‘২০ বছর লে মজুরির কথাই বলছি’
Posted: 06 জুলাই, 2025
‘২০ বছর লে চা পাতা তুলছি। যখন লে পাতা তুলছি মজুরির কথাই বলছি, কেউ ত নায় শুনলো। আপনাদের মতন সাংবাদিক আসে ছবি তুলে লিয়ে চলে যায় কিন্তু হামাদের দাবি গিলা এমনি রয়ে যায়। দাবি আদায় আর নায় হয়।’
এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন মৌলভীবাজার জেলার শ্রীমঙ্গলের সাতগাঁও চা বাগানের শ্রমিক প্রভা উরাং। গত ৩০ জুলাই (সোমবার) ৫০ বছর বয়সী এই নারীকে ক্লান্তিভরা শরীর নিয়ে সকাল থেকে চা পাতা তুলতে দেখা যায়।
প্রচণ্ড রোদ-বৃষ্টির মধ্যে চা পাতা তুলতে সমস্যা হয় কি না প্রশ্নের উত্তরে- তিনি বলেন, ‘কি করার আছে। ছোট বেলালেই পুঞ্জি কামে যাইতম, পরে পাতা তুলতে আইলম। হামদের অভ্যাস হয়ে গেছে। তবে বর্ষাকালে খুব সমেস্যা হয়, মেঘ আইলে থাকার কোন ঘর নাইখে সেকশনে।’
চা বাগানের তথ্য বলছে, বর্তমানে ১৭৮ টাকা দৈনিক মজুরি (২৪ কেজি পাতা হিসাবে) পান একজন চা-শ্রমিক। যদি ২৪ কেজির বেশি পাতা তুলতে পারেন তবে ৬ টাকা কেজি হিসাবে বাড়তি অর্থ প্রদান করা হয়।
প্রভা উরাং এর সঙ্গে কথোপকথনের মধ্যে রাস্তার পাশে দেখা মিলে খাবার পানি বহনকারী ট্রাকের। চা-বাগানের সবচেয়ে বড় যে সংকট তা হচ্ছে সুপেয় পানি। কারণ প্রচণ্ড গরম আর তীব্র পরিশ্রমে পানি একমাত্র ওষুধ চা-শ্রমিকদের কাছে। অথচ চায়ের দেশ খ্যাত এই অঞ্চলটিতে সুপেয় পানির সংকট।
বাগানে পানি সরবরাহ থাকলেও বসতভিটায় সুপেয় পানি সংগ্রহ করতে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। সরেজমিন, সাতগাঁও চা-বাগানের ভিতরে বাসকারী শ্রমিকদের (বিশেষ করে শিশু-বৃদ্ধদের) সুপেয় পানি সংগ্রহ করার জন্য এক জায়গা অন্য জায়গায় যাতায়াত করতে দেখা যায়। বাগানের মধ্যে থাকা বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের পানি সরবরাহের মাধ্যমগুলো নষ্ট হয়ে পড়ে থাকতে দেখা মিলে।
বাগানের এক শ্রমিক কৈরই (ছদ্মনাম) জানান, একটা ওয়াটারএইড বসানো ছিল। কিছুদিন পানি পাওয়া যাচ্ছিলো। এখন নষ্ট হয়ে পড়ে আছে। সরকার তো কোন ব্যবস্থা করে নি। ম্যানেজার বাবু (বাগান কর্তৃপক্ষ) পানি দেয় নাহলে টিলায় যায় পানি আনি। ভাউচারে করে যে পানি দেয় তাতে একবেলা চললেও আরেকবেলা হয় না। আগে টিউবওয়েল ছিল কিন্তু পানি বের হয় না সব শুকিয়ে গেছে। তাই বাগানের সরবরাহ পানি এখন ভরসা।
তবে চাহিদার তুলনায় সরবরাহকৃত পানির পরিমাণ কম বলে অভিযোগ করেন তিনি।
