স্মরণে কৃষকনেতা অচিন্ত্য বিশ্বাস

Posted: 27 জুলাই, 2025

খুলনার কৃষক আন্দোলনের অন্যতম কিংবদন্তি অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাসের মৃত্যুদিবস ২৮ জুলাই। দীর্ঘ রোগভোগের পর ২০১৬ সালে তিনি মারা যান। খুলনার বটিয়াঘাটা উপজেলার ফুলতলা গ্রামের বাসিন্দা অচিন্ত্য বিশ্বাস ছিলেন বাংলাদেশ কৃষক সমিতি খুলনা জেলা কমিটির সভাপতি। তিনি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি খুলনা জেলা কমিটিরও সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন। পেশাগতভাবে বটিয়াঘাটা কলেজের ইতিহাস বিভাগের শিক্ষক ছিলেন। ছিলেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস ১৯৯১, ১৯৯৬ এবং ২০০১ সালে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা-১ আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। প্রথম দুইবার তিনি দ্বিতীয় অবস্থানে ছিলেন। দ্বিতীয়বার, অর্থাৎ ১৯৯৬ সালে পরিস্থিতি এমন ছিলো যে, বটিয়াঘাটা এবং দাকোপ উপজেলার মানুষের মাঝে অসম্ভব জনপ্রিয় এই জননেতা জিতে যাবেন, আর আওয়ামী লীগের মধ্যে কোন্দলের কারণে একক প্রার্থী দেওয়া যাচ্ছে না, তখন অচিন্ত্য বিশ্বাস তথা সিপিবির বিজয়, কিংবা আওয়ামী লীগের পরাজয় ঠেকাতে দলের সভানেত্রী শেখ হাসিনা স্বয়ং দাঁড়ালেন এই আসন থেকে। বিএনপি, জামায়াত, জাতীয় পার্টির প্রার্থীও ছিলো, কিন্তু বিস্ময়কর ব্যাপার হলো- বিজয়ী শেখ হাসিনা এবং নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অচিন্ত্য বিশ্বাস ছাড়া বাকি সকল প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়। অচিন্ত্য বিশ্বাস তুমুল পরিচিতি আর জনপ্রিয়তা পেয়েছিলেন ১৯৯৫ সালে। সে বছর বটিয়াঘাটার আমিরপুর, ভান্ডারকোট, বালিয়াডাঙ্গাসহ কয়েকটি ইউনিয়নে অবৈধ চিংড়ি ঘেরের বিরুদ্ধে জোরদার আন্দোলন হয়েছিলো। একজন নিহত হন। তিনি ছিলেন কড়িয়া গ্রামের কৃষক জাবের শেখ। বেশ কয়েকজন গ্রেপ্তার হয়ে কারা নির্যাতন ভোগ করেন। গ্রেপ্তারকৃত নেতাদের মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস। সেই আন্দোলন ছিলো আদতেই গণআন্দোলন। শহর থেকে ভাড়া করে আনা গুন্ডাবাহিনীর বিরুদ্ধে কৃষক-জনতার প্রতিরোধ আন্দোলনে সন্ত্রাসীরা পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। উচ্ছেদ হয় অবৈধ ঘের। দক্ষিণাঞ্চলের নদীতে প্রতি ছয় ঘণ্টা পরপর জোয়ার এবং ভাটা হয়। জোয়ারে আসা নোনা পানি জমিয়ে বড় পুকুরে মাছ চাষ করার প্রক্রিয়া ঘের নামে পরিচিত। মাইলের পর মাইল জুড়ে নোনা পানির ঘের থাকলে সেই এলাকার মাটিতে লবণাক্ততা (ঝধষরহরঃু) বৃদ্ধি পায়, যা মাটির স্বাভাবিক কৃষি উৎপাদন ক্ষমতা বিঘি্নত করে। তাছাড়া আরও কিছু পরিবেশ-প্রতিবেশগত সমস্যাও তৈরি হয়। শুধু তাই নয়, এসব ঘেরের বেশিরভাগ মালিক ছিলো খুলনা এবং সাতক্ষীরা শহরের কোটিপতি ব্যবসায়ী। কৃষকদের অস্ত্র দেখিয়ে জোর করে অনেক জায়গায় জমি দখল করা হতো। ঘের করার জন্য ইজারা নেওয়া জমির জন্য প্রদেয় টাকা, যা স্থানীয়ভাবে হারি নামে পরিচিত, সেটিও ঠিকভাবে অনেকসময় পরিশোধ করা হতোনা। তাছাড়া ঘের মালিকদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, সহিংসতাও হতো। এসমস্ত কারণে খুলনা, যশোর ও সাতক্ষীরার বিস্তির্ণ অঞ্চল জুড়ে ১৯৮৯-৯০ সালের দিকে বিরাট আন্দোলন গড়ে ওঠে। বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি নেতা কমরেড রতন সেনের নেতৃত্বে পরিচালিত হয় আন্দোলন। জাতীয় কৃষক সমিতি, কৃষক সংগ্রাম সমিতিসহ আরও কয়েকটি বামধারার কৃষক সংগঠনও অগ্রণী ভূমিকা রেখেছিলো। ১৯৮৮ সালে যশোরের কেশবপুরে ডহুরী বাঁধ কাটার আন্দোলনে গোবিন্দ দত্ত নামে এক স্কুল শিক্ষক নিহত হন। ১৯৮৯ সালে খুলনার পাইকগাছায় ঘেরবিরোধী আন্দোলনে প্রাণ দেন করুণাময়ী সরদার। ১৯৯০ সালে খুলনা ও যশোরের বিশাল এলাকাজুড়ে বিস্তৃত বিল ডাকাতিয়ার জলাবদ্ধতা নিরসনের দাবিতে পরিচালিত হয় দুর্বার আন্দোলন। এইসব আন্দোলন-সংগ্রাম আর রক্তপ্রবাহের ভেতর দিয়েই রচিত হয় বটিয়াঘাটার আন্দোলন। অধ্যাপক অচিন্ত্য বিশ্বাস ছিলেন কৃষক-জনতার প্রাণের মানুষ। ১৯৯৬ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে যেদিন অচিন্ত্য বিশ্বাস মনোনয়নপত্র জমা দিতে যাবেন, সেদিন মিছিল শুরুর আগে বর্ষীয়ান একজন কৃষক অচিন্ত্য বিশ্বাসের হাতে কিছু টাকা তুলে দেন। বলেন, মাছ ধরার টাকা প্রতিদিন একটু একটু করে জমিয়ে তিনি এই টাকাটা এনেছেন কাস্তে মার্কার নির্বাচনী তহবিলের জন্য। বটিয়াঘাটা কলেজের শিক্ষক অচিন্ত্য বিশ্বাস তাঁর কলেজ প্রাঙ্গণেই সেই বৃদ্ধ কৃষকের পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে টাকাটি গ্রহণ করেন। এমনই বিনয়ী আর সজ্জন মানুষ ছিলেন তিনি। কারও সাথে একবার পরিচয় হলে ভুলে যেতেন না। মনে রাখতেন সবসময়। অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন তিনি। ১৯৮৪ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রথম শ্রেণি পেয়েছিলেন এমএ পরীক্ষায়। বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়নের সাথে যুক্ত ছিলেন, তবে শীর্ষ কোনো পদে ছিলেন না। ছাত্রজীবন শেষে কৃষক সংগঠনে যুক্ত হন। নিজ এলাকাতেই থাকতেন। যোগাযোগ ছিলো বাংলাদেশ রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মিলন পরিষদের সাথে। শিক্ষক হিসেবে যথেষ্ট আন্তরিক ছিলেন। একজন ছাত্রনেতার প্রথম কাজ ঠিকভাবে পড়াশুনা করা, এ কথা প্রায়ই বলতেন। ব্যক্তিগত জীবনে অকৃতদার ছিলেন অচিন্ত্য বিশ্বাস। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পর বিভিন্ন কারণে রাজনীতি থেকে খানিকটা নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েন অচিন্ত্য বিশ্বাস। শারীরিক অসুস্থতা ছিলো তার অন্যতম কারণ। ইউরেশিয়া রোগে আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। অবশেষে ২০১৬ সালের ২৮ জুলাই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। লেখক : সদস্য, সিপিবি, খুলনা জেলা কমিটি