বাংলাদেশ এখন কোথায়?

Posted: 06 জুলাই, 2025

চব্বিশে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর মানুষের মনে নতুন এক স্বপ্নের বাসা বাধে। ৫ আগস্ট পরবর্তী সময়ে দেশের মানুষের মনে নতুন করে গণতান্ত্রিক আকাঙ্ক্ষার জাগরণ ঘটে। গণঅভ্যুত্থানের পর শ্রমিকেরা ভেবেছিল বেতন বৈষম্য কাটবে, শ্রমজীবী মানুষ তার মজুরি পাবে। কৃষক তার ধানের দাম পাবে, নারী পাবে নিরাপত্তা। অথচ গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে দেশের মধ্যে ঘটতে দেখা যায় সহিংসতা, ধর্ষণ ও মব তৈরি করে হত্যার মতো ঘটনা। গণঅভ্যুত্থান স্বাক্ষী দেয় আত্মত্যাগের। জুলাইয়ে আমাদের নারীরা নেমে এসেছিল নিরাপত্তার দাবিতে, গণতন্ত্রের দাবিতে। কিন্তু গণঅভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে মানুষের মনে ক্ষোভ আর নানা দ্বিধাদ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছে। অভ্যুত্থান নিয়ে নানা সমীকরণ চালাচ্ছে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নিজস্ব এজেন্ডায়। আন্দোলনকে নিজস্ব সম্পত্তি বানিয়ে তুলছে একটি পক্ষ। সম্প্রতি দেশের মধ্যে আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিয়েও মানুষের মনে সংশয় তৈরি হয়েছে। মব আর ধর্ষণের ঘটনা অহরহ ঘটছে। আন্দোলনের নারীরা পিছু হাটছে গণঅভ্যুত্থানের আশা আকাঙ্ক্ষা থেকে। নির্বাচনের দাবিতে রাজনৈতিক দলগুলো গত ১০ মাস ধরে দাবি জানিয়ে আসছে। কিন্তু আন্দোলনের মালিক দাবি করা একটি গোষ্ঠী- ক্ষমতা কুক্ষিগত করার চেষ্টায় মগ্ন। সরকার নির্বাচনের বিষয়ে অগ্রগতি না দেখিয়ে সংস্কারের নামে টালবাহনা করছে, বলে মনে করেন গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের নেতারা। নির্বাচন, মব, ধর্ষণ–এ তিনটি শব্দ বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে বেশি আলোচিত। এই শব্দগুলো দেশের মানুষকে ভাবিত যেমন করছে, একই সঙ্গে ভবিষ্যৎ ভাবনায় অহর্নিশ করছে উদ্বিগ্ন। নির্বাচন কবে হবে কিংবা হওয়ার মতো কোনো দৃশ্যমান আলামত আদৌ আছে কি না, মব ভায়োলেন্সের নামে খুনখারাবি-দখলদারত্ব-লুটপাট আর কতদিন চলবে, নারী-শিশুরা আর কতদিন ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হবে, শুধু মুখের কড়া বার্তা দিয়ে রাষ্ট্র আর কতদিন এগুলোকে প্রশ্রয় দেবে–এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর জানা নেই সাধারণ মানুষের। নির্বাচনের কথার টেবিলে একদল বলছে, সংস্কার শেষ না হওয়া পর্যন্ত তারা নির্বাচন চায় না, আরেক দল বলছে জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হতে হবে। আবার দাবি আছে আনুপাতিক বা পিআর পদ্ধতির নির্বাচন নিয়েও। দীর্ঘ দেড় দশক ধরে দেশের মানুষ ভোটারধিকার বঞ্চিত। তারা ভেবেছিল, শেখ হাসিনা সরকারের পতন হলে দেশে একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পথ রচিত হবে। কিন্তু গত ১০ মাসে এর কোনো নমুনা দেখা যাচ্ছে না। সম্প্রতি ‘লন্ডন বৈঠকে’ অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূস বলেছেন, ‘প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন করা গেলে ২০২৬ সালে রমজান শুরু হওয়ার আগের সপ্তাহে দেশে জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। তবে সেক্ষেত্রে সংস্কার ও বিচারের বিষয়ে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করা প্রয়োজন হবে।’ বিএনপি এ বছরের ডিসেম্বরের মধ্যে নির্বাচনের দাবিতে অনড় থাকলেও ওই বৈঠককে তারা ইতিবাচক হিসেবেই দেখেছে। তবে জাতীয় ঐক্য কমিশনের বৈঠকে ঐক্যের নামে বারবার অনৈক্য, প্রধান ইস্যুগুলোতে দলগুলোর বিপরীতমুখী অবস্থান আর বিচারের নামে পুরোনো কায়দায় প্রহসন নির্বাচন নিয়ে নতুন করে সংশয়-সন্দেহের উগ্রেক করছে। ‘লন্ডন বৈঠকের’ তিন সপ্তাহ যেতে না যেতেই নির্বাচন নিয়ে ফের আশঙ্কা ও অনিশ্চয়তা উঁকি দিচ্ছে। অনেকে আবারও ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছেন। অনেকেই মুখে না বললেও ইউনূস সরকারের প্রতি সাধারণ মানুষের এক ধরনের অনাস্থা আর অবিশ্বাস যে বেড়েই চলেছে, সেটিও ক্রমশ স্পষ্ট হচ্ছে। মানুষ এখন আর এ সরকারের ওপর ভরসা রাখতে চাচ্ছে না। এ সরকারকে ঘিরে স্বপ্ন দেখতে চাচ্ছে না। বরং ভোটের মাধ্যমে জনগণ চাইলে যে কাউকে যে ক্ষমতায় বসাতে পারে বা ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলতে পারে, দেশবাসী এখন সেই অধিকারেরই প্রয়োগ চাচ্ছে। মানুষ দ্রুত সময়ে ভোটের একটা আয়োজন দেখতে চাইছে। রাজনৈতিক অঙ্গনের এই টালমাটাল পরিস্থিতিতে থেমে নেই ‘মব ভায়োলেন্স’ও। আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক)-এর তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে ২০২৫ সালের মে পর্যন্ত ১০ মাসে দেশে মব সৃষ্টির মাধ্যমে হত্যার শিকার হয়েছেন মোট ১৭৪ জন। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে ৮০ জন, খুলনা বিভাগে ১৪ জন, রাজশাহী বিভাগে ১৬ জন, রংপুর বিভাগে ৭ জন, সিলেট বিভাগে ৫ জন, চট্টগ্রাম বিভাগে ২৯ জন, বরিশাল বিভাগে ১৭ জন এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৬ জন। সরকারের পক্ষ থেকে বারবার ‘মব ভায়োলেন্সের’ বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা বলা হলেও কার্যত এতে কোনো ফল হচ্ছে না। কথিত উত্তেজিত জনতার নামে একের পর এক ঘটানো হচ্ছে অপ্রীতিকর ঘটনা। এতে জনজীবনে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা বাড়ছে। অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে দ্রুত সময়ের মধ্যে বিচার না হওয়ার সংস্কৃতি আছে। মানুষ কোনো আচরণে ক্ষুব্ধ হলে নিজেই প্রতিশোধ নিতে চায়। আবার নেহায়েত স্বার্থ হাসিল বা অন্যকে ঘায়েল করার জন্যও অন্যের ওপর চড়াও হয়। এখন এগুলোই হচ্ছে। মব আইনের শাসনের পরিপন্থি একটি বিষয়। এটিকে দ্রুত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ছড়াবেই। এর জন্য দায় যেমন সরকারকে নিতে হবে, নিয়ন্ত্রণমূলক ব্যবস্থাগ্রহণের দায়িত্বও সরকারেরই। এসময়ে মাগুরায় আছিয়া ধর্ষণের নির্মমতা নিশ্চয়ই মানুষ ভুলে যায়নি। দেশে নারী নির্যাতন ও যৌন নিপীড়ন কমছেই না। বরং নারীর প্রতি সহিংসতা বাড়ছে নানান মাত্রায়। প্রতিদিনই দেশের কোথাও না কোথাও নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন নারী। কী পরিবার, সমাজ বা কর্মস্থল–কোথাও যেন নারীর নিরাপত্তা নেই। এ নিয়ে সরকার বিভিন্ন সময় কড়া বার্তা দিলেও অপরাধীদের লাগাম টানা যাচ্ছে না। সবশেষ কুমিল্লার মুরাদনগরে এক গৃহবধূকে ধর্ষণের ঘটনা নতুন করে আলোড়ন তুলেছে। গত ২৬ জুন দিনগত রাতে মুরাদনগর উপজেলার একটি গ্রামে বসতঘরের দরজা ভেঙে ওই নারীকে (২৫) ধর্ষণের অভিযোগ ওঠে স্থানীয় ফজর আলী নামে এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। ভুক্তভোগীকে বিবস্ত্র করে মারধরের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। এ নিয়ে সারাদেশে ওঠে সমালোচনার ঝড়। এরই মধ্যে ধর্ষণ ও বিবস্ত্র করে নির্যাতনের ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় থানায় পৃথক দুটি মামলা করেছেন ভুক্তভোগী নারী। ফজর আলীসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। তবে ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা ধর্ষণের মতো অভিযোগ ছাপিয়ে তার রাজনৈতিক পরিচয় নিয়ে চলছে টানাহেঁচড়া। এভাবেই একের পর এক ধর্ষণ-গণধর্ষণের ঘটনা ঘটছে, আবার নতুন ঘটনায় সেগুলো চাপাও পড়ছে। বিচারের বাণীর এই নীরব কান্নায় কেবলই ভারী হচ্ছে বাংলাদেশের আকাশ! নির্বাচন নিয়ে ধোঁয়াশা দ্রুত কেটে যাক, মব ভায়োলেন্স শক্ত হাতে দমন হোক, ধর্ষকের হৃদপি- কেঁপে উঠুক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিতে–দেশের মানুষ এখন এর বাইরে কিছু বুঝতে চাইছে না।