শ্রীমঙ্গলের কয়েকটি বাগানের সরেজমিন তথ্য বলছে, পরিদর্শনকৃত চারটি বাগানের মধ্যে তিনটির বসবাসকারীদের অভিযোগ সুপেয় পানি ও পয়নিস্কাশন ব্যবস্থা সম্পর্কে।
চা-শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, এখানে আধাপাকা কিংবা মাটির ঘর বানিয়ে থাকতে হয়। উন্নতমানের কিংবা পাকা ঘর দেওয়ার অনুমতি নেয়। তাই আধুনিক শৌচাগার ব্যবস্থা নির্মাণ করা যায় না। বেশিরভাগ ক্ষেত্রে আমাদের এই সংকটের মুখোমুখি হতে হয়।
বাগান কর্তৃপক্ষ থেকে প্রাপ্ত সুবিধা :
এতকিছু সংকটের পরও কিছু নামমাত্র সহায়তা পেয়ে থাকেন চা-শ্রমিকেরা। রেশন হিসাবে তারা আটা আর উৎসবের সময়গুলোতে বরাদ্দ ও বোনাস পেয়ে থাকে। তাছাড়া বাগান হাসপাতালগুলোতে প্রাথমিক চিকিৎসার সহায়তা প্রদান করে কর্তৃপক্ষ। কিন্তু হাসপাতালগুলোকে এমবিবিএস চিকিৎসক নাই। তবে, প্রাপ্ত সুবিধাগুলো চাহিদার তুলনায় খুবই সামান্য বলে মন্তব্য চা-শ্রমিক আন্দোলনের সংগঠক প্রশান্ত কৈরীর।
চা-শ্রমিক প্রভা উরাং-এর পরিবারের সদস্য সংখ্যা ৭ জন। তার মধ্যে তিনি শুধু চা-শ্রমিক হিসাবে বাগান কর্তৃপক্ষের থেকে মাত্র তিন কেজি আটা পান (সপ্তাহে একবার)। প্রাপ্ত তিন কেজি আটা দিয়ে তার সংসারের সদস্যদের ৭ দিন চলতে হয়। পরিবারে শিশু সন্তান থাকলে তার জন্য আলাদাভাবে আটার বরাদ্দ থাকে বলে জানা গেছে।
তবে, রেশন হিসাবে আটা ছাড়া অন্য কোনো সুযোগ কিংবা খাদ্য সহায়তা পান না বলে জানান বাগানের শ্রমিক আলাউরা।
তিনি বলেন, ‘হামরা সবসময়েই আন্দোলন করি। মৌলভীবাজার যাই, সিলেট যাই মিছিল করতে। বাকিন হামদের কথা ত কেউ নায় শুনে। মজুরি কম দেয় বলে হামরা আনারস বাগানে কাজ করি। কতবার আটা বাড়াই দিবার লাগি বলেছিলম বাকিন হামদের কথা কানেই নায় লিল।’
বাগানের কর্মরত এক চা-শ্রমিক জানান, কত বড় বড় সরকারি কর্মকর্তা আসে ঢাকা থেকে- বোর্ড থেকে। সবাইকে অভিযোগ দি...। ছবি তুলে কাগজে লিখে নিয়ে চলে যাই কিন্তু কোন দাবি আদায় হয় না। মজুরি বাড়ানোর কথা বলতে বলতে নিজেকে এখন দোষী মনে হয়।
পেটের জন্য সব আন্দোলনে যেতে রাজি চা-শ্রমিকেরা। সামনে যদি বৃহত্তর আন্দোলনের ডাক আসে তবে কাজ বাদ দিয়ে আবারো রাজপথে নামতে প্রস্তুত তারা।
আন্দোলন করতে করতে বয়স শেষ, যে কদিন বাঁচবেন সে কদিনও আন্দোলন করে যাবেন বলে জানান প্রভা উরাং।
সম্প্রতি, শ্রীমঙ্গলে চা শ্রমিকদের অধিকার আদায়ের লক্ষ্য নিয়ে সম্মেলন সমাপ্ত করেছে ‘চা শ্রমিক ট্রেড ইউনিয়ন কেন্দ্র’। সম্মেলনের আয়োজকেরা চা-শ্রমিকদের ভূমির অধিকার, ৬০০ টাকা দৈনিক মজুরি, শিক্ষা-স্বাস্থ্য ও সকল নাগরিক অধিকারসহ ১০ দফা দাবি তুলে ধরেন।