ফিরে দেখা শাহবাগের গণজাগরণ

Posted: 11 ফেব্রুয়ারী, 2024

শাহবাগ আন্দোলন, ২০১৩ সালের ৫ ফেব্রুয়ারিতে গড়ে উঠেছিল- ১৯৭১ এর যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিকে কেন্দ্র করে। যুদ্ধাপরাধের বিচারের জন্য গঠিত ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল’ এই দিন রাজাকার কাদের মোল্লার বিচারের রায় ঘোষণা করেন। কবি মেহেরুন্নেসাকে হত্যা, একটি গ্রামের ৩৪৪ জন মানুষ হত্যাসহ পাঁচটি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরেও সর্বোচ্চ শাস্তি না দিয়ে তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়া হয়েছিল। সাধারণ মানুষ এই রায় মেনে নিতে পারেনি। যুদ্ধাপরাধীদের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে লক্ষ লক্ষ মানুষ শাহবাগের আন্দোলন অংশ নিয়েছিল। আন্দোলন ছড়িয়ে পড়েছিল সারা দেশে, গণজাগরণমঞ্চের আদলে। এই আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল এর অহিংস, নান্দনিক, শিল্পিত ও নারীবাদী চরিত্র। নারীবাদী চরিত্র বলতে আমি যা দেখেছি তা হচ্ছে, এই আন্দোলনে নারী পুরুষের স্বাধীন, স্বতঃস্ফূর্ত, নিঃসংকোচ, মানবিক সম-অংশগ্রহণ। বৃদ্ধ মাতা এসেছেন তাঁর সন্তানের হাত ধরে, শিশুকে কোলে নিয়ে এসেছেন তরুণী মাতা। সকল মুক্তিযোদ্ধাদের ‘মা’ শ্রদ্ধেয় জাহানারা ইমামের বিশাল ছবি যেন এক প্রতীকী মাতৃঅস্তিত্বের উপস্থিতি, যা ধারণ করেছিল শাহবাগ আন্দোলনের অবয়ব। শাহবাগ আন্দোলন গড়ে ওঠার ঐতিহাসিক পটভূমি রচিত হয়েছিল, এই মহীয়সী নারীর সাহসী ভূমিকায়। তাঁর দীর্ঘদিন ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির অগ্রভাগে থেকে যুদ্ধাপরাধীর বিচারের দাবি নিয়ে নিরলস সংগ্রামের ধারায়। শুরু থেকেই সঙ্গীতে, স্লোগানে, মোমের আলোয়, ফুলের আলপনায়, নাটকের সংলাপে, দেয়ালের রঙিন গ্রাফিতিতে, সারিবদ্ধ ল্যাপটপ স্ক্রিনের আলোয় শাহবাগ হয়ে উঠেছিল এক জীবন্ত শিল্প, একটি লিভিং আর্ট, যা উৎসারিত হয়েছিল জাতীয় সংগ্রামের মর্মমূল থেকে, সৃজনশীল উদ্ভাবনে এবং নারী, শিশু ও আদিবাসীদের অন্তর্ভুক্তিতে, মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে ধারণ করে। বাংলাদেশে সামাজিক রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে, এই বুদ্ধিবৃত্তিক আয়োজন এবং শিল্পিত নান্দনিক প্রকাশ ছিল অভূতপূর্ব। শাহবাগের আন্দোলনের বিরুদ্ধে ঘৃণা প্রকাশ, বিরূপ সমালোচনা, ছিদ্রান্বেষণ শুরু হয়েছিল সেই ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি থেকেই। এটা শুরু করে যুদ্ধাপরাধী রাজাকার আলবদরের রাজনীতির বর্তমান অনুসারী, তাদের সহযোগী ও মুখোশধারী পৃষ্ঠপোষকেরা। আজকেও সামাজিক মাধ্যমে শাহবাগ নিয়ে পোস্টের কমেন্টে সেইসব চরিত্র দেখা যায়, যারা শাহবাগকে ঘৃণা করে, কারণ তাদের রাজনৈতিক নেতা ও মিত্র একাত্তরের ঘাতক ধর্মব্যবসায়ী যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। শাহবাগ আন্দোলন সংগঠিত না হলে, এই বিচার সম্পন্ন করা সম্ভব হতো না। শাহবাগ আন্দোলনের প্রতি এই ঘাতক রাজনীতির অনুসারীদের ঘৃণা প্রকাশ তাই স্বাভাবিক। শাহাবাগের আন্দোলনের বিপক্ষে ঘৃণা প্রচার শুরু হয়েছিল বিএনপি-জামাত সমর্থিত পত্রিকায়, চেষ্টা হয়েছিল আন্দোলনটিকে ‘ধর্ম বিরোধী’ রঙে চিত্রিত করায়। এটি ছিল একটি অসৎ রাজনৈতিক প্রোপাগান্ডা। লেখা হয়েছিল পুস্তিকা, যা শাহবাগ আন্দোলনকে ‘সরকারি ষড়যন্ত্র’ হিসেবে ব্যাখ্যার চেষ্টা করেছিল। এর বাইরে ‘সাহিত্য’ রূপে প্রথম আলোর মত পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল শাহবাগ আন্দোলনের নারী নেত্রীদের চরিত্র হননের ‘গল্প’। এমনকি বিরূপ সমালোচনা হয়েছে বিদেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেখানে শাহবাগ আন্দোলনকে ‘সহিংস’ দেখানোর চেষ্টা করা হয়েছে। আজকে শাহবাগ আন্দোলনের একদশক পেরিয়ে যাওয়ার পরে, এই আন্দোলনের সাথে যুক্ত ছিলেন এমন অনেকের মাঝেও শাহবাগ আন্দোলনের সাফল্য নিয়ে প্রশ্ন দেখা যাচ্ছে। একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন যে, শাহবাগ আন্দোলন গড়ে উঠেছিল একটি সুস্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট দাবীর ভিত্তিতে। দাবিটি ছিল ১৯৭১ এর ঘাতক যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও সর্বোচ্চ শাস্তি বিধান। এই সুনির্দিষ্ট লক্ষ্যকে বিবেচনায় নিলে, শাহবাগ আন্দোলন, নিকট অতীতের একটি অন্যতম সফল আন্দোলন। একাত্তরের ঘাতক দালাল যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হয়েছে। সাধারণ মানুষ যে কারণে আন্দোলনে যুক্ত হয়েছিল সেই মূল দাবি অর্জিত হয়েছে। মুক্তিযুদ্ধের পরে বাঙালির রাজনৈতিক জীবনে শাহবাগ এক নতুন অধ্যায়ের ও নতুন রূপের গণসংগ্রাম। মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথা যেমন এখনো রচিত হচ্ছে, তেমনই শাহবাগের অভিজ্ঞতা নিয়েও লেখা হবে, আগামীতে। এদেশের মানুষের রাজনৈতিক জীবনে আবারো শাহবাগ ফিরে আসবে, বৈষম্য ও সহিংসতা পীড়িত এই জনপদে সাম্য ও শান্তির সংগ্রামে। আগামীতে জাতীয় অধিকারের যে কোনো আন্দোলনে, শাহবাগের অভিজ্ঞতা গণসংগ্রামের অহিংস নীতি ও নান্দনিক চরিত্র নির্ধারণে ভূমিকা রাখবে। লেখক : লেখক ও গবেষক