২০২৪ ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থান

Posted: 03 আগস্ট, 2025

জুলাই-আগস্ট ২০২৪। বাংলাদেশের ইতিহাসে রচিত হয় এক রাজনৈতিক পট পরিবর্তন। সংগঠিত হলো ছাত্র-জনতার এক অভূতপূর্ব গণ-অভ্যুত্থান। দুর্বার গণজোয়ারে পতন হয় এক যুগ ধরে চেপে বসা ফ্যাসিস্ট আওয়ামী শাসনের। পদত্যাগ করে দেশ থেকে পালিয়ে যেতে হলো শেখ হাসিনাকে। শহীদ আবু সাঈদ, মুগ্ধ, ছাত্র ইউনিয়ন নেতা রিজভী, ক্ষেতমজুর নেতা প্রদীপ ভৌমিকসহ সহস্রাধিক ছাত্র-জনতার আত্ম-বলিদান এবং গুলির মুখে বুক পেতে দেওয়া জাগ্রত ছাত্র-শ্রমিক-জনতার রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মধ্য দিয়ে এই বিজয় অর্জিত হয়েছে। এ বিজয় মানুষের গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার বিজয়। এই বিজয়ের মর্মবস্তুকে রক্ষা ও সংহত করতে হবে। এই গণ-অভ্যুত্থান স্বৈরাচারী দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর দীর্ঘদিনের সংগ্রামের ফসল। একটানাভাবে চলতে থাকা সুদীর্ঘ আওয়ামী দুঃশাসনকালের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ এবং তার বিরুদ্ধে অব্যাহতভাবে চলতে থাকা জনগণের বিভিন্ন সংগ্রাম গণ-অভ্যুত্থানের পটভূমি রচনা করে রেখেছিল। এই ফ্যাসিস্ট দুঃশাসনের বিরুদ্ধে দেশবাসীর মনে যে তীব্র ক্ষোভের আগুন পুঞ্জীভূত হয়েছিল, তা বিস্ফোরিত হওয়ার জন্য কোনো না কোনো উপলক্ষের অপেক্ষায় ছিল। ২০২৪-এর জুলাইয়ে সরকারি চাকরিতে কোটা ব্যবস্থা পুনরায় চালু করার বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা পথে নেমে যে সংগ্রাম শুরু করেছিল, সেই সংগ্রামই বৈষম্যবিরোধী এবং চূড়ান্ত পর্যায়ে সরকারবিরোধী গণবিস্ফোরণের পথে দ্রুত অগ্রসর হয়েছিল। মাত্র দুই-তিন সপ্তাহের মধ্যে এই সংগ্রামই দাবানলের মতো জ্বলে ওঠে এবং ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার এক অদম্য গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় অর্জিত হয়। ২০২৪-এর জুলাই মাসে হাইকোর্ট কর্তৃক কোটা পদ্ধতি পরিপূর্ণ বাতিলের বিরুদ্ধে রায় প্রকাশিত হয়। এই রায়ের ফলে ছাত্রসমাজ আবার ক্ষোভে গর্জে ওঠে। আওয়াজ ওঠে- ‘কোটা না মেধা-মেধা, মেধা’। সাথে যুক্ত হয় বৈষম্য নিরসনের কথা। দাবি মেনে নেওয়ার বদলে সরকার এই রায়ের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের অ্যাপিলেড ডিভিশনে আপিল করবে বলে বিবৃতি দিয়ে শিক্ষার্থীদের ক্ষোভ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করে। সরকারের কোনো কথার গ্রহণযোগ্যতাই ছাত্র-জনতার কাছে ছিল না। ফলে শিক্ষার্থীদের দেশব্যাপী শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভ চলতে থাকে। এ দিকে শাসকদের দীর্ঘদিনের অন্যায়, অবিচার, দম্ভ, মানুষের প্রতি অবজ্ঞাসহ নানা কারণে বিস্ফোরক গতিতে পুঞ্জীভূত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ঘটতে থাকে। এই বিক্ষোভ দ্রুতই গণজাগরণে পরিণত হয়। জেলা-উপজেলায় এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের মানুষের মধ্যে তা তড়িৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়ে। আন্দোলন দমন করতে সরকারি দলের পক্ষ থেকে এক ভয়াবহ সংঘাতের পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়। রাজপথে অবস্থান নিয়ে বেপরোয়া হয়ে ওঠা লক্ষ লক্ষ লড়াকু সাধারণ শিক্ষার্থীর বিরুদ্ধে ছাত্রলীগের সশস্ত্র সন্ত্রাসী বাহিনীকে লেলিয়ে দেওয়া হয়। এভাবে সংকট আরও গভীর হয়। এই আন্দোলনকে মহান মুক্তিযুদ্ধের বিপরীতে দাঁড় করানোর জন্য মিথ্যাচার ও ঘৃণ্য অপপ্রচার চালানো হলেও, সেসব কথা কোনো যুক্তিশীল মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাই সংগ্রাম অবদমিত না হয়ে বরং আরও বেগবান হতে থাকে। স্বৈরাচারী ফ্যাসিস্ট সরকার প্রচণ্ড দমনপীড়ন, সশস্ত্র তাণ্ডব ও বর্বরতা আরও বৃদ্ধি করে আন্দোলন দমন করার পথ নেয়। রাজপথে বিভিন্ন বাহিনী নামানো হয়। কারফিউ জারিসহ গণতান্ত্রিক অধিকার হরণ করা হয়। চালানো হয় এক নিষ্ঠুরতম হত্যাযজ্ঞ। কিন্তু এই হত্যাযজ্ঞ ও শ্বেতসন্ত্রাস জাগ্রত ছাত্র-জনতার সংগ্রামের উত্তাল অগ্রযাত্রাকে দমাতে পারেনি। জুলাই থেকে চলতে থাকা আন্দোলনের পটভূমিতে ৫ আগস্ট জাতির ইতিহাসে এক অনন্য গণ-অভ্যুত্থানের বিজয় অর্জিত হয়। স্বৈরাচারী শাসক শেখ হাসিনা দেশ ছেড়ে পালিয়ে যায়। জুলাই-আগস্টের এই গণ-অভ্যুত্থানে এক হাজারের বেশি মানুষ জীবন দিয়েছেন। আহত হয়েছেন কয়েক হাজার। হাসপাতাল বা বাড়িতে অনেক আহত মানুষ অসহায় দিন কাটাচ্ছেন। এদের মধ্যে চার শতাধিক মানুষ চোখ হারিয়েছেন, পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন অনেকেই। শহীদ ও আহতদের পরিবারের আহাজারিতে বাতাস এখনো ভারী হয়ে আছে। শুধু রাজপথে নয়, ঘরের মধ্যে ছাদের ওপরেও শিশুর জীবন নিরাপদ ছিল না। শুধু রাস্তায় নয়, সরকারি বাহিনী হেলিকপ্টার থেকেও গুলি করেছে। ফলে ঘরের মধ্যে থাকা শিশু থেকে শুরু করে নারীসহ অনেককে জীবন দিতে হয়েছে। প্রকাশিত হিসাব অনুসারে, ১০ হাজারেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়। এক যুগ ধরে পতিত স্বৈরাচার শেখ হাসিনার সরকারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল ও শ্রেণি-পেশার সংগঠন আন্দোলন করে আসছিল। তার মধ্যে একটি প্রধান শক্তি ছিল বিএনপি। আরও কিছু দলকে জোটসঙ্গী করে দলটি আন্দোলন অগ্রসর করছিল। বিএনপির সাথে সমমনা হিসেবে পরিচিতরাও এ সময়ে আন্দোলনের পক্ষে ভূমিকা পালন করে। একাত্তরের ঘাতক যুদ্ধাপরাধী দল জামায়াতে ইসলাম তার নিজস্ব অবস্থান থেকে আপন কায়দা-কৌশলে সরকারের বিরোধিতা করেছিল। জুলাই মাসে ছাত্রসমাজ কর্তৃক সূচিত আন্দোলন অগ্রসর হতে থাকার এক পর্যায়ে, সরকার প্রশাসনিক নির্দেশের মাধ্যমে জামায়াত-শিবিরকে সন্ত্রাসী সংগঠন হিসেবে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। চলমান আন্দোলনে তা কোনো প্রভাব বিস্তার করে নাই। আন্দোলনের শেষ দিকে এবং বিশেষত বিজয়ের পরপর, ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে জামায়াত, হেফাজত ইসলাম ও হিজবুত তাহরির উপস্থিতি দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। এই আন্দোলনে যেসব শিক্ষার্থী কেন্দ্রীয় ও প্রধান সারিতে ছিল, সাধারণ ছাত্র-জনতার কাছে তারা বা তাদের নাম অপরিচিত ছিল। তারা সাধারণ ছাত্র-জনতার দ্বারা ‘নির্দলীয় ও অরাজনৈতিক’ হিসেবে নিজেদের হাজির করে এবং সেভাবেই তারা গণ্য হয়। কিন্তু বস্তুত অনেকে গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তি নামে একটি সংগঠনের সাথে যুক্ত ছিল। এর সঙ্গে ছিল ছাত্রপক্ষ নামক আরেকটি শক্তি। গণতান্ত্রিক ছাত্র শক্তির সঙ্গে যুক্ত ছাত্ররা একসময় গণঅধিকার পরিষদের সঙ্গে যুক্ত ছিল। এরা দীর্ঘদিন ধরে ফরহাদ মজাহারসহ আরও কিছু ব্যক্তিবর্গের সাথে যোগাযোগ করে সারাদেশে বিশেষত ছাত্রসমাজের মাঝে পাঠচক্র পরিচালনা, যোগাযোগ নেটওয়ার্ক গড়ে তুলেছিল। এই আন্দোলনে তারা এবং তাদের চিন্তাভাবনা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। আওয়ামী লীগ যেকোনো উপায়ে ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য ১৪ দলকে সাথে নিয়ে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত চেষ্টা করেছে। বিকল্প কোনো কন্টিনজেন্সি এক্সিট বা এ অবস্থা থেকে রক্ষা পাবার পরিকল্পনা ছিল না। এ সময়কালে দেশের মিডিয়া প্রায় একচেটিয়াভাবে দ্বি-দলীয় ধারার রাজনীতি, প্রকারান্তরে শাসকগোষ্ঠীর রাজনীতিকে সামনে রাখতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি বলয়ের প্রচারকেই গুরুত্ব দিয়েছে। এর বাইরে, সরাসরি রাজনৈতিক দল নয় এমন ‘সুশীল’ নামধারীদের কর্মকাণ্ডও প্রচারমাধ্যমে গুরুত্ব পায়। অন্যদিকে, সামাজিক প্রচারমাধ্যমের ব্যবহার ও ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ সময়কালে দেশের বামপন্থী দল ও শক্তিগুলো প্রচারমাধ্যমে তো নয়ই, এমনকি মাঠে-ময়দানেও সেভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠতে পারেনি। বামপন্থীদের অনেকের মধ্যে বিভ্রান্তি ও দ্বিধা-দ্বন্দ্ব থাকলেও, আন্দোলনে অনেকেই বলিষ্ঠভাবে সক্রিয় ছিল। তারা মাঠে থেকেছে এবং সঠিক সময় সঠিক স্লোগানগুলো সামনে আনার চেষ্টা করেছে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি) পৃথকভাবে এবং বাম গণতান্ত্রিক জোট হিসেবে ও একইসঙ্গে ফ্যাসিবাদবিরোধী বাম মোর্চা, বাংলাদেশ জাসদ, ঐক্য ন্যাপসহ অপরাপর গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তিকে সঙ্গে নিয়ে নানা সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও সাধ্যমতো এই আন্দোলনকে অগ্রসর করতে ভূমিকা রেখেছে। শেখ হাসিনার পদত্যাগের দাবিতে রাজনীতি সচেতন, প্রগতিশীল, প্রতিক্রিয়াশীল এবং অরাজনৈতিক ব্যক্তি- সকলেই অংশগ্রহণ করেন। রাজনীতি সচেতন অংশগুলো নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গিতে আন্দোলনকে পরিচালিত করার জন্য শুরু থেকেই সচেষ্ট ছিলেন। বাম গণতান্ত্রিক জোট শুরু থেকেই আলাদাভাবে ও অন্যান্য মিত্র শক্তিকে নিয়ে এই আন্দোলনকে অগ্রসর করছিল, সুনির্দিষ্টভাবে হাসিনা সরকারের পদত্যাগের দাবিকে সামনে নিয়ে এসেছিল। এই আন্দোলনে চলাকালে ভূ-রাজনীতির প্রভাব এবং সাম্রাজ্যবাদী-আধিপত্যবাদী শক্তিসহ আন্তর্জাতিক শক্তিগুলোর সম্পৃক্ততাও ছিল। এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত তথ্য এখন পর্যন্ত না জানা থাকলেও এ কথা বলা যায় যে, তাদের মধ্যে যারা দীর্ঘদিন ধরে সরকারের পক্ষে-বিপক্ষে ছিল, এ সময় তারা তাদের সেই নিজ নিজ অবস্থান অনুযায়ী ভূমিকা পালন করেছিল। সরকারের পতনের পরেও তা অব্যাহত আছে। বহুল আলোচিত ‘কালার রেভ্যুলেশনের’ মাধ্যমে বিরাজনীতিকরণের ধারাকে সামনে এনে রাজনীতিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার প্রয়াসও এ সময় ছিল। দীর্ঘদিনের আলোচিত ‘মাইনাস টু ফর্মুলা’ এবং বিরাজনীতিকরণের শক্তিকে শক্তিশালী করে শাসক-শোষক শ্রেণির স্বার্থে ক্ষমতা বজায় রাখার চেষ্টাও ছিল। ভবিষ্যতে নানা তথ্য-উপাত্ত সামনে আসলে যাচাই-বাছাই করে এসব বিষয়ে পরিপূর্ণ মূল্যায়ন করা সম্ভব হবে।