোনো সম্ভাবনাকে উড়িয়ে দেওয়া যায় না। দুই এদেশে কমিউনিস্ট, বামপন্থি প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তিসমূহ দীর্ঘদিন ধরে মানুষের ওপর মানুষের শোষণ বঞ্চনার বিরুদ্ধে ও এর অবসানে সংগ্রাম করে চলেছে। এর জন্য আঁকাবাঁকা নানা পথে অগ্রসর হতে হয়েছে, হচ্ছে। এর মধ্যে অন্যতম হলো, মানুষের ন্যূনতম গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) তার গঠনতন্ত্রে ঘোষণা করেছে, ‘দেশের জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার, গণতন্ত্রের মূল্যবোধ, আইনের শাসন, গণতান্ত্রিক বিধিব্যবস্থা ও প্রতিষ্ঠানসমূহ গড়ে তোলা এবং বিকশিত করার জন্য নিরবচ্ছিন্ন সংগ্রাম পরিচালনা করবে। বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, সংবাদপত্র ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা, বহুদলীয় রাজনৈতিক ব্যবস্থা এবং জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটাধিকারের জন্য কাজ করে যাবে। পার্টির লক্ষ্য ও কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আদর্শগত ক্ষেত্রে বিভিন্নমুখী ধারায় আন্দোলন ও সংগ্রাম পরিচালনায় পার্টি সর্বতোভাবে নিয়োজিত থাকবে। পার্টি জনগণের সংখ্যাগরিষ্ঠের সমর্থনের ভিত্তিতে রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার জন্য প্রয়াস চলবে।’ গঠনতন্ত্রের নির্দেশিত এই কর্তব্যকে সামনে রেখে ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান-উত্তর পরিস্থিতিতে পার্টি তার কার্যক্রম অব্যাহত রেখে চলেছে। জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত জাতীয় সংসদসহ, স্থানীয় সরকার ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলায় তার কণ্ঠ সোচ্চার রেখেছে। একইসাথে বিভিন্ন সংস্কার আলোচনায় অংশ নিয়ে পার্টির মতামত তুলে ধরা হয়েছে। এ সময় এ কথা বারবার তুলে ধরা হয়েছে যে, পার্টির লক্ষ্য সমাজতন্ত্র ও সাম্যবাদী সমাজ প্রতিষ্ঠা করা। ঐ লক্ষ্যে বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তন সম্পন্ন করতে পার্টির সুনির্দিষ্ট ১৭ দফা কর্মসূচি রয়েছে। যে কর্মসূচি ঘোষণার সময় পার্টি বলেছে, ‘সমাজতন্ত্র অভিমুখীন বিপ্লবী গণতান্ত্রিক পরিবর্তনের মৌলিক ধারণার ভিত্তিতে প্রণীত বর্তমান পর্যায়ের এই কর্মসূচিটি পরিবর্তনশীল। বিষয়গত ও বিষয়গত বাস্তবতার আলোকে ক্রমেই আরো সুনির্দিষ্ট রূপ ধারণ করবে এবং এর ভিত্তিতে সংগঠিত হওয়ার মধ্য দিয়েই জনগণ সমাজ পরিবর্তনের একটা বস্তুগত শক্তিতে পরিণত হবে।’ তিন চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের পর মূল্যায়নে পার্টি বলেছে, ‘ছাত্র জনতার ব্যাপক অংশগ্রহণ ও বিক্ষোভের মধ্য দিয়ে অভূতপূর্ব গণঅভ্যুত্থানে ফ্যাসিবাদী শাসন পরাজিত হওয়ায় দেশকে গণতন্ত্রের ধারায় অগ্রসর করার পথ, শক্তি ও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক সংস্কারের সম্ভাবনা সৃষ্ট হয়েছে। কিন্তু রাষ্ট্রের শ্রেণি চরিত্রের কোনো বদল হয়নি। যে সিভিল মিলিটারি ব্যুরোক্রেসি, লুটেরা মাফিয়া ব্যবসায়ী, লুটপাটকারী রাজনীতিবিদ ও সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী আন্তর্জাতিক শক্তির সমর্থনে ফ্যাসিবাদ যে শোষণ ও শাসন কাঠামো স্থাপন করে রেখেছিল তা এখনো বহাল আছে। দেশকে আমেরিকার ভূ-রাজনৈতিক প্রভাব নেওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত আছে। আধিপত্যবাদী ভারত তার আধিপত্য পুনঃপ্রতিষ্ঠা করতে নানাভাবে মরিয়া হয়ে তৎপরতা চালাচ্ছে। আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে অন্যান্য শক্তির সঙ্গে দক্ষিণপন্থি প্রতিক্রিয়াশীল রাজনৈতিক শক্তি এই আন্দোলনে যুক্ত হয়ে নানা ষড়যন্ত্র করেছিল, এখনো করছে। ...সঠিক ধারায় প্রকৃত গণসংগ্রামের চাপ অব্যাহত না রাখতে পারলে গণঅভ্যুত্থানের গণআকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের লক্ষ্যাভিমুখী গতিমুখ পাল্টে যেতে পারে।’ এসব বিবেচনাকে সামনে রেখে পার্টি তার কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। দিন দিন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের কর্মকাণ্ড ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা, দক্ষিণপন্থি শক্তিসমূহের আধিপত্য বিস্তার এবং ভূ-রাজনীতিতে সাম্রাজ্যবাদের কাছে সরকারের আত্মসমর্পণের চেহারা স্পষ্ট হয়ে উঠছে। এসময় পার্টি অন্তর্বর্তী সরকারের ক্ষমতা দীর্ঘায়িত না করা ও নির্বাচিত সরকারের দাবিকে সামনে নিয়ে আসে। এ বছর অর্থাৎ ২০২৫-এর ৩ জানুয়ারি ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে অনুষ্ঠিত বিশাল সমাবেশ থেকেও অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কার করে নির্বাচনের দাবিকেও সামনে আনা হয়। সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের জন্য সিপিবির বক্তব্য, জাতীয় সংসদে সংখ্যানুপাতিক পদ্ধতি প্রবর্তন, স্থানীয় সরকার শক্তিশালী করা, ‘প্রার্থী হওয়া-ভোট দান ও প্রচার’–সব ক্ষেত্রে সমসুযোগ, ‘না’ ভোট প্রচলন, প্রতিনিধি প্রত্যাহার বিধান, নির্বাচনে টাকার খেলা-পেশী শক্তি, সাম্প্রদায়িক প্রচারণা, প্রশাসনিক কারসাজি বন্ধ করাসহ নির্বাচনকালীন নির্দলীয় তদারকি/তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের সামনে আনার চেষ্টা করা হয়। জনস্বার্থের অনেক সংস্কারকে বাদ দিয়ে সরকার সংস্কারের কতক প্রস্তাবকে মৌলিক সংস্কারের প্রস্তাব হিসেবে সামনে এনে আলোচনা শুরু করে। নির্বাচন ব্যবস্থার আমূল সংস্কার প্রস্তাব আড়ালে পড়ে যায়। সরকারের ঐ সব সংস্কার প্রস্তাবে বিশেষ গোষ্ঠীর কিছু বিশেষ প্রস্তাব যেমন, সংবিধানের চার মূলনীতি পরিবর্তন, মুক্তিযুদ্ধকে কৌশলে বিতর্কিত করার বিষয়ে সচেতন থেকে দৃঢ়তার সাথে এর বিরোধিতা করা হয়। ঐ সময় অপরাপর সমমনা শক্তিকে কাছে নিয়ে ঐক্যবদ্ধভাবে রুখে দাঁড়ানো এবং আমাদের বক্তব্য দৃশ্যমান করার প্রচেষ্টা নেওয়া হয়। অন্যদিকে বুর্জোয়া ব্যবস্থা সংসদীয় গণতন্ত্রের ধারায় গণতান্ত্রিক ও প্রতিষ্ঠানসমূহকে গড়ে তুলতে সংস্কারের কিছু প্রস্তাবে আলোচনার মধ্যে দিয়ে আমাদের ইতিবাচক অবস্থান তুলে ধরা হয়। যেমন- সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ, সংসদীয় কমিটির সভাপতি, বিচার বিভাগ বিকেন্দ্রীকরণ, রাষ্ট্রপতির ক্ষমা সংক্রান্ত বিধান, নির্বাচনী এলাকার সীমা নির্ধারণ, জরুরি অবস্থা ঘোষণা, প্রধান বিচারপতি নিয়োগ, প্রধানমন্ত্রীর একাধিক পদে থাকার বিধান- মেয়াদ, নির্বাচন কমিশনসহ অন্যান্য সাংবিধানিক ও সংবিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ, সংসদে নারী প্রতিনিধিত্ব, তত্ত্বাবদায়ক সরকার, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন- দায়িত্ব ও ক্ষমতা, নাগরিকদের মৌলিক অধিকার সম্প্রসারণ–এসব বিষয়ে মতামত তুলে ধরে বলা হয়, মৌলিক এসব বিষয়সমূহে আগামীতে নির্বাচিত সংসদের জন্য রেখে দিতে হবে। যাতে তারা আইন অনুযায়ী সংস্কার ও বাস্তবায়ন করতে পারে। অনেক মহলের আলোচিত, জাতীয় সিকিউরিটি কাউন্সিল, গণভোট, গণপরিষদ নির্বাচন বা এলএফও (লিগ্যাল ফ্রেমওয়ার্ক অর্ডার) এর মাধ্যমে উল্লিখিত প্রস্তাবসমূহে বাস্তবায়নকে অগ্রহণযোগ্য বলে নাকচ করা হয়। এসব আলোচনায়ও জোর দেওয়া হয়, দ্রুততম সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের। আলোচনায় অনেক পক্ষ- এখনকার সময়ে অপ্রয়োজনীয় আলোচনা তুলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সময় দীর্ঘায়িত করার প্রচেষ্টা নেয়, যা এখনো অব্যাহত আছে। ধৈর্য ধরে আমরা আলোচনায় অংশ নিলেও সংবিধানের চার মূলনীতি নিয়ে নানা কারসাজির প্রস্তাবে বিরোধিতা করে সভা চূড়ান্তভাবে বর্জনের ঘোষণা দিয়ে বের হয়ে আসতে হয়। চার এই পরিস্থিতির মধ্যেও সরকার ৫ আগস্ট ২০২৫ ‘জুলাই ঘোষণাপত্র’ নামে একটি ঘোষণা পাঠ করে। ঐ ঘোষণাপত্র সম্পর্কে সিপিবি বা অধিকাংশ দল আমরা অবহিত নই। তাই ঐ অনুষ্ঠানে আমন্ত্রণ পেলেও আমরা অংশ নেই নাই। ঐ ঘোষণাপত্রের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকার সুযোগ নেই। ইতোমধ্যে পঠিত ঐ পত্রে, ইতিহাস বিকৃতি, একচোখা, বিশেষ উদ্দেশ্যে প্রণীত বলে বিভিন্ন মহল থেকে বলা হচ্ছে। যার ফলে এটি গ্রহণযোগ্যতা ও প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে। এসময় সাধারণ মানুষের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠছে। সরকারি তথ্যই বলছে, প্রতি ৪ জন মানুষের মধ্যে এক জন বহুমুখী দারিদ্র্যের মধ্যে বসবাস করছে। শ্রমিক, কৃষক, মেহনতি মানুষসহ নারীদের জীবনে সংকট বাড়ছে। দেশের অভ্যন্তরে মুক্তিযুদ্ধবিরোধী দক্ষিণপন্থি শক্তির দাপট বাড়ছে। সাম্রাজ্যবাদের কাছে সরকারের ও অন্যান্য নানা মহলের আত্মসমর্পণ দৃশ্যমান হচ্ছে। নির্বাচন সামনে আসতে থাকলে রাজনীতির নানা মেরূকরণ আরো স্পষ্ট হয়ে উঠবে। ক্ষমতা রাজনীতিতে দেশি-বিদেশি নানা গোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, আধিপত্য বিস্তার বাড়তে থাকবে। এ সময়ে বাম-প্রগতিশীল গণতান্ত্রিক শক্তি ও বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের ঐক্য গড়ে তুলে এগিয়ে যাওয়ার প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষকে নিজ নিজ দাবিতে ঐক্যবদ্ধ করে গণসংগ্রাম গড়ে তোলার কাজকে অন্যান্য কাজের মধ্যে অধিকতর গুরুত্ব দিয়ে পরিকল্পিত উদ্যোগ নিতে হবে। একইসাথে সুষ্ঠু, অবাধ, গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের জন্য প্রয়োজনীয় সংস্কারের সুনির্দিষ্ট বক্তব্য তুলে ধরে অর্জনের জন্য প্রয়াস চালাতে হবে। সরকারের সব ধরনের গণবিরোধী পদক্ষেপ রুখে দাঁড়াতে হবে। আন্দোলনমুখী অবস্থানের মধ্য দিয়ে আমাদের বক্তব্য জনগণের কাছে তুলে ধরে আগামী নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য সব ধরনের প্রস্তুতি রাখতে হবে। দীর্ঘ লড়াইয়ে আমাদের উচ্চারিত স্লোগান হলো- ‘দুঃশাসন হটাও, ব্যবস্থা বদলাও, বাম বিকল্প গড়ে তোলো’। গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দুঃশাসক হটলেও দুঃশাসন হটেনি। তাই সামগ্রিকভাবে দুঃশাসনের শেকড় উপড়ে ফেলতে ব্যবস্থা বদল ও এর জন্য বিকল্প শক্তি সমাবেশ গড়ে তোলার বিকল্প নেই। এই কাজটি সব সময়ের জন্য প্রাসঙ্গিক। দেশব্যাপী সর্বক্ষেত্রে আমাদের বিকল্প প্রস্তাবসমূহ তুলে ধরে আমাদেরকে দৃশ্যমান করতে হবে। মানুষের আস্থা অর্জন করতে হবে। নির্বাচনী সংগ্রামকেও গুরুত্ব দিতে হবে। মানুষের সাথে থেকে তাদের সচেতন ও সংগঠিত করে সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য নির্বাচন, গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ও বৈষম্যহীন রাষ্ট্র গড়ার পথে হাঁটাই এখনকার অন্যতম কর্তব্য